ঢাকা, মঙ্গলবার 19 September 2017, ০৪ আশ্বিন ১৪২8, ২৭ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাদের জন্মই আমৃত্যু অপরাধ?

মোঃ তোফাজ্জল বিন আমীন : প্রতিবাদ করার যখন কেউ থাকে না বা প্রতিবাদ করার সাহস যখন কেউ করে না,তখন ক্ষমতাসীন শাসকের নির্মম নির্যাতনে নিরীহ মানুষের মৌলিক মানবাধিকার ভূ-লুণ্ঠিত হলেও কেউ টুশব্দ পর্যন্ত করে না। কারণ ক্ষমতার দাপটের অস্ত্রের কাছে জনগণ হয়ে পড়ে অসহায়। আবুজেহেল আবু লাহাবের উত্তরসূরীরা বিশ্বব্যাপী মুসলিম নিধনের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে অথচ মুসলিম নামধারী শাসকেরা নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে। একটা সময় তো এমন ছিল সারা বিশ্ব আবু বক্কর, উমরের মতো শাসকেরা শাসন করতো। এখন আর তেমনটা দেখা যায় না শুধু মনের আয়নাতে কল্পনা করা যায়। ইসলাম বিদ্বেষী গোষ্ঠীরা মুখে মানবতার স্লোগান আর অন্তরে মুসলিম নিধনের মনোভাব থাকার কারণে যে কোন সন্ত্রাসী ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর তদন্ত ব্যতীত সকল দায়ভার মুসলিমদের কাঁধে সুকৌশলে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালেই দেখা যাবে যে সবচেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করেছে ইহুদি, খ্রিস্টান, বৌদ্ধরা। হিটলার মানুষকে খুন করলেও কেউ তাঁকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করেনি। কারণ হিটলার মুসলমান নন! মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে গত বৃহস্পতিবার সেনা অভিযানের পর থেকে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের ষ্টীম রোলার প্রয়োগ করা হচ্ছে নিরীহ রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর। গত শুক্রবার থেকে রাখাইন রাজ্যে হাজারো রোহিঙ্গা মুসলিমকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হত্যা করেছে। এখনো আরকান রাজ্যে জ্বলছে আগুন চলছে নিষ্ঠুরতা। জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা হাজারো রোহিঙ্গাদের আর্তনাদে কাঁদছে মানবতা। তবু থামছে না মিয়ানমারে হিংস্রতার তান্ডব। বাড়িঘর, স্বজন, সহায়সম্বল সব হারিয়ে শুধু প্রাণ বাঁচাতেই যে যে ভাবে পারছে সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছে। মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বর্বরতা ও বীভৎসতার সব কথা লিখলে সমাপ্তি টানা যাবে না। দেশটির সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাবসতিতে প্রবেশ করে নারী, পুরুষ, শিশুদের পাখির মতো গুলি করে হত্যা করছে। অথচ মুসলিম বিশ্বের বিবেকহীন বোবা শাসকেরা নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে। নিরীহ রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর এ নৃশংস বর্বরতার নিন্দা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। তবে এটা আজ দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে গেছে গোটা বিশ্বের অমুসলিম শক্তি আজ মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলিম নিধনের ঘৃণ্য এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।
যে সময়ে নিবন্ধনটি লিখছি সে সময়েও মিয়ানমারের মুসলিম অসহায় নারী পুরুষ ও নিষ্পাপ শিশুদের উপর বর্বরতা চালিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। মুসলিম রোহিঙ্গাদের চোখের পানিতে শুধু মিয়ানমার নয়! পৃথিবীর আকাশ ক্রন্দন করছে। তবু থামেনি হায়েনাদের নিষ্ঠুর বর্বরতার পৈশাচিকতা। পাঠক চোখ বন্ধ করে একটু ভাবুন তো? আপনার সন্তান কিংবা বাবা-মা, ভাই-বোন যদি এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতেন তাহলে আপনি কী করতেন? নিশ্চয় আপনি প্রতিবাদ করতেন। সুবোধ বালকের মতো ঘরে বসে নিশ্চয় তসবিহ জপতেন না। প্রতিবাদ করতে গিয়ে সন্ত্রাসী কিংবা জঙ্গী উপাধি দেওয়া হলেও আপনার বন্দুকের গুলি কিন্তু থেমে যেতো না। কারণ স্বজনের ভালোবাসার চেয়ে দামী কোন জিনিস এই দুনিয়াতে নেই। আমরা যখন আমাদের কলিজার টুকরা সন্তানকে নিয়ে আনন্দে মেতেছি তখন সাগরে রোহিঙ্গা শিশুর নিথর লাশ ভাসছে। রোহিঙ্গা মুসলিম শিশুর লাশ এখন ভাইরাল। সাগরের পানির ওপর ভাসা লাশগুলোর ছবি দেখে জীবনের স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজে মন দিতে পারছি না। ছবিগুলো মনের অজান্তে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন নিজেকে অপরাধী মনে হয়। যুগ যুগ ধরে মিয়ানমারের নিপীড়িত, অত্যাচারিত রোহিঙ্গাদের হত্যা করার পরও স্বীকৃতি দেয়নি বিকৃত মানবিকতার মানবাধিকার। পৃথিবীর যে কোন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ এবং ধর্মভীরু। এটা ইতিহাসে প্রমাণিত। সরকারকে বলব দয়া করে অসহায় রোহঙ্গাদের জীবন বাঁচাতে আপাতত সীমান্ত খুলে দিন। সাময়িক সমাধান হিসেবে। মানচিত্রের চাইতে মানবতা বড়। ভাসিয়ে দেবেন না অসহায় মানুষগুলোর জীবনকে নদীতে। ওরা তো আমাদের মতোই মানুষ। মানবিক দিকটা বিবেচনা করে স্টেপ নিন দ্রুত। এভাবে চুপ করে থাকলে ওইসব শিশুহত্যার দায় আমাদের তাড়িয়ে ফিরবে আজীবন।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমান নিধন নতুন কোনো বিষয় নয়! কিন্তু এর বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের ভূমিকা সত্যিই বেদনাদায়ক। অন্যদিকে বিশ্ব বিবেক জেগে উঠলেও মিয়ানমার সরকারের সাথে আর্থিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে মার্কিন প্রভাবাধীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরব ভূমিকা পালনের কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন বেড়েই চলছে। আরাকানে তাদের বাঙালি বলে গালি দেয়া হলেও বাঙালিদের রাষ্ট্রেও তাদের ঠাঁই নেই। কোনো দেশই তাদের চায় না। জাতিসংঘের দেওয়া খেতাবে তারা পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। রোহিঙ্গা মুসুলমানদের চেয়ে করুণ,লাঞ্ছিত ও আশাহীন শরণার্থী খুব কম আছে। জন্মই যেন তাদের আজন্ম পাপ। তাই জন্মের মতো তাদের দেশছাড়া করা হয়, মৃত্যু দিয়ে চলে জন্মের প্রায়শ্চিত্ত। রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ করার জন্য জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন বারবার বিবৃতি দিলেও এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। ২০১২ সালের হত্যাকান্ডের সময় তখনকার মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের জনগণ নয়, বিতাড়ন করাই এ সমস্যার একমাত্র সমাধান। গণতন্ত্রের মানসকন্যা অহিংস নেত্রী অং সান সুচিও রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে হিংসা প্রকাশে কোনো রাখঢাক রাখেনি। আরাকানের রোহিঙ্গাদের বাঙালি বা মুসলমান যা-ই বলা হোক না কেন, তারা কোনোভাবেই বহিরাগত নয়। বরং আধুনিক সময়ে ১৭৮৫ সালে আরাকান দখলকারী বর্মিরাই বহিরাগত। এটি শান্তিতে নোবেল জয়ী নেত্রী সুচি না জানলেও মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনের পিতৃপুরুষেরা ঠিকই জানতেন। বার্মার প্রথম প্রেসিডেন্ট উনু রোহিঙ্গাদের আরাকানের অধিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালের বার্মার প্রথম সংবিধান সভার নির্বাচনে তারা ভোট দিয়েছিল। ১৯৫১ সালে তারা আরাকানের অধিবাসী হিসেব পরিচয়পত্র পায়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন বার্মার প্রতিষ্ঠাদের অন্যতম শাও সোয়ে থাইক বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গারা স্থানীয় আদিবাসী না হলেও আমিও বহিরাগত। কিন্তু ১৯৬২ সালে সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার দিন থেকেই রোহিঙ্গাদের জীবনে নেমে আসে নির্মম নির্যাতনের করুণ মহাকাব্য। অসংখ্য মা বোনের ইজ্জত কেড়ে নেয়া হচ্ছে। সন্তানহারা করা হচ্ছে অসংখ্যা মমতাময়ী মাকে। স্বামীহারা করছে হাজারো স্ত্রীকে। ভাইয়ের সামনে বোনের ইজ্জত লুটে নিয়ে উল্লাস করলেও ভাই তার বোনের ইজ্জতকে রক্ষা করতে পারছেন না। মজলুম মুসলিম রোহিঙ্গাদের চোখের পানিতে ভাসছে মিয়ানমার। তারপরেও নীরব কেন মানবাধিকার সংস্থা? নিশ্চুপ কেন জাতিসংঘ। পৃথিবীতে দেড়শ কোটি মুসলমান থাকার পরও দেশে দেশে মুসলিম নিধন চলছে। তাহলে কি আমরা ধরেই নিব রোহিঙ্গারা মুসলিম হওয়াটাই অপরাধ?
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের অতীত ইতিহাস আজকের মত ছিল না। তাদের হাতে স্বাধীন রাষ্ট্র ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যখন মুসলমানদের হাতে ছিল তখন তারা সন্ত্রাসী বৌদ্ধদের উপর এভাবে নির্যাতন করেনি, যেভাবে আজ বৌদ্ধরা মুসলমানের উপর করছে। মিয়ানমারের মুসলিম জনগণের ভাগ্য বিড়ম্বনার ইতিহাস যে কাউকে শোকাহত করবে। ইতিহাসের পাতায় পড়েছি- উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে কয়টি এলাকা মুসলিম বসতি হিসেবে গড়ে উঠে ছিল আরাকান তার মধ্যে অন্যতম। রোহিঙ্গারা সেই আরাকানী মুসলমানের বংশধর। এক সময় আরাকানে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসন দুইশ বছরেরও অধিককাল স্থায়ীত্ব ছিল। ১৬৩১ সাল থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৬৬০ সালে আরাকান রাজা থান্দথুধম্মা নিজ রাজ্যে আশ্রিত মোঘল সম্রাট শাহজাদা সুজাকে সপরিবারে হত্যা করে। এরপর থেকে শুরু হয় মুসলমানের উপর তার নিষ্ঠুর অমানবিক নির্যাতন নিপীড়ন। ১৭৮০ সালে বর্মী রাজা বোধাপোয়া আরকান দখল করার পর পরই গণহারে মুসলিম নিধন করতে থাকে। ১৮২৮ সালে মিয়ানমার ইংরেজদের অধীনে চলে যায়। ১৯৩৭ সালে মিয়ানমার স্বায়ত্তশাসন লাভ করার পর বৌদ্ধদের পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রায় ৩০ লাখ মুসলমানকে তারা হত্যা করে ছিল। ইতিহাস সাক্ষী শত শত বছর ধরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে বাস করলেও তাদেরকে সরকার নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমানদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয়। তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ তো দূরের কথা, নেই কোন সামাজিক ও সাংবিধানিক অধিকার। ধর্মীয় মত পার্থক্যের অমিল হওয়ার কারণেই রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীরা সীমাহীন অত্যাচার চালিয়ে নিধন করছে। বাংলাদেশ মিয়ানমারের প্রতিবেশি দেশ হিসেবে মানবিক কারণেই রোহিঙ্গা মজলুম মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানো ঈমানী দায়িত্ব। সুরা নিসার ৭৫-৭৬ আয়াতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কী হলো, তোমরা কেন আল্লাহর রাস্তায় অসহায় নর-নারী ও শিশুদের জন্য লড়াই করছ না, যারা দুর্বলতার কারণে নির্যাতিত হয়ে ফরিয়াদ করে বলছে,হে আমাদের রব! এই জনপদ থেকে আমাদের বের করে নিয়ে যাও,যার অধিবাসীরা জালিম এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য কোন বন্ধু, অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাঠাও। শেষ করছি একজন মুসলিম খলিফার ঈমানীদীপ্ত দায়িত্ববোধের ঘটনাটি উল্লেখ করে। ইটালীর রোম শহরে আব্বাসী খলিফার যুগে এক মুসলিম রমনীকে খ্রিস্টানরা নির্যাতন করেছিল। ওই রমনী ইটালীর রোম শহর থেকে আর্তচিৎকার করে বলেছিলেন হে মুসলমানের খলিফা মুতাসেম তোমার এক বোন ইটালীর রোমে নির্যাতিত। তুমি কি তোমার বোনের ইজ্জত রক্ষার্থে এগিয়ে আসবে না। নির্যাতিত মুসলিম রমনীর হৃদয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা আর্তচিৎকারের কথা গোয়েন্দা মারফত বাগদাদের খলিফা মুতাসেম শুনেছে। তারপর খলিফা বলল হে আমার বোন আমি তোমার ডাকে সাড়া দিলাম। ঐ রমনীর ইজ্জত রক্ষা করার জন্যে খলিফা একটা বাহিনী প্রেরণ করলেন যার এক মাথা ছিল বাগদাদে আরেক মাথা ছিল ইটালীর রোমে। ২০০ কোটির উপরে মুসলমান থাকা সত্ত্বেও আরাকানের মুসলিম রোহিঙ্গাদেরকে রক্তের সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছে মিয়ানমান সরকারের আজ্ঞাবহ সেনাবাহিনী। তবে এটাও ঠিক মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের প্রতি যে অন্ধঘৃণা দেখাচ্ছে তা শেষবিচারে তাদেরই অন্ধ করে দেবে ইনশাল্লাহ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ