ঢাকা, শুক্রবার 15 September 2017, ৩১ ভাদ্র ১৪২8, ২৩ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ত্রাণ তৎপরতায় কেন এই বাধা

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : মিয়ানমারের নৃশংস বর্বর সরকারের নির্যাতনের হাত থেকে যে রোহিঙ্গা মুসলিম মানুষেরা প্রাণ নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে এসেছেন, তাদের বাঁচাতে বিপুল পরিমাণ ত্রাণ চাই। বাংলাদেশ সরকার কখন এ নিয়ে কী বলছে, তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। প্রথমে তারা সীমান্তে বিজিবি মোতায়েন করে এই রোহিঙ্গা জনস্রোত ঠেকানোর চেষ্টা করেছে। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, অতো সংখ্যক রোহিঙ্গাকে তারা আবার রাখাইনের মৃত্যুপুরীতে ফেরত পাঠিয়েছে। আতঙ্কে কেঁপে কেঁপে উঠেছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। যে হাজার হাজার মানুষকে বিজিবি ফেরত পাঠাচ্ছে, কী পরিণতি হবে তাদের? সরকার গর্বের সঙ্গে এই অমানবিক কাজকে তাদের কৃতিত্ব বলে জাহির করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন সরল ছিল না। মিয়ানমার সরকার পুরো রাখাইন রাজ্য জুড়ে চালিয়েছে গণহত্যার উৎসব। সে হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞ এখনও চলছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও মগ বর্বরেরা মুসলমান অধ্যুষিত এই এলাকার গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ সীমান্তে দাঁড়িয়ে আগুনের সে লেলিহান শিখা প্রতি মুহূর্তে জ্বলতে দেখা যাচ্ছে।
পাহাড়-জঙ্গল, নদী-সমুদ্র পেরিয়ে শুধুমাত্র প্রাণ বাঁচাতে প্রতিদিন হাজারে হাজারে রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। পুরুষদের দলে দলে হত্যা করছে মিয়ানমার বাহিনী। হাজার হাজার মানুষকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলছে। মায়ের কোল থেকে শিশুদের কেড়ে নিয়ে আছড়ে মেরে ফেলছে। মায়ের সামনেই খুন করছে তার স্বামী-পুত্রদের। কোনো কোনো পরিবারে খুন হয়েছে সবাই। শুধু বেঁচে আছেন মা ও তাদের শিশু সন্তান। শুধুমাত্র বাঁচার আকুতি নিয়ে তারা কেবলই বাংলাদেশের দিকে ছুটেছেন। বনে-জঙ্গলে খেয়েছেন লতাপাতা। হারিয়েছেন সহায় সম্বল সম্ভ্রম। তারপর এসেছেন নো-ম্যান’স ল্যান্ডে। মিয়ানমার বাহিনী সে দিকে ছুঁড়েছে গুলি। আর সেই সুযোগে মিয়ানমানের সেনাবাহিনী তাদের ফেরার পথে স্থাপন করেছে নিষিদ্ধ স্থল মাইন। যাতে মিয়ানমারে ফেরার চেষ্টা করলে সে মাইন বিস্ফোরণে উড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তারা। এর মধ্যে প্রতিদিন খবর আসছে, মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ গেছে রোহিঙ্গাদের। প্রাণ যাচ্ছে বাংলাদেশিদেরও। বাংলাদেশিদের প্রাণ যাচ্ছে এই কারণে যে, মিয়ানমার বাহিনী সীমান্ত লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের ভেতরে এসে মাইন পুঁতেছে। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিয়ানমার বাহিনী ও তাদের পোষা বৌদ্ধ পিশাচদের বর্বরতার শত শত ভিডিও চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। তার দিকে চোখ রাখা যায় না। কান্না দমন করা যায় না। মানুষ মানুষের ওপর এমন বর্বর নির্যাতন করতে পারে, তা কল্পনারও অতীত। এই পৈশাচিক গণহত্যা পৃথিবীর সমস্ত বর্বরতাকে হার মানিয়েছে। ভিয়েতনামের মাই লাই হত্যাকান্ড, যুগোস্লাভিয়ার বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, রাশিয়ার চেচনিয়া বা কসোভোর সকল বর্বরতাকে নস্যি করে দিয়েছে মিয়ানমারের গণহত্যাকারী সেনাবাহিনী। এমন কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও একযোগে এমন হত্যাকান্ডের ঘটনা বিরল। আধুনিক পৃথিবীতে এত বড় মানবিক বিপর্যয় আর ঘটেনি। সংবাদপত্রের রিপোর্টে বলা হয়েছে, যে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা ইতোমধ্যে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তাদের ৮০ শতাংশই নারী ও শিশু। তবে কি সেখানকার বেশির ভাগ পুরুষকেই নিধন করা হয়েছে? আমরা নিশ্চিত করে তা বলতে পারি না। কিন্তু নিধনযজ্ঞ চলছে।
এই পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকার বললো যে, বাংলাদেশের একার পক্ষে এই রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা দরকার। এই আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য প্রথমেই এগিয়ে এসেছে তুরস্ক সরকার। তুর্কি প্রেসিডেন্ট তাইয়্যেব এরদোগান তার স্ত্রীকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিলেন পরিস্থিতি সম্যক উপলব্ধি করতে। তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, এই বিপদের দিনে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা মুসলমানদের প্রতি মুসলিম বিশ্বের সমর্থনের জন্য। এরপর ধীরে ধীরে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতি নির্মূলের অভিযোগ ওঠে সারা বিশ্বে। গোটা পৃথিবী এখন রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে এখন মুখর। জাতিসংঘ ও এর বিভিন্ন সংস্থা মিয়ানমার সরকার কর্তৃক রোহিঙ্গা জাতি নির্মূলের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই নিধনযজ্ঞে মিয়ানমার সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে ভারত, চীন ও রাশিয়া। সেখানে এক এক রাষ্ট্রের এক এক ধরনের স্বার্থ।
দ্বিধা-দ্বন্দ্ব পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বলেছে, যত দিন মিয়ানমার তাদের ফিরিয়ে না নিচ্ছে, ততোদিন সরকার তাদের খাদ্যের সংস্থান করবে, আশ্রয় দেবে। এতে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের জন্য সাধুবাদ উচ্চারিত হয়েছে। অনেক দেশ ইতিমধ্যে ত্রাণ পাঠিয়েও দিয়েছে। কোনো কোনো দেশের ত্রাণবাহী জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেছে। অনেক দেশ আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকারও বলেছে যে, উদ্ভুত পরিস্থিতি সরকারের পক্ষে একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কার্যত রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যা একটি জাতীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে। এই সঙ্কট মোকাবিলায় সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। সে সহযোগিতা দানে প্রস্তুত আছে বাংলাদেশের মানুষ। কিন্তু সরকারের মনোভাব তার অনুকূল নয়।
গত বুধবার ২২টি ট্রাকে করে প্রায় দেড় শ’ টন ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল রওয়ানা হয়েছিল রোহিঙ্গাদের ত্রাণ শিবিরের উদ্দেশ্যে, বিতরণের জন্য। কিন্তু রওয়ানা হবার আগেই ‘উপরের মহলের নির্দেশে’ পুলিশ ত্রাণবাহী ট্রাকগুলোকে ঘিরে ফেলে এবং ট্রাকের চাবি নিয়ে নেয়। ঐ এলাকায় ত্রাণ বিতরণের ঘোষণা বিএনপি আগেই দিয়েছিল। পুলিশের বক্তব্য হলো, ত্রাণ দিতে হলে ডিসি অফিসের অনুমোদন লাগবে। সে অনুমোদনের জন্য বিএনপি নেতারা ডিসি অফিসে হাজির হলে দেখা যায় তিনি অফিসে নেই। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকও কোনোরূপ অনুমোদন দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এভাবে বাধার মুখে পড়ে ত্রাণ দলের নেতা মির্জা আব্বাস সাংবাদিকদের বলেন, আমরা কক্সবাজারে ত্রাণ দিতে এসেছি, রাজনীতি করতে আসিনি। আশা করি কর্তৃপক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। এ সব ট্রাকে ত্রাণ সামগ্রী হিসেবে রয়েছে চাল, ডাল, চিড়া, চিনি, তেল, খাবার পানি, আশ্রয় স্থলের ওপরে ছাউনি দেওয়ার পলিথিন প্রভৃতি। এগুলোই এই মুহূর্তে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রী। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ঐ বুধবারই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দুই হাজার রোহিঙ্গাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও কাপড় বিতরণ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বিএনপিকে যদি ডিসি অফিস ত্রাণ বিতরণের অনুমোদন না দিয়ে থাকে, তা হলে আওয়ামী লীগকে কেন সে অনুমোদন দেওয়া হলো। তাদের ত্রাণ সামগ্রী কেন ডিসি অফিসে জমা দিতে বলা হলো না?
কক্সবাজারে যদি ইতিমধ্যে চার লাখ উদ্বাস্তু বিপন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে থাকেন, আর তাদের জন্য যদি দৈনিক ২৫০ গ্রাম করে চালের ব্যবস্থা করতে হয়, তাহলে সরকারের প্রতিদিন প্রয়োজন হবে ১০০ টন অতিরিক্ত চাল বা খাদ্যসামগ্রী। এভাবে দরকার হবে লক্ষ লক্ষ টন চালের। কিন্তু সে চাল নেই বাংলাদেশ সরকারের খাদ্যগুদামে। সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে, সরকারি খাদ্য গুদামে আছে মাত্র তিন লাখ টন চাল। তাতেও রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। গুদাম থেকে এসব চালের সিংহভাগই চুরি হয়ে গেছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, খাদ্য গুদামে সংরক্ষিত প্রতিটি বস্তায় চাল থাকার কথা ৩০ কেজি। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেসব বস্তায় চাল আছে ১০ থেকে ১৩ কেজি করে। বাকিটা চুরি হয়ে গেছে। আশা করি, সরকার এই চুরির জন্য বিএনপিকে দায়ী করবে না। অর্থাৎ সরকারি গুদামে প্রকৃত পক্ষে বড় জোর চালের মজুত আছে সোয়া লাখ থেকে দেড় লাখ টন। ইতিমধ্যে সরকার ঘোষণা করেছে, তারা হাওড় এলাকার বন্যা দুর্গত মানুষদের মধ্যে বিনামূল্যে চাল বিতরণ করবে। সে ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দরিদ্র মানুষদের জন্য সস্তায় চাল বিতরণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাজারে চালের দাম বাড়ছে হু হু করে। ৪৫ টাকা কেজির নিচে কোনো চাল নেই। ইতিমধ্যেই দরিদ্র সাধারণ মানুষের মধ্যে নাভিশ্বাস উঠে গেছে।
প্রমাণিত হয়েছে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম চরম অথর্ব। যখন দেশে খাদ্য মজুত বাড়ানোর দরকার ছিল, তখন সেদিকে খেয়াল না করে প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করতে তিনি দিনরাত ব্যস্ত ছিলেন বিএনপি নেতাদের গালিগালাজে। আমাদের ঢেঁড়া পিটিয়ে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে খাদ্য রফতানি শুরু করেছে। আসলে সেটিও যে ধোঁকাবাজি ছিল, এখন তা প্রমাণিত হয়ে গেছে। মনে হয়, সরকারের সাফল্য দেখাতেই ওসব বাড়তি কথা  বলা হয়েছিল। প্রকৃত অবস্থা তখনও যে তিমিরে ছিল, এখনও সে তিমিরেই আছে। উপরন্তু তিনি খাদ্য কেনার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে সস্ত্রীক গিয়েছিলেন মিয়ানমারে। যেন মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের কিছুই হয়নি। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছেন। আওয়ামী এই বাকোয়াজির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বিএনপির ত্রাণের ট্রাক আটকে দিয়ে কাদের বলেছেন, রোহিঙ্গাদের মাঝে বিএনপির ত্রাণ বিতরণ লোক দেখানো প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি আরও বলেছেন যে, মিয়ানমার যতদিন রোহিঙ্গাদের ফেরত না নেবে, ততোদিন তাদের মানবিক সহায়তা দেওয়া হবে।
রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের পাশে দাঁড়াতে সাধ্যমতো প্রস্তুত আছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। কিন্তু সে সহায়তা ডিসি অফিসে জমা দিতে কেউ ভরসা পাচ্ছেন না। কেউই বিশ্বাস করেন না যে, সেখানে জমা দিলে তা সত্যি সত্যি দুর্গত উদ্বাস্তুদের কাছে পৌঁছবে। ডিসিকে এক হাত নিয়ে আওয়ামী ‘চাটার দল’ তা খেয়ে ফেলবে। যেভাবে তারা খেয়ে ফেলেছে সুরক্ষিত খাদ্য গুদামের চাল। সুতরাং ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে বাধাদান নয়, বরং সরকার জোন ভাগ করে দিতে পারে, ত্রাণ নিয়ে যাওয়া মানুষেরা কে কোথায় ত্রাণ বিতরণ করবেন। তাতে সরকারের ওপর চাপ বহুলাংশে কমবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ