ঢাকা, শুক্রবার 15 September 2017, ৩১ ভাদ্র ১৪২8, ২৩ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কবিতার শরৎ

-সাকী মাহবুব
সবুজ শ্যামলিমায় পরিপূর্ণ আমাদের এ দেশ অপরুপ ঋতু বৈচিত্র্যের আধার। অপূর্ব রুপ এবং অফুরন্ত সম্ভার নিয়ে এখানে একের পর এক আবর্তিত হয় ছয়টি ঋতু। বর্ষার অবিশ্রান্ত রিমঝিম গানের অলস বিধুর মনথরন যখন ক্লান্তিতে মনকে বিষন্ন করে তোলে, ঠিক তখন শরৎ তার স্নিগ্ধরুপ মাধুর্য নিয়ে হঠাৎ আলোর মতো নীল আকাশে ঝলমল করে হেসে ওঠে। শিউলি ঝরা শরতের মেঘশুণ্য নীলাকাশ হেমন্তের কনক ধানের সোনালী সম্ভার প্রকৃতিকে করে প্রাণময়তা। এই প্রাণময়তা মুগ্ধ করে আমাদের বিশেষভাবে উচ্ছসিত করে কবি সাহিত্যিকদের। শরৎ যেমন বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে তেমনি সাহিত্যেকর্মেও শরতের উজ্জল উপস্থিতি লক্ষনীয়। যুগে যুগে কবি সাহিত্যিকরা প্রকৃতি বর্ণনায় শরৎকালকে ব্যবহার করেছেন। শরৎ বন্দনায় পঞ্চমুখ থেকেছেন শব্দভাষ্যে। তাই শরৎ নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ। চর্যাপদের পদকর্তা থেকে শুরু করে আজকের তরুণতম কবির রচনায় ও শরৎকাল তার নান্দনিক ব্যঞ্জনা নিয়ে উদ্ভাসিত। কবিদের কবিতায় শরৎ পেয়েছে প্রাধান্য। কবির পড়ক্তিমালা হয়েছে শরৎ সিক্ত মহাকবি কালিদাস শরৎ বর্ণনায় লিখেছেন
“প্রিয়তম আমার, ঐ চেয়ে দেখ,
নব বধুর ন্যায় সুসজ্জিত শরৎকাল সমাগত”

বাংলা সাহিত্যের আদি মধ্যযুগের কবি চন্ডীদাসের কবিতায় শরৎকে তুলে ধরেছেন এভাবে
“ভাদর মাঁসে অহোনিশি অন্ধকারে।
শিখি ভেক ডাহুক করে কোলাহলে
তাওনা দেখিবো যঁবে কাঞ্চির মুখ
চিন্তিতে চিন্তিতে মোর ফুটি জায়ির বুক”।

চট্টগ্রামের কবি আলাওল তাঁর পদ্মাবর্তী কাব্যের
ষট ঋতু বর্ণন খন্ডে দেখি শরৎনিশি যাপনের এক মিলন মধুর দৃশ্য

“আইল শরৎ ঋতু নির্মল আকাশ।
দোলায় চামর কাশ কুসুম বিকাশ॥
নবীন খঞ্জন দেখি বড়ই কৌতুক
উপজিত থামিনী দমপতি মনে সুখ॥
চুত:সম চন্দনে লেপিয়া কলেবর।
সুকুমার শ্বেতশয্যা অতি মনোহর।
নানা আভরন পট্ট বস্ত্র পরিধান।
যুবকের মরণে জাগায় পঞ্চবান।
সুখশয্যা সুতি সতী সুস্বামীর সনে।
নানা মুখ বিলসেন্ত হরষিত মনে”।

মধ্যযুগের ধারাবাহিকতা শেষে আধুনিক যুগের কবিদের কবিতায় শরতের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বিশেষ রবীন্দনাথের কাব্যেও গানে শরতের বন্দনা লক্ষণীয়। রবীন্দনাথ ঠাকুর শরৎকে ঘিরে প্রচুর কবিতা ও গান লিখে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ ও সুবাসিত করে গেছেন।

উর্দ্ধৃতি হিসেবে তুলে ধরছি-
১) আজি কী তোমার মধুর মুরতি
  হেরিনু শারদ প্রভাতে
    হে মাতা বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ
    ঝলিছে অমল শোড়াতে।
 (কৈশোর শরৎ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

২) শরৎ তোমার অরুন আলোর অঞ্জলি
ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি।
শরৎ তোমার শিশির ধোয়া ধোওয়া কুন্ডলে
বনের পথে লুটিয়ে পড়া অঞ্চলে
আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি।
আজ শরতের আলোয় এই যে চেয়ে দেখি
মনে হয় এ যেন আমার প্রথম দেখা।
(শরৎ তোমার অরুন আলোর অব্ধল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

বাংলা সাহিত্যে ঈর্ষনীয় প্রতিভা কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় আমরা শরতের চিত্র দেখি যেভাবে
“সই পাতালো কি শরতে আজিকে স্নিগ্ধ আকাশ ধরনী?
নীলিমা বাহিয়া সওগাত নিয়া নামিছে মেঘের তরনী!
অলকার পানে বলাকা দুটিছে মেঘ দূত মনমোহিয়া
চঞ্চু রাঙা কলমীর কুড়ি মরতের ভেট বহিয়া।
সখীর গাঁয়ের সেউঁতি বোটার ফিরোজায় রেঙে পেশোযাজ
আসমানী আর মৃন্ময়ী সখি মিশিয়াছে, মেঠো পথ মাঝ।
(রাখি বন্ধন কাজী নজরুল ইসলাম)

“রুপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ শরৎকে দেখেছেন যেভাবে
এখানে আকাশ নীল নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল
ফুটে থাকে হিম শাদা রংতার আশ্বিনের আলোর মতন
আকন্দফুলের কালো ভীমরুল এই খানে করে গুজরণ
রৌদ্রের দুপুর ভরে বারবার রোদ তার সুচিক্বন চুন
কাঁঠাল জামের বুকে নিংড়ায় দহে বিলে চঞ্চল আঙ্গুল”।
(এখানে আকাশ নীল জীবনানন্দ দাশ)

কবি জসীমউদ্দীনের কবিতায় শরতের যে চিত্র আমাদের বিমোহিত করে তাহলো
“গণিতে গণিতে শ্রাবণ কাটিল
আসিল ভাদ্র মাস,
বিরহী নারীর নয়নের জলে
ভিজিল বুকের বাস”।
খ্যাতিমান কবি আল মাহমুদ তাঁর এক শরত কবিতায় শরতের চিত্র একেছেন-এভাবে
“এক শরতে বিদায় হলে আমার থেকে
কিছু ছন্দ কিছু গন্ধ গেছ রেখে
আজও সে সব স্মৃতি আমার পড়ছে মনে
হাওয়ায় যেন ভাসছে হৃদয় আপন মনে।
ভাসছে হৃদয় কাশের ফুলে ঘাস যেখানে
ঘন হয়ে ছড়িয়ে আছে কুঞ্জবনে
আসছে শরৎ আবার দেখো ভাসছে হৃদয়
হাসছে একা কাশের ফুলে সজ্ঞোপনে”।
(এক শরতে আল মাহমুদ)

শরৎ নিয়ে কবি আহসান হাবীবের সুন্দর অনুভুতি
“এবার শরৎ রাত্রি স্বপ্ন নং এনেছে সঙিন
লুন্ঠিতস্বর্ণের শীষে সে স্বপ্ন রঙিন
কেদে মরে মৃত্তিকায় মিশে যায় ধীরে
এবার শরৎ রাত্রি উদযাপিত হবে আঁখি নীরে”।
(শরৎ/আহসান হাবীব)

কবি শামসুর রাহমান শরৎ নিয়ে তার কবিতায় লেখেন
“জেনেছি কাকে চাই, কে এলে চোখে ফোটে
নিমিষে শরতের খুশির জ্যোতিকনা”।
কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ শরৎ নিয়ে লিখতে গিয়ে কলম চালিয়েছেন এভাবে
“ঘনকালো মেঘের আধাঁর একটু হাসে একটু কাঁদে
রোদের সাথে লুকোচুরি খেলাটা বেশ জামিয়ে তোলে
এই যে এখন মনটা ভালো এই যে এখন মনটা খারাপ
ইচ্ছে হলেই গাল ফুলিয়ে কান্না শুরু
ইচ্ছে হলেই রোদের পরে রোদের খেলা
কখন কী হয় সবাই ভীতু এমন যে শরৎ ঋতু”
(একটু হাসে একটু কাদে আলাউদ্দিন আল আজাদ)

কবি রফিক আজাদ শরৎ নিয়ে লিখেছেন চমৎকার এক কবিতা
“শরৎ শব্দটি উচ্চারণ মাত্র আমার চোখের সামনে অর্থাৎ দৃষ্টি সীমার মধ্যে শারদ আকাশ কিংবা কাশফুল এসে দাড়ায় না
বরং শরৎ চন্দ্র মুতিমান হন
না শরৎচন্দ্র, নীলাকাশে সমুজ্জল কোনো চাঁদ নয়
মহামতি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্বয়ং”
(আমার শরৎ, রফিক আজাদ)

কবি হাসান হাফিজের কবিতায় দেখি আমরা শরতের কাছে আরজ। যেমন
“শরতে জন্মেছি, চাই শরতেই হোক ছুটি, আলগোছে
নিভৃত প্রস্থান। শরত মানবমনে সঞ্জারিত করো তুমি কিঞ্চিৎ দয়া ও ধর্ম, পয়দা করো হৃদয়ে রহম তারা যেন ভালোবেসে নিষ্কলংক শিউলিফুল সামান্য দরদী হয়। মানবিক হয়। শরৎ হে প্রিয় বাঞ্জিতা ঋতু সামান্য কবির এই  অনুল্লেখ্য গরিবি আরজ; অবহেলে দিয়ো না দিয়ো না ফেলে করুণাবশত করো প্রীতি বিবেচনা”
(রক্তৃতা দূর করো হে বন্ধু শরৎ/হাসান হাফিজ)

কবি নির্মলেন্দুগুনের কবিতায় শরৎ এসেছে যেভাবে
“সরে তো এই বর্ষা গেল
শরৎ এলো মাত্র,
এই মধ্যে শুভ্র কাশে
ভরলো তোমার গাত্র।
ক্ষেত্রের আলে মুখ নামিয়ে
পুকুরের এ পাড়টায়
হঠাৎ দেখি কাশ ফুটছে
বাশবনের ঐ ধারদিয়া।
..........................
(কাশফুলের কাব্য/নির্মলেন্দু গুন)

শরৎ নিয়ে কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ কলম চালিয়েছেন এভাবে
“কাশফুল নদীজলে মুখ দেখে অভাবের সংসারে একাকী ভাঙ্গা আরশিতে ষোলবতী বয়রেস স্বভাব উজ্জল স্বাধীন ভাবনাগুলো মেলে দেয় শরতের নির্জন মেঘে সেও নদীটির জলে মুখ রাখে পড়ন্ত বিকেলে”।
(শরৎ দুপুরের খন্ডচিত্র/জাহাঙ্গীর ফিরোজ)
এভাবেই বাংলা সাহিত্যের অনেক নামী, দামী, জ্ঞানী, গুনী, কবি সাহিত্যিকগণ শরতের বর্ণিল শোভায় মুগ্ধ হয়ে প্রাণ উজার করে লিখেছেন শরতের কবিতা। শরৎ তাই শুভ্র সমুজ্জল, শরৎ তাই প্রাণময়। আবহমান বাংলা কবিতায় শরৎ দেখা দিয়েছে প্রকৃতি ও প্রাণের পরম প্রীতি ও পূর্ণতায়। বাংলাদেশের অন্য কোন ঋতুকেই আমরা এতটা গভীরভাবে দেহ-মন ও অনুভুতির সাথে মিলিয়ে নিতে পারি না। তাই শরৎ অনেকের কাছেই প্রিয় ঋতু হিসেবে বিবেচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ