ঢাকা, সোমবার 25 September 2017, ১০ আশ্বিন ১৪২8, ০৪ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রাণী সম্পদ : দেশ ও সমাজ উন্নয়নের সহায়ক

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : সব ধরনের উৎসবেরই কিছু অর্থনৈতিক দিক রয়েছে। ধর্মীয় উৎসব ছাড়াও বাংলাদেশে ইদানীং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব পালন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এসব উৎসবে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করা ছাড়াও দেশের মানুষ উৎসবের থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পোশাক-পরিচ্ছদ ক্রয় বা পরিধান করে থাকে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুটি উৎসব হচ্ছে ধর্মীয় উৎসব বা ঈদ উৎসব। তার মধ্যে একটি হচ্ছে কোরবানির ঈদ। অন্যান্য উৎসবের চেয়ে এ উৎসব কিছুটা ব্যতিক্রম। মোটামুটি অন্য সব উৎসবের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, নতুন পোশাক কেনাকাটা। কিন্তু কোরবানির ঈদ মূলত পশুকেন্দ্রিক। এ ঈদে বিপুল সংখ্যক পশু জবাই করা হয়, যার মাংস ও চামড়ার একটি বড় অংশ গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। তাই এ ঈদ উৎসব দেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে।
কোরবানি ঈদের অর্থনীতি পশুকেন্দ্রিক হওয়ায় আজকের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে পশু উত্পাদন ও এর বাজার ব্যবস্থাপনা। এক্ষেত্রে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, তার মধ্যে পশুর উৎপাদন, পশুর মাংস, পশুর বাজার ব্যবস্থাপনা এবং পশুর মূল্য নির্ধারণ, পশুর চামড়া ও অন্যান্য উপজাত অন্যতম। এক হিসাবে দেখা যায় যে, কোরবানীর ঈদে মোটামুটি এক কোটি পশু কোরবানি দেয়া হয়ে থাকে, যার মধ্যে গরুর পরিমাণ প্রায় ৬০ লাখ এবং বাকি ৪০ লাখ ছাগল, ভেড়া, মহিষ ইত্যাদি।
গড়ে একটি গরুর দাম ৫০ হাজার টাকা ধরলে এ সময়ে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার গরু কেনাবেচা হয়েছে। অন্যদিকে গড়ে ১০ হাজার টাকা মূল্য ধরে হিসাব করলে বাকি পশুর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকার মতো। এবং এর সঙ্গে অন্যান্য ব্যয় যোগ করলে মোটামুটি এ ঈদে ৪ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।
পশুর বাজার ব্যবস্থাপনার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এ বিপুল পরিমাণ গবাদিপশুর চাহিদা মূলত দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে মেটানো হচ্ছে। দু-তিন বছর আগে ভারত কর্তৃক গরু রফতানি নিষিদ্ধ করার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট গরুর চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি করা হতো (বৈধ ও অবৈধ পথে)। বর্তমানে ভারত থেকে আসা গরুর পরিমাণ ৫-১০ শতাংশে নেমে এসেছে বলে শোনা যায়। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শুধু দেশীয় উত্পাদনের মাধ্যমে ঈদের সময়কালীন বিপুল চাহিদা মেটানোর প্রচেষ্টাকে আমরা ইতিবাচক মনে করতে পারি বিভিন্ন কারণে। এতে করে এখানে আমদানি প্রতিস্থাপন নীতি গ্রহণের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভালো দাম পাওয়ার কারণে খামারিরা গবাদিপশু উৎপাদনে আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি উৎসাহ বোধ করছে। ফলে এ খাতের দিকে আরো মনোযোগ দেয়ার সময় এসেছে।
বিভিন্ন গবাদিপশু খামারি এবং কৃষকের ভাষ্য অনুযায়ী, এ খাতের উন্নয়নে সরকারের তরফ থেকে নানা পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। যেমন পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে অনেকে বাণিজ্যিকভাবে গবাদিপশু পালন করতে পারছে না। ফলে সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ এবং অন্যান্য প্রণোদনা এ খাতে দেয়া যেতে পারে। এ খাতের উন্নয়নে তাই সহজ শর্তে ঋণ, আর্থিক সহায়তা, পশুখাদ্যে ভর্তুকি, পশু চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ইত্যাদি ব্যবস্থা আরো জোরালোভাবে নেয়া প্রয়োজন। প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি ও প্রণোদনার যেমন প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তেমনি এ খাতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থাপনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কয়েক বছর ধরে পশু ও মাংসের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। মোটামুটি প্রতি বছর শতকরা ৩০-৪০ ভাগ হারে গবাদিপশুর দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তার সঙ্গে মাংসেরও। দাম বৃদ্ধিতে চাহিদা জোগানের ঘাটতির একটি প্রতিফলন রয়েছে।
এটি দিয়ে এ বিষয়ও মোটামুটি পরিষ্কার যে, দেশীয় চাহিদার ঘাটতি মেটানোর জন্য আরো গবাদিপশু উত্পাদনের সুযোগ রয়েছে। দামের ক্ষেত্রে কোরবানির পশুর হাটের একটি আলাদা চিত্র রয়েছে। ঈদের কয়েক দিন আগের পশুর বাজার পর্যালোচনা করলে দামের ক্ষেত্রে একটি ট আকৃতির ধারা লক্ষ করা যেতে পারে। যেমন যদি ঈদের আগের এক সপ্তাহ বিবেচনা করা হয়, তাহলে প্রথম তিন-চারদিন দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকে, পরের দু-এক দিন নিম্নমুখী এবং শেষ দিন ঊর্ধ্বমুখী। এটি মোটামুটি সাধারণ চিত্র। তবে এর ব্যতিক্রমও লক্ষ করা যায়। ঈদের আগের দিন এ দাম নিম্নমুখী হয়ে যাওয়া। ঈদের পশুর বাজারের দামের এ ওঠানামা কয়েক বছর পর্যালোচনা করলে এতে Cob-Web cycle পাওয়া যেতে পারে এক বছর বৃদ্ধি, পরের বছর নিম্নগতি আবার তার পরের বছর বৃদ্ধি। ধরা যাক, এ বছর পশু ব্যবসায়ীরা যদি দাম কমে যাওয়ায় ভালো মূল্য না পেয়ে থাকেন, তাহলে তারা আগামী বছর পশু কম উৎপাদন করবেন বা বাজারে আনবেন। তাহলে চাহিদা জোগানের যে ঘাটতি তৈরি হবে, তাতে করে আগামী বছর পশুর মূল্য আবার ঊর্ধ্বমুখী হবে। বাজারের এ ভালো অবস্থা দেখে ব্যবসায়ীরা আবার যদি জোগান বাড়িয়ে দেয়, তাহলে তার পরের বছর দামের আবার নিম্নমুখিতা দেখা যেতে পারে। এ ধরনের দামের ওঠানামা বাজারে দেখা গেলে তাকে অর্থনীতির ভাষায় Cob-Web cycle বলা হয়। দামের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্যাটার্ন যদি দেখা যায়, তাহলে এ খাতের ওপর এ ধরনের মূল্যের প্রভাব কি, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বাজার ব্যবস্থাপনার জন্যও এ ধরনের দামের প্যাটার্ন বোঝা দরকার। ঈদের পশুর বাজারের মূল্য এবং গবাদিপশু খাতের ওপর এর প্রভাব-সংক্রান্ত কোনো গবেষণা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট খাতের গবেষকরা গবেষণা করতে পারেন, যা নীতিনির্ধারকদের এ খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ায় সহায়তা করতে পারে।
গবাদিপশু বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত। একটি গবাদিপশুর উপজাত হিসেবে যা কিছু পাওয়া যায়, তার সব কিছুই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন মাংস, চামড়া, নাড়িভুঁড়ি, শিং ইত্যাদির চাহিদা দেশের বাজার ছাড়াও বিদেশে রয়েছে। বাংলাদেশ দেশীয় চাহিদা মেটানোর পরও বিদেশে গত অর্থবছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করেছে। রফতানির ক্ষেত্রে তৈরি পোশাকের পর চামড়া শিল্পের অবস্থান। আরো উৎসাহব্যঞ্জক খবর হলো, গত অর্থবছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার নাড়িভুঁড়ি, শিং ইত্যাদি রফতানি করা হয়েছে। এছাড়া বিদেশে হালাল মাংসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই রফতানি বহুমুখীকরণে লাইভস্টক খাতের উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাসঙ্গিকভাবে চামড়া শিল্পের ওপর আলোকপাত করা প্রয়োজন। কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ, সাভারের ট্যানারিপল্লীতে চামড়ার ফ্যাক্টরি সরিয়ে নেয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রতিবার ঈদের সময় উঠে আসে। এ সময়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে বেশকিছু পরিমাণ কাঁচা চামড়া পার্শ্ববর্তী দেশে চোরাই পথে চলে যাওয়ার খবরও পাওয়া যায়। তাই চোরাচালান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে সাভারে নবনির্মিত পরিবেশবান্ধব ট্যানারিপল্লীতে হাজারীবাগ হতে চামড়ার ফাক্টরি সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে চামড়া শিল্প মালিকদের গড়িমসি করাটা মনে হয় তাদের নিজেদের জন্যই ভবিষ্যতে ক্ষতির কারণ হবে। পরিবেশ-বিষয়ক কমপ্লায়েন্স যদি তারা না মেনে চলে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে তাদের চামড়ার চাহিদা দেশে ও বিদেশে কমে যেতে বাধ্য। এ অবস্থায় আমরা আশা করি, এ শিল্পের সম্ভাবনাকে বেগবান করতে ট্যানারি কারখানাগুলো যত দ্রুত সম্ভব সাভারে স্থানান্তরিত হওয়া প্রয়োজন।
কোরবানির ঈদের অর্থনীতির আরেকটি দিক হচ্ছে, গরিব-দুঃখীদের মধ্যে কোরবানির মাংস বিতরণের মাধ্যমে কিছুদিনের জন্য তাদের প্রোটিনের চাহিদার জোগান হয়। এতে করে তাদের পুষ্টির চাহিদা কিছু সময়ের জন্য হলেও মিটে থাকে। এ ঈদের সময় খুব স্বল্প সময়ের জন্য, বিশেষ করে শহরে কসাই শ্রেণীর শ্রমিকের আবির্ভাব ঘটে। গ্রামাঞ্চল থেকে তারা এক বা দুদিনের জন্য শহরে আসে এবং বেশকিছু অর্থ উপার্জন করে আবার চলে যায়।
গবাদিপশু খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত। রফতানির জন্য এটি একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। ভারতের গরু রফতানি বন্ধের সিদ্ধান্তকে এ খাতের জন্য শাপে বর হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে গার্মেন্টস শিল্পের পরেই এ খাতের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ খাতের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এ খাতের উন্নয়নের জন্য যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা মোকাবেলা করার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। এ খাতের বাজার ব্যবস্থাপনা অবশ্যই প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে। এজন্য বাজার তদারকির ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পশু পালনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হবে। পশু মোটাতাজাকরণের নামে অগ্রহণযোগ্য ওষুধ ব্যবহার প্রতিরোধ করা এবং এ খাত সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। রোগবালাইয়ের মহামারী প্রতিরোধে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং এর জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের যথাযথ প্রস্তুতি থাকতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি। তাহলেই এ খাত অদূর ভবিষ্যতে আরেকটি পোশাক খাত হয়ে উঠতে পারবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ