ঢাকা, শনিবার 16 September 2017, ০১ আশ্বিন ১৪২8, ২৪ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সম্রাট আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা অভিযোগ

সুহৃদ আকবর : অনেক মুসলমান শাসকের মতই সম্রাট আওরঙ্গজেবের বিরূদ্ধে অনেক মিথ্যা অভিযোগ ইতিহাসে প্রচলিত আছে। এভাবে মুসলমান শাসকেরা ইসলাম বিরোধীদের দ্বারা নানা সময় নানাভাবে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ ইতিহাস লেখার নাম করে সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দিয়েছেন। এতে সাধারণ মানুষ প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারছে না। এর ফলে কী হচ্ছে, যা হচ্ছে তা অতি ভয়াবহ রূপলাভ করছে। আমাদের মুসলমান ঘরের ছেলে-মেয়েদের মনে-মননে, অস্থি-মজ্জায় ইসলাম এবং মুসলমান সম্পর্কে একটা খারাপ ধারণা জন্ম লাভ করছে। যার ফলে আমাদের মুসলমান ঘরের ছেলে-মেয়েদেরা এবং লেখক বুদ্ধিজীবীদেরকে যত বেশি ইসলাম এবং মুসলমানদের বিরূদ্ধে লেখালেখি করবে তত বেশি তারা বাহবা কুড়াচ্ছে। পুরস্কার পাচ্ছে। তাদের নাম হচ্ছে প্রগতিশীল, সুশীল বুদ্ধিজীবী। তারা নাকি মুক্তচিন্তার মানুষ! এ ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুসলমান জাতি কবে মুক্তি পাবে কে জানে। আল্লাহ্ যেন মুসলমানদেরকে সঠিক বুঝ দান করেন। 

অনেক ইতিহাসবিদ বলেছেন যে সম্রাট আওরঙ্গজেব হিন্দুদেরকে বিশ্বাস করতেন না। অথচ বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন কথা বলে। তিনি যদি কাউকে বিশ্বাস না করতেন তবে তিনি কখন টুপি সেলাই করতেন, কখন কোরআন কপি (নকল) করতেন, কীভাবে এত নামাজ পড়তেন। আর কারও কথা না উল্লেখ করে যশোবন্ত সিংয়ের কথাই ধরা যাক। যশোবন্ত সিং দারাশেকোহর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তিনি ক্ষমা চেয়ে আওরঙ্গজেবের সাথে যোগদান করেছিলেন। সেখানেও তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করে আবার সুজার সাথে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি আবার আওরঙ্গজেবের নিকট ক্ষমা চেয়েছিলেন এবং সম্রাট পবিত্র কোরআনের আদর্শ মেনে ও নবী (সা:)-এর বাণী স্মরণ করে তাকে ক্ষমাও করেছিলেন। 

যশোবন্ত সিংকে সম্রাট বিশ্বাস করে তাকে শাসককর্তা মনোনীত করে কাবুলে প্রেরণ করেছিলেন। বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শুধু ক্ষমা করা নয়, তাকে প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব প্রদান করে কাবুলে প্রেরণ করা কি আওরঙ্গজেবের গোঁড়া মুসলমান, হিন্দুকে বিশ্বাস করতেন না বা হিন্দুবিদ্বেষী এসবের পরিচয় বহন করে? হিন্দু সেনাপতি জয়সিংকে তিনি শিবাজীর দেখাশুনার জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলেন। শিবাজীর পলায়ণের পরও তিনি জয়সিংকে দায়ী করেননি। 

শিবাজী কতভাবে আওরঙ্গজেবকে অস্থিরতার ফেলতে চেষ্টা করেছিলেন বার বার তবুও অন্তরে আওরঙ্গজেব তার প্রতি সহানুভূতির মনোভাব দেখিয়েছিলেন বলে ইতিহাসে প্রমাণ আছে। উদয়পুরের মহারাজ্য রাজসিংয়ের পুত্র রাজা ভীম সিং আওরঙ্গজেবের উচ্চ মানের সামরিক অফিসার ছিলেন। তার অধীনে পাঁচ হাজার সৈন্য ছিল। যারা আওরঙ্গজেবকে হিন্দুবিদ্বেষী, কাউকে বিশ্বাস করতেন না, হিন্দুদেরকে রাজকার্য থেকে বিতারিত করতেন বলে মনগড়াভাবে অভিযোগ করতেন সে সকল মতলবি লেখকরাই বরং এতদিন প্রকৃত ইতিহাসের কাঠগড়ায় আসামী প্রতিপন্ন হবেন। তবে যারা কাঁচা লেখক, প্রকৃত তথ্য না জানার কারণে তাকে দোষারোপ করেছেন, তারা ক্ষমা পাওয়ার দাবি করতে পারেন। 

সম্রাট আওরঙ্গজেব শুধু মুসলমান শাসকদের মধ্যেই নয়; সমগ্র ভারত বর্ষের শুধু নয় তিনি তাঁর ন্যায়বিচার, ধর্মভীরুতার জন্য সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। মানুষের মনে-মননে, আচরণে-কর্মে তাঁর আদর্শ সদা জাগরুক থাকবে। আগামী দিনের শাসকদের জন্য সম্রাট আওরঙ্গজেবের জীবনাদর্শ থেকে অনেক শিক্ষা রয়েছে। আজও কোন শাসক যদি সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসন প্রদ্ধতি অনুসরণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করে; তাহলে সে রাষ্ট্র হবে সুখী, সমৃদ্ধ ও ন্যায়ের সৌধের উপর নির্মিত। তাই সময় এসেছে এই মহান জন দরদী, দেশপ্রেমিক, ন্যায়পরায়ণ শাসকের জীবন নতুন করে অধ্যয়ণ করবার। 

 

লেখক: সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ