ঢাকা, শুক্রবার 22 September 2017, ০৭ আশ্বিন ১৪২8, ০১ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মজুদ না বাড়িয়ে বল প্রয়োগে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা

 

 

 

এইচ এম আকতার : ছলে বলে কৌশলে সরকার চালের দাম কমাতে মরিয়া। কখনও শুল্কছাড়, কখনও আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা বা খোলাবাজারে কম দামে বিক্রি করে। তবে কিছুতেই যেন মিলছে না স্বস্তি। সরকার মজুদ না বাড়িয়ে উল্টো বল প্রয়োগে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সঠিক সময়ে যোগান না বাড়ানোর মাশুল দিতে হচ্ছে সরকারকে। তবে এ জন্য বল প্রয়োগ কোনভাবেই কাম্য নয়, তাতে বাজার আরো অস্থির হতে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বে তুলনায় বাংলাদেশে মোটা চালের দাম সবচেয়ে বেশি।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই বিশ^ বাজারে সবচেয়ে বেশি মোটা চালের দাম বাংলাদেশে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৫ সেপ্টেম্বর ভিয়েতনামে মোটা চালের দাম ছিল প্রতিটন ৩৮৯ মার্কিন ডলার। সে হিসেবে প্রতি কেজি চালের দাম ৩১ টাকা। আর থাইল্যান্ডে এ চালের দাম ৩৯৪ ডলার। যার খুচরা মূল্য ৩১ টাকা ৫০ পয়সা। প্রতিবেশি ভারতে এ চালের দাম আরও কম। প্রতিটন মোটা চালের দাম ৩৭৪ মার্কিন ডলার। এ হিসেবে দাম পড়বে ৩০ টাকা। 

অথচ বাংলাদেশের বাজারে এই মোটা চালের দাম এখন ৫০-৫২ টাকা। প্রতি কেজি চালের দামে পার্থক্য দাড়িয়েছে ২০-২২ টাকায়। অতীতে এত বেশি টাকায় কখনও মোটা চাল খেতে হয়নি। কোন দেশে দুর্ভিক্ষ না হলে মোটা চালের দাম এত হতে পারে না। কোন যুদ্ধ বিগ্রহ ছাড়া এত বড় চালের সংকট হতে পারে না। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের বাজার মনিটরিং থাকার কথা তা নেই।

বল প্রয়োগে বাজার নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবেই সারা দেশে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গতকাল চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়তলি সাগরিকা বাজারের বিসিক এলাকায় একটি গুদামে অভিযান চালিয়ে ৮০ হাজার বস্তা চাল জব্দ করেছে প্রশাসন। অবৈধভাবে চাল মজুত করার দায়ে গুদামের ব্যবস্থাপককে আটক ও গুদামটি সীলগালা করে দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

 এ অভিযান চালায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। আদালতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সৈয়দ মোরাদ আলী।

তিনি জানান, গোয়ন্দা সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী পাহাড়তলির সাগরিকা বিসিক এলাকায় আহমেদ ট্রেডিং নামে চালের গুদামে অভিযান চালানো হয়। এ সময় নিয়ম ভেঙে গুদামে চালের অবৈধ মজুদ গড়ে তোলায় ৮০ হাজার বস্তা চাল জব্দ করা হয়। সেই সাথে গুদামের ম্যানেজার তারেককে আটক করা হয়। গুদামটিও সীলগালা করে দেয়া হয়।

গুদামের ব্যবস্থাপক তারেক ভ্রাম্যমাণ আদালতকে জানান, মজুদ চালের বস্তাগুলো মাসুদ এন্ড ব্রাদার্স নামে একটি চাল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের। অভিযান এড়াতে চালগুলো এখানে গুদামজাত করা হয়।

এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোরাদ আলী। অবৈধ মুজদদার এবং অতিরিক্ত দামে চাল বিক্রি নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ আদালতের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, চালের দোকানে বেচাকেনার চেয়ে যেন দরকষাকষির ছবিটাই বেশি। আর ব্যবসায়ীদের গল্পটা প্রায় একই রকম। তারা বলছেন বেচা বিক্রি খুবই কম। গত এক সপ্তাহ ধরে বেচা-কেনা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে করে আমাদের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।

চালের বাজার স্থিতিশীল করতে সরকারের নেয়া একাধিক পদক্ষেপ কাজে না আসায় শেষ পর্যন্ত অভিযানে নামে মিল মালিকদের বিরুদ্ধে। হুশিয়ারী আসে অতিরিক্ত মজুদের বিপরীতে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাক বিতন্ডায় জড়ায় সরকার, ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকরা। তিন মন্ত্রীর সাথে চালের ব্যবসায়ীদের বৈঠক হওয়ার পরে চালের দাম কমার আশ^াস দিলেও তার কোন প্রভাব নেই বাজারে।

এরই মধ্যে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য খোলাবাজারে চাল বিক্রির কার্যক্রম চলছে। এতেও ইতিবাচক প্রভাব নেই বাজারে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ বলছেন, বাজারের জন্য বল প্রয়োগ ভালো তৎপরতা নয়। এতে হিতে আরও বিপরিত হতে পারে। এক জন রশিদের পিছনে না দৌড়িয়ে কোন লাভ নেই। সরকারের কাজ হবে মজুদ বাড়ানো।

 তিনি আরও বলেন, সরকার সময় মত আমদানি না করে দেশকে বিপদে ফেলেছে। তার ফল এখন জনগণকে ভোগ করতে হচ্ছে। কিছুই করার নেই। চালের মজুদ বাড়াতে পারলেই কেবল বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। সরকার যদি অভিযানের নামে বল প্রয়োগ করে তাহলে এর ফল ভাল হবে না।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব বলছে, ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারের কাছে চালের মজুদ আছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন। আগের বছর একই সময়ে যা ছিল প্রায় আট লাখ মেট্রিক টন।

চাল ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে তিন মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের পর এখনও লাগামহীন চালের বাজার। কেননা তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর চালের দাম কিছুটা কমার কথা থাকলেও পাইকারি ও খুচরাভাবে মোটা ও চিকন চালের দাম আগের অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া বাজারে কোন মনিটরিং না থাকায় আগামী রোববারের আগে চালের দাম কমার কোন আশা দেখছেন না চালের আড়তৎদাররা।

রাজধানীর কাওরান বাজারে কুমিল্লা রাইস এজেন্সির সারোয়ার জানান, চালের বাজার এখনও আগের মতোই রয়েছে। দাম কমার বিষয়ে আমরা কোন ঘোষণা কিংবা এ জাতীয় কোন নির্দেশনা পাইনি। তাই আগামী রোববারের আগে দাম কমার কোন সম্ভাবনা নেই।

বাজারে সরকারের কোন মনিটরিং আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোন মনিটরিং নেই, কেউ এসে খোঁজখবরও নিচ্ছে না। শুধু মিডিয়ার লোকেরা এসে খবর নিয়ে যায়।

এর আগে মঙ্গলবার চাল ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে তিন মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীদের সকল দাবি মেনে নেয় সরকার। এর ফলে চালের মূল্য কেজি প্রতি দুই টাকা কমবে বলে আশা করেছেন ব্যবসায়ীরা। বৈঠকের একদিন পার হলেও চালের দাম নিয়ে কোন আশার আলো নেই। তবে বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বুধবার থেকে উপজেলা পর্যায়ে ওএমএস চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

কোরবানি ঈদের পর কোন কারণ ছাড়াই হঠাৎ করেই অস্থির হয়ে উঠে দেশের চালের বাজার। বাজারে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে প্রায় ১০ টাকা করে বেড়ে যায়। অবশ্য চাল ব্যবসায়ী নেতারা বলেছেন, সংকট কাটাতে চাল আমদানির শুল্ক দেরিতে কমানো, চাল ও ধান সংগ্রহে সরকারের দাম অনেক কম হওয়াসহ নানা কারণে এবার চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

সচিবালয়ে চাল ব্যবসায়ীদের নিয়ে তিন মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে কেউ কেউ চালের বাজার বৃদ্ধিতে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন প্রলেছেন।

এদিকে খিলগাঁও বাজারে আটা কিনতে আসা একরামুল হক জানান, চালের দাম বৃদ্ধির কারণেই আটা খাওয়া বাড়িয়ে দিয়েছি। গত মাসে প্রতি কেজি আটার দাম ছিল ২৮ টাকা। এখন এক মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ টাকায়। ভরসার আটারও এমন মূল্যবৃদ্ধিতে নাজেহাল হয়ে পড়েছেন ক্রেতারা।

উল্লেখ্য, বিশ্বের মধ্যে মোটা চালের দাম এখন বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। ফলে নিরুপায় হয়ে খাদ্যাভাস পরিবর্তন করছেন সীমিত আয়ের মানুষেরা। বিকল্প খাদ্য হিসেবে দু’বেলা এখন রুটি খাচ্ছেন অনেকে। কিন্তু তাতেও নিস্তার নেই। প্রধান খাদ্যের দাম বাড়ায় এখন এর প্রভাব পড়ছে দ্বিতীয় খাদ্যশস্য অর্থাৎ আটার বাজারে। গত কয়েক দিনে বাজারে কেজিতে আটার দাম বেড়েছে ছয় টাকা পর্যন্ত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চালের দাম বৃদ্ধির এ সুযোগে আটা-ময়দার বাজারে চড়াও হয়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। গত প্রায় দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) আটার দাম বেড়েছে মানভেদে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। একইভাবে ময়দার দাম বেড়েছে বস্তাপ্রতি ২০০ টাকা।

পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিশ্ববাজারে গমের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। এতে গত কয়েক মাসে দেশে প্রচুর পরিমাণে গমেরও আমদানি হয়েছে। কিন্তু কোনো রকম কারণ ছাড়াই আটা-ময়দার দাম দফায় দফায় বাড়াচ্ছেন মিল মালিকরা। এখন মিল থেকে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহও দেয়া হচ্ছে না। মিলে ডিও’তে (ডেলিভারি অর্ডার) আটা-ময়দা না দিয়ে স্পেশাল অর্ডারে বাড়তি দামে আটা-ময়দা বিক্রি করছে মিলগুলো।

জানতে চাইলে আটা-ময়দার বড় ব্যবসায়ী ও মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি হাজী মো. আবদুল রাজ্জাক বলেন, মিল থেকে আটা-ময়দার সরবরাহ কমানো হয়েছে এটা সত্য। যারা কম দামে ডিও কিনেছে, তারা এখন আটা-ময়দা পাচ্ছে না। কিন্তু বাড়তি দামে মিল থেকে স্পেশাল অর্ডারে মাল আসছে বাজারে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। দাম বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক পরিচালক এম আসাদুজ্জামান বলেন, স্বাভাবিকভাবেই চালের প্রচুর দাম বৃদ্ধির কারণে মানুষ খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করছে। বিকল্প খাদ্য হিসেবে তারা দ্বিতীয় খাদ্য গমের ওপর নির্ভর করছে। এতে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবসায়ীরাও এ বাড়তি চাহিদায় বাড়তি মুনাফা করতে চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক। বাজারে এখন তেমনটাই হচ্ছে। কিন্তু আমি তাদের চেয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণকারীদের বেশি দায়ী করছি। কারণ ব্যবসায়ীদের সঠিকভাবে তদারকি করা উচিত ছিল। এখন আটা-ময়দার মতো অবলম্বনের দাম বৃদ্ধি নি¤œআয়ের মানুষগুলোকে আরও বিপদে ফেলবে।

কাওরান বাজারে প্রতি কেজি আটা খুচরায় বিক্রি করা হচ্ছে ৩৫-৩৬ টাকায়। প্রতি বস্তা আটার দাম মানভেদে এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৩৫০ টাকা, যা গত দুই সপ্তাহ আগে এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি করা হতো। একইভাবে প্রতি বস্তা ময়দার দাম এক হাজার ৪০০ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬০০ টাকায়।

কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী ইব্রাহীম আলী বলেন, নারায়ণগঞ্জের নন-ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে সিটি, মেঘনা, আকিজ, বসুন্ধরার সব ব্র্যান্ডের আটা-ময়দার দামই বেড়েছে। প্রথমে বাজারে ব্র্যান্ডের কিছু আটার দাম বেড়েছিল। তার দেখাদেখি একে একে সব নন-ব্র্যান্ডগুলোও তাদের আটা-ময়দার দাম বাড়িয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ