ঢাকা, সোমবার 18 September 2017, ০৩ আশ্বিন ১৪২8, ২৬ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিশ্বব্যাপী ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোব্যাকোর ব্যাপক দুর্নীতির বিষয়ে বিদেশী বিভিন্ন পত্রিকায় রির্পোট প্রকাশ

 

সংগ্রাম রিপোর্ট : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোব্যাকোর দুর্নীতির তথ্য বের হয়ে আসছে। বিভিন্ন দেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রতিষ্ঠানটি ঘুষ-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় ব্রিটিশ গণমাধ্যমসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোব্যাকো পৃথিবীতে দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি এই ঘুষ ও দুর্নীতিকে ব্যবসা চালাবার ব্যয় হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানীর এক সাবেক কর্মকর্তা পল হপকিন্স, যিনি প্রায় ১৩ বছর ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোব্যাকোর কেনিয়া অফিসে কাজ করেছেন। যুক্তরাজ্যের সিরিয়াস ফ্রড অফিস পূর্ব আফ্রিকাতে এই কোম্পানীর দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখছে। ঘটনার  সুত্রপাত বিবিসি প্যানোরামা নামক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যখন ২০১৫ সালের শেষ  দিকে পল হপকিন্স নামক এ সাবেক কর্মকর্তা সব ঘটনা ফাঁস করে দেন। তিনি জানান যে, তার কাজ ছিল ব্যাবসায়িক প্রতিযোগীরা যাতে বড় হয়ে উঠতে না পারে তার ব্যবস্থা  করা ।  তিনি স্বীকার করেন যে, পৃথিবীর এই দ্বিতীয় বৃহত্তম তামাক কোম্পানি টি বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গকে ঘুষ দিয়ে যাচ্ছে এবং হপকিন্স নিজেই তার ব্যবস্থা করে দিতেন আর এটাই ছিল তার চাকুরী । কোম্পানিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো যে, তামাক আইন প্রভাবিত করার জন্য তারা আমলা, রাজনীতিবীদদের অর্থপ্রদান করেছে। হপকিনস এর শেয়ার করা গোপন কিছু কাগজপত্রের বরাত দিয়ে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক একটি সংবাদপত্র জানায় যে এই ঘুষ কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য ছিল তামাক বিরোধী আইন গুলো কে বাধাগ্রস্থ করা। ধারণকৃত তথ্য ও কাগজপত্র অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো বুরুন্ডির একজন উচ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে দেশটির টোবাকো নিয়ন্ত্রণ বিলের একটি খসড়া কপি সরবরাহের জন্য অর্থ প্রদান করেছে। 

ব্রিট্টিশ দ্য গার্ডিয়ান    ইংরেজি  দৈনিকের তদন্ত অনুযায়ী ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো আফ্রিকার প্রায় ৮টি দেশের সরকারকে বিভিন্ন সুবিধা দিতে চাপ প্রদান করেছে।  বিভিন্ন খ্যাতনামা পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী,ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো শুধুমাত্র সরকারি কর্মকর্তা বা রাজনীতিবিদদের যে বিশেষ সুবিধা দিয়ে থাকে তা নয়, বরং আন্তর্জাতিক সংস্থা গুলোতেও লবিং এর ব্যাপারে তাদের নামে অভিযোগ আছে। পল হপকিন্স এর দেয়া সাক্ষাৎকারে বিশ্ব স¦াস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন ও টোবাকো কন্ট্রোল এর দুই সদস্য কে অবৈধ অর্থ প্রদানের অভিযোগ মিলেছে। বিশ্বব্যাপী সচেতন নাগরিক এবং স¦াস্থ্য কর্মীরা এসব ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেছেন। এর আগে ২০১৩ সালে যখন অভিযোগ ওঠে যে সলোমন মুয়িতা নামে ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকোর এক লবিস্ট পার্লামেন্টের সদস্যসহ প্রায় ৫০ জনকে ঘুষ দিয়েছে, তখন কোম্পানিটি ঘুষ দেওয়ার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ওই লবিস্টকে চাকরিচ্যুত করেন। তবে সলোমন মুয়িতা জানান যে তিনি কেবল কোম্পানির আদেশ পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে তিনি অন্যায় অপসারণ এর দায়ে কোম্পানির বিরুদ্ধে একটি মামলাও করেন। 

  দ্য ন্যাশনাল মিডিয়া অব কেনিয়া রিপোর্ট করেছে যে ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো কেনিয়াতে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির উপর নজরদারি রাখতে সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ প্রদান করেছে।  পত্রিকাটি আরো রিপোর্ট করেছে যে, প্রতিদ্বন্দ্বী মাস্টারমাইন্ড নামক কোম্পানির  উপর নানাবিধ কর দাবি করার জন্য সিগারেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে কেনিয়া রাজস্ব কর্তৃপক্ষ এর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা মোটা অংকের ঘুষ নিয়েছে, যা কিনা দেশীয় শিল্প গুলোকে চাপের মুখে রাখার একটি কৌশল মাত্র। প্রতিপক্ষ কোম্পানির বোর্ড মিটিং এর তথ্য , মার্কেটিং প্ল্যান , প্রোডাকশন প্রসেস ইত্যাদি ফাঁস করার জন্য কোম্পানিটি প্রতিপক্ষের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়োগের ব্যাপারে সচেষ্ট ছিল বলে প্রতিবেদন এ প্রকাশ পায়। রিপোর্টে আরো বলা হয় যে কেনিয়াতে মাস্টারমাইন্ড এর পরই ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো মার্কেট নিয়ন্ত্রণ করে। 

বড় সিগারেট কোম্পানিগুলোর অসাধু ব্যবসা চর্চা আফ্রিকার বাইরেও হয়ে থাকে।  এদের সন্দেহজনক ক্রিয়াকলাপের কারণে যুক্তরাষ্ট্র , যুক্তরাজ্য এবং আসিয়ান দেশগুলো তেও বিভিন্ন প্রশ্নের উৎপত্তি হয়েছে। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে কর ফ্রিজ এর বিনিময়ে কোম্পানিটি মালয়েশিয়াতে কমনওয়েলথ গেমস এর নিয়মাবলী লঙ্ঘন করে। সাউথ ইস্ট এশিয়া টোবাকো কন্ট্রোল এলায়েন্স এর বক্তব্য অনুযায়ী ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো মালয়েশিয়াতে ১৯৯৮ সালে কমনওয়েলথ গেমস স্পনসর করে এবং কিছু অন্যায় সুবিধা পাওয়ার জন্য বাৎসরিক রিপোর্টে প্রকাশ সংক্রান্ত নিয়ম এড়িয়ে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত মালয়েশিয়াতে পাঠিয়ে দেয়। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো মালয়েশিয়া, ক্যাম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম সহ প্রায় সব আসিয়ান দেশগুলো তে সিগারেট বিক্রি করে থাকে এবং এই সকল দেশগুলোর অনেকগুলো তেই তামাকের বাজারের একটা বড় অংশ তাদের দখলে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ এসেছে। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এই পাবলিকলি ট্রেডেড তামাক কোম্পানিটি আমেরিকায় কংগ্রেসম্যানদের চাপের সম্মুখীন হয়, যার নেতৃত্ব দেন লয়েড ডগেট এবং সেনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল যারা দাবি করেন যে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর কার্যকলাপ হয়তো ফরেন করাপ্ট প্রাক্টিসেস এক্ট এবং আন্টি-ব্রাইবারি উভয় আইনেরই লংগন - এমনটি   রিপোর্ট করেছে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা। যুক্তরাষ্ট্রে তদন্তের এমন আহ্বান শোনা যায় ঠিক যখন আটলান্টিকের ওপর পারে যুক্তরাজ্যে কিছুদিন আগেই কোম্পনিটিকে জরিমানার ঘটনা ঘটে।  দ্য গার্ডিয়ান রিপোর্ট করেছে যে যুক্তরাজ্যের রাজস্ব ও কাস্টমস দপ্তর কোম্পানিটিকে কম করের ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে ওভার সাপ্লাই এর দায়ে ৬৫০,০০০ পাউন্ড জরিমানা নির্ধারণ করে।  স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক সংগঠন গুলো শঙ্কা করছে যে অতিরিক্ত সিগারেট গুলো হয়তো যুক্তরাজ্যেই ফেরত আসবে।   

 সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশের দুটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো আবারো আলোচনায় আসে। জানা যায় যে, ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো আইন মন্ত্রণালয় থেকে স্বার্থনুকূল মতামত পাওয়ার জন্য এবং সরকারের প্রাপ্য মূসক ফাঁকি দেওয়ার জন্য লবিং করছে।  উল্লেখ্য যে , ২০০৯-১০ থেকে ১২-১৩ অর্থ বছরে কোম্পানিটি ১৯২৪ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকির ব্যাপারে করা একটি মামলায় হাইকোর্ট এ হেরে যায়। রিপোর্ট এ প্রকাশিত হয় যে কোম্পানিটি ভ্যাট প্রদানের ব্যাপারে সুরাহা করতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনারকে কে ব্যবহার করছে। ব্রিটিশ হাই কমিশনার এলিসন ব্লেক বাংলাদেশ সরকারকে দেওয়া এক চিঠিতে বলেন যে আইন মন্ত্রণালয় এর দেওয়া একটি চিঠির ব্যাপারে তিনি অবগত আছেন যেখানে বলা হয়েছে যে ভূতাপেক্ষ ভাবে কোনো উৎপাদনকারী কে ভ্যাট প্রদানে দায়ী করার কোনো সুযোগ নেয়। 

  এর পূর্বে একই বিষয়ে গার্ডিয়ান এ প্রকাশিত এক সংবাদের ভিত্তিতে বলা হয় যে, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বিশ্বের অন্যতম দরিদ্রতম দেশ বাংলাদেশে কর ফকির অভিযোগে একজন সিনিয়র কূটনীতিকের সহায়তা গ্রহণ করেছে। ব্রিট্টিশ ভিত্তিক সংবাদপত্র টি আরো রিপোর্ট করে যে, ২০১৫ সালে পাকিস্তানে দেশটির অর্থমন্ত্রীর সাথে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর বৈঠকে ব্রিটিশ হাই কমিশনার যোগদান করেন যে মিটিং এর উদ্দেশ্য ছিল তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম গুলো বিরোধিতা করা।  বাংলাদেশের একটি বেসরকারি সংস্থার বরাত দিয়ে পত্রিকাটি বলে যে, বাংলাদেশে প্রায় ১ লক্ষ মানুষ তামাকের কারণে মারা যায় এবং প্রায় ৩ লক্ষ ৮২ হাজার মানুষ তামাক সেবনে পংগু হয়। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশে তামাক খাতে সর্বোচ বাজার দখল করে আছে যা অনেকটা মনোপলি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ