ঢাকা, শনিবার 16 September 2017, ০১ আশ্বিন ১৪২8, ২৪ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

টাকা না পেয়ে ব্যবসায়ীর চোখ তোলাসহ নানা কারণে খুলনার পুলিশ বিভাগ ইমেজ সঙ্কটে পড়েছে

খুলনা অফিস : টাকা না পেয়ে ব্যবসায়ীর চোখ তোলা, পিটিয়ে কলেজছাত্রের পা ভেঙে দেয়া এবং ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে টাকা আদায়সহ নানা কারণে খুলনার পুলিশ বিভাগ ইমেজ সঙ্কটে পড়েছে। এর মধ্যে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি), গোয়েন্দা বিভাগ এবং জেলা পুলিশও রয়েছে। এসব ঘটনায় ইতোমধ্যেই ইন্সপেক্টরসহ ১১ পুলিশ ও আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা এবং পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে।

সাধারণ মানুষের ওপর পুলিশী নির্যাতন দিনের পর দিন বাড়ছে। ফলে বিনা কারণে দোষী হয়ে হাজত খাটতে হচ্ছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষকে। এমনকি শুধুমাত্র টাকার কারণে পুলিশ শাহজালাল নামে এক যুবকের চোখ উপড়ে ফেলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে নগরীর খালিশপুর থানা এলাকায়। বিষয়টির রেশ কাটতে না কাটতেই বিএল কলেজের অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র আবু জাফর শেখকে বিনা কারণে পিটিয়ে পা ভেঙে দেয়ার অভিযোগ মিলেছে। জাফর বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। পুলিশের নির্যাতনের কারণে এম্বুলেন্সে চড়ে সে অনার্স শেষ বর্ষের পরীক্ষায় অংশ নেয়।

অনুসন্ধান ও আদালতে দায়েরকৃত মামলার সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ জুলাই ব্যবসায়ী মো. শাহজালাল তার স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে নিয়ে পিরোজপুরের কাউখালি উপজেলার সুবিদপুর গ্রামের বাড়ি থেকে খুলনা নগরীর নয়াবাটি রেললাইন বস্তি কলোনীর শ্বশুরবাড়িতে আসেন। ওইদিন রাত ৮টায় তার শিশু কন্যার দুধ কেনার জন্য বাসার পার্শ্ববর্তী দোকানে যান শাহজালাল। এ সময় খালিশপুর থানার ওসি নাসিম খানের নির্দেশে তাকে থানায় ডেকে নেয়া হয়। তার ফিরতে দেরি হয়ায় খোঁজ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা থানায় গেলে ওসি তাকে ছাড়ানোর জন্য দেড় লাখ টাকা দাবি করেন। অন্যথায় তাকে জীবনে শেষ করে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু দাবিকৃত টাকা দিতে ব্যর্থ হয়ে স্বজনরা থানার সামনে অপেক্ষা করতে থাকেন। এর মধ্যে রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ কর্মকর্তারা শাহজালালকে পুলিশের গাড়িতে করে বাইরে নিয়ে যায়। কিন্তু তাকে রাতে আর থানায় আনা হয়নি। দীর্ঘ কয়েক ঘন্টা অপেক্ষার পর স্বজনরা বাসায় ফিরে যান। পরদিন ১৯ জুলাই ভোর সাড়ে ৫টায় তারা থানায় গিয়ে জানতে পারেন শাহজালাল নামে কেউ থানায় নেই। পরবর্তীতে খোঁজ খবর নিয়ে তারা জানতে পারেন সে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে। সেখানে গিয়ে হাসপাতালের তৃতীয় তলায় ১০-১১নং ওয়ার্ডের বারান্দায় তাকে পড়ে থাকতে এবং দু’টি চোখ উপড়ানো অবস্থায় দেখতে পান। এ সময় শাহজালাল তাদের জানান, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে পুলিশ কর্মকর্তারা হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে গাড়িতে করে গোয়ালখালি হয়ে বিশ্ব রোডের (খুলনা বাইপাস সড়ক) নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে তার হাত-পা চেপে ধরে এবং মুখের মধ্যে গামছা ঢুকিয়ে স্ক্রু ডাইভার দিয়ে দু’টি চোখ উপড়ে ফেলে। পরে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেখে আসে। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তার দু’টি চোখই অন্ধ হয়ে গেছে। এ ঘটনায় অন্ধ শাহজালালের মা রেনু বেগম বাদি হয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিমের আমলী আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় খালিশপুর থানার ওসি নাসিম খান, এসআই রাসেল, এসআই তাপষ রায়, এসআই মোরসেলিম মোল্লা, এসআই মিজান, এসআই মামুন, এসআই নূর ইসলাম ও এএসআই সৈয়দ সাহেব আলী, আনসার সদস্য (সিপাহী) আফসার আলী, আনসার ল্যান্স নায়েক আবুল হোসেন, আনসার নায়েক রেজাউল এবং অপর দু’জন খালিশপুর পুরাতন যশোর রোড এলাকার সুমা আক্তার ও শিরোমণি বাদামতলা এলাকার লুৎফুর হাওলাদারের ছেলে রাসেলকে আসামি করা হয়েছে। আদালত আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর আদেশের দিন ধার্য করেছেন। শাহজালালের পিতা জাকির হোসেন বলেন, ‘ঘটনার দিন শাহজালালকে থানা হাজতে রেখে টাকার জন্য প্রথম দফায় নির্যাতন চালালে সে হাতে জখম হয়। থানা পুলিশ তখন রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাকে পার্শ্ববর্তী খালিশপুর ক্লিনিকে নিয়ে চিকিৎসা করায়। এসময় ডাক্তার তার হাতে যখন ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন তখন তার দু’চোখই ভাল ছিল। যা ওই ক্লিনিকের সিসি ক্যামেরা দেখলে সনাক্ত করা যাবে’। তিনি বলেন, ‘থানার সিসি ক্যামেরা থাকলে এবং ওই দিনের দৃশ্য নষ্ট না করলে সেখানেও চোখওয়ালা শাহজালালকে দেখা যাবে’।

অপরদিকে, পুলিশের প্রহারে পা ভেঙেছে খুলনার বিএল কলেজের ডিগ্রি (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) শেষ বর্ষের পরীক্ষার্থী আবু জাফর শেখের। তিনি দিঘলিয়া উপজেলার উত্তর চন্দনিমহল গ্রামের আবুল শেখের ছেলে। তিনি বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। এমনকি অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে তাকে পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে। এ ঘটনা তদন্ত করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) মো. বদিউজ্জামানের নেতৃত্বে এক সদস্যের কমিটি। সূত্র জানিয়েছে, কলেজ ছাত্র আবু জাফর তার বন্ধু মামুন শেখ, বোরহান মোল্লা ও আবু বক্কর ঈদের পরদিন ৩ সেপ্টেম্বর স্থানীয় উত্তর চন্দনিমহলের শিল্প সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদে বসে গল্প করছিলেন। এ সময় দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (আইসি) এসআই প্রকাশ চন্দ্র সরকারের নেতৃত্বে এএসআই তামিম ইসলাম, ফরহাদ হোসেন ও কনস্টেবল শিমুল স্কুলের সামনে দিয়ে টহলে যাওয়ার সময় তাদের দেখে ছাদ থেকে নামতে বলেন। তারা নামার সময় পুলিশ কথা বলার ফাঁকে তাদের বেধড়ক পেটাতে শুরু করে। সবাইকেই বেদম প্রহার করা হলে লাঠির আঘাতে কলেজছাত্র আবু জাফরের ডান পা ভেঙে যায়। খবর ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই এলাকাবাসী জড়ো হয়ে পুলিশের টহল টিমকে ঘেরাও করে। সেনহাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গাজী জিয়াউর রহমান এবং দিঘলিয়া থানার ওসি (তদন্ত) বিরাজ কুমার কর্মকার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পরে ইউপি চেয়ারম্যানের মধ্যস্থতায় দোষী পুলিশের শাস্তির আশ্বাস দিলে এলাকাবাসী অবরোধ তুলে নেয়।

একই উপজেলার সেনহাটি শিববাড়ি মন্দির সংলগ্ন এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ভারতীয় নাগরিক প্রিতি চাও (২১) নামে এক নারীকে ৩০ আগস্ট অর্থের বিনিময়ে দালালদের কাছে হস্তান্তরের অভিযোগ রয়েছে দিঘলিয়া থানার এসআই মধুসুদন পান্ডের বিরুদ্ধে। কোন ধরনের বৈধ পাসপোর্ট ভিসা না থাকলেও পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়। এমনকি এ ঘটনায় নাগরিক প্রীতি চাও’র স্বামী তুহিন মৃধা ও শ্বশুর রুস্তম মৃধাকে গ্রেফতার করে তাদের কাছ থেকেও অর্থ নেয়া হয়। এর আগেও সোহান মোল্লা নামে একজন মাঝিকে মোটরসাইকেলের কাগজ তল্লাশির নামে জিম্মি করে প্রায় অর্ধলাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠে এসআই মধুসুদন পান্ডের বিরুদ্ধে।

এর আগে গত ৯ জুলাই খুলনার ডুমুরিয়ায় অভিযানের নামে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি টিম আবদুস সালাম গাজী নামে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে ৭৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ‘বি’ সার্কেল মো. সজীব খান তদন্তে এ ঘটনার সত্যতা পায়ায় জেলা ডিবিতে কর্মরত এসআই এইচ এম শহিদুল ইসলাম, এসআই আবু সাঈদ, এএসআই শাহাজুল ইসলাম, এএসআই মিকাইল হোসেন ও এএসআই কামাল হোসেনকে ডিবি থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে ক্লোজড করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও দায়ের করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডুমুরিয়া উপজেলার আবদুস সালাম গাজীর আঠারমাইল কলেজ রোডের আবদুল্লাহ ফুড নামক তিলের খাজার কারখানায় গিয়ে ডিবির একটি টিম কাগজপত্র দেখতে চান। কাগজপত্র দেখালেও তাকে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। এর আগে পুলিশের সদস্যরা তার তিনটি মোবাইল ফোন কেড়ে নেন। ভয়ে সালাম ৭৭ হাজার টাকা ডিবি পুলিশকে দেন। যাওয়ার সময় বিষয়টি কাউকে না বলার জন্য হুমকি দেয়া হয়। পরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ হলে তাদের তোপের মুখে টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন পুলিশের ওই সদস্যরা। তবে অর্থ ফেরত দিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি তাদের।

এ সব ব্যাপারে খুলনা জেলা পুলিশ সুপার মো. নিজামুল হক মোল্লাা বলেন, ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বেআইনিভাবে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে ভারতীয় নাগরিককে অর্থ নিয়ে ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে কোন লিখিত অভিযোগ নেই এবং কলেজছাত্রের পা ভাঙার সঙ্গে পুলিশের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এসব ঘটনায় পুলিশের ইমেজ সঙ্কট হয় কি-না জানতে চাইলে বলেন, ‘পত্রিকায় লিখলে হয়, না লিখলে হয় না’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ