ঢাকা, সোমবার 25 September 2017, ১০ আশ্বিন ১৪২8, ০৪ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সম্ভাবনাময় সবজি রুকোলা

এম এস শহিদ : আমাদের দেশে অন্যান্য ফসলের মতো শাকসবজি উৎপাদনেও ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকর নানা ধরনের রাসায়নিক পদার্থ। আর এসব রাসায়নিক পদার্থ থেকে নিঃসৃত কারসিনোজেনিক পদার্থ খাদ্য ও পানির সাথে মিশ্রিত হয়ে আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। ফলে আমাদের শরীরে বাসা বাঁধছে মরণব্যাধি ক্যান্সার। সেইসাথে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও রক্তনালী সংক্রান্ত নানা জটিল রোগে। ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার ছাড়াই কিভাবে সবজি চাষ করা যায় তা নিয়ে কৃষি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চালিয়ে আসছেন। শেষপর্র্যন্ত তারা সফলও হয়েছেন। রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের  [শেকৃবি] কৌলিণতত্ত্ব ও উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ আব্দুর রহিম দীর্ঘ আড়াই বৎসর গবেষণার মাধ্যমে রুকোলা নামের এক ধরনের সবজি চাষ করে সফল হয়েছেন। এ সবজি নানা উপায়ে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে প্রতিরোধ করা যাবে এসব প্রাণঘাতী রোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, রুকোলা সরিষা পরিবারের [ব্রাসিকাসিয়া] একটি বর্ষজীবী নরম কান্ড ও সবুজ পাতাবিশিষ্ট এক জাতীয় উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম ইরুকা স্টিভা। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এর উৎপত্তিস্থল। এটি নানা দেশে নানা নামে পরিচিত। রোমান আমল থেকে ইতালিতে এ সবজি রুকোলা নামে চাষ করা হয়। ধারণা করা হয় রুকোলার আদি নিবাসও ইতালিতে।
এছাড়া এটি জার্মানিতে সালট্রিকা, স্পেনে ইরুকা, আমেরিকায় আরগুলা ও ফ্রান্সে রাকেট নামে পরিচিত শীতকালীন সবজি রুকোলা। শীতকালে রুকোলার পাতার বৃদ্ধি দ্রুত ঘটে। বপনের এক মাস পর থেকে পাতা সংগ্রহ করা যায়। বসন্তকালে এটি সরিষার পডের মতো পড তৈরি করে বীজ ধারণ করে। এর পাতা ২০ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। পাতা রসালো, লম্বাটে ও খাঁজযুক্ত হয়। এর বংশবিস্তার বীজের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। ত্বক, ফুসফুস এবং মুখগহ্বর ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ কতে পারে এমন গুন রয়েছে রুকোলার সবুজ পাতায়। রুকোলার পাতায় রয়েছে গ্রহনযোগ্য মাত্রায় ফ্লাভোনল নামের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। তাছাড়া স্বাস্থ্যসহায়ক রাসায়নিক উপাদান সালফিউরান, থায়োসায়ানেটস, আইসোসায়ান্টেস, ইডলস, এবং আলফা লিপোইক এসিড এর মধ্যে রয়েছে, যা বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে। রুকোলার পাতা তেলে ভাজলে বা ঝলসালে এর মধ্যে থাকা ক্লোরোফিল ও টোরোসাইক্লিক অ্যামাইন নি:সৃত হয়, যা দেহকে কার্সিনোজেনিক প্রভাব থেকে রক্ষা করে জটিল রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। অন্যদিকে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমিয়ে এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায় তার জন্য রেকোলার পাতায় বিদ্যমান রয়েছে লিপোইক এসিড। তাছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, রুকোলার পাতা নিয়মিত খেলে হৃৎপিন্ড ও রক্তনালির রোগের ঝুঁকি হ্রাস করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রতি ১০০ গ্রাম রুকোলায় স্বাস্থ্যসহায়ক ২৫ কিলোক্যালরি শক্তি, ৯৭ মাইক্রোগ্রাম ফলিক এসিড, ভিটামিন এ [২৩৭৩ আইইউ], ভিটামিন সি ১৫ মিলিগ্রাম, ভিটামিন কে ১০৮.৬ মাইক্রোগ্রাম এবং ভিটামিন বি কমপ্লেক্স রয়েছে। রোগপ্রতিরোধী এ সবজিটি আমাদের দেশে সারা বৎসর চাষ করা যাবে বলে রুকোলার গবেষক ড. আব্দুর রহিম বলেন, এটি সালাদ হিসেবে টমেটো, জলপাই ও পনিরের সাথে পিজা তৈরির পর পরিবেশনের সময় পিজা টপিং হিসেবে পান্তারসাথে এবং মাংস দিয়ে তৈরি নানা সুস্বাদু খাবারের সাথে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। রুকোলার বীজ থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদন করা যায়। একে পালংশাকের মতো রান্না করে খাওয়া যায়।
এর উৎপাদন সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া রুকোলা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এটি সারা বৎসর উৎপাদন করা যায়। বাড়ির অঙ্গিনায়, শহরের বাড়ির টবে, ছাদে কিংবা বেলকুনিতে এটি জন্মানো যায়। এ সবজি বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে দেশের স্বনামধন্য সব রেষ্টুরেন্ট এবং ফাস্ট ফুডের দোকানগুলোতে বিক্রি করা যাবে। সেইসাথে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করেও প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ