ঢাকা, সোমবার 18 September 2017, ০৩ আশ্বিন ১৪২8, ২৬ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণে সরকারের কোনো ব্যবস্থাপনা নেই ॥ সেনা মোতায়েন দাবি

দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গতকাল রোববার সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

 

স্টাফ রিপোর্টার: কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণে সরকারের কোনো ব্যবস্থাপনা নেই বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। তারা অবিলম্বে এই কর্মকান্ডে সেনা বাহিনীকে সম্পৃক্ত করার দাবি জানিয়েছে। গতকাল রোববার দুপুরে নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার যে ত্রাণ-টান করছেন, ব্যবস্থা করছেন তা লোক দেখানো ব্যাপার। এখন পর্যন্ত খবর আছে সেখানে কোনো ম্যানেজমেন্ট নেই, প্রায় ফেল করে যাচ্ছে। ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই বিশাল সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের অবিলম্বে জাতীয় পর্যায়ে সমস্ত রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোকে নিয়ে আলোচনা করে সকল মানুষকে এখানে সম্পৃক্ত করাটা অত্যন্ত জরুরী বলে আমরা মনে করি। আমি বলব, পরস্পর কাঁদা  ছোঁড়াছুঁড়ি না করে ভালো হবে যদি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এই বিষয়গুলোর ওপর জোর দেন। 

সাংবাদিক সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী, সাংগঠনিক সম্পাদক  সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। 

মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা মনে করি, অবিলম্বে মিয়ানমার সরকারের ওপরে চাপ সৃষ্টি করার জন্য, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নাগরিকত্ব দিয়ে সসন্মানে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন এবং তার জন্য যা যা করার প্রয়োজন তা তাদের ব্যবস্থা নেয়া অত্যন্ত দরকার বলে আমরা মনে করি। 

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, আমি কিছুক্ষণ আগেই ইউএনডিপি‘র ঢাকার আবাসিক প্রধানের সঙ্গে কথা বলে এসেছি। তারা বলেছে যে রোহিঙ্গা শরণার্থী ওয়ান মিলিনয় ছাড়িয়ে গেছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত ছিলো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা, সরকারের উচিত ছিলো সমস্ত রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন এবং অন্যান্য সংগঠন যারা ত্রাণ র্কাপ রিচালনা করে তাদেরকে ডেকে কথা বলে একটা জাতীয় ঐক্য তৈরি করে এই ভয়াবহ যে চ্যালেঞ্জ, সেই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করার জন্য জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করা। সরকার তা না করে অত্যন্ত অন্যায়ভাবে বিরোধী দল যে ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছে বিশেষ করে বিএনপি যে ত্রাণ নিয়ে গেছে তাতে বাধার সৃষ্টি করেছে। 

কক্সবাজার থেকে সরেজমিনে দেখে এসে রিলিফ টিমের আহ্বায়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, সেখান অবস্থা ভয়াবহ। সরকারের প্রতি আহ্বান জানাবো, অবিলম্বে দেশী-বিদেশী যত সহযোগিতা ও অনুদান এসেছে তা সুষ্ঠুভাবে বন্টনের জন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সেনাবাহিনী নিয়োগ করুন। রোহিঙ্গা শরনার্থীদের পূর্ণবাসনসহ সকল প্রকার ত্রাণ তৎপরতায় সেনা বাহিনী নিয়োগ করার জন্য আমরা অনুরোধ জানাচ্ছি। 

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও দলের পক্ষ থেকে আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো রাজনীতি নয় আসুন দলমত নির্বিশেষ সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে আর্ত মানবতার সেবায় কাজ করি। জাতীয় দুযোর্গে যখন একসঙ্গে কাজ করা কর্তব্য তখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ত্রাণ কাজে বাঁধা প্রদানের মতো নোংরামী থেকে বিরত থাকার জন্য আমি সরকার ও মাথা মোটা মন্ত্রীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। 

 রোহিঙ্গাদের ত্রাণ ও সহায়তা প্রদানে মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। গত ১৩ সেপ্টেম্বর দলের এই রিলিফ টিম মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে কক্সবাজারের উখিয়ায় ত্রাণ দিতে গেলে স্থানীয় কক্সবাজারেই দলের ২২টি ট্রাক আটিকয়ে দেয়। মির্জা আব্বাস জানান, ২২ ট্রাকের ত্রাণ সামগ্রি স্থানীয়ভাবে রোহিঙ্গাদের কাছে বিতরণ করা হচ্ছে। 

স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস অভিযোগ করে বলেন, আমরা সফরকালে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনকে ত্রাণ তৎপরতা দিতে দেখলেও সরকার ও আওয়ামী লীগের তেমন কোনো কার্য্ক্রম দেখিনি। ১৩ সেপ্টেম্বর আমাদেরকে ত্রাণ বিতরণ করতে বাঁধা দেয়া হলেও ১৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকে ত্রাণ বিতরণ করতে এবং মঞ্চ করে ব্যানার লাগিয়ে বক্তৃতা দিতে দেয়া হয়েছে। আমরা সরকারের এহেন দ্বিমুখী আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই। আর্ত মানবতার সেবায় আমরা ত্রাণ দিতে গিয়েছিলাম, এটা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিলো না। 

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ক্ষমতাসীনরা চাঁদাবাজি করছে অভিযোগ কওে মির্জা আব্বাস বলেন, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা অসহায় মানুষদের কাছ থেকে ক্ষমতাসীনদের চাঁদাবাজীর খবর শুনেছি। এই অপরাধে যুব লীগের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক বর্তমানে কারাগারে আছেন। কেন্দ্রীয় রিলিফ টিমের সঙ্গে কাজ করার অভিযোগে স্থানীয় দলের ৬ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার ও তাদের ভ্রাম্যমান আদালতে সাজা প্রদানের ঘটনার নিন্দাও জানান রিলিফ টিমের আহ্বায়ক। 

মির্জা আব্বাস জানান, বিএনপির রিলিফ টিম টেকনাফ ও উখিয়ায় শরনার্থী শিবিরের কাছে ৪০টি স্যানেটারি টয়লেট, ১২টি টিউবওয়েল স্থাপন, মৃত রোহিঙ্গাদের দাফনে সহযোগিতা প্রদান, চিকিৎসা সেবা ও বিনামূল্যে ঔষধ প্রদান করেছে। তিনি বলেন, আমাদের ত্রাণ তৎপরতা বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশমতো অব্যাহত থাকবে এবং কোনো অপকৌশলে এই কার্য্ক্রম সরকার বন্ধ করতে পারবে না। 

রোহিঙ্গাদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, রোহিঙ্গা শরনার্থীদের আশ্রয় স্থলসমূহ পরিদর্শনকালে আমরা অত্যন্ত বেদনার সাথে পরিবার বিচ্ছিন্ন নারী ও শিশু, পিতৃহীন অনাথ, মায়ানমার বাহিনীর নিষ্ঠুরতার চিহ্ন বহনকারী বৃদ্ধ এবং তাদের বর্বর অত্যাচারের শিকার নারীদের দেখেছি। নিহত নিকটাত্মীয়দের শোকে ক্রন্দনরত আর নিখোঁজ আত্মীয়দের জন্য অপেক্ষারত নারী-পুরুষ ও শিশুর আর্তনাদে গোটা এলাকার আকাশ বাতাশ ভারী হয়ে আছে। এর মাঝেও এসব মানুষের গরু, ছাগল, গয়নাগাটি এবং অর্থসম্পদ লুটের মত নৃশংসতার অভিযোগও আমরা পেয়েছি। পাহাড়ে, টিলায় কিম্বা খালি জায়গায় একটা থাকার জায়গা পেতে ক্ষমতাসীনদের চাঁদা দিতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগও শুনতে হয়েছে আমাদের। নির্যাতীত মানুষের পাশে এসব অমানুষের অবস্থান কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা এর প্রতিকার এবং অপরাধীদের শাস্তি দাবী করি।  

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদকের প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে প্রথম থেকে এখন পর্যন্ত দেয়া মিথ্যা ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, বিএনপি’কে ত্রাণ কাজে বাধা দেওয়ার নেপথ্য কারিগর হিসাবে তিনি তার অপরাধ ঢাকার বৃথা চেষ্টা করে চলেছেন। আমরা যদি তার মত সামান্য কিছু ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে বড় বড় কথা বলতে যেতাম - তাহলে হয়তো বাধা দেয়া হতো না। বেশী করে ত্রাণ সামগ্রী নেয়ায় আমরা তার রোষের ও বাধার শিকার হয়েছি। তবে তাকে আমরা জানাতে চাই যে, আমাদের ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত থাকবে এবং কোন অপকৌশলেই তিনি তা বন্ধ করতে পারবেন না। মির্জা আব্বাস বলেন, অসহায় বুভুক্ষ মৃত্যুপথযাত্রী রোহিঙ্গাদের জীবন বাঁচাতে আওয়ামী সরকার অদ্যাবধি কোন প্রকার ত্রাণ সামগ্রী না পাঠিয়ে সমস্ত জনপ্রিয়তা অর্জনের নামে বিবৃতি ও বক্তব্য দিয়ে অসহায় রোহিঙ্গাদের প্রতারণা করছেন। ক্ষুধাতুর রোহিঙ্গাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রতিদিনই গণমাধ্যমে বিএনপি’র ২২ ট্রাক ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে কেন বক্তব্য দিয়েই যাচ্ছেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। তবে অনুমান করা যায় যে, বিএনপি’র ত্রাণ সহায়তার ভূমিকায় সরকারী দল হেরে গেছে এবং এজন্যই তাদের এতো গাত্রদাহ। বিএনপি’র ত্রাণ কাজে বাধা দেয়ার মতো যে অপরাধ সরকার সংঘটিত করেছে তা ধামাচাপা দিতেই তিনি অনবরত বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। 

নিন্দা ও প্রতিবাদ: বগুড়া জেলা বিএনপি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদ মাফ্তুন আহমেদ খাঁন রুবেল আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দমন করতে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী উৎপীড়ণের পন্থা বেছে নিয়েছে। দেশে আইনের শাসন নেই বলেই বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাজানো মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, কারান্তরীণ করা হচ্ছে। বগুড়া জেলা বিএনপি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি মাফ্তুন আহমেদ খাঁন রুবেল বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বলেই তাকে মিথ্যা মামলায় জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবিলম্বে মাফ্তুন আহমেদ খাঁন রুবেল এর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার করে নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ