ঢাকা, সোমবার 25 September 2017, ১০ আশ্বিন ১৪২8, ০৪ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খাদ্য ঘাটতি খাদ্যমূল্য খাদ্য সংগ্রহ নিয়ে আগাম ভাবনা

জিবলু রহমান : [চার]
চাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কারসাজি করে চালের বাজার অস্থির করার অভিযোগ তুলেছিল খোদ সরকারই। ১৪  সেপ্টেম্বর ২০১৭ খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা চাল নিয়ে চালবাজি করছেন। চাল নিয়ে রাজনীতি চলছে। আমরা চালবাজি ও ষড়যন্ত্রের মধ্যে আছি। সমস্ত দেশকে একটা বিভ্রাটের মধ্যে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মিল মালিকদের কারসাজিকে দায়ী করে সরকারি হিসেবেই মোটা চালের দাম গত এক মাসে বেড়েছে ১৮%, এক বছরে বেড়েছে ৫০%। এখন বাজারে ৫০ টাকার নিচে কোনো মোটা চাল নেই। ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেশের সব জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দিয়ে যারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে চালের দাম বাড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সরকারের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চালের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এর মূল্য বৃদ্ধিতে তৎপর রয়েছে। এসব অসাধু ব্যবসায়ীকে চিহ্নিত করে তাদের কার্যক্রম রোধকরণসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, চালের মূল্য গ্রহণযোগ্যভাবে স্থিতিশীল রাখা ও মূল্যবৃদ্ধি রোধ এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিং নিশ্চিতকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এ চিঠি পাওয়ার আগের দিন চালের দাম বৃদ্ধির মধ্যে মজুদদারি বন্ধে প্রশাসন সপ্তাহে বিভিন্ন রাইস মিলে অভিযান শুরু করে। কুষ্টিয়ার খাজানগরে বাংলাদেশ চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রশিদের রশিদ অ্যাগ্রো ফুড প্রডাক্টসে (চালকলে) ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আগে কেনা ধানের বর্তমান বাজারমূল্য দেখিয়ে চাল বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ আনা হয়েছে রশিদ অ্যাগ্রো ফুড প্রডাক্টের বিরুদ্ধে। কিন্তু রশিদকে জরিমানা করার পর এই কদিনে মিনিকেট চালের দাম বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ৪০০ টাকার মতো বাড়িয়ে দেয়া হয়। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অন্যান্য চালের দাম। এক পর্যায়ে চালকল মালিক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়।
কিন্তু তাদের নিয়েই সচিবালয়ে বৈঠক করলেন সরকারের তিন মন্ত্রী। আর বৈঠকে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিষয়ে জোরাল অবস্থান নেয়া তো দূরের কথা, উল্টো নতজানু হয়ে তাদের তিন দাবি মেনে নিয়েছেন মন্ত্রীরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে অবশ্য মিল মালিকরা ঘোষণা দিয়েছেন চালের মূল্য দুই থেকে তিন টাকা কমানোর। তবে ভোক্তা পর্যায়ে এ সুবিধা কতটুকু ও কবে মিলবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে করণীয় নির্ধারণের বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে সরকারের তিনজন সিনিয়র মন্ত্রীর সঙ্গে চাল ব্যবসায়ীদের এক বৈঠকে ব্যবসায়ীদের চালের দাম কমানোর অনুরোধ জানিয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, আগামীকাল থেকে ৫০ লাখ মানুষকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল দেয়ার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি স্থগিত করেছি। আগামীকাল (২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭) থেকে সারা দেশের উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ওএমএস কর্মসূচি চালু করছি।
চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ও বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কায়কোবাদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
এ বৈঠকে মন্ত্রীদের সঙ্গে রীতিমতো তর্কে জড়ান চাল মিল মালিক, ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা। মন্ত্রীদের চাপে ফেলে যে তিন দাবি তারা আদায় করে নিয়েছেন সেগুলো হল-চাল আমদানি ও পরিবহনে পাটের বস্তার পরিবর্তে প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার, স্থলবন্দর দিয়ে চালবাহী ট্রাক দ্রুত পার এবং রেলপথে চাল আনার ব্যবস্থা করার নিশ্চয়তা।
জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বৈঠক শেষ করেই এ বিষয়ে এনবিআর, রেলপথ এবং পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তিনি কথা বলবেন। ব্যবসায়ীদের যাতে হয়রানি না করা হয়, সে ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন। এতে ব্যবসায়ীরা খুশিতে টেবিল চাপরাতে চাপরাতে বিদায় নেন। আড়ালেই থেকে যায় চাল সিন্ডিকেটের দুই হোতা আবদুর রশীদ ও লায়েক আলী কিংবা এদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি।
ব্যবসায়ীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অটো  মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক পক্ষের সভাপতি আবদুর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী, অপর গ্রুপের খোরশেদ আলম খান, বাংলাদেশ রাইস এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহ আলম বাবু, মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানসহ বিভিন্ন চাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নেতারা। বৈঠকের শুরুতে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম দেশে চালের কোনো সংকট নেই এবং সারা দেশে প্রায় এক কোটি টন চাল আছে মন্তব্য করে ব্যবসায়ীরা কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ তোলেন। সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে উল্টো সরকারের নানা নীতির সমস্যা ও সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেয়ার কারণেই সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন।
দিনাজপুরের জহুর অটোরাইস মিলের মালিক আবদুল হান্নান নিজেকে সরকারদলীয় সমর্থক পরিচয় দিয়ে বলেন, চালের আমদানি শুল্ক কমাতে গিয়ে অনেক সময় নেয়া হয়েছে। ধাপে ধাপে কমানো হয়েছে। এসব কারণে দাম বেড়েছে। এরপর ব্যবসায়ীরা একে একে চালের দাম বাড়ার কারণগুলো তুলে ধরেন। একজন চাল ব্যবসায়ী বলেন, বঙ্গবন্ধু সেতুতে নির্ধারিত টোলের বাইরেও ট্রাকপ্রতি ২ হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়। না দিলে ড্রাইভারকে মারধর বা ট্রাক ভাংচুর করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোহনপুর ও বেনাপোলে হাজার হাজার চালের ট্রাক দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকে পার হতে পারে না। এ কারণে চালের দাম বৃদ্ধি পায়। এ সময় সরকারের মন্ত্রীরা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন ‘তাহলে ক্যামনে হবে’।
সাবেক খাদ্যমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি যখন খাদ্যমন্ত্রী ছিলাম, তখন ভারত থেকে চাল আমদানি করতে গিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। মাত্র পাঁচ লাখ টন চাল আনার চুক্তি করেও কোনো চাল আনতে পারিনি। পরে ভিয়েতনাম থেকে চাল এনে সংকট মোকাবিলা করেছি।’ তিনি মোটা চাল কেটে মিনিকেট বানানোর বিষয়টিও নাকচ করেন। এ সময় ব্যবসায়ীরা তাকে সমর্থন জানান। ব্যবসায়ীদের চালের দাম কমানোর অনুরোধ জানিয়ে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার নিজেও আমদানি করে মজুদ বাড়াচ্ছে। আগামীকাল থেকে ৫০ লাখ মানুষকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল দেয়ার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি স্থগিত করেছি। আগামীকাল থেকে সারা দেশের উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ওএমএস (খোলা বাজারে চাল বিক্রি) কর্মসূচি চালু করছি।’ আশা করি এতে চালের বাজারে প্রভাব পড়বে।
বৈঠকে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কেএম লায়েক আলী বলেন, ‘কাল থেকে চালের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা করে কমে যাবে।’
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সংবাদপত্রকে জানান, সরকার চালের মতো স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে খুব সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। একই সঙ্গে ঠা-ামাথায় ও গভীর বিচার-বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ নিচ্ছে। জনগণের বৃহৎ স্বার্থে অনেক কিছুতেই নমনীয়তা দেখাচ্ছে সরকার। তিনি বলেন, সবাই দেশের নাগরিক। দেশের প্রতি ব্যবসায়ীদেরও দায়বদ্ধতা আছে। সরকার চায়, নিরাপদ স্তরে চালের মজুদ গড়ে ওঠুক। এজন্য সরকারিভাবে আমদানির পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও উৎসাহিত করা হচ্ছে। তাদের মজুদ পরিস্থিতি কেমন ও কী অভাব-অভিযোগ রয়েছে এবং কোথায় কী সংকট, তা জানার চেষ্টা করছে। সে লক্ষ্য নিয়েই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এ বৈঠক করা হয়েছে। তিনি আশা করেন, সহায়ক সম্পর্ক ও সমঝোতার মাধ্যমে অনেক কঠিন পরিস্থিতিও স্বাভাবিক করা যায়। সরকার সে পদক্ষেপেই হাঁটছে।
খাদ্যমন্ত্রী মো. কামরুল ইসলাম বলেছেন, ‘বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এ ছাড়া কিছু করার নেই।’ চালের বাজার অস্থিরতার পেছনে সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলেও তিনি মনে করেন।
সরকার বলছে, দেশে চালের মজুদ রয়েছে এক কোটি টনের ওপরে। কিন্তু বাজারে চালের দাম কমছেই না, উল্টো লাফিয়ে বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, চালের বাজারে যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবেই এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল কিংবা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মতো প্রতিষ্ঠান চালের বাজারে কোনো অভিযান না চালানোয় চাল ব্যবসায়ীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেছেন, বাজারে অন্যান্য পণ্যে মনিটরিং ব্যবস্থা থাকলেও চালের বাজারে সরকারি কোনো নজরদারি নেই। চালের বাজারে এখন মহাসংকট চলছে। কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীল কোনো সংস্থা বা মন্ত্রণালয়ের চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে কোনো রকম উদ্যোগ নেই। এ কারণে বাজারে পর্যাপ্ত চাল থাকলেও সরবরাহ লাইনে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চালের দাম বাড়ানো হচ্ছে। সেই সঙ্গে চাল ব্যবসায়ীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তিনি আরো বলেন, আমদানীকৃত চালের মজুদ মনিটর করা হলে দ্রুত সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘দেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে একটা সমাধানে আসা জরুরি। বিদেশ থেকে চাল আমদানির পেছনে না ছুটে দেশের অভ্যন্তরে যাদের হাতে চাল রয়েছে, সেই চাল বাজারে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। সেটি করতে পারলে চালের দাম কিছুটা কমতে পারে।’  (সূত্র : দৈনিক কালের কন্ঠ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭)
সাবেক খাদ্য সচিব আবদুল লতিফ ম-ল বলেছেন, চালের বাজার অস্থিরতার পেছনে চাল ব্যবসায়ীদের কারসাজি ও সরকারের ভুল নীতি দায়ী। হাওর এলাকায় অকাল বন্যা ও ব্লাস্ট রোগের কারণে ২০ লাখ টন কম হলেও পর্যাপ্ত বোরো উৎপাদন হয়েছে। সরকারের দাবিকেও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাদের দাবি, অসাধু ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে চালের বাজার অস্থির করেছে। এ কারণে কাউকে কাউকে ছ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আবার তাদের সঙ্গেই বৈঠক করে হয়রানি না করার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ চাল কারসাজির দায়ে অভিযুক্তরা পার পেল। শেয়ার বাজারেও তা-ই হয়েছে।
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেছেন, কাকে ধরা হল, কাকে ছাড়া হল বা কার সঙ্গে বৈঠক করা হল-তার চেয়ে বড় কথা হল দেখতে হবে আসলেই দোষী কি না? দোষী হয়ে থাকলে ব্যবস্থা না নিয়ে একসঙ্গে বৈঠক করা অবশ্যই নিন্দনীয়। তিনি দাবি করেন, চাল নিয়ে অবশ্যই কারসাজি হচ্ছে। সেটা ব্যবসায়ীরাই করছে। সরকার এদের চিহ্নিত না করলে নিজেই ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে। (সূত্র : দৈনিক যুগান্তর ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭)
দাম বৃদ্ধির বিষয়ে কাওরানবাজারের মেসার্স মতলব  ট্রেডার্সের মালিক আবু রায়হান জগলু বলেছেন, মিল মালিকরা চাল মজুদ করায় দাম বেড়েছে। তারাই সবকিছু বলতে পারেন, কেন চালের দাম বেড়েছে। কাওরানবাজার কিচেন মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও চাল ব্যবসায়ী হাজী লোকমান হোসেন বলেছেন, হাওর অঞ্চলে বন্যা ও উত্তরাঞ্চলে দ্বিতীয়বার বন্যা, মিল মালিক ও বড় কৃষকদের মজুদদারি মনোভাব এবং ধানের জমিতে পাট, অন্য ফসল ও মাছের ঘের  তৈরির কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় চালের দাম বাড়ছে। এছাড়া সরকার চালের শুল্ক কমিয়ে দিলেও ভারত, থাইল্যান্ডসহ অন্য দেশগুলো চালের দাম বাড়িয়েছে। ফলে বেশি দামেই আমদানি করতে হচ্ছে।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী কবির হাসান লিটন বলেছেন, দেশে চালের সংকট নেই। মিনিকেট চাল যে ধান দিয়ে তৈরি হয় সেই ধান মজুদ করেছেন মিলাররা। তাছাড়া গ্রামে মিলের সংখ্যা বেড়েছে কিন্তু সেই তুলনায় ধানের উৎপাদন বাড়েনি। ফলে প্রতিযোগিতা বেশি হওয়ায় ধানের দাম বেড়েছে। তার প্রভাব পড়েছে চালের ক্ষেত্রে। (সূত্র : দৈনিক যুগান্তর  ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭)
১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ অবৈধভাবে চাল মজুত, ওজনে কম দেওয়া, বেশি দামে বিক্রিসহ বিভিন্ন অভিযোগে দেশের চার জেলায় অভিযান চালিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। আজ সোমবার এসব অভিযান চালানো হয়। অভিযান চলাকালে বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে মোট ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার চাঁচকৈড় বাজারে চারটি চালকলের মালিককে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অবৈধভাবে চাল মজুত, ওজনে কম  দেওয়া ও প্রক্রিয়াকরণ খরচের চেয়ে বেশি দামে চাল বিক্রিসহ বিভিন্ন অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত এ জরিমানা করেন। আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোর্তুজা খান।
চাঁচকৈড় বাজারের সততা ট্রেডার্সের মালিক রায়হান উদ্দিনকে ৭০ হাজার টাকা, চৌধুরী ট্রেডার্সের মালিক কিশোর কুমার চৌধুরীকে ৫০ হাজার টাকা, ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমকে ৫০ হাজার টাকা ও কে এম ট্রেডার্সের মালিক আলমগীর কবিরকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
অবৈধভাবে ধান-চাল মজুতের অভিযোগে রাজশাহী নগরের দুই ব্যবসায়ীকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) সুব্রত পালের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ছিলেন রহিমা সুলতানা ও উম্মে তাবাসসুম।
আদালত নগরের বিসিক এলাকার হামিম অ্যাগ্রো ফুড লিমিটেডকে ৫০ হাজার টাকা ও আসলাম রাইস মিলসকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। হামিম অ্যাগ্রো ফুড লিমিটেডের ব্যবস্থাপক ফয়সাল হোসেন ও আসলাম রাইস মিলসের মালিক হলেন আসলাম তোহা। হামিম অ্যাগ্রো ফুড লিমিটেডে অভিযান চালিয়ে ৪ হাজার ২৯ বস্তা চাল পাওয়া গেছে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের চাল মজুত করার কোনো লাইসেন্স নেই। একই এলাকার আসলাম রাইস মিলসে অভিযান চালিয়ে পাওয়া গেছে ১ হাজার ২৮৫ বস্তা ধান ও ১০০ বস্তা চাল। এই প্রতিষ্ঠানের ধান-চাল মজুত করার লাইসেন্স নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। দুটি প্রতিষ্ঠানই অবৈধভাবে ধান-চাল মজুত করে রেখেছিল।
সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে চাল বিক্রির অপরাধে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া বাজারের চাল ব্যবসায়ী চান মিয়াকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
ফরিদপুর সদরপুর উপজেলায় অবৈধভাবে চাল মজুতের দায়ে এক চাল ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাড়ে সাতরশি বাজারের চাল ব্যবসায়ী তোফাজ্জেল হোসেন খানকে নগদ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সদরপুর উপজেলার ইউএনও রোকসানা রহমান। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭)
সিন্ডিকেটের সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়া ভালো দৃষ্টান্ত নয়। সরকারের সংশ্লিষ্টরা কখনোই দ্রব্যমূল্য নিয়ে কারসাজির  হোতাদের শাস্তির মুখোমুখি করতে পারেনি। কোনো ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেও গুরুদণ্ডের স্থলে দেয়া হয়েছে লঘুদণ্ড। এর ওপর এ সমঝোতা তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও উসকে দেবে।
প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহারের কারণে এমনিতেই চালের মূল্য কেজিতে ২-৩ টাকা কমার কথা। কারণ চটের বস্তার দাম ৮০ টাকা। কিন্তু পলি-বস্তার মূল্য ১৫ টাকা। সুতরাং দু-তিন টাকা মূল্য কমানোর বিষয়টি কার্যত ফাঁকি।
চালের বাজারে হঠাৎ করে অস্থিরতা তৈরি হয়নি। হাওরে অকাল বন্যায় যখন আগাম বোরো ফসলের ক্ষতি হলো তখন কেন টনক নড়েনি খাদ্য অধিদপ্তরের? তখনতো সরকারের গুদামে চালের মজুদ তলানীতে ছিল। সে সময় কেন খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আগাম সংকটের আভাস পেলেন না। সময়মতো চাল আমদানির উদ্যেগ নিলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতো না। এছাড়া চাল আমদানিতে শুল্ক যখন কমানোই হলো তাহলে তা আরো আগে কমানো হলো না কেন? নাকি শুল্ক কমানোর জন্যই ইচ্ছাকৃতভাবে চালের বাজারে এ অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছিল?
সাধারণত মার্চের দিকে চালের মজুদের পরিমাণ কিছুটা কমে আসলেও তা ছয়-সাত লাখ টনের নিচে নামে না। আর মে মাসে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বোরো সংগ্রহ শুরু হলে মজুদ বাড়তে থাকে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টো হয়েছে। কারণ, তার আগেই হাওরে অকাল বন্যায় আগাম বোরো ফসল নষ্ট হয়েছে। ফলে খাদ্য বিভাগ অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বোরো সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছে। খাদ্য বিভাগ যদি এ সংকট মোকাবেলায় দ্রুত ব্যবস্থা নিত তাহলে চালের বাজারে এ সমস্যা হতো না।
চালের মজুদ তলানীর বিষয়টি ও হাওরে অকাল বন্যায় বোরো ফসলের ক্ষতিতে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন সময় মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিলে চালের বাজারে কোন সংকট হতো না। [সমাপ্ত]
jiblu78.rahman@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ