ঢাকা, মঙ্গলবার 19 September 2017, ০৪ আশ্বিন ১৪২8, ২৭ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চালের বাজারে আগুন ॥ ক্ষুধার্ত মানুষের পেটে জ্বালা

এইচএম আকতার : বাজার নিয়ন্ত্রণে ওএমএস’র চাল বিক্রিসহ নানা উদ্যোগ নিলেও নিভছে না আগুন। উল্টো বাড়ছেই চালের দাম। আগুনে পানি না দিয়ে বাতাস দেয়ার মত অবস্থা। ব্যবস্থা যত নিচ্ছে দাম ততই বাড়ছে। অবস্থা এমন যে চালের বাজারে আগুন আর ক্ষুধার্ত মানুষের পেটে জ্বালা। তারপরেও ওএমএস’র মাধ্যমে আতপ চাল বিক্রি হওয়াতে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ক্রেতারা। সংকট সমাধানে সরকার মজুদ না বাড়িয়ে উল্টো মিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। অভিযানের ভয়ে অনেক মিল মালিক গুদাম বন্ধ করে দেয়ায় সরবরাহ কমে গেছে। এ অবস্থা পরিবর্তন না হলে চালের বাজারে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

জানা গেছে, রাজধানীর পাইকারি আড়তগুলোয় চাল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন মিলমালিকরা। এমনকি অনেক চালকল মালিকের সঙ্গে যোগাযোগও করা যাচ্ছে না। এ অভিযোগ রাজধানীর খুচরা চাল বিক্রেতাদের। তারা বলছেন, দেশে ভয়াবহ বন্যার কারণে চলতি মৌসুমে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শস্য উৎপাদন। আর এ সুযোগে কম উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি দেখিয়ে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন মিলমালিকরা। সরকার দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

খাদ্য বিভাগ জানায়, চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে রোববার থেকে সারা দেশে ওএমএস (খোলা বাজারে বিক্রি) কর্মসূচি চালু হয়েছে। চলবে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত। সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন ওএমএস পয়েন্টে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আকস্মিকভাবে দ্বিগুণ মূল্য নির্ধারণ এবং আতপ চাল হওয়ায় তাদের কাছ থেকে তেমন সাড়া মিলছে না।

দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুদ আছে বলে সরকার দাবি করছে। যদিও ওএমএসের চালের দাম এবার গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ নির্ধারণ করা হয়েছে। সারা দেশে রোববার থেকে ওএমএসের মাধ্যমে একযোগে চাল বিক্রি শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অনেক পয়েন্টে বিক্রি হয়নি বলে জানা গেছে। পর্যাপ্ত প্রচারের অভাবে অনেকে জানেনই না যে ওএমএসের মাধ্যমে চাল বিক্রি ফের শুরু হয়েছে।

 গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১২ টাকা। এতে নাভিশ্বাস উঠেছে নিম্ন আয়ের মানুষের। আয়-ব্যয়ে সামাঞ্জস্য রাখতে না পেরে কেউ কেউ ভাত খাওয়া কমিয়ে রুটির উপর নির্ভরশীল হচ্ছেন। রাজধানীর নিম্ন আয়ের মানুষদের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

সেলিনা আক্তার একজন নিম্ন আয়ের মানুষ। বাবা-মায়ের টানাটানির সংসারে কিছুটা হাল ধরতে পড়াশুনা শেষ না করেই নেমে পড়েন কাজের সন্ধানে। তিন বছর আগে ঢাকার একটি তৈরি পোশাক কারখানায় পাঁচ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন তিনি। রোববার দুপুরে লাঞ্চের ছুটির ফাঁকে চাল কিনতে গেছেন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে। এসময় এক অবিশ্বাস্য তথ্য জানান এই পোশাক কর্মী। বললেন, চালের দামের উর্দ্ধগতির কারণে ভাত খাওয়ার পরিমাণ কমাচ্ছেন তিনি। তার সহকর্মীদের মধ্যেও অনেকেই রাতে ভাত না খেয়ে রুটি কিনে খাচ্ছেন।

বাবুল নামের একজন রিকশা চালক বলেন, ভাত না খেয়ে তো বাঁচা যাবে না। কিন্তু এখন তো দেখছি খাওয়া কিছুটা কমাতে হবে। এছাড়া উপায় নাই। তাছাড়া এখন ওএমএস’র মাধ্যমে আতপ চাল বিক্রি করছে। আতপ চালের ভাত খাওয়ার চেয়ে আটা খাওয়া অনেক ভাল।

বাঙালী ঐতিহ্য রয়েছে শীতকাল এলেই সাধারন মানুষ পিঠা খেতে এই আতপ চাল ব্যবহার করে থাকে। এই চালের ভাত খেতে অভ্যাস্ত নয়। অনেক সময় রোগীদের এই চালের ভাত খাওয়াতে বলে থাকেন ডাক্তাররা। অবস্থা এমন যে না খেয়ে থাকলেও অনেক এই চালের খাত কেতে চাননা।

ভোক্তাদের এসব আক্ষেপ আর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বাজার যাচাই করে। কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ থেকে ১২ টাকা।

খোদ সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবমতে, এক সপ্তাহে চালের দাম বেড়েছে ১০ টাকা। সংস্থাটির দৈনিক বাজার দর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রোববার মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৪ টাকায় আর সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৬৮ টাকায়।

এদিকে মিয়ানমার থেকে চাল আমদানির বিষয়ে দেশটির ৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গতকালও বৈঠক করেছে খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলামের সঙ্গে। অবশ্য এ সময় কোনো চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক হয়নি। জানা গেছে, দেশটি প্রতিটন চালের মূল্য ৪৫০-৪৮৫ মার্কিন ডলার করে দাবি করছে। সফরকারী দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মিয়ানমার রাইস ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট উন থান উং।

খাদ্য বিভাগের রেশনিং কর্মকর্তা ডি-১ তৌফিক-ই-এলাহী বলেন, ওএমএসের অনেক ভোক্তা পুরনো দামে (১৫ টাকা কেজি) কিনতে না পেরে ফেরত যেতে দেখেছেন তিনি। এই কর্মকর্তা বলেন, অনেক ভোক্তাই আতপ চাল কিনতে রাজি হননি। আর দাম বৃদ্ধির কথাও অনেকে জানতেন না। প্রথম দিন তাই ওএমএসের বিক্রিতে গতি আসেনি।

সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, চাল বিক্রি চলছে ঢিলেঢালাভাবে। ক্রেতার ভিড় তেমন একটা নেই। চালের বাজারে যখন আগুন, তখন ক্রেতা সমাগম কম কেন জানতে চাইলে ওএমএসের ডিলার মো. মহিউদ্দিন জানান, প্রচার ছিল না, দামও দ্বিগুণ এবং আতপ চাল হওয়ায় এ সমস্যা। রাজধানীর ঝিকাতলা স্টাফ কোয়ার্টারের মোড়ে ট্রাকে করে ওএমএসের চাল বিক্রি করছিলেন তিনি।

সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মহিউদ্দিন জানান, দাম দ্বিগুণ ও আতপ চাল হওয়ায় ক্রেতাদের অনেকেই বিরক্ত হচ্ছেন। বলা যায়, যারা কিনছেন তারা একরকম ঠেকায় পড়েই কিনছেন। সেখানে দেখা গেল, ক্রয় করা চাল ফেরত দিতে এসেছেন মো. হাসানুজ্জামান নামে এক ক্রেতা। তিনি বলেন, ১৫ টাকার বদলে ৩০ টাকায় কেনা চাল, তা-ও আবার আতপ এ কেমন কথা! সরকারের বিবেচনা বলে কি কিছু নেই? বেসরকারি ইনস্যুরেন্স কোম্পানির সাধারণ এই কর্মচারীর চোখে-মুখে হতাশা।

চাল কিনতে আসা আরেক ক্রেতা রিকশাচালক আনিসুর রহমান। চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনছিলেন অন্যদের কথা। তাকে জিজ্ঞেস করা হলে হতাশার সঙ্গে বলেন, ১৫ টাকায় কিনতে আসছিলাম চাল। এখন তো দেখি ৩০ টাকা। কী করুম ভাবতেছি, স্যার। ঝিকাতলার ঋষিপাড়ার গৃহিণী চিত্ররেখা। তিনি জানান, দ্বিগুণ দামের চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। হতাশায় জর্জরিত এই নারী বলেন, ১৫ টাকার চাল ৩০ টাকা। তা-ও কিনলাম। ৪০ টাকা হলেও না কিনে উপায় নেই, ভাই। বাজারে চালের দামে যে আগুন, তাতে আমরা তো সবাই কোণঠাসা আর জিম্মি।

এদিকে সরকারি গুদামে থাকা ১৭শ টন আতপ চাল বিতরণ না হওয়া পর্যন্ত ওএমএসে সিদ্ধ চাল সরবরাহ করা হবে না বলে জানা গেছে খাদ্য বিভাগ সূত্রে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মোটা-চিকন সব ধরনের চালের দাম বেড়েই চলছে। সপ্তাহের ব্যবধানে নাজিরশাল, মিনিকেটসহ সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত। নাজির ও মিনিকেট চালের দাম ৬৫ থেকে ৭০, লতা ৫০ থেকে ৫১, আটাশ চালের দাম ৫৪ থেকে ৫৫, স্বর্ণা চালের দাম ৫৪ থেকে ৫৫ টাকা।

সূত্র জানায়, নওগাঁ, দিনাজপুর, আশুগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সান্তাহার, রাজশাহী, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় তিন শতাধিক চালকল মালিক রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩০ জন বড় মাপের মিলমালিক ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে বর্তমানে ধান-চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। সরকারের হাতে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, চালের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে একটি ‘দুর্ভিক্ষ’ সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। চলছে সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টা। চিহ্নিত এসব মজুতদারের গুদামে এ মাসেই হানা দিয়ে খাদ্য লাইসেন্সের ধারা অনুযায়ী সমুদয় চাল বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেবে সরকার।

খাদ্য বিভাগ জানায়, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে চলতি অর্থবছরে ২২ হাজার ৪৬৩ জন চালকল মালিকের সঙ্গে বোরো চাল সংগ্রহের জন্য চুক্তি করে সরকার। শর্ত ছিল, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এরা সরকারি গুদামে ৮ লাখ টন চাল সরবরাহ করবেন। কিন্তু সরকারের আহ্বানে সাড়া দেননি তারা।

জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি একাধিক সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ মুহূর্তে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের কিছু বড়মাপের চালকল মালিক ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। বোরো ও আমন মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে চাল কিনে গুদামজাত করেছেন তারা। এসব অবৈধ চালের মজুতদারদের আটক করতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।

খুচরা ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের অভিযোগ, মিলারদের সিন্ডিকেট সৃষ্টিই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। যদিও মিলমালিক ও শীর্ষস্থানীয় চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, ধানের সংকটই দামবৃদ্ধির মূল কারণ। এ ছাড়া সোনামসজিদ বন্দর দিয়ে জুলাই থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮০ হাজার টন চাল আমদানি হলেও বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

প্রশাসন বলছে, চাল মজুদকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন পেলে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নিতে তারা প্রস্তুত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) মো. এরশাদ হোসেন খান জানান, চালের বাজার ও মজুদকারীদের ব্যাপারে প্রশাসন খুব সতর্ক রয়েছে।

আমদানিকারক মেরাজুল ইসলাম জানান, খোদ ভারতেই চালের বাজার চড়া হওয়ার কারণে পূর্বে এলসি করা চাল রপ্তানিকারকরা এখন পাঠাতে বিলম্বিত করছে। এমনকি রপ্তানিকারকরা প্রতিটনের এলসিতে আরও ১০০ ডলার বাড়িয়ে ৫০০ ডলার করার পাঁয়তারা করছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ