ঢাকা, বুধবার 20 September 2017, ০৫ আশ্বিন ১৪২8, ২৮ জিলহজ্ব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অভিমত


বেওয়ারিশ লাশের মিছিল বেড়েই চলেছে
-মো. তোফাজ্জল বিন আমীন
নিবন্ধটি শুরু করছি সত্যজিৎ রায়ের ছবি ‘হীরক রাজার দেশে’র একটি ঘঠনাকে অবলম্বন করে। অনেকে হয়ত জানেন,‘হীরক রাজার দেশে’ নিয়ম ছিল শুধু রাজার জয়গান গাইতে হবে। রাজার কোনো কাজের সমালোচনা বা নিন্দা করা যাবে না। সমালোচনা করলেই তার শাস্তি পেতে হবে। এই ছবির এক গায়ক গান গেয়েছেন,‘আমি যে দিকে তাকাই অবাক বনে যাই,আমি ইহার অর্থ নাহি খুঁজে পাই। আমাদের মতো অধম নাগরিকদের অবস্থাও তাই হয়েছে। অন্যায় অবিচার জুলমের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হলেও পরিত্রাণের জন্যে টুঁ শব্দ পর্যন্ত করা যাচ্ছে না। কারণ যারাই ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত থাকেন তারা কেউ সত্য উচ্চারণ সহ্য করতে পারেন না। এ আলামত দেশের জন্য মোটেও সুখকর নয়! মানুষ যদি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে না পারে, স্বাধীনভাবে চলতে ও কথা বলতে না পারে, নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করতে না পারে তাহলে সে সমাজ বা রাষ্ট্রকে স্বাভাবিক বলা যায় না। দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে বেওয়ারিশ লাশের মিছিল লাগামহীনভাবে বেড়েই চলছে।
পৃথিবীতে কেউ তো বেওয়ারিশ হয়ে জন্মায় না, তাহলে মানুষকে মৃত্যুর পর কেন বেওয়ারিশ হতে হবে? সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে প্রতিটি মানব সন্তান মা-বাবার হাত ধরে পৃথিবীতে আসে। জন্মের পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মানুষ যেমন কারও অধীনে থাকে, তেমনি পরিণত বয়সেও তার ওয়ারিশ হিসেবে কাউকে না কাউকে পৃথিবীতে রেখে যায়। এভাবে যুগ যুগ ধরে মানুষ তার ওয়ারিশ রেখে যাচ্ছে। একটা মানুষের স্বাভাবিক মৃত্য যেখানে মেনে নেয়া মেলা ভার সেখানে বেওয়ারিশ লাশ হয়ে মৃত্যু হওয়াটা সত্যিই বেদনাদায়ক। সারাদেশে খুন, ধর্ষণ, অপহরণের মতো বেওয়ারিশ লাশের মিছিলের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। দেশে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড নেই। তারপরেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি লক্ষ করার মতো। একের পর এক লোমহর্ষক হত্যাকান্ড  আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কখনো গলাকেটে, কখনো গুলী করে, কখনো গুম করে মানুষ খুন করা হচ্ছে। একটি খুনের তদন্ত শুরু না হতেই আরেকটি খুনের নির্মম কাহিনী পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশের আনাচে কানাচে বেওয়ারিশ লাশের গলিত অর্ধগলিত লাশ মিলছে খালে-বিলে,নদী মহাসড়কের পাশে এমনকি ডাস্টবিনেও। আবার ডোবা-নালা ও ময়লার ভাগাড়ে মিলছে অজ্ঞাত লাশ কিংবা অর্ধগলিত পচে যাওয়া মানুষের কংকাল। বেওয়ারিশ লাশের মিছিলের ভারে আক্রান্ত সমাজ ও রাষ্ট্র । বিগত কয়েক বছরে এর হার আশংকাজনক হারে বেড়ে গেলেও ক্ষমতাসীনদের টনক নড়েনি। দেশের সন্তানতুল্য নাগরিকদের জীবন ইজ্জতের নিরাপত্তা দেয়া সরকারের দায়িত্ব হলেও সরকার তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। যে কারণে উন্নয়নের ফানুস শুধুমাত্র তাদের বক্ত্যব বিবৃতিতে শোভা পাচ্ছে বাস্তবতার সাথে কোন মিল নেই। প্রতিদিন আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী রাজধানীর আশপাশ থেকে পরিচয়হীন বেওয়ারিশ মানুষের লাশ উদ্ধার করছে। আকাশে বাতাসে গলিত অর্ধগলিত লাশের অংশটুকু শকুনেরা টেনে হিঁছড়ে ছড়াছড়ি করছে। বেওয়ারিশ লাশের মানুষগুলোর মতো হতভাগ্য মানুষ পৃথিবীতে আর কেউ নেই। কেননা মৃত্যুর পর তাদের স্বজনরা নিথর লাশটাও পান না। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে? গত কয়েক বছর ধরে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়ায় মানবাধিকার সংগঠনের পাশাপাশি বিরোধীদলগুলো উদ্বেগ উৎকন্ঠা প্রকাশ করছে।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের ভাষ্যমতে, ২০১৬ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত বিচার বহির্ভূতভাবে ১১৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ক্রসফায়ারে মৃত্যু হয়েছে ১৩৭ জন। আর বেওয়ারিশ লাশের বিষয়ে বলা হচ্ছে, বেশিরভাগ সময়েই লাশগুলো থাকে গলিত বা অর্ধগলিত। অনেক সময় পুরো লাশটিও পাওয়া যায় না। একটা নির্দিষ্ট সময় পর এগুলো বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম দাফন করছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে প্রতিমাসে দেড়শ’র মতো লাশ দাফন হচ্ছে বেওয়ারিশ হিসেবে। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে প্রতিদিন গড়ে ৪টি লাশ যাচ্ছে বেওয়ারিশ হিসেবে। চলতি বছরের ২৪ এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার পূর্বাচল উপশহরের ১৩ নম্বর সেক্টরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল কালো রঙ্গের একটি ব্রিফকেস। সেটিকে ঘিরে এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা দেখা দিলে স্থানীয় লোকজন বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করে। পুলিশ এসে সেটি খুলে দেখতে পান এক তরুণীর নিথর নিঃস্তব্দ দেহ। যার হাত পা বাঁধা। অজ্ঞাত এ তরুণীর পরিচয় উদঘাটন করতে পারেনি রূপগঞ্জ থানা পুলিশ। পরিচয় না মেলায় শেষ পর্যন্ত বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফনের জন্য হস্তান্তর করা হয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামকে।
একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার রিপোর্টে ওঠে এসেছে যে, চলতি বছরের জুলাই মাসে শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকা থেকে ১১৪টি লাশ দাফন করা হয়েছে বেওয়ারিশ হিসেবে। ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে ১ হাজার ৩০০ লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই মাসে ১০৯টি,আগস্ট মাসে ১১১টি,সেপ্টেম্বর মাসে ১১২টি,অক্টোবর মাসে ১২২টি,নভেম্বর মাসে ২০৯টি,ডিসেম্বর মাসে ১০৮টি,জানুয়ারি মাসে ১০১টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ৬৮টি, মার্চ ১১১টি,এপ্রিল-১১৮টি, মে মাসে ১২৭টি,জুন মাসে ১০৪টি লাশ দাফন করা হয়। এর আগে ২০১৫ ও ২০১৬ অর্থ বছরে ১৩৫৭টি লাশ দাফন করা হয়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৬ সালে ২০৯৯টি, ২০০৭ সালে ২২৫৯টি, ২০০৮ সালে ১৮৬৭টি, ২০০৯ সালে ১৯৮১টি, ২০১০ সালে ১২০৪টি, ২০১১সালের ১১৯২টি, ২০১২ সালে ১২৪৭টি, ২০১৩ সালে ১৪৩৭, ২০১৪ সালে ১৪৯৫টি, ২০১৫ সালে ১২৮৪ টি, ২০১৬ সালে ১৪৩০টি লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের পক্ষ থেকে। বেওয়ারিশ লাশগুলোর শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া গতানুগতিক ও দায়সারা হওয়ার কারণে বেওয়ারিশ লাশগুলোর পরিচয় নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে অনেক লাশের পরিচয় নির্ণয় করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে। রাজধানী ঢাকা শহরেই প্রতি বছর গড়ে দেড় হাজারের মতো বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার করা হয়। আর সেসব লাশে আঘাতের ধরন ও ময়নাতদন্ত রির্পোট মিলিয়ে ৮০ শতাংশই হত্যাকান্ড বলে প্রতীয়মান হয়। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় এসব হত্যাকান্ড কী কারণে ঘটেছে সে বিষয়টি অজানাই রয়ে যাচ্ছে। মানবাধিকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মতে, লাশ শনাক্তে পুলিশের যথাযথ পদক্ষেপ না থাকায় বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে যখন দৈত্যের শাসন চলে তখন আর সেখানে সুশান থাকে না। মানুষের মৌলিক অধিকার যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে ভূলন্ঠিত হয় তখনই কেবল গুম,খুন,অপহরণ, বেওয়ারিশের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠে। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভে আইনের শাসন না থাকলে দুর্বৃত্তায়ন বেড়ে যায় এটা ক্ষমতাসীনদের অনুধাবন করা প্রয়োজন। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে উন্নয়নের বুলি প্রচার করার চেয়ে বেশি প্রয়োজন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। সরকারের মুখে যত উন্নয়নের গল্প শোনা যায় তার ছিটেফোঁটা যদি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে শোনা যেত তাহলে বেওয়ারিশ লাশের মিছিল দীর্ঘ হতো না। বেওয়ারিশ লাশের মিছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে এখনই বন্ধ করা প্রয়োজন।

২.
গুমের তত্ত্বকথা ও মানবাধিকার লংঘন
-মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান
সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন উপাদানটি সংযোজিত হয়েছে, তা হলো গুম। এই গুমের বহুল প্রচলিত ইংরেজী প্রতি শব্দ হলো Disappear। এই Disappear-এর অর্থ হচ্ছে হারিয়ে বা উধাও হয়ে যাওয়া। কোনো ব্যক্তি Disappear হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো উক্ত ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত না পাওয়া। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে না পাওয়ার অর্থই হচ্ছে গুম। গুম বা Disappear সাধারণত তিন ধরনের হতে পারে। প্রথমত কোনো ব্যক্তি নিজে স্বেচ্ছায় গুম বা উধাও হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত কোনো ব্যক্তি দুর্ঘটনাবশত গুম বা উধাও হন এবং তৃতীয়ত কোনো ব্যক্তিকে জোরপূর্বক গুম বা উধাও করা হয়। এই  বিশ্বে গুমের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, বহু প্রাচীন যুগ হতে এই গুমের ঘটনা ঘটে এসেছে। বিশেষত প্রাচীন যুগে যুদ্ধে পরাজিত হবার পর পরাজিত দলের নেতা গুম হয়ে গেছেন। এই ধরনের গুমে পরাজিত দলের নেতা হয় নিজে উধাও হয়েছেন কিম্বা তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। যে কারণে তার দেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। ৩৭৮ খৃস্টাব্দে রোমান সম্রাট ভ্যালেন Battle of Adrianople-এর যুদ্ধে পরাজিত হবার পর গুম বা উধাও হয়ে যান। হয় তিনি নিজে পরাজিত হয়ে উধাও হয়েছেন অথবা তাকে হত্যা করা হয়েছে। তাকে আর কখনও দেখা যায়নি বা তার দেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
৮৩৪ খৃস্টাব্দে মোহাম্মদ ইবনে কাশেম Abbasid খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিলে পরাজিত ও বন্দী হন। এই বন্দী অবস্থা থেকে পলায়ন করার পর মোহাম্মদ ইবনে কাশেমকে আর কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ১২০৩ সালে ইংল্যান্ডের সিংহাসনের উত্তরাধিকার প্রথম আর্থার গুম বা উধাও হন। ১৪৮৩ সালে ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ এডওয়ার্ডের পুত্র পঞ্চম এডওয়ার্ড গুম হয়েছিলেন। মনে করা হয় তার চাচা তৃতীয় রিচার্ড তাকে গুম করেন। অপরাধ বিষয়ক বিখ্যাত লেখক আগাথা ক্সিস্টি ১৯২৬ সালে গুম বা উধাও হয়েছিলেন। অবশ্য কিছুদিন পরে তিনি আবির্ভূত হন। তার এই সাময়িক গুম হয়ে যাওয়ার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। বিশ্বের ইতিহাসে এ ধরনের অনেক গুমের ঘটনা খুঁজে পাওয়া যায়। তবে সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে জোরপূর্বক গুম একটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক এ ধরনের গুমের ঘটনা এখন প্রায় অকল্পনীয়।
নব্য আবিষ্কার করতে গিয়ে বহু উদ্ঘাটনকারী গুম বা উধাও হয়েছেন। বিশেষ করে এই পৃথিবীর রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে বহু নাবিক ও বৈজ্ঞানিক উধাও হয়ে গেছেন। অবশ্য এই সমস্ত উধাও দুর্ঘটনাবশত হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। বিংশ শতাব্দীতে এসে এই গুমের ব্যবহার রাজনৈতিকভাবে শুরু হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফ্যাসিস্ট ও একনায়কতান্ত্রিক শাসকগণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতাবলম্বীদের ধ্বংস করার জন্য এই গুম শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে নাজি জার্মানির হিটলার তার Gestapo বাহিনী এবং গোপন পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে বহু গুমের ঘটনা ঘটিয়েছেন। সামপ্রতিককালে গুমের ঘটনা শুরু হয় তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। এই সমস্ত উন্নয়নশীল দেশে একনায়কতান্ত্রিক শাসকগণ ক্ষমতা দখল করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ধ্বংস করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে গুম শুরু করেন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনার স্বৈরশাসক জেনারেল জর্জ র্যাফেল ভিডেলা ত্রিশ হাজার ব্যক্তিকে গুম করে ফেলেন। এই গুম করার কাজে ব্যবহার করা হয় সামরিক বাহিনী ও রাষ্ট্র কর্তৃক সৃষ্ট গোপন পুলিশ বাহিনীকে।
১৯৭৩ সালে চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে অগাস্ট পিনোচেট রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে বহু মানুষকে গুম করে ফেলেন। এক হিসাব অনুযায়ী দেখা যায় যে, পিনোচেটের শাসনামলে ২২৭৯ জন গুম হয়। কলোম্বিয়ায় ২০১৬ সালের এক হিসাব অনুযায়ী দেখা যায়, আধাসামরিক বাহিনী ও গেরিলা গ্রুপের মাধ্যমে ৩০০০০ ব্যক্তি গুম হয়েছে। ল্যাটিন আমেরিকার বাইরে গুমের ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন দেশে। সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে ইরাকে, গাদ্দাফির শাসনামলে লিবিয়ায়, সিরিয়ার হাফেজ আল আসাদের শাসনামল থেকে গুমের ঘটনা লক্ষ্য করা যায়। আফ্রিকার মরক্কো, আলজেরিয়া ও অন্যান্য দেশে গুমের ঘটনা উল্লেখযোগ্য।
এই সমস্ত দেশে গুমের সাথে জড়িত শাসকদের পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। আর্জেন্টিনার জর্জ ভিডেলাকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে এবং তাকে কারাবাস করতে হচ্ছে। চিলির পিনোচেটকেও সম্মুখীন হতে হয়েছে বিচারের। এমনকি তাকে হত্যা করার জন্য সৃষ্টি হয়েছিল একটি বাহিনী। হিটলার, সাদ্দাম হোসেন ও গাদ্দাফির করুণ পরিণতি আমাদের সবারই জানা। গুমের মাধ্যমে ক্ষমতায় যারা টিকে থাকার চেষ্টা করেছেন, তারা কেউই ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি এবং নিক্ষিপ্ত হয়েছেন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। গুমের ঘটনার প্রতিবাদে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সৃষ্টি হয়েছে সশস্ত্র প্রতিপক্ষ। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় আলজেরিয়া, গুয়াতেমালা, কলোম্বিয়া প্রভৃতি দেশ। এছাড়াও দেশের জনগণ এই গুমকে সহজভাবে গ্রহণ করতে না পারায় ফুঁসে উঠেছে এবং অবসান ঘটিয়েছে স্বৈরশাসকদের।
সম্প্রতি এই উপাদান যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। তবে এটা যে একেবারেই নতুন উপাদান তা নয়। অতীতে বাংলাদেশে গুমের ঘটনা ঘটেছে।
স্বাধীনতার পরপর গুম হন বিখ্যাত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব জহির রায়হান। স্বাধীনতার পর জাসদের গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির অনেক সদস্যের গুম হওয়ার ঘটনা শোনা যায়। সাম্প্রতিককালে এই বিষয়টি যে তীব্র আকার ধারণ করেছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে বর্তমানে গুমের সাথে যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা রয়েছে এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কিছুদিন পূর্বে মানবাধিকার কমিশনের প্রধান মন্তব্য করেছেন যে, অনেক গুমের সাথেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততা খুঁজে পাওযা যাচ্ছে। তার এই বক্তব্য এটাই প্রমাণ করে যে, সাম্প্রতিক গুমের সাথে রাষ্ট্রযন্ত্রের সমপৃক্ততা রয়েছে। যদিও সরকার বিষয়টিকে তীব্রভাবে অস্বীকার করছে। এখন প্রশ্ন হলো যে, কেন সরকার এই গুম বন্ধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে? তবে কি গুমের সাথে জড়িত গোষ্ঠী সরকারের চাইতেও ক্ষমতাশালী? যদি তাই হয়, তবে এটা সরকারের জন্যও বিপজ্জনক। বর্তমানে যারা সরকার পরিচালনা করছেন তাদের মনে রাখা উচিত যে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। বর্তমানে সরকার পরিচালনাকারিগণ যখন ক্ষমতার বাইরে থাকবেন তখন তারাও যে এই গুমের শিকার হবেন না তার নিশ্চয়তা কি দেয়া যায়? কাজেই সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে এই বিষয়টি বন্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
গুম বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ২০০২ সালে Rome Statute of the International Criminal Court গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০৬ সালে সম্মিলিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ গুমের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance নীতিমালা গ্রহণ করে। এই নীতিমালা অনুসারে গুম মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং এই অপরাধ শাস্তিযোগ্য।
বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করে জনগণকে যে আশার আলো দেখিয়েছে, ঠিক তখনই শুরু হয়েছে আরেকটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। এই মানবতাবিরোধী অপরাধ যাতে আর সংঘটিত হতে না পারে, তার জন্য সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এই সরকারকে হয়ত একদিন চিহ্নিত হতে হবে মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ