ঢাকা, সোমবার 18 September 2017, ০৩ আশ্বিন ১৪২8, ২৬ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হিতে বিপরীত হতে পারে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

 

এইচ এম আকতার: চালের বাজার অস্থিরতার জন্য মিলার সিন্ডিকেটকে দায়ী করছে সরকার। আর বাজার নিয়ন্ত্রণে এসব মিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু করেছে। এবার অবৈধভাবে চাল মজুতদারদের  গ্রেফতার করতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। আর এ অভিযান চলবে সারা দেশব্যাপী। এবারও দায় চাপছে বিএনপি পন্থী মিলাদের ঘাড়ে। তবে সারা দেশে অভিযানে চালের বাজার আরও অস্থির হতে পারে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা। 

গতকাল রোববার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে অটোরাইস মিল এসোসিয়েশনের নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এমন তথ্য জানান। বৈঠকে খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। 

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সারাদেশে চালকলগুলোতে অভিযানের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেখানে চালের অবৈধ মজুত পেলে ওই চালকল মালিককে গ্রেফতার করতে হবে। 

তিনি বলেন, গতকাল নওগাঁয় বাংলাদেশ চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশিদের গোডাউনে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত রাখা বিপুল পরিমাণের চাল পাওয়া গেছে। ওই প্রতিষ্ঠানকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ায় আব্দুর রশিদের ১৩টি গোডাউনে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণে চাল উদ্ধার করা হয়। 

এসময় বাণিজ্যমন্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, বাংলাদেশ চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে তারা ষড়যন্ত্র করছেন।তাদেরকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছেও বলেও জানান তিনি। 

কথিত আছে, কুষ্টিয়ায় গুটি কয়েক মিলারের কারসাজিতেই অস্থির চালের বাজার। মিডিয়াগুলোর এমন রিপোর্ট প্রচারের পর নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। অভিযান চালায় টাস্কফোর্স। মিলারদের বিরুদ্ধে বিপুল মজুদের প্রমাণ পেয়েছে তারা। যদিও বরাবরের মতোই অভিযোগ অস্বীকার করছেন চালকল মালিকরা।  

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরে রশিদ এগ্রোফুড প্রোডাক্ট লিমিটেডে অভিযান চালিয়েছে জেলা টাস্কফোর্স কমিটি। রোববার বিকেল চারটার দিকে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয়। 

এর আগে গত সোমবার সেখানে অভিযান চালিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। রশিদ এগ্রোফুডের মালিক আবদুর রশিদ বাংলাদেশ অটো মেজর এন্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি। 

ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আবদুর রশিদের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তাঁকে মিলে আসার জন্য মিলের কর্মকর্তাদের তাগাদা দিতে থাকেন। তবে মিলের কর্মকর্তারাও আবদুর রশিদের মিলে আসার ব্যাপারে কোনো কথা বলেন না। একপর্যায়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা মিলের ব্যবস্থাপককে আটকের জন্য ওসিকে বলেন। 

এদিকে আব্দুর রশিদ বলেন,৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু কারনে এই জরিমানা করা হয়েছে তা আমি জানি না। আমার মিলে বর্তমানে সবচেয়ে কম চাল মজুদ রয়েছে। 

এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জাতীয় সংসদের অনির্ধারিত আলোচনায় বলেন,ভারত থেকে বাংলাদেশে চাল রপ্তানি বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।কারও স্বাক্ষর ছাড়া একটি চিঠি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ভিত্তিতে কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করেছে; যা মিথ্যা ও বানোয়াট। এটা চালের কৃত্রিম সংকট ও দাম বাড়ানোর চেষ্টা। একটি শ্রেণি কারসাজি করে চালের দাম বাড়াতে চায়। 

এদিকে খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, দেশে চালের কোন সংকট না থাকলেও একটি সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে বাজার অস্থিতিশীল করে তুলছে। চাল নিয়ে যারা চালবাজি করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। 

খাদ্যমন্ত্রী বলেন, হাওর অঞ্চলে ফসলহানিসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। ঘাটতি মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানি হচ্ছে। কিন্তু অসাধু একটি সিন্ডিকেট ভীতি ছড়িয়ে উদ্দেশ্যমূলক ভাবে চালের দাম বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। 

এদিকে চাল নিয়ে কথা বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কাজী সাহাবউদ্দিন। তিনি বলেন, ১০ বছর পর চাল নিয়ে সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। উৎপাদন কম হওয়ায় বাজারে প্রধান এই খাদ্যপণ্যের দাম উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে আমদানি করছে, সেখানেও দাম বেড়েছে। আগামী মে মাস নাগাদ বোরো মৌসুমের চাল বাজারে না আসা পর্যন্ত চালের বাজারে স্বস্তি ফেরার আশা দেখা যাচ্ছে না। 

 তিনি আরও বলেন, এটা হয়েছে হাওরে ফসলের ক্ষতি ও পরবর্তী বন্যায়। গত বোরো মৌসুমে প্রায় ২০ লাখ টন চাল কম উৎপাদিত হয়েছে বলে বলা হচ্ছে। চালের দাম মে মাস থেকেই বাড়তে শুরু করে। তখনই যদি সরকার থেকে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে আজকের পরিস্থিতি তৈরি না-ও হতে পারত। কারণ তখন আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কম ছিল। এরপর কিন্তু সরকারের মজুত একেবারে কমে গেল। সাধারণত দেখা যায়, সরকারের মজুত কমে গেলে খোলাবাজারে চালের দাম বেড়ে যায়। বেসরকারি খাত কিন্তু জানে, সরকারের মজুত কত। কিন্তু বেসরকারি খাতে মজুত কত, তা কিন্তু সরকারের অজানা। যদিও ২০১৩ সালে একটি আইন করা হয়, বেসরকারি খাতে মজুত কত, সে হিসাব তারা প্রতি মাসে দেবে। কিন্তু সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। 

তিনি আরও বলেন, সব দিক বিবেচনায় ভারতই আমাদের জন্য উপযোগী। ওই দেশ থেকে দ্রত আমদানি করা যায়। কিন্তু ভারত তো চালের দাম বাড়িয়ে দিল। আবার শুনছি, তারা আড়াই মাস রপ্তানি বন্ধ রাখবে। যদিও এর সত্যতা আমি জানি না। 

তিনি বলেন,বেসরকারি চালকল মালিকদের গুদামে অভিযান চালালে পরিস্থিতি হিতে বিপরীত হতে পারে। এতে বাজার আরও অস্থিতিশীল হবে। আমাদের আমদানি করে মজুত বাড়াতে হবে, সেটা যত দ্রত সম্ভব। এরপর খোলাবাজারে চাল বিক্রি কর্মসূচি (ওএমএস) চালু করতে হবে এবং তা বেশ বড় আকারে। বেসরকারি খাতকে আমদানির যথেষ্ট প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতকে সঙ্গে নিয়েই এ ধাক্কা সামলাতে হবে। কারণ সরকারের পক্ষে এটা সামলানো কঠিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ