ঢাকা, শনিবার 16 September 2017, ০১ আশ্বিন ১৪২8, ২৪ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোনে বাজার সয়লাব আসল-নকল চেনা কঠিন

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : আবু বকর ছিদ্দিক। চাকরি করেন একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে। হাতে একটি দামী নতুন স্যামসং মোবাইল ফোন সেট। বেতনের সাথে হাতের মোবাইলটি কোনভাবেই মানানসই মনে হচ্ছিল না ভেবে কৌত’হলবশত জানতে ইচ্ছে করলো মোবাইলটির দাম কত? কোত্থেকে কিনেছে এসব। হাসি দিয়ে বললেন, এটা আমার এক আতœীয় বিদেশ থেকে পাঠিয়েছে। সুন্দর না! হাতে নিয়ে দেখলাম। বললাম, দারুণ। এটা আমাদের দেশে (বাংলাদেশ) বিশ হাজার টাকার কম হবে না। মোবাইল সেটটা উনার হাতে দিতে দিতে বললাম, বিদেশে আতœীয় থাকলে এমন সেট ব্যবহার করা যায়। কথাটি শেষ করতে না করতেই বলে উঠলেন, আরে না ভাই, এটা আমার কোনো আতœীয় পাঠায়নি। এটি বিদেশী সেটও না। এটি ঢাকা থেকে কিনেছি, দাম মাত্র তিন হাজার টাকা। আমার পরিচিত একজন থেকে নিয়েছি। 

শুধু ছিদ্দিকই নয়, এমন অনেকের হাতেই আজকাল এমন দামি মোবাইল সেট দেখা যায়। সিএনজি ড্রাইভার, রিক্সা চালক, তরকারি ব্যবসায়ী, বাসের হেলপারসহ অল্প আয়ের মানুষের হাতে এখন এমন মোবাইল অহরহ দেখা মেলে। যেগুলো প্রথমে দেখলেই মনে হবে কোনো ‘শো-রুম’ থেকে কেনা। আসলে এসব মোবাইল তৈরী হচ্ছে খোদ রাজধানীর উপকন্ঠেই। এছাড়া চীন-ভারত থেকেও আসছে এসব মোবাইল ফোন সেট। এগুলো বাইর থেকে দেখতে সুুন্দর হলেও ভেতরের মেশিন দুর্বল। কয়েক মাস ব্যবহারের পরই দেখা যায় নানান সমস্যা। তারপরও এসব মোবাইলের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। দাম কম হবার কারণে নষ্ট হলেও আফসোস থাকে না অনেকের। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন ও ভারত থেকে মানহীন আমদানিকৃত এবং দেশে তৈরি ফোনসেটগুলো নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এ সব ফোনসেটে ইআইআর (ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্ট্রার) নম্বর থাকে না। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, নিম্নমানের এ সব ফোনসেটের মধ্যে থাকা রেডিয়েশনের গতি স্বাভাবিক সেটের তুলনায় ৪-৫ গুণ বেশি, যা মানবদেহে ক্যান্সারসহ জটিল রোগ সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশ মোবাইল ফোন বিজনেসম্যান অ্যাসোসিয়েশনের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১ কোটিরও বেশি মোবাইল ফোনসেট বিক্রি হচ্ছে। আমদানিকৃত এ সব ফোনসেট আসছে চীন, ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ থেকে। আর কিছু আসছে কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে। নকল আসল মিলিয়ে এই সংখ্যা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরায় তৈরি হচ্ছে পৃথিবীর সব নামীদামি ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন। তবে আসল নয়, নকল। এই ‘মেইড ইন জিঞ্জিরা’র অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোনের চকচকে তাক লাগানো লেবেল দেখে আসল-নকল ফারাক করা বেশ কঠিন। এসব ফোন চলে যাচ্ছে অভিজাত শপিংমল থেকে দেশের ছোট দোকানে। বিক্রি হচ্ছে চায়নিজ ফোন নামে। এমনকি ঢাকা স্টেডিয়াম এবং আউটার স্টেডিয়ামের বারান্দায় পাওয়া যাচ্ছে ‘চায়নিজ আইফোন।’ তবে চীন থেকেও আসছে হাজার হাজার নিন্মমানের মোবাইল সেট। 

সূত্র মতে, এসব ফোন কিনে প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি পণ্য উদ্ভাবনে এগিয়ে রয়েছে চীন। তেমনি নকল পণ্য তৈরিতেও চীনারা সিদ্ধহস্ত। জিঞ্জিরাও নকল পণ্য তৈরির চেষ্টা করে আসছে যুগযুগ ধরে। চীনের যন্ত্রাংশ আর জিঞ্জিরার কারিগর মিলে তৈরি হচ্ছে এসব মোবাইল ফোন। জানা গেছে, এখন অনেক মোবাইল শো-রুমেও পাওয়া যাচ্ছে নকল মোবাইল সেট। গ্রাহকদের হাতে আসল বলে নকল সেট ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে আসল আর নকলের মাঝে ফারাক না বুঝে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। 

জানা যায়, বিশ্বের যে কোনো ব্র্যান্ডের মোবাইলের খুচরা যন্ত্রাংশ সুলভে মেলে রাজধানীর গুলিস্তান পাতাল মার্কেট, হাতিরপুলের মোতালেব প্লাজা, ইস্টার্ন প্লাজা, ইস্টার্ন মল্লিকা, বসুন্ধরা সিটি, বায়তুল বিল টাওয়ারসহ কয়েকটি মার্কেটে। সেখানকার যন্ত্রাংশ খরিদ করে তা দিয়ে সহজেই তৈরি হচ্ছে অবিকল অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন। জিঞ্জিরা আগানগর, বাঁশপট্টি, কাঠপট্টি, থানাঘাট, ফেরিঘাট, বাসস্ট্যান্ড মার্কেট ও গুলিস্তান সিনেমা হলের সামনে হাবীব কমপ্লেক্সসহ এই এলাকার বেশ কিছু বাড়িতে তৈরি হয় এসব মোবাইল। স্যামসাং, আইফোন, নকিয়া, লেনোভো, সনি, এইচটিসি, লাভা, মাইক্রোম্যাক্স, সিম্ফনি, পাইলট, সিনিজু, রিগ্যাল, ম্যাক্সিমাস, ফ্যাশন, ব্লুটুথ, এমপি ফোর, এলকাটেল, টেকনো, ফর মি, সি ফাইভ, উইয়িং, লি ফোন, ডিস্পিল, গিলভ, এমটিভি, ডিডব্লিউএস, কিংসটেল, কুয়িক শেয়ার, ভিএস এন্ড মিসহ অর্ধশতাধিক ব্র্যান্ডের নকল ও রেপ্লিকা মোবাইলে সয়লাব বাজার। ‘চায়না অ্যান্ড্রয়েড’ মোবাইল ফোন সেট তৈরিতে জিঞ্জিরার বাসস্ট্যান্ড মোবাইল ফোন মার্কেটের সার্ভিসিংয়ের কারিগর স্বল্পশিক্ষিত সুমনের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। মাদারবোর্ড, ক্যাসিং, ব্যাটারি, চার্জারসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ দিয়ে দ্রুত তৈরি করতে পারে সে যে কোনো ব্র্যান্ডের ফোন।

জিঞ্জিরার কাঠুরিয়া এলাকার মোবাইল ফোন মার্কেটের একজন ব্যবসায়ী জানান, জিঞ্জিরার কয়েকটি মার্কেটে কারিগররা ঢাকা থেকে খুচরা যন্ত্রাংশ কিনে এনে এখানে ফিটিং করে। ‘আইফোন- ৬’ হলে তার চায়না যন্ত্রাংশই ব্যবহার করা হয়। তারপর ক্যাসিংটা দিলেও আসলের মতোই মনে হয়। বাজার থেকে অর্ডার দিয়ে তৈরি করে আনা হয় প্যাকেজিং প্যাকেট ও ওয়ারেন্টি-গ্যারান্টি কার্ড। এরপর বাসায় কারিগররা যন্ত্রাংশ ফিটিং করে তৈরি করে মোবাইল ফোন। এছাড়া মোবাইল তৈরির টুকটাক মালামাল নিজেরাই বানিয়ে নেয়ার মতো কারিগরও আছে।

তবে রিকন্ডিশন্ড আইফোন তৈরি একটু কষ্টসাধ্য। বসুন্ধরা মার্কেটের একজন ব্যবসায়ী জানান, অ্যাপলের অনুমোদিত সিগনেচার্ড আউটলেট নেই বাংলাদেশে। এখানে মার্কেটে যে আইফোনগুলো পাওয়া যাচ্ছে তা চোরাই পথে আসছে, অথবা রিকন্ডিশন্ড অথবা নকল। তিনি জানান, দেশের ভেতর থেকে ও বিভিন্ন দেশ থেকে নষ্ট আইফোনের মাদারবোর্ড, কেসিং এবং যন্ত্রাংশসমূহ সংগ্রহ করে তা দিয়ে তৈরি হয় এই নকল আইফোন। নকল ব্যাটারি, নকল কেসিং, নকল ডিসপ্লেø এমনকি আইফোনের আইএমই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি) নম্বর মিলিয়ে অ্যাপলের আসল বাক্সের মতো হুবহু বাক্স তৈরি করা হয়। তারপর বিভিন্ন দেশের বাজারে সেগুলো পাঠানো হয়। চায়না থেকে কোরিয়ান ‘মাস্টার কপি’ আইফোন বেশিদিন টেকে। বাংলাদেশে যেগুলো তৈরি হচ্ছে তার যন্ত্রাংশ চীনের। এগুলোর মান খুব খারাপ। দামও কম। আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা। ফুটপাতেও এই ফোন পাওয়া যায়। চীন এবং কোরিয়ান রিকন্ডিশন্ড আইফোন, চার্জার ও ইয়ারফোন মূলত বেশি বিক্রি হয় ইন্টারনেটে শ্রেণিবদ্ধ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পণ্য কেনাবেচার অনলাইন শপিং গ্রুপে। এ সব শপিং গ্রুপের কোনো অফিস থাকে না। টাকা পাঠালে তারা রিকন্ডিশন্ড আইফোন বা যে কোনো ব্যান্ডের নকল এন্ড্রয়েড ফোন পৌঁছে দেয় ঠিকানায়। সমস্যা দেখা দিলে যোগাযোগ করলে অনলাইন শপিং গ্রুপ তালবাহানা শুরু করে। তাদের ঠিকানা চাইলে জানানো হয় তাদের কোনো অফিস নেই। 

সূত্র মতে, এসব নকল মোবাইল ফোন সেট ব্যবহার রোধে মাঝে মধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। তবে এসব ব্যবসার সাথে সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতারা জড়িত থাকার কারণে সেগুলোর কোন প্রভাব বাজারে পড়েনা। ফলে প্রশাসনের নাকের ডগায় হর-হামেশা চলছে এসব ব্যবসা। অবস্থা এমন যে, এসব নকল মোবাইল ফোনই এখন আসল ফোনে পরিণত হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ