ঢাকা, সোমবার 25 September 2017, ১০ আশ্বিন ১৪২8, ০৪ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কুরআনের অলৌকিকতায়ও লৌকিকতা আবর্তিত

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : মহান আল্লাহর বাণী পবিত্র কুরআনে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘জালিকাল কিতাব লা রাইবা ফিহ।’ (সূরা বাকারাহ: ২য় আয়াতের ১ম অংশ)। এর অর্থ: এটি এমন একটি কিতাব (বিধান), যার মধ্যে কোনওপ্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি বা সন্দেহ নেই। ‘হুদাল্লিল মুত্তাকিন।’ (আয়াতের ২য় অংশ)। অর্থ: মুত্তাকি বা বিশ্বাসীদের জন্য ‘হুদা’ বা দিক-নির্দেশনা। হিদায়াত। জীবনশৈলী বা পদ্ধতি। এ কিতাব অনুসরণ করে চললে মুত্তাকিদের বিভ্রান্ত হবার আশঙ্কা নেই।
পৃথিবীর সমস্ত পন্ডিত, চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী, সমাজচিন্তক, বিজ্ঞানী, সমাজবিদের কাছে জিজ্ঞাসা, বলুনতো মানুষের লেখা কোনও একখানা ক্ষুদ্রগ্রন্থের শুরুতেই এভাবে চেলেঞ্জ ছুঁড়ে দেবার দুঃসাহস করেছেন কেউ? নিশ্চয়ই না। একবার আল্লাহর রাসূল সা: বেঁচে থাকতেই আরব দেশের সেরা সেরা কবিরা বলে বসেন তাদের দ্বারা কুরআনের মতো গ্রন্থরচনা সম্ভব। সব কবি একত্র হয়ে বহু চেষ্টা করে দেখলেন। কিন্তু সম্ভব হলো না। পরে তারাই সম্মিলিতভাবে সাক্ষ্যপ্রদান করেন যে, ‘না, এ হলো আল্লাহ্র বিস্ময়কর কালাম; এর সমতুল্য একটি আয়াতও রচনা করা কোনও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।’
উল্লেখ্য, ১৪শ’ বছরে কোটি কোটি গ্রন্থ প্রণীত হয়েছে, যেগুলোর নামও জানে না এখনকার মানুষ। আর সেসবের সিংহভাগই ধ্বংসপ্রাপ্ত। এর বিপরীতে কুরআনের কথা ভাবুনতো! এ কিতাবটির কোনও কি ব্যত্যয় ঘটেছে? সামান্যতম পরিবর্তন বা পরিমার্জনের প্রয়োজন পড়েছে? না, পড়েনি। কিন্তু কেন? গভীর মনোযোগসহকারে আবারও ভেবে দেখুন। এর রহস্য আসলে কী?
পৃথিবীতে ১০/২০ পৃষ্ঠার কোনও একটি বইয়ের এতো হাফিজ আছেন কি কোথাও ? নেই। কিন্তু পবিত্র কুরআনের ছয় কোটিরও অধিক হাফিজ রয়েছেন বলে প্রকাশ। যারা এর জের, যবর, পেশ, নোকতা অর্থাৎ বিন্দুবিসর্গ পর্যন্ত নিখুঁতভাবে কণ্ঠস্থ করেছেন। প্রতিদিন অসংখ্য হাফিজ তৈরি হচ্ছেন। এমনকি ৪/৫ বছর বয়সের শিশুরাও ত্রিশপারার বিশাল কিতাব পুরোপুরি মুখস্থ করে ফেলে। তাও অর্থ না বুঝেই। এমন বিরল নজির আর কোনও গ্রন্থের নেই।
অনেকে পুরো কুরআন হিফজ করেন মাত্র ৩/৪ মাসে। আবার অসংখ্য অন্ধ হাফিজও রয়েছেন পৃথিবীতে। কুরআন ব্যতীত কোনও কিতাবের এমন নজির  আর নেই বললেই চলে। পৃথিবীর সমস্ত ছাপা কুরআন, ক্যাসেট, হার্ডডিস্ক পুড়ে ছাই করে ফেললেও এর কপি হাফিজদের কাছ থেকে সহজেই পাওয়া যাবে। অন্য কোনও গ্রন্থের এমনটি প্রায়ই অসম্ভব।
১৪শ’ বছর আগের হাতের লেখা আর বর্তমান কম্পিউটার যুগের কুরআনের মধ্যে বিন্দুমাত্র ফারাক নেই। এমন উদাহরণ আর কি আছে? এর কারণ হচ্ছে : কুরআন সর্বশেষ আসমানি কিতাব। এর সংরক্ষক আল্লাহ্ নিজে। পবিত্র কুরআনের মতো এমন অলৌকিতা আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
পৃথিবীর বহু পন্ডিত পবিত্র কুরআনের খুঁত (নাউজুবিল্লাহ) ধরতে এসে পরিশেষে বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হয়ে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছেন প্রতিদিন। এমন ঘটনা ঘটছে প্রায় রোজ ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলোতে বেশি। যারা এ চিরশাশ্বত নিয়ামত থেকে বঞ্চিত তারা সত্যিকার অর্থেই হতভাগ্য!
হটকারিতা নয়, বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে নয়, কোনও ভাবাদর্শে আপ্লুত হয়ে বা আবেগে নয়, গভীর আন্তরিকতা ও ঔদার্য নিয়ে আমার কথাগুলো ভাবুনতো কিছুক্ষণ, কেমন মনে হয়!
একশ্রেণির প-িত অভিযোগ করেন, কুরআন হযরত মুহম্মদ সা: এর রচনা। কিন্তু এ মিথ্যে অভিযোগ যাতে ধোপে না টেকে সেজন্য আল্লাহ্তায়ালা বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ সা: কে উম্মি বা নিরক্ষর করে রাখেন। ভেবে দেখুন, একজন অক্ষরজ্ঞানহীন ব্যক্তির পক্ষে এমন আধুনিক নিখুঁত তাল-লয়-ছন্দময়তায় সমৃদ্ধ কিতাব প্রণয়ন কি সত্যই সম্ভব? এর কোনও সদুত্তর আধুনিক কাব্যবিশারদরা দিতে আজও অক্ষম। কীভাবে সক্ষম  হবেন? কারণ আল কুরআন বিশ্বনবী সা: এর প্রণীত নয়। তিনি নবী হলেও কিন্তু মানুষ। তবে সাধারণ মানুষ নন। শ্রেষ্ঠ এবং উম্মি রাসূল। পবিত্র কুরআন আল্লাহ্র ওহি হিসেবে সুদীর্ঘ তেইশ বছর ধরে মুহম্মদ সা: এর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণার্থে।
কুরআনে এমন কোনও বিষয় নেই যা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়নি। দুনিয়া, আখিরাত, জীবন, মরণ, কৃষি, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, সমাজ, রাষ্ট্র, দর্শন, ভূগোল, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, সৃষ্টি, ধ্বংস, একত্ববাদ, বহুত্ববাদ, অণু, পরমাণু, আলো, আঁধার, প্রকৃতি সব বিষয়ে চুম্বক আলোচনা আছে। তবে এসব বিষয়ের কোনওটি নিয়েই এ কিতাব নয়। এর প্রধান বিষয় হচ্ছে মানুষ। মানুষের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণই প্রাধান্য পেয়েছে এতে। তবে মানুষ যে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বা আশরাফুল মাখলুখ এর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে আল-কুরআনে।
মজার বিষয় হচ্ছে: কুরআনকে অনেকেই শুধু মুসলমানদের জন্য মনে করেন। এটা কিন্তু সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। কুরআন নাযিল হয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য। তাই এ থেকে কল্যাণ নেবার অধিকার রয়েছে সব মানুষের। কুরআন কোনও সম্প্রদায় বিশেষের জন্য নয়।
ভারত মহাদেশে এমন কিছু ধর্মগ্রন্থ প্রণীত হয়েছিল যেগুলো বিশেষ শ্রেণির বিশেষ মর্যাদাবান ব্যক্তি ব্যতীত অন্যদের পাঠের, স্পর্শ করবার বা পাঠ শুনবার অধিকার নেই। কিন্তু কুরআন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ পড়তে পারেন। শুনতে পারেন। কেউ কেউ মনে করেন, অজু ব্যতীত কুরআন স্পর্শ করা যায় না। কিন্তু কোনও অমুসলিম যদি কুরআন পড়তে চান, তাকে কি মানা করবেন? যে ব্যক্তি আল্লাহ্ বিশ্বাসই করে না, তারতো অজুর কোনও প্রয়োজন নেই। কিন্তু কুরআন পড়তে তাকে বাধা দেবার আপনি কে? তবে কেউ যদি উদ্দেশ্যমূলক কুরআনের অমর্যাদা করতে চায়, তাহলে তাকে শুধু বাধা নয়, প্রতিহত করা ঈমানদারের দায়িত্ব।
তাওরাত, ইঞ্জিল, জবুরসহ সব দীনী কিতাব বিকৃত করা হয়েছে। একমাত্র আল-কুরআন রয়েছে অবিকল ও অপরিবর্তিত অবস্থায়। এটাও একটা মুযেজা বা অলৌকিকতা। এছাড়া কুরআন নাযিল হবার পর পূর্বেকার দীন যেমন বাতিল হয়ে গেছে, ঠিক তেমনই আসমানি কিতাবসমূহও স্বাভাবিকভাবে বাতিল হয়ে গেছে। আর তাই আল্লাহ্র দীন ব্যতীত মানবপ্রণীত কোনও আদর্শ বা বিধান দীন হিসেবে মানবার প্রশ্নই ওঠে না। এই সত্যতো দিবালোকের মতোই সুস্পষ্ট। কিন্তু বিভ্রান্ত মানুষ এখনও মিছে মরীচিকার পেছনে ধাবিত হয়!
মহান আল্লাহর অনেক বিধান সব মানুষই মানে। যেমন: পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, এটা মানে। সূর্যের আলো ছাড়া চলে না, এটাও মানে। আহার গ্রহণ না করলে মানুষ বেশিদিন বাঁচতে পারে না, এটা অস্বীকার করে না। জন্মের পর আজ হোক, কাল হোক সব প্রাণি মৃত্যুবরণ করবে, এটাও মানে মানুষ। কিন্তু কালকিয়ামত হবে, মানুষকে শেষবিচারের মুখোমুখি হতে হবে এটা অনেকেই বিশ্বাস করতে চায় না। মরলো আর কবরে গেল বা পুড়ে ফেলা হলো। সব শেষ। এমনই মনে করে অনেকে। কিন্তু আল্লাহ্ যে মানুষকে আবার জীবিত করে বিচারের সম্মুখীন করাবেন, এটা অনেকের বুদ্ধিতে কুলোয় না। চোখে যা দেখে সেটাই শেষ মনে করে মানুষ। মানুষের চোখে দেখবার বাইরেও যে অনেক কিছু ঘটে তা মানুষ স্বীকারই করতে চায় না।
হ্যাঁ, লেখাটা শুরু করেছিলাম কুরআন আল্লাহ্র কিতাব বা বিধান এ কথা দিয়ে। মানুষ মাত্রই ভুল করে। এটাই স্বাভাবিক। ভুল হয় না আল্লাহ্র। মহাজগত সৃষ্টিতে সামান্য বিন্দু পরিমাপ ভুল হলে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বজগত ধ্বংস হয়ে যেতো। ভুল হয়নি বলেই সব ঠিক আছে। কুরআনও মহান আল্লাহ্র অভূতপূর্ব সৃষ্টি বলে এর চুল পরিমাণ ভুল নেই। এজন্যই কুরআনকে অলৌকিক বলা হয়। তবে কুরআন সৃষ্টিতে মানুষের কোনও সম্পর্ক বা ছোঁয়া না থাকলেও এতে মানুষই প্রাধান্য পেয়েছে। এও এক অভাবনীয় অলৌকিকতা বটে।
নোট: ভারত থেকে ভুল ছাপা কুরআনের কপি এদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যার সচিত্র প্রমাণ আমরা কিছু দিন আগে পেশ করেছি। তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ