ঢাকা, বুধবার 27 September 2017, ১২ আশ্বিন ১৪২8, ০৬ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাখাইনে হত্যা-ধর্ষণ-উচ্ছেদের বিপুল আলামত পেয়েছে এইচআরডব্লিউ

সংগ্রাম ডেস্ক : গত ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দমনপীড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ আখ্যা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এইচআরডব্লিউ। সোমবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংগঠনটি এই পর্যবেক্ষণ হাজির করেছে। হত্যা-ধর্ষণ-উচ্ছেদের বিপুল আলামত পাওয়ার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ৪টি ক্ষেত্র শনাক্ত করেছে এইচআরডব্লিউ। 

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গুরুতরভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। গত ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনী যে নিপীড়ন চালিয়েছে তা আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রগুলো হলো : ক) কোনও জনগোষ্ঠীকে স্থানান্তরিত ও বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য করা, খ) হত্যা, গ) ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সন্ত্রাস এবং ঘ) আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম স্ট্যাচুর বিবেচনায় নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড করা। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১২ এবং ২০১৬ সালে উগ্র বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং রাখাইনের বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্তরা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল তখনও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের জন্য বার্মিজ সরকারকে দায়ী করেছিল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত- আইসিসির রোম স্ট্যাচু এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, মানবতাবিরোধী অপরাধ হলো এমন এক উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ড যা বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিস্তৃত ও কাঠামোবদ্ধ হামলার মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়। এ ধরনের হামলা অবশ্যই রাষ্ট্রীয় অথবা সাংগঠনিক নীতির অংশ হতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনি বিচারব্যবস্থা অনুযায়ী এ হামলা হতে হবে বিস্তৃত অথবা কাঠামোবদ্ধ। হামলার বিস্তৃিতর মানে হলো ‘অপরাধের মাত্রা কিংবা ঘটনার শিকার মানুষদের সংখ্যা’ এবং কাঠামোবদ্ধ হামলা দিয়ে বোঝায় ‘পদ্ধতিগত পরিকল্পনা’।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মানবতাবিষয়ক আইনে বলা আছে মানবতাবিরোধী অপরাধ যে কেবল সামরিক হামলার ক্ষেত্রে হবে তা নয়। কারণ, মানবতাবিরোধী অপরাধ সশস্ত্র সংঘাতমূলক প্রেক্ষাপটের মধ্যে কিংবা এর বাইরেও হতে পারে। তাছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধ মানে যে কেবল একটি এলাকার গোটা জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা পরিচালনা করা, তা নয়। হিউম্যান রাউটস ওয়াচ মনে করে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর বিস্তৃত ও কাঠামোবদ্ধ হামলা চালিয়েছে। পূর্বে স্যাটেলাইটে ধারণকৃত ছবিতে দেখা গেছে যে এলাকায় জ্বালাও পোড়াও এর আলামত পাওয়া গেছে তা রাখাইন রাজ্যের ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে নভেম্বরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জ্বালাও পোড়াও এর তৎপরতা নির্দিষ্ট এলাকা থেকে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।

হিউম্যান রাইটসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদেরকে স্থানান্তরিত ও বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য করেছে। আইসিসি পূর্ববর্তী সব বড় বড় আন্তর্জাতিক অপরাধের দলিলেই বিতাড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। 

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের মতো করেই সে দেশের এই মানবাধিকার সংস্থা রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিরুদ্ধে সরব। চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে টেলিভিশনে প্রচারিত জাতির উদ্দেশে দেওয়া অং সান সু চির ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ- এইচআরডব্লিউ স্পষ্ট বিবৃতিতে জানায়, ওই ভাষণের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে হারানো গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা নিয়েছেন সু চি। তবে বক্তব্যে সু চি দেশের রোহিঙ্গাবিরোধী জনতা এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে গেছেন বলে অভিযোগ তোলে তারা। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর অবরোধ ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানায় সংস্থাটি।

এর ক'দিন পরে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী এখনও বাংলাদেশ সংলগ্ন সীমান্তে স্থল মাইন পুঁতে রাখছে বলে প্রমাণ হাজির করে এইচআরডব্লিউ। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, স্বাধীন সংবাদকর্মীর প্রতিবেদন আর এ সংক্রান্ত বিভিন্ন আলোকচিত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা জানায়, গত কয়েক সপ্তাহেও অ্যান্টি-পার্সোনেল মাইন ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। এই মাইনের ব্যবহার আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ। মিয়ানমারকে অবিলম্ব ওই নিষিদ্ধ অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করে ১৯৯৭ সালের মাইন নিষিদ্ধকরণ চুক্তিতে সই করার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওই আন্তর্জাতিক সংস্থা।

ত্রাণের অভাবে রোহিঙ্গাদের জীবনে বিপর্যয়ের আশঙ্কা জাতিসংঘের

মানবিক সহায়তা না বাড়ালে রোহিঙ্গাদের ভয়াবহ মানবিক দুর্যোগ থেকে বিপর্যয় সৃষ্টির আশঙ্কা জানিয়েছে জাতিসংঘ। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের পর সংস্থাটির শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের পক্ষ থেকে সোমবার এই আশঙ্কা জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনের প্রধান ফিলিপ গ্রান্ডি মানবিক বিপর্যয়ের গতি প্রেিরাধের উদ্যোগ বাড়ানো অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন। 

নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্টে বিদ্রোহীদের হামলার পর ক্লিয়ারেন্স অপারেশন জোরদার করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তখন থেকেই মিলতে থাকে বেসামরিক নিধনযজ্ঞের আলামত। পাহাড় বেয়ে ভেসে আসতে শুরু করে বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দ। পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামগুলো থেকে আগুনের ধোঁয়া এসে মিশতে শুরু করে মৌসুমী বাতাসে। মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে নিয়ে শূন্যে ছুড়ে দেয় সেনারা। কখনও কখনও কেটে ফেলা হয় তাদের গলা। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় মানুষকে। ওই সহিংসতা থেকে বাঁচতে এ পর্যন্ত ৪ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তার অভাবে মানবেতর দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

‘অবস্থাটা এখন ভয়াবহ, এক্ষুণি যদি মানবিক সহায়তার গতি না বাড়ানো যায়, সেক্ষেত্রে আমরা একটা বিপর্যয়ের ঝুঁকির মধ্যে পড়ব।’ কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনের প্রধান ফিলিপ গ্রান্ডি। রোহিঙ্গাদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকে স্থিতিশীলতার পথে নিতে ত্রাণ কার্যক্রমের গতি বাড়ানো অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রবিবার কক্সবাজারের কুতুপালঙ শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে ফিলিপ গ্রান্ডি বলেন, রাখাইনের নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা পৃথিবীর সবথেকে বিপন্ন জনগোষ্ঠীর ওই মানুষেরা ট্রমায় আক্রান্ত হয়ে রয়েছে। বহু রকমরে জটিলতায় আক্রান্ত তাদের নিত্য জীবন। তিনি বলেন, ‘নিজেদের গ্রামকে চোখের সামনে পুড়ে যেতে দেখেছে তারা। পরিবারের সদস্যদের মরতে দেখেছে চোখের সামনে। অনেকেই রাখাইনে ফিরতে চান, তবে এজন্য তারা সহিংসতার অবসান কামনা করেন’।

শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে সোমবার ঢাকার এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন ফিলিপো গ্রান্ডি। তিনি বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যখন শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত বন্ধ করে দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে।

কক্সবাজার এবং বান্দরবানের যে সব জায়গায় রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আশ্রয় নিয়েছে সেখানকার স্থানীয় বাংলাদেশিদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন ফিলিপো গ্র্যান্ডি। তিনি বলেন, যে কোনো ত্রাণ কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের কল্যাণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। "স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বড় ধরণের চাপ তৈরি হয়েছে। সুতরাং শুধুমাত্র রোহিঙ্গাদের কথা ভাবলে চলবে না। স্থানীয়দের নিরাপত্তা, তাদের ঘরবাড়ি, জমাজমি এবং পরিবেশের বিষয়টি সমস্ত পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়া দরকার।"

ত্রাণ সাহায্যে কি পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন - এই প্রশ্নে ইউএনএইচসিআর প্রধান বলেন, ৭৪ মিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ প্রয়োজন।

মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন ইতোমধ্যে ‘জাতিগত নির্মূলের পাঠ্যপুস্তকীয় দৃষ্টান্ত আখ্যা দিয়েছে। মহাসচিব প্রশ্ন তুলেছেন দুই তৃতীয়াংশ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হলে তাকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ ছাড়া আর কী নামে ডাকা হবে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণকে রোহিঙ্গা তাড়ানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও এনেছে জাতিসংঘ।

কানাডার প্রধানমন্ত্রীর চিঠির জবাব দেননি সু চি!

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো গত ১৮ সেপ্টেম্বর একটি চিঠি দেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে। এক সপ্তাহ অতিবাহিত হয়ে গেলেও সু চি সেই চিঠির জবাব দেননি। 

জাস্টিন ট্রুডো রোহিঙ্গাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন, বর্বরতা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে সু চিকে সেই চিঠি দিয়েছিলেন। তার আগের সপ্তাহে জাস্টিন সরাসরি ফোন করে সু চিকে একই অনুরোধ করেছিলেন।

উক্ত চিঠিতে জাস্টিন মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, আপনি শান্তিতে নোবেল বিজয়ী হয়ে বহির্বিশ্বে সম্মান পেয়েছেন, আপনি একজন সম্মানজনক কানাডিয়ান। আপনার ক্রমাগত নীরবতা এবং এই আচরণে আপনার সাথী কানাডিয়ানরা গভীর বিস্মিত, হতাশ এবং অত্যন্ত বেদনাক্রান্ত। চার লাখ মানুষকে জবরদস্তিমূলক বাংলাদেশে বিতাড়িত করার মতো নিষ্ঠুর নিপীড়নের আপনার ভূমিকায় বিশ্ববাসী বিস্মিত!

ওই চিঠিতে দ্রুত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার বন্ধ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা, সেই সাথে রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরে নেয়া এবং তাদের নাগরিকত্ব অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার জন্য জাস্টিন আহ্বান জানিয়ে ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ