ঢাকা, শুক্রবার 15 September 2017, ৩১ ভাদ্র ১৪২8, ২৩ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অস্থির চালের বাজারে আগুন দেয়া হল

এইচ এম আকতার: বাংলাদেশে চাল সংকটের সুযোগ নিয়ে আড়াই মাসের জন্য রফতানি নিষিদ্ধ করলো ভারত সরকার। এতে করে বাংলাদেশের অস্থির চালের বাজারে আগুণ লেগেছে। এদিকে চাল রফতানি নিষিদ্ধের কথা অস্বীকার করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তবে কোন কারণ ছাড়াই ঘন্টায় ঘন্টায় বাড়ছে চালের দাম। কোন পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকলে বাংলাদেশে সে পণ্য ঢুকিয়ে ড্যাম্পিং করা আর দাম বেশি হলে রফতানি বন্ধ করে বাজার আরও অস্তির করাই ভারতের কাজ। দীর্ঘ দিন ধরে তারা এ কাজটি করে আসলেও বাংলাদেশে তাদের বন্ধু হিসেবেই দেখছে। দীর্ঘ মেয়াদী এই কৌশলের কারণে এক দিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের কৃষকরা অন্যদিকে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন ভোক্তারা। এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে চাল নিয়ে। চালের বাজার এখন যেন পাগলা ঘোড়া।

জানা গেছে, মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশে চাল রপ্তানি করবে না ভারত। আগামী ৩০ নবেম্বর পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে বলে বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার।

মঙ্গলবার বন্দরে পৌঁছা ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ভারতে চালের মূল্য যাতে বৃদ্ধি না পায় এবং খাদ্য সংকট সৃষ্টি না হয়, সে কথা বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। তবে বাসমতি চাল এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকছে।

বন্যায় বোরো এবং আমনের ক্ষতির ফলে ভারতসহ পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। এ জন্য আমদানির শুল্কহার ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ২ শতাংশ করা হয়েছিলো।

এদিকে ভারতের পথেই হাঁটছে মিয়ানমার। খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম চাল কিনতে সপরিবাবে মিয়ানমার গেলেও সে দেশের সরকার চাল দেয়ার কথা নাকচ করে দিয়েছেন। এতে করে খালি হাতেই তাকে ফিরতে হয়েছে। খালি হাতে ফিরে তিনি এখনও দাম বৃদ্ধির ষড়যন্ত্র খুঁজছেন। তিনি বলছেন, চালের দাম ৮০ টাকা করার পাঁয়তারা চলছে।

খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছেন, দেশে চালের কোন সংকট না থাকলেও একটি সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে বাজার অস্থিতিশীল করে তুলছে। চাল নিয়ে যারা চালবাজি করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

 বেশ কিছুদিন ধরেই চালের বাজারে অস্থিরতা, হু হু করে বেড়েই চলেছে চালের দাম। পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও চালের দাম কেন বাড়ছে?, এ নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এমনটি জানান মন্ত্রী।

চালের বাজার ঠিক রাখতে রোববার থেকে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শুরু হচ্ছে ওএমএস।খাদ্যমন্ত্রী বলেন, হাওর অঞ্চলে ফসলহানিসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। ঘাটতি মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানি হচ্ছে। কিন্তু অসাধু একটি সিন্ডিকেট ভীতি ছড়িয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে চালের দাম বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

খাদ্যমন্ত্রী বলেন, কারা কারা চালের মজুদ গড়ে তুলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে তাদেরকে খুঁজে বের করার কাজ চলছে। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক ডেকেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

সূত্র মতে যখনই দেশের কোন পণ্যের দাম অস্থির হয়ে উঠে তখনই ভারত সরকার সে পণ্যের রফতানি বন্ধ করে বাজারে আগুণ লাগিয়ে দেন। সে পণ্য রফতানি বন্ধ হলেও চোরাই পথে তা ঠিকই বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এতে করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া তাদের জন্য সহজ হয়। 

অতীতেও দেখা গেছে, গত দু মাস আগে যখন পেয়াজের দাম বেড়ে গেল তখন বন্যার অজুহাতে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিল ভারত সরকার। এতে করে পেয়াজের দাম ২০ থেকে বেড়ে ৮০ টাকা হয়ে গেলো। একইভাবে গত বছরজুড়ে রসুনের দাম ছিল ২০০ টাকা। রসুন রফতানি বন্ধ করে দিলে তার দাম বেড়ে দায় ৩৫০ টাকায়।

অথচ এ বছরই দেশি পেয়াজের দাম ছিল ৪০-৪৫ টাকা। আর ইন্ডিয়ান পেঁয়াজের দাম ছিল ২৫ টাকা। এভাবেই তারা আমাদের বাজার পণ্য ড্যাম্পিং করে চলছে। বছরজুড়ে তারা এক দিনের জন্যও পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করেনি। তাহলে কেন রসুন রফতানি তারা বন্ধ করলো।

অথচ গত বছর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পণ্য ড্যাম্পিয়ের অভিযোগ করে ভারত। কিন্তু বাংলাদেশ এক বারের জন্যও ভারতের বিরুদ্ধে পণ্য ড্যাম্পিয়ের অভিযোগ করেনি। ব্যবসায়ীদের কড়া প্রতিবাদের পরেও বাংলাদেশ সরকার তেমন কোন প্রতিবাদ করতে পারেনি। 

সূত্র আরও জানায় চাল আমদানিতে দেশের ব্যবসায়ীরা এলসি খোলার পরেও চালের দাম বাড়িয়েছে ভারতের ব্যবসাযীরা। বেনাপোলে চালের ট্রাকের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে গত ১৫ দিন আগেও। একদিকে দাম বৃদ্ধির পায়তারা অন্যদিকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার। বিক্রির পরেও কিভাবে পন্যের দাম বাড়ে তা কেউ বলতে পারছে না। এটি একমাত্র ভারতের পক্ষেই সম্ভব।

সরকার ভারত,কম্বোডিয়া, তুরস্ক, মিয়ানমার এবং ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিলেও আর্ন্তজাতিক বাজারে চালের দাম বৃদ্ধির কারণে কাক্সিক্ষত পরিমাণ চাল আমদানি করতে পারেনি। সরকারের ধারনা ছিল আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার হলেই বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি হবে। এতে বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসবে। আর এ কারনেই সরকার তেমন বেশি পরিমান চাল আমদানি করেনি। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাজারে।

অবস্থা এমন দাড়িয়েছে সরকার কম্বোডিয়া এবং মিয়ানমার থেকে কোন চাল আর আমদানি করতে পারছে না। আর ভারত চাল বাংলাদেশ চাল রফতানি নিষিদ্ধ করছে আড়াই মাসের জন্য। এমন নেতিবাচক সংবাদ প্রচারে দেশের বাজারে হু হু করে বাড়ছে চালের দাম। সরকার কোনভাবেই তা নিয়ন্ত্রন করতে পারছে না। চাল ৮০ টাকা করার ষড়যন্ত্র চলছে মন্ত্রীর এমন বক্তব্যে জনগণের ভয় প্রবেশ করছে। আর একারনেই বাজারে চালের দাম বাড়ছেই। কি কারনে চালের দাম বাড়ছে তা কেউ বলতে পারছে না। তবে এ জন্য খুচরা ব্যবসায়ী এবং মিল মালিকরা পরস্পরকে দায়ী করছেন। আসলে এর জন্য কে দায়ী তা খতিয়ে দেখার আগে বাড়ছে চালের দাম।

সরকার ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ১৫ লাখ টন চাল আমদানির পরিকল্পনা করলেও তার কোন সুফল পায়নি। কিছু পরিমান চাল আমদানি করলেও তার ফল পায়নি দেশের জনগন। কি কারনে সরকার চাল আমদানি করতে পারছে না তা বলতে পারছে না কেউ।

এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ এস কে মজুরি বলেছেন,অবস্থা যা দাড়িয়েছে এতে সংকট আরও বাড়বে। সরকারকে মজুদ আরও বাড়াতে হবে। তা না হলে কোনভাবেই দাম কমবে না। একই সাথে সরকারের উচিত হবে দেশের কৃষকদের বীজ এবং কৃষি ঋন দিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে ধান উৎপাদন করা। তা না হলে বড় সংকট সামনে অপেক্ষা করছে।

 কৃষি মার্কেট পাইকারি চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারন সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন,প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় চালের দাম বেড়েছে। চাল বিক্রিও হচ্ছে। এর জন্য দায়ী মিল সিন্ডিকেট। চাল তাদের কাছেই মজুদ রয়েছে। সরকারের কাছে তেমন চাল মজুদ নেই জেনেই এই সিন্ডিকেট নিজেদের ইচ্ছা মত দাম বাড়াছে। অবস্থা দেকে মনে হচ্ছে তা দেখার মত ওকেউ নেই।

এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ভারত সরকার চালের রপ্তানি বন্ধ করেনি বা এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। প্রতিদিন ভারত থেকে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি হচ্ছে। একটি কুচক্রি মহল ভারত সরকারের একটি স্বাক্ষরবিহীন মিথ্যা চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশে চাল রপ্তানি বন্ধের বিষয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা এ অপপ্রচার চালাতে পারে। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চালের বাজার অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করছে। এতে বিভ্রান্ত হওয়ার কারণ নেই।

মন্ত্রী বলেন, কিছু পত্র-পত্রিকায়ও এর উপর ভিত্তি করে এ সংবাদ প্রচার করা হয়েছে, যা সঠিক নয়। দেশ ও জাতির স্বার্থে সাংবাদিকদের সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল ও যতœবান হওয়া প্রয়োজন।

তিনি দাবি করেন, দেশে চালের কোনো সংকট নেই। প্রয়োজনীয় চাল মজুত রয়েছে। বাজারে পর্যাপ্ত চালের সরবরাহ রয়েছে। হাওর এলাকায় পানি প্রবেশ এবং বন্যার কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, চাল আমদানি করে তা পূরণ করা হচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিদিন চাল আমদানি হচ্ছে। বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিদিন ট্রাকে করে চাল আসছে।

তোফায়েল আহমেদ বলেন, চালের সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। খোলাবাজারে ন্যায্য মূল্যে চাল বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অবিলম্বে দেশের সাধারণ মানুষ এ চাল কিনতে পারবেন।

তিনি বলেন, চাল-এর অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। প্রত্যেক জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারকে অভিযান পরিচালনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ