ঢাকা, শুক্রবার 15 September 2017, ৩১ ভাদ্র ১৪২8, ২৩ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনায় যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ওয়েল্ডিং কারখানা

খুলনা অফিস: খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন সড়ক মহাসড়কের দুই পাশে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ওয়েল্ডিং কারখানা। পরিবেশ আইন না মেনে গড়ে তোলা এসব কারখানার প্রভাবে চোখে আলোকরশ্মি প্রবেশ করে রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া  পরিবেশের উপরও পড়ছে বিরূপ প্রভাব। এদিকে যত্রতত্র ওয়েল্ডিং কারখানার প্রভাবে নানা চোখের রোগের পাশাপাশি মারাত্মকভাবে বিপদগ্রস্ত হচ্ছে কোমলমতি শিশু, পথচারী ও স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীরা। এসব কারখানায় ঝালাইকালে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে তীর্যক অতি বেগুনি আলোক রশ্মির বিচ্ছুরণ ও উচ্চ শব্দ ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করে চলছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নগরীর রূপসা থেকে রয়্যাল মোড়, নিউ মার্কেট থেকে দৌলতপুর, ময়লাপোতা থেকে পাওয়ার হাউজ মোড়, ময়লাপোতা থেকে গল্লামারি, গল¬ামারি থেকে বয়রা, বয়রা থেকে নতুন রাস্তাসহ বিভিন্ন সড়কের দু’পাশে যত্রতত্র গড়ে তোলা হয়েছে ওয়েল্ডিং কারখানা। এসব কারখানায় খোলা স্থানে জনসম্মুখে দিনে রাতে চলছে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ। এছাড়া রীতিমতো প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাস্তার দুই পাশ দখল করে চলছে বাস ট্রাক ওয়েল্ডিং, গাড়ীর পার্টস কাটা ছেড়া জোড়া দেয়া, পুরোনো আনফিট বাস ট্রাক জোড়াতালি দেয়া, রং করা ইত্যাদি। এতে করে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি সাধারণ পথচারি চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আবাসিক এলাকাসহ প্রধান সড়কগুলোর দু’পাশের এভাবে রাস্তায় খোলামেলাভাবে ওয়েল্ডিং কারখানা খুলে দিনে-রাতে ঝালাই-এর কাজ করায় বিপর্যয়ের মধ্যে বসবাস করছে নগরবাসী। রাস্তার দু’পাশে গড়ে উঠা এসব দোকানের বাক্স, গ্রীলের দরজা-জানালা ইত্যাদি ফুটপাথ দখল করে রাখায় পথচারীদের চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘœ ঘটছে। পাশাপাশি ফুটপাত বেদখল হওয়ায় হরহামেশা পথচারী ও স্কুলগামী শিশুরা ছোটখাট দুর্ঘটনায় পড়ছে।
বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, খোলা জায়গায় দোকানীরা ওয়েল্ডিং-এর কাজ করায় পথচারীদের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, পাশাপাশি কৌতূহলবশত কোমলমতি স্কুলগামী ছেলে-মেয়েরা আগ্রহভরে ওয়েল্ডিং-এর কাজ দেখায় চোখের ক্ষতি ডেকে আনছে। যারা ওয়েল্ডিং-এর কাজ করছে তারা কালো গ্লাস ব্যবহার করলেও এ কাজ ঘরের ভিতরে বা আড়ালে করার নিয়ম থাকলেও তারা করছে না। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে প্রশাসনের অভিযান না থাকায় তারা দখলের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। অপর দিকে এসকল দোকানের নেই পরিবেশের ছাড়পত্র।
এদিকে পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুৎ এর সাথে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্র মানছে না পিডিবি। আর পিডিবির এ উদাসীনতার কারনে নগরীর ৯০ শতাংশ ওয়েল্ডিং ব্যবসায়ীর পরিবেশের লাইসেন্স নেই বলে জানায় পরিবেশ অধিদপ্তর। আর এ কারনে পরিবেশের ছাড়পত্র নিতে আগ্রহ হারাচ্ছে ওয়েল্ডিং ব্যবসায়ীরা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (কারিগরী) মো. আব্দুল মালেক মিয়া বলেন, আমাদের সাথে পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুতের একটি সমঝোতা স্বাক্ষর আছে। এতে ওয়েল্ডিং কারখানার বিদ্যুতের সংযোগ নিতে হলে পরিবেশের লাইসেন্স নিতে হবে। পল্লী বিদ্যুৎ এ নিয়মটা মানায় পল্লী অঞ্চলের ৯০ শতাংশ দোকানের পরিবেশের ছাড়পত্র রয়েছে। অথচ শহরে মাত্র ১০ শতাংশ দোকানে পরিবেশের ছাড়পত্র রয়েছে। অপরদিকে আমরা এ বিষয়ে সরাসরি মোবাইল কোট করতে পারছি না। যতক্ষণ না পরিবেশ আইন ১৯৯৫ এর ১২ ধারা মোবাইল কোটের আওতায় না আসছে।আর ওয়েল্ডিংয়ের কাজ সব সময় কালো কাপড় ঢেকে বা ঘরের ভিতরে বন্ধ স্থানে করতে হবে । এর আলোকরশ্মি চোখের ও মস্তিস্কে প্রচুর ক্ষতি হয় বলে তিনি জানান।
পথচারি পাবলিক স্কুলের ছাত্র ইমনের অভিভাবক বলেন, বাচ্চারা না বুঝেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ওয়েলডিং দেখতে থাকে। আর যদি হয় রাত তবে দুই এক মাইল দূর থেকেও চোখে আলো পড়ে। এ জন্য চোখে নানা সমস্যা দেখা দেয়।
বৈকালির সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং এর মোশী বিশ্বাস  বলেন, এতে ক্ষতি হয় আমরা বুঝি। প্রথমে পর্দা দিয়েছিলাম, পরে দেখি কেউই দেয় না এ জন্য খুলে ফেলেছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন ৫০ বছর এ কাজ করছি। এখন চোখে কম দেখি এ জন্য চশমা পরতে হয়।
ওয়েলডিং এর ক্ষতিকারক প্রভাব সম্পর্কে ডাক্তার জহিরুল ইসলাম সাগর বলেন, ওয়েল্ডিং এর আলোকরশ্মি সরাসরি চোখে ভেতরে প্রবেশ করে রেটিনার ক্ষতিগ্রস্ত করে। যা দৃষ্টির ব্যাপ্তি হ্রাস করে ধীরে ধীরে অন্ধ করে দিতে পারে। এ ছাড়া চোখ থেকে পানি পড়া, যন্ত্রণা, জ্বালাপোড়াসহ নানা সমস্যা হতে পারে।
সিটি কর্পোরেশন এস্টেট অফিসার নুরুজ্জামান তালুকদার বলেন, আমি গত ১৫ দিন আগে খুলনা আলিয়া মাদরাসার সামনের কারখানায় অভিযান চালিয়ে দশ হাজার টাকা জরিমানা করেছি। তবে তিনি স্বীকার করেন, এটা একটা বড় সমস্যা। এর সমাধানে সকল শাখাকে এক সাথে কাজ করতে হবে।
ওজোপাডিকো প্রকল্প পরিচালক আবু হোসেন বলেন, আমাদের সাথে পরিবেশের একটা চুক্তি আছে। তবে আমরা চেষ্টা করি, কিন্তু সিটি কর্পোরেশনেরও এ বিষয় সচেতন হতে হবে। পরিবেশ, বিদ্যুৎ ও সিটি কর্পোরেশন এক সাথে কাজ করলে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
সাধারণ পথচারি আঃ রহমান বলেন, প্রশাসন সচেতন হলে কখনও এ সকল অনিয়ম হতে পারে না। তবে আমরা চাই প্রশাসন ফুটপাত দখল মুক্ত করে পথচারীর চলাফেরায় সাহায্য করবে এবং যত্রতত্র ওয়েল্ডিং কারখানার ঝালাই এর কাজ দোকানীরা ঘরের ভিতরে করে পরিবেশসহ এলাকাবাসীকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ