ঢাকা, শনিবার 16 September 2017, ০১ আশ্বিন ১৪২8, ২৪ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পঞ্জিকার শাসনে এলো আশ্বিন

সাদেকুর রহমান : ‘আশ্বিনে গা করে শিন্ শিন’-বহুল প্রচলিত প্রবচনটি এখন শুধুই কথার কথা। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বহুমাত্রিক বৈপরীত্যে, মৃদু ঠান্ডা নয়, মৃদু তাপপ্রবাহের মধ্যে আজ শনিবার থেকে আশ্বিন শুরু হলো। এ যেন কেবলি পঞ্জিকার শাসন মানা। বঙ্গাব্দের ‘হাস্যময়ী’, লাস্যময়ী’ শরতের দ্বিতীয় তথা শেষ মাস এটি। ভাদ্রের শেষ তথা শরতের বিদায় দিনে আকাশজুড়ে সাদা-কালো মেঘের লুকোচুরি খেলার চেয়ে গুমোট ভাবটাই দৃশ্যমান ছিল। 

“হিমের শিহর লেগেছে আজ মৃদু হাওয়ায়/ আশ্বিনের এই প্রথম দিনে/ ভোর বেলাকার চাঁদের আলো/ মিলিয়ে আসে শ্বেত করবীর রঙে”- এমন কাব্যকথা যেনো জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরিতায় কেবলি আবেগময় পঙক্তিমালায় পরিণত হতে বসেছে। মওসুমি ঠান্ডা বায়ুপ্রবাহ এখনো শুরু হয়নি। তবে অনেক ব্যত্যয়ের পরও আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতির ভারসাম্য বজায় রাখার চিরন্তন নিয়মে দিনের পরিধি ক্রমশ ছোট হচ্ছে, বড় হচ্ছে রাত। এ পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শীতের শাক-সবজি ইতোমধ্যে বাজারে উঠতে শুরু করেছে। 

আবহাওয়ার ছন্দপতন স্বত্ত্বেও মধ্য আশ্বিনের পর থেকেই হয়তো স্বচ্ছ শিশির ভিজিয়ে দেবে তৃণরাজি, বৃক্ষরাজির সবুজ পাতা আর বৈচিত্র্যময় মাটি। মওসুমি ধুনকারেরা দল বেঁধে নেমে পড়বে লেপ, তোষক, জাজিম ইত্যাদি শীত নিবারণী সামগ্রী বানাতে। প্রভাতী শিশির মনে আনবে অপার্থিব প্রফুল্লতা ও সজীবতা। কোমল রূপালী জোছনায় শিহরিত হবে মানবমন। এই মাসের আরেক লক্ষণীয় দিক হলো, বাংলা পঞ্জিকায় ৩০ দিনের মাস এ থেকেই শুরু হয়। প্রথম পাঁচটি মাস ‘একত্রিশা’ হয়ে থাকে। 

পূর্ববর্তী মাসগুলোর মতো বঙ্গাব্দের ষষ্ঠ তনয়া এই আশ্বিনেও স্নিগ্ধতার আমেজের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। বিস্তৃত কাশবনেও কেন জানি প্রাণহীনতা বিরাজ করছে। তারপরও বাংলার আকাশ আর জমিনকে ঘিরে রূপ বদলের অনাড়ম্বরও আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। শিশু-কিশোরদের দুরন্তপনায়ও নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। কাশবনে ‘টুক পলান্তি’ খেলা কিংবা ঘুড়ি উড়িয়ে সাদা মেঘ, নীলাকাশ ছোঁয়ার বাসনাকেই যেন জানান দেয় ওরা। নিকষ রাতের অবসানে কপালে লাল টিপ পরে বৃন্তচ্যুত হয়ে মাটির বুকে ঝরে পরে ছোট ফুল ‘শিউলী’। মনোহরিণী জর্দা রঙা এই ফুলের আরেক নাম ‘ শেফালী’। বর্ষার বিস্তীর্ণ পানির আধারে জন্মানো শাপলা ফুল এখনো সৌন্দর্য বিলাবার চেষ্টা করছে। জাতীয় ফুলটির ডাটি সুস্বাদু সবজি হিসেবেও নাগরিকদের রসনা তৃপ্ত করছে। হাওড়ের অকাল বন্যার পর মওসুমি বন্যার ধাক্কা সামলে উঠার নিরন্তর সংগ্রামে রত দুর্গত এলাকার লাখ লাখ মানুষ। 

ওদিকে, এ মাসে পানির উৎস ধারা স্বচ্ছ থেকে স্বচ্ছতর হতে থাকে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষক সমাজকে কালে কালে আশ্বিন মাস প্রভাবিত করেছে। খনার বচনে আছে, “ভাদ্রের চারি আশ্বিনের চারি/কলাই বুনি যত পারি”। অর্থাৎ ভাদ্রমাসের শেষ চার দিন এবং আশ্বিনের প্রথম চার দিন মাসকলাই চাষের জন্য উপযুক্ত সময়। অন্যদিকে, এ সময় ধান লাগালে একেবারেই ফলন হয় না। লোকগীতিতে এসেছে, “আশ্বিন মাসেতে ভাইরে পাটের দর ভাও/পাট বেইচ্যা গিরস্থের কিনলো দৌড়ের নাও”। আশ্বিন মাসে শসার আসল স্বাদ পাওয়া যায় বলে এর চাহিদাও বেড়ে যায়। 

আশ্বিন মাস ধর্মীয় ও লোকাচারের এক উত্তম সময় বলে বিবেচ্য। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের বৃহত্তর আচার দুর্গাপূজা পালন করে থাকে। হিন্দু বিধবারাও এ মাসে বিশেষ পূজা করে। আরো উল্লেখ আছে লোককাব্যে, “আশ্বিন মাসে হে কন্যা অষ্টমী/ ধান দুর্বারে করে পূজা ব্রাহ্মণী”। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) কর্তৃক ১৩৯০ বঙ্গাব্দের বৈশাখে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের মেলা’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, শারদীয় আশ্বিন মাসে সারা দেশে ৮২টি গ্রামীণ মেলা বসে। এর মধ্যে ৭১টিই দুর্গাপূজা উপলক্ষে। বাকিগুলো বসে আশ্বিনী পূর্ণিমা, বার্ষিক ওরশ ও নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে। কালের পালা বদলে এসব মেলার ঐতিহ্য-জৌলুসে ভাটা পড়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আশ্বিনের প্রকৃতি-বৈভব সত্যি সত্যিই অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ