ঢাকা, শনিবার 16 September 2017, ০১ আশ্বিন ১৪২8, ২৪ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সহিংসতা বিধ্বস্ত রাখাইনে এখন আছে কারা?

১৫ সেপ্টেম্বর, এনডিটিভি : সামরিক অভিযানের মুখে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যে ভয়াবহ মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তাতে এরই মধ্যে প্রায় চার লাখ শরণার্থী প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

এনডিটিভি জানায়, লাখো রোহিঙ্গা মুসলিমদের পাশাপাশি রাখাইনের প্রায় ৩০ হাজার হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীও গৃহহীন হয়েছে।

তারা বলছে, রাখাইনের উত্তর দিকের যে এলাকা থেকে উত্তেজনার শুরু, প্রথম থেকেই তা ঘিরে রেখেছে সরকারি বাহিনী।

অন্যদিকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছে, সেনাবাহিনী ও সংঘবদ্ধ বৌদ্ধরা গ্রামের পর গ্রামে গণহত্যা চালিয়ে সেগুলো মুসলিমশূন্য করার পাশাপাশি গ্রামগুলোকে মাটির সঙ্গে মিশিয়েও দিচ্ছে।

জাতিসংঘ গত সপ্তাহে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনযজ্ঞের অভিযোগ আনলেও ইয়াঙ্গুন এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তাদের সেনাবাহিনী জঙ্গি নির্মূলে রাখাইনে পরিকল্পিত অভিযান চালাচ্ছে।

গত ২৪ অগাস্ট রাতে বিদ্রোহী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) রাখাইন রাজ্যে একসঙ্গে ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে হামলা চালায়। হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার পর থেকে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে সেনা অভিযান শুরু হয়।

কঠোর সেনা অভিযানের মধ্যে লাখো রোহিঙ্গা দেশ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। তাহলে সহিংসতা বিধ্বস্ত রাখাইনে এখন থাকছে কারা?

২০১৫ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, রাখাইনে বাস করা ৩০ লাখ মানুষের মধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম। তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তরের জেলা মংডোয়েই এক-তৃতীয়াংশের বাস বলে মিয়ানমার সরকার জানিয়েছে।

গত তিন সপ্তাহে ওই মংডো জেলারই অন্তত ৪০ শতাংশ গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়েছে বলে সরকারের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে এনডিটিভি।

“১৭৬টি গ্রামের সবাই পালিয়ে গেছে,” বুধবার সাংবাদিকদের এ তথ্য দেন মুখপাত্র জাউ হতাই।

রোহিঙ্গারা জেলাটির মোট ৪৭১টি গ্রামে বসবাস করতো বলেও জানান তিনি।

গত কয়েকদিনে বাংলাদেশে যত শরণার্থী এসেছে তা মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গাদের এক তৃতীয়াংশের বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মিয়ানমারের তথ্য বিষয়ক কমিটি বলছে, ৫৯টি গ্রামের প্রায় ৭ হাজার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে; যেগুলোর বেশিরভাগই ‘বাঙালিদের’।

 রোহিঙ্গাদের অনেকদিন ধরেই এ নামে ডেকে আসছে মিয়ানমার সরকার। বছরের পর বছর বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশটিতে বসবাস করে আসলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে তারা।

শুক্রবার মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২৫ অগাস্টের পর থেকে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত দুই ডজনেরও বেশি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করেছে। তাদের ছবিতে থাকা ধুসর ছাই রংয়ের এলাকাগুলোতে একসময় বিভিন্ন ভবনের অস্তিত্ব ছিল, এখন নেই।

রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যেসব ক্যাম্পে ভিড় করছেন সেই নাফ নদীর বাংলাদেশ প্রান্ত থেকেও প্রায় প্রতিদিনই জ্বালিয়ে দেয়া গ্রামগুলোর উপরে ওঠা ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে।

শরণার্থীরা বলছেন, গুলি ও অন্যান্য হুমকিতে আতঙ্কিত হয়ে পালানোর পর মিয়ানমারের সেনা এবং সংঘবদ্ধ বৌদ্ধরা তাদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।

একে ‘সুপরিকল্পিতভাবে জাতিগত নিধনের’ নমুনা বলছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

মিয়ানমার এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি আদায়ের কৌশল হিসেবে বিদ্রোহীরা নিজেদের গ্রামগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে।

এখনো লাখ লাখ রোহিঙ্গা বৃষ্টি আর কাদায় মাখামাখি এলাকা পেরিয়ে দেশান্তরী হওয়ার পথে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিভিন্ন সাহায্যদাতা প্রতিষ্ঠান বলছে, অগাস্টের শেষে সহিংসতা শুরুর পর থেকেই তারা উত্তর রাখাইনে পৌঁছাতে পারছেন না, যে কারণে কী ধরনের মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে তারও পরিমাপ করা সম্ভব হচ্ছে না।

“হাজার কিংবা লাখো মানুষ হয়তো সীমান্ত থেকে অনেক দূরে আটকে আছে যেখানে খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহের ঘাটতি আছে এবং যেখানে নিরাপত্তা পৌঁছাতে অক্ষম,” বলেন জাতিসংঘের কোঅর্ডিনেশন অব হিউম্যান অ্যাফেয়ার্সের মুখপাত্র পিয়েরে পেরন।

অ্যামনেস্টির লরা হেই বলছেন, যেসব রোহিঙ্গারা এখনও তাদের গ্রামেই আছেন তারাও ভয় নিয়েই বসবাস করছেন; বছরের পর বছর যে খাদ্য সাহায্য তারা পেয়ে আসছিলেন তা পেতেও তাদের কষ্ট হচ্ছে।

“তারা আদতে আটকা পড়ে আছে, বাজারগুলোও ঠিকমতো চালু না,” বলেন লরা।

মিয়ানমার বলছে, তারা রোহিঙ্গা অধ্যুষিত মংডোতে ত্রাণের ব্যবস্থা করছে, যদিও এ সম্বন্ধে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।

বৃহস্পতিবার দেশটির তথ্য বিষয়ক কমিটি বলেছে, ‘জঙ্গিদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই এমন নিশ্চয়তা দিচ্ছে যেসব মুসলমান’ তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা হচ্ছে।

সরকারের মুখপাত্র জাউ হতাই বলেন, তার দেশ থেকে যারা বাংলাদেশে পালিয়ে গেছেন, তাদের সবাইকে ফেরত নেওয়া হবে না।

“অনেকে সীমান্তের ওপারে চলে গেছেন; যদি তারা ফিরেও আসতে চায়, আমরা সবাইকে নিতে পারবো না।”

যারা ফিরে আসবে তাদেরকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে আসতে হবে বলেও জানান তিনি।

মণিপুরে রেড অ্যালার্ট

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে কোনো রোহিঙ্গা মুসলমান যেন ভারতে ঢুকতে না পারে সেজন্য দেশটির মণিপুর রাজ্যে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।

মণিপুরের সঙ্গে মিয়ানমারের ৩০০ কিলোমিটার সীমান্ত আছে। আন্তর্জাতিক এই সীমানার ১৬ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ভারত ও মিয়ানমারের নাগরিকদের ভিসা ছাড়া যাতায়াতেরও সুযোগ আছে। এই সুযোগে যেন কোনো রোহিঙ্গা ভারতে ঢুকে না পড়ে সেজন্য মণিপুর পুলিশের এই সতর্কতা জারি করেছে বলে জানায় এনডিটিভি।

“আন্তর্জাতিক সীমানার দুই ফটকের কোনোটি দিয়েই যেন শরণার্থীরা না ঢুকতে পারে সে বিষয়ে আমাদের সদস্যরা সতর্ক অবস্থায় আছে,” বলেন তেঙ্গনৌপাল পুলিশের সুপারিনটেন্ডেন্ট ইবোমচা সিং।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ