ঢাকা, বুধবার 20 September 2017, ০৫ আশ্বিন ১৪২8, ২৮ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘৭৪ সালের ন্যায় ভয়াল দুর্ভিক্ষ ধেয়ে আসছে

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম রাজধানীর জজকোর্টের সামনে মিয়ানমার রহিঙ্গা মুসলমানদেরকে হত্যা নির্যাতন ও দেশ থেকে বিতাড়িত করার প্রতিবাদে এবং তাদেরকে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : দেশে বর্তমানে খাদ্য নিরাপত্তার লেশমাত্র নেই বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে দলের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক রুহুল কবির রিজভী এই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, দেশে চালের ‘পর্যাপ্ত’ মজুদ থাকলে কেনো মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে তা দেশবাসী জানতে চায়। তিনি বলেন, মূলত দেশে চরম খাদ্য সংকট চলছে। সরকার জনগণকে চাল সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। দেশে ১৯৭৪ সালের ন্যায় ভয়াল দুর্ভিক্ষ চারদিক থেকে ধেয়ে আসছে।

সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, কেন্দ্রীয় নেতা শামা ওবায়েদ, মীর সরফত আলী সপু, আবদুস সালাম আজাদ, মুনির হোসেন, আবদুল আউয়াল খান, আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

বর্তমানে চালের দাম সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে মন্তব্য কওে রিজভী বলেন, মোটা চালের দাম এখন ৫৫ টাকা এবং মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৬৫-৭০ টাকা পর্যন্ত। দেশে বর্তমানে খাদ্য নিরাপত্তার লেশমাত্র নেই। যে মজুদ থাকার কথা ছিলো, তার অর্ধেকের কম চাল আছে কিনা সন্দেহ। তারপরেও প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রীরা বলছেন কোটি কোটি টন চালের মজুদ আছে। আমাদের প্রশ্ন- তাহলে চালের বাজারে অস্থিরতা কমছে না কেনো? আমি বিএনপির পক্ষ থেকে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। এই জাতির অনাহার ও দুর্বিষহ অবস্থার যে বিষন্ন মেঘটি আমরা আকাশে দেখতে পাচ্ছি সেটা জন্য আমরা সবাই আতঙ্কিত। অবিলম্বে চালের বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সরবারহ বৃদ্ধির দাবিও জানান রিজভী।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে যে খাদ্য সংকট চলছে, যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে চালের দাম বাড়ছে, যেভাবে অভিযানের নামে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে, খাদ্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের মন্ত্রীরা যেভাবে মিথ্যাচার করছেন তাতে প্রকৃত ও প্রকট সংকট আড়াল করা যাবে না। ৭৪ সালের ন্যায় ভয়াল দুর্ভিক্ষ চারদিক থেকে ধেয়ে আসছে।

বিএনপির এ নেতা বলেন, বাংলাদেশে চালের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এএফও) সর্তকবার্তা দিয়েছে এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অথচ বর্তমান শাসকগোষ্ঠী এ ব্যাপারে নির্বিকার। খাদ্যমন্ত্রী তার স্ত্রীকে নিয়ে আনন্দভ্রমনে যান মিয়ানমার থেকে চাল কিনতে। আমরা শুনছি প্রধানমন্ত্রী ১‘শ অধিক, কেউ বলছেন ২‘শ অধিক ঘনিষ্ঠজন নিয়ে গেছেন নিউইয়র্কের জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে। সবখানে যেন মনে হয়, ক্ষমতাসীন দল ও সরকার প্রধান এক ধরনের উৎসবের মধ্যে আছেন, আনন্দনঘন পরিবেশের মধ্যে আছেন।

চালের গুদামের সরকারের ‘নিষ্ফল’ অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেন, চালের বাজার অস্থির হওয়ায় নিম্ন বিত্ত ও সাধারণ মানুষ আজ বিপর্যস্ত ও আতঙ্কিত। মজুদদারি ও সিন্ডিকেট এটা তো সম্পূর্ণ আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে। তারাই দীর্ঘ ৯ বছর যাবত সিন্ডিকেট করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি করছে। তারা(ক্ষমতাসীন দল) ফাঁপা বক্তৃতা করা, ফাঁপা কথা বলা এবং মিথ্যাচার করা ক্ষমতাসীন দলের স্বভাব-ধর্ম। মানুষের আহার নিয়ে, মানুষের ক্ষুধা নিয়ে তাদের এই মস্করা, তাদের এই রসিকতা।

রাখাইন থেকে হত্যাযজ্ঞে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ে তাদের দেশে ফিরিয়ে নিতে সরকারকে জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের আবারো আহবান জানিয়েছেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নতুন নয়। ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালেও এই সংকট দেখা দিয়েছিলো। সেসময়গুলোতেও মিয়ানমার বাহিনীর বর্বর ও পৈশাচিক নির্যাতনে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলো। তখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও জোরালো আন্তর্জাতিক তৎপরতায় মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা শরনার্থীদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলো।

রিজভী বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও বর্বর নির্যাতনে দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়লেও সরকার এখনও কোন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে খাদ্য নেই, খাবার পানি নেই, আহত-গুলীবিদ্ধ ও অসুস্থ নারী-পুরুষ-শিশুরা খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে প্রতিদিনই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। গুলীবিদ্ধ রোহিঙ্গাদের শরীর পচে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। গুলী করে গণহত্যা, যুবতী মেয়েদের অপহরণ ও ধর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা খাবার ও পানির সংকটে ছটপট করছে। বিএনপি’র পক্ষ থেকে শুরু থেকেই সরকারের বিভিন্ন বাধা উপেক্ষা করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ ও চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাসহ বাংলাদেশের বেসরকারি সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের বিভিন্নভাবে সেবা প্রদান করে আসছে। অথচ সরকারি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদেরকে আশ্রয়ের নামে তাদের সর্বস্ব লুটে নেয়ার খবরে দেশবাসী স্তম্ভিত।

রিজভী বলেন, আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে বলতে চাই, অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আবারো মিয়ানমারকে বাধ্য করতে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে সরকারের প্রতি আহবান জানাচ্ছি। অবশ্যই অসহায় রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নিরাপত্তায় স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে হবে।

রিজভী জানান, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সার্বিক সহায়তা প্রদানে কক্সবাজারে বিএনপি একটি কন্ট্রোল রুম (নিয়ন্ত্রণ কক্ষ) স্থাপন করেছে। সেখানে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা পর্যায়ক্রমে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করে বলেন, আসন্ন দুর্গা পূজাকে সামনে রেখে সারাদেশে আওয়ামী সন্ত্রাসী ও সরকারের আজ্ঞাবহ পুলিশ বাহিনীর তান্ডব চরম মাত্রায় উপনীত হয়েছে। যেটা আমরা আমাদের দলের স্থায়ী কমিটি সদস্য বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বাড়িতে (কেরানিগঞ্জ) পূজা উদযাপন কমিটির সভায় পুলিশ হামলার ঘটনাটি বলেছি। বিভিন্ন পূজামন্ডপে প্রতিমা ভাঙার উৎসবে মেতে উঠেছে ক্ষমতাসীনরা। সাতক্ষীরা, নাটোর, মানিকগঞ্জ, যশোরে পূজামন্ডপে যে হামলার ঘটনা ঘটেছে তা নজিরবিহীন, পূজামন্ডপে হামলা করে প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে। মানিকগঞ্জে ১৫টি ও নাটোরে ১৮টি পূজামন্ডপে হামলা হয়েছে। এটা হচ্ছে আওয়ামী লীগের নোংরা রাজনীতি। আমরা এসব ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের ‘নোংরা রাজনীতি’ সম্পর্কে দলমত নির্বিশেষে সকলকে সর্তক থাকারও আহবান জানান তিনি। দুর্গাপূজার এই বড় উৎসব যাতে নির্বিগ্ন হয়, শান্তিপূর্ণ হয়, আনন্দমূখর হয় সেজন্য বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতা কর্মীকে হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে থাকার আহবান জানাচ্ছি।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একটি মামলায় ৫ অক্টোবরের মধ্যে হাজির হওয়ার বিষয়ে ঢাকা মহানগর হাকিমের আদেশ দেয়ার প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, আপনারা সকলে জানেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন লন্ডনে চিকিৎসাধীন। তার ডান চোখে অস্ত্রোপচার হয়েছে। তার চিকিৎসা অব্যাহত আছে। ডাক্তাররা ফলোআপ করছেন। আমি বলতে চাই, এই নির্দেশ সরকারের একটা ঘৃণ্য নীল নকশার পরিকল্পনার অংশ। তার (খালেদা জিয়া) অনুপস্থিতিতে এই নিম্ন আদালত যে নির্দেশ দিয়েছেন এটি আমি মনে করি শেখ হাসিনার গোপন নির্দেশ, সেই নির্দেশের প্রতিধ্বনি করা হয়েছে। আমি এর তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ, ধিক্কার জানাচ্ছি।

জজকোর্ট প্রাঙ্গণে মানববন্ধন: এদিকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা জজকোর্ট প্রাঙ্গণে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও সু চি বাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গাদের গণহত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন, দেশান্তরে বাধ্য করার প্রতিবাদে ও নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার দাবিতে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম আয়োজিত মানববন্ধনের বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, লাগামহীন চালের মূল্য বৃদ্ধির কারণে দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এই দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ করবে কে?’ তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, আজ কোথায় আপনাদের প্রাণের বন্ধু ভারত? এই খাদ্য সংকটের দিনে ভারত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে এই মুহূর্তে চাল রপ্তানি করবে না। এই হলো বন্ধুত্বের পরিচয়।

রিজভী বলেন, দেশে চালের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, সরকারি গোডাউনে চাল নেই। চালের বদলে সেখানে ইঁদুর খেলা করছে। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এই দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ করবে কে? এদিকে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনকারী দেশ মিয়ানমার থেকে চাল কিনে সরকার ঘাতকদের উৎসাহিত করেছে দাবি করে রিজভী বলেন, সরকারের এই আচরণে ঘাতকরা উৎসাহ পাচ্ছে ও আরও নৃশংস হয়ে উঠছে। মিয়ানমার থেকে এক লাখ মেট্রিকটন আতপ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সোমবার সাংবাদিকদের একথা জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। প্রতি মেট্রিক টনের দাম পড়বে ৪৪২ ডলার।

রিজভী বলেন, নাফ নদীর পানি আজ পানির রং নেই। নাফের পানি আজ রোহিঙ্গাদের রক্তের রং। আর সেই রক্তের ওপর দিয়ে লজ্জাজনকভাবে মিয়ানমার থেকে এক লাখ টন চাল আমদানি করছে সরকার। মিয়ানমারের বর্বর সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গাদের হত্যার এভাবেই প্রতিদান দিচ্ছে ভোটারবিহীন অবৈধ সরকার। বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ওপর যে বর্বরতা চলছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। সেখানে বিচিত্র রকমের হত্যাযজ্ঞ চলছে। মহামতি গৌতম বুদ্ধের অনুসারীরা এত বীভৎস, কসাই হতে পারে সেটা ভাবা যায় না। রিজভী অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতেই হবে। তাদের জানমালের নিরাপত্তা দিয়েই ফিরিয়ে নিতে হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা করে রিজভী বলেন, ‘জ্বি হুজুর জ্বি হুজুর করে এই রোহিঙ্গা সংকট সমাধান সম্ভব নয়।’ মানববন্ধনে বিএনপিপন্থি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্যরা অংশ নেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ