ঢাকা, শনিবার 16 September 2017, ০১ আশ্বিন ১৪২8, ২৪ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রখ্যাত নিসর্গবিদ ও লেখক দ্বিজেন শর্মা আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের প্রখ্যাত নিসর্গবিদ, উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও লেখক দ্বিজেন শর্মা আর নেই।  রাজধানীর বেসরকারি স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল শুক্রবার ভোর পৌনে ৪টার দিকে প্রাণ ও প্রকৃতির মায়া কাটিয়ে তিনি পরলোক গমন করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ঢাকার সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজের দর্শণের সাবেক অধ্যাপিকা ড. দেবী শর্মা, ছেলে ডা. সুমিত্র শর্মা ও মেয়ে শ্রেয়সী শর্মা ছাড়াও অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। 

দ্বিজেন শর্মার পরিবারের বরাত দিয়ে প্রকৃতিবিষয়ক সংগঠন তরুপল্লবের সাধারণ সম্পাদক মোকাররম হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, কিডনি ফেইলিওর, ফুসফুসে পানি জমে যাওয়া ছাড়াও মাল্টিপল অর্গ্যান ফেইলিওরের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। 

গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্বিজেন শর্মাকে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বারডেম হাসপাতাল থেকে স্কয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেদিন সন্ধ্যায় শুরু হয় ডায়ালাইসিস। এর আগে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে গত জুলাইয়েও দ্বিজেন শর্মাকে বারডেমে ভর্তি হতে হয়েছিল। ফুসফুসের সংক্রমণের ধাক্কা সামলে উঠতে পারলেও কিডনির জটিলতা আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি। 

 মোকাররম হোসেন জানান, দ্বিজেন শর্মার মেয়ে শ্রেয়সী শর্মা লন্ডনে আছেন। তিনি দেশে ফিরলেই শেষকৃত্য হবে। দ্বিজেনের শেষ ইচ্ছা ছিলো তাকে যেন দাহ না করে সিলেটের বড়লেখায় গ্রামের বাড়িতে সমাহিত করা হয়।

দ্বিজেন শর্মা ১৯২৯ সালের ২৯ মে মৌলবীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে  কবিরাজ চন্দ্রকান্ড শর্মা ও সমাজসেবী মগ্নময়ী দেবীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা কবিরাজ ছিলেন বলে বাড়িতেই দেখেছেন নানা লতা-পাতা আর বৃক্ষের সমাহার। প্রজাপতি ডানা মেলা দিনগুলোতে পাথারিয়া পাহাড়ের আরণ্যক নিসর্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। সেখান থেকেই হয়তো লতা-পাতা, বৃক্ষ আর অরণ্য-প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। 

প্রকৃতি ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়ে তার ৩০টিরও বেশি বই রয়েছে। উদ্ভিদ ও প্রকৃতি নিয়ে তার লেখা ‘শ্যামলী নিসর্গ’কে বিবেচনা করা হয় আকরগ্রন্থ হিসেবে। তার অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে- ‘সপুষ্পক উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাস’, ‘ফুলগুলি যেন কথা’, ‘গাছের কথা ফুলের কথা’, ‘এমি নামের দুরন্ত মেয়েটি’, ‘নিসর্গ নির্মাণ ও নান্দনিক ভাবনা’, ‘সমাজতন্ত্রে বসবাস’, ‘জীবনের শেষ নেই’, ‘বিজ্ঞান ও শিক্ষা: দায়বদ্ধতার নিরিখ’, ‘ডারউইন ও প্রজাতির উৎপত্তি’, ‘বিগল যাত্রীর ভ্রমণ কথা’, ‘গহন কোন বনের ধারে’, ‘হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ডালটন হুকার’, ‘বাংলার বৃক্ষ’ ইত্যাদি। তার লেখা বইগুলোতে গাছ, ফুল বা ফলের বর্ণনায় ফিরে ফিরে এসেছে ময়মনসিংহ গীতিকা, জীবনানন্দ দাশ, জসীম উদ্দীন, সিলেটের লোকগীতি কিংবা মধ্যযুগের কাব্যগাথা। তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়াও পেয়েছেন বিভিন্ন সম্মাননা।

শৈশবেই গ্রামের পাঠশালায় দ্বিজেন শর্মার হাতেখড়ি হয়। তারপর করিমগঞ্জ পাবলিক হাইস্কুলে পড়াশুনা। মায়ের ইচ্ছে ছিল ছেলে ডাক্তার হবে কিন্তু প্রকৃতিপ্রেম তাকে উদ্ভিদবিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট করল। কলকাতা সিটি কলেজ থেকে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর (১৯৫৮) করে দ্বিজেন শর্মা উদ্ভিদবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে করিমগঞ্জ কলেজ, বি এম কলেজ ও নটর ডেম কলেজে চাকরি করেন। পরে প্রগতি প্রকাশনে চাকরি নিয়ে মস্কো চলে যান, সেখানে কাটে প্রায় বিশ বছর। দেশে ফিরে কাজ করেন বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিতে। জীবিকার তাড়না জীবনকে যেখানেই নিয়ে যাক, দ্বিজেন শর্মা নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন প্রাণ ও প্রকৃতির রূপের সন্ধানে। তিনি রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় নানা প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন, তৈরি করেছেন উদ্যান ও বাগান। গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণ এবং প্রকৃতিবান্ধব শহর গড়ার জন্য আজীবন প্রচার চালিয়ে গেছেন। বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে পরোক্ষ সংযোগের কারণে কিছুকাল আত্মগোপন, এমনকি কারাবাসও করতে হয়েছে দ্বিজেন শর্মাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ