ঢাকা, রোববার 24 September 2017, ০৯ আশ্বিন ১৪২8, ০৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আমদানির নামে মুদ্রা পাচার

এইচ এম আকতার : আমদানির নামে মুদ্রা পাচার কোনভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ না থাকায় বিদেশে অর্থ পাচার বাড়ছে বলে মনে করেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা। শেয়ারবাজার, ব্যাংক, ডেসটিনি আর যুবকের লুট হওয়া অবৈধ টাকার পরিমাণ বাড়ছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির নামে ভুয়া এলসি খুলে টাকা পাচার হচ্ছে প্রতি নিয়ত। চাঞ্চল্যকর ৯০ কন্টেইনারের মতো একই কায়দায় আরও ৩১ কন্টেইনারের আড়ালেও মুদ্রাপাচারের ঘটনা ঘটেছে।

জানা গেছে, রপ্তানিকারক এক হলেও আমদানিকারক ভিন্ন। তবে এবারও অস্তিত্বহীন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। এর পেছনেও আইএফআইসি ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এখন নেপথ্যের চক্রটির খোঁজে তদন্ত করছে। এদিকে, ৯০ কনটেইনারের আড়ালে মুদ্রাপাচারের অভিযোগে আমদানিকারক, সিএন্ডএফ এজেন্ট, আইএফআইসি ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যে কোনো সময় মামলা করবে সংস্থাটি। সংস্থাটি বলছে তদন্তে সত্যতা প্রমাণ পাওয়ার পরেই মামলার অনুমতি দিয়েছে এনবিআর।

আমদানিকারক ভুয়া, রপ্তানিকারকেরও অস্তিত্ব নেই। ব্যাংক ও কাস্টমস কর্মকর্তাসহ স্তরে স্তরে ম্যানেজ করে একটি দুটি নয়, একে একে ৯০ কনটেইনার ভরে আনা হয়েছে অবৈধ পণ্য। এর আড়ালে পাচার করা হয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। মিডিয়ার এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারের পর উচ্চতর তদন্তে নামে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

তদন্তে একই কায়দায় আরও ৩১ কনটেইনার মুদ্রাপাচারের ঘটনা ধরা পড়ে। এক্ষেত্রে আমদানিকারকের মুখোশ বদল হলেও যোগসাজশে আইএফআইসি ব্যাংকের সেই কর্মকর্তারাই। তবে রপ্তানিকারক জমরাজ নামের আগের অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান হলেও দেশ দেখানো হয়েছে চীন। এখন এর নেপথ্যের চক্রটিকে ধরতে কাজ করছে শুল্ক গোয়েন্দা।

এদিকে, ৯০ কনটেইনারে মুদ্রাপাচারের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আমদানিকারক হেনান আনহুই এগ্রো, এগ্রো বিডি এন্ড জিপি, সিএন্ডএফ এজেন্ট রাবেয়া এন্ড সন্স, আইএফআইসি ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার অনুমতি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, এনবিআর। এদের বিরুদ্ধে যে কোনো সময় মামলা করবে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর। 

শুল্ক গোয়েন্দা জানান, সাধারণত শূন্য বা কম শুল্কের শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগে একটি চক্র এভাবে অবৈধভাবে পণ্য নিয়ে আসে, করে মুদ্রাপাচার। এ ব্যাপারে সতর্কও তারা।

জানা গেছে, দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ না থাকায় বিদেশে অর্থ পাচার বাড়ছে বলে মনে করেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা। শেয়ারবাজার, ব্যাংক, ডেসটিনি আর যুবকের লুট হওয়া নানাভাবে পাচার হচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাও অর্থ পাচার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। টাকা পাচার বন্ধে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এই দেশে থেকে অর্থ পাচারের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাব অন্যতম কারণ। এ ছাড়া দেশের ভেতরে নিরাপত্তার অভাববোধও অরেকটি কারণ। বিদেশে অর্থ পাচাররোধে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, অপরাধীদের দৃশ্যমান শাস্তি, ঋণ খেলাপিদের ক্ষেত্রে বিদেশে টাকা পাঠাতে না দেয়া ও শেয়ারবাজার থেকে টাকা সংগ্রহের পর তার সঠিক ব্যবহার নিয়ে যথাযথ তদারকির প্রয়োজন বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

তিনি আরও বলেন, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক মাত্র ১ শতাংশ। আর এ সুযোগে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে বিদেশে। বিভিন্ন সময় পন্য আমদানির নামে পাচার হলেও ধরা ছোয়ার বাইরে মূল হোতারা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেন, বাংলাদেশে অনেকে টাকা রাখতে ভয় পান। তাই বিদেশে টাকা পাচার করেন। শুধু করের হার কমালেই টাকা পাচার বন্ধ হবে না। টাকা পাচার বন্ধে তিনি একটি স্থায়ী আইনি কাঠামো তৈরির সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা এনবিআর একা টাকা পাচার বন্ধ করতে পারবে না। এ জন্য একটি স্বতন্ত্র অফিস তৈরি করা উচিত, গুরুতর অপরাধ দমন অফিসের মতো। এটা হওয়া উচিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে। এ অফিসে পুলিশ, অর্থনীতিবিদ ও সমাজতাত্ত্বিকেরা থাকতে পারেন। তবে সুইস ব্যাংকের যে টাকা রাখা হয়েছে তা শুধু রাজনীতিবিদদেরই। সামনে নির্বাচন তাই সুইস ব্যাংকে টাকা বেড়েছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্বনর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, বিনিয়োগের সুযোগের অপ্রতুলতার কারণেই মূলত টাকা পাচার হয়, এতে কোনও সন্দেহ নেই। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ থাকলে এত টাকা পাচার হতো না। তার মতে, রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণেও টাকা পাচার হয়। নির্বাচনের বছর ২০০৮ সালে যে টাকা পাচার হয়েছে, তা আগের বছরের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি। আর ২০১৩ সালে যে অর্থ পাচার হয়েছে, তা আগের বছরের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি। নির্বাচন এলেই টাকা পাচার হয়। এ জন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। অর্থ পাচারে বিনিয়োগবান্ধব প্রতিকূলতাও অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বাংলাদেশের এই অর্থনীতিবিদ।

সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কয়েকটি বিষয়ে কাজ করলে অর্থ পাচাররোধ সম্ভব। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি উন্নত ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, পাচার হওয়া অর্থের চেয়ে পাচার রোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিনিয়োগ নিঃস্ব একটি দেশ এখন ক্রমান্বয়ে পুঁজি রফতানিকারক দেশে পরিণত হচ্ছে। এর মতো বৈপরীত্য আর কিছু দেখি না। যে দেশে বিনিয়োগের জন্য পুঁজি আসছে না, সেই দেশ থেকে পুঁজি পাচার হয়ে যাচ্ছে।

 দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা বছরে মোট যত টাকা বিনিয়োগ করেন, প্রায় তত টাকাই পাচার হয় বাংলাদেশ থেকে। একসময় ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা অর্থ পাচার না করে দেশেই বিনিয়োগের কথা ভাবতেন। শুধু রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ বিদেশে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে রাখতেন। কিন্তু এখন দেশের ভেতরে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকা ও বিনিয়োগ সুরক্ষার অভাব আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরাও বিদেশে অর্থ পাচার করে বাড়ি বানাচ্ছেন, জমি কিনছেন, কারখানা গড়ছেন। 

ব্যবসায়ীরা দেদার অর্থ পাচার করছেন আমদানি-রপ্তানির আড়ালে, আমদানি পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে আর রপ্তানি পণ্যের দাম কম দেখিয়ে। মধ্যম সারির কর্মকর্তা থেকে উচ্চপর্যায়ের আমলা, বেসরকারি চাকরিজীবীরাও নগদ অর্থ পাচার করছেন হুন্ডি করে, ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে, বিদেশে বসে ঘুষের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে। শুধু ২০১৪ সালেই বাংলাদেশ থেকে আরো প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। ২০১৩ সালে দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এভাবে গত ১০ বছরে দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে ছয় লাখ ছয় হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। 

২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ওই বছরে সারা দেশে উন্নয়ন কর্মকা-ের পেছনে সরকারের ব্যয় হওয়া অর্থের প্রায় সমান। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) পরিমাণ ছিল ৭৫ হাজার কোটি টাকা। আবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে টাকার অঙ্কে বাংলাদেশে স্থানীয় বিনিয়োগ নিবন্ধনের পরিমাণ ছিল ৯১ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। আর যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয় তার অনেকাংশই বাস্তবায়ন হয় না। সেই হিসাবে ২০১৪ সালে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা দেশে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে, পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ (৭৩ হাজার কোটি টাকা) তার প্রায় কাছাকাছি বলেই ধরা হচ্ছে (এক ডলার সমান ৮০ টাকা ধরে এই হিসাব করা হয়েছে)।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির নামে যেভাবে বিদেশে টাকার পাচার হচ্ছে তা কোনভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এসব টাকা পাচার হওয়ার কারণে তা রোধ করা যাচ্ছে না। আমদানির নামে টাকা পাচার অতীতের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো বিচার না হওয়া। অন্যদিকে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকাকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, শুল্ক গোয়েন্দাদের সাথে যোগসাজশ করেই এসব ভুয়া আমদানি দেখানো হয়। কিন্তু কোন কারণে বনিবনা না হলেই তা ধরা পড়ে। তা না হলে ধরা পড়ার কোন সুযোগ নেই। তাহলে কি পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে তার কোন পরিমাণ কেউ বলতে পারছে না। আর এভাবে দেশের কালো টাকার পরিমাণ বেড়ে চলছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ