ঢাকা, বুধবার 27 September 2017, ১২ আশ্বিন ১৪২8, ০৬ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ওজোপাডিকোর প্রি-পেইড মিটারের তুঘলকি কারবারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন গ্রাহকরা

খুলনা অফিস : ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানীর প্রি-পেইড মিটারের তুঘলকি কারবারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে খুলনার গ্রাহকরা। ইতোমধ্যে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন এক ব্যক্তি। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির পক্ষ থেকেও ওজোপাডিকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর পত্র দিয়ে প্রি-পেইড মিটারের মূল্য বাবদ ভাড়া নেয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। অপরদিকে, খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে প্রি-পেইড মিটারের হয়রানি নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের সাথে গ্রাহকদের বিরোধ ক্রমান্বয়ে তীব্র হচ্ছে। নাগরিক নেতাদের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে নানা রকম কর্মসূচী চলছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ উন্নয়ন-৩ অধিশাখার উপ সচিব মো. শওকত আলী স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে ওজোপাডিকোর বিদ্যুৎ গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রি-পেইড মিটারের মূল্য বাবদ প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে ভাড়া আদায় করার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। ওই নির্দেশ অনুযায়ী গত মাস থেকে আবাসিক গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসে ৪০ টাকা এবং থ্রি-ফেজ মিটারের গ্রাহকদের কাছ থেকে আড়াইশ’ টাকা আদায় করা হচ্ছে। প্রি-পেইড মিটারের কার্ড কিনতে যাওয়া গ্রাহকদের কাছ থেকে অটোমেটিকই এ টাকা কেটে নেয়া হচ্ছে। কতদিন এমন টাকা কাটা হবে সেটিও উল্লেখ নেই ওই প্রজ্ঞাপনে। তবে ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষ বলছেন, যতদিন গ্রাহক বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন ততোদিনই ভাড়া বাবদ টাকা নেয়া হবে। আবার প্রজ্ঞাপনে এটিকে প্রি-পেইড মিটারের মূল্য উল্লেখ করা হলেও একইসাথে ভাড়ায় সমন্বয় পদ্ধতি অনুসরণের কথা বলা হয়। অর্থাৎ মূল্য নেয়া হলে সেটির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়ার কথা থাকলেও ভাড়া উল্লেখ করলে এর কোন প্রয়োজন হয় না। এসব বিষয় নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া নতুন ডিজিটাল মিটার পরিবর্তন করে তদস্থলে ফ্রি প্রি-পেইড মিটার দেয়ার কথা বলে কিছু কিছু এলাকায় প্রি-পেইড মিটার বসানো হলেও এখন আবার ভাড়া আদায়কে কেন্দ্র করে এমন জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। আবার অধিকাংশ গ্রাহকদের আগের ডিজিটাল মিটার ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষ নিয়ে যাওয়ায় ওইসব গ্রাহকরা ধরেই নিয়েছেন যে, একটি মিটারের পরিবর্তে আর একটি মিটার দেয়া হয়েছে। সুতরাং মূল্য বা ভাড়ার প্রশ্নটি এখন অহেতুক হয়রানি বলেও কেউ কেউ উল্লেখ করেন। এতে অনেক গ্রাহক ক্ষিপ্ত হচ্ছে বিদ্যুৎ কর্মীদের সাথে। ওজোপাডিকোর প্রি-পেইড মিটারের এমন তুঘলকি কারবার বন্ধের আহ্বান জানিয়ে নগরীর দক্ষিণ টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. মিজানুর রহমান খানের পক্ষ থেকে কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর সম্প্রতি আইনগত নোটিশ দেয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এবং খুলনা জজকোর্টের আইনজীবী এডভোকেট এজাজুল হাসান শিকদার সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের পক্ষ থেকে এ নোটিশ দেন। নোটিশে বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৭ মে’র ২৬৬ নম্বর প্রজ্ঞাপনটি বাতিল ঘোষণার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, অন্যথায় উক্ত গ্রাহক ব্যক্তিগতভাবে অথবা জনপ্রতিনিধিত্বমূলক মামলা করবেন।

ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, ওজোপাডিকোর ৪টি বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্রের আওতায় নগরীতে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার গ্রাহক রয়েছে। যার মধ্যে ১৪টি ফিডারের ৬০ হাজার গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় আনা হয়েছে। আরো ৮ হাজারসহ মোট ৬৮ হাজার গ্রাহককে এ প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। আর বাকী গ্রাহকদের পরবর্তী প্রকল্পে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় আনা হবে। এসব গ্রাহকদের মিটারের কার্ড রিচার্জের জন্য নগরীর হাজী মহসিন রোড, টুটপাড়া, শেখপাড়া, পূর্ব বানিয়াখামার, শেরে বাংলা রোড, দৌলতপুর বিদ্যুৎ অফিস, খালিশপুর নেভি চেকপোস্টসহ ১২টি ভেন্ডিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। ভেন্ডিং স্টেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন মিটারের রিচার্জের জন্য কার্ড বেসরকারি পর্যায়ে কয়েকটি ব্যাংকের ৯টি শাখায় পাওয়া যাচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভেন্ডিং স্টেশন ও ব্যাংকগুলোতে গ্রাহকদের দীর্ঘলাইন। তাদের রয়েছে নানা অভিযোগ। দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থেকে কার্ড পায়ার পর একে অপরের কাছে অভিযোগ করতেও দেখা গেছে। ডিভিশন-২ এর গ্রাহক মহেশ^রপাশা বণিকপাড়া এলাকার বাসিন্দা শেখ সালাউদ্দিন বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে রিচার্জ কার্ড পেয়েছি। মিটারের কার্ড কিনতে আসলে অন্যান্য কাজ ফেলে আসতে হয়। এর আগেই ভালো ছিল ব্যাংক অথবা মোবাইলের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করা সম্ভব হতো। কিন্তু এখন বিদ্যুৎ অফিসে এসে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে কার্ড সংগ্রহ করতে হচ্ছে। আর কার্ড নিয়ে এখন মিটারের ভাড়া কেটে নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মিটার বসানোর সময়ে ফ্রি’তে দেয়া হচ্ছে বলে এখন কেন ভাড়া নেয়া হচ্ছে। আর কত দিন এমন ভাড়া দিতে হবে। তিনি বলেন, রিচার্জেও জন্য কার্ড কিনতে ৯শ’ টাকা দিয়েছি, অথচ পেয়েছি মাত্র ৭৭৭ টাকা ১৪ পয়সা পেয়েছি। এর মধ্যে মিটারের ভাড়া ৪০ টাকা, ডিমান্ড চার্জ ৩০ টাকা, সার্ভিস চার্জ ১০ টাকা, ভ্যাট ৪০ টাকা ৮৬ পয়সা কেটে নেয়া হয়েছে। এভাবে টাকা কাটলে চলবো কিভাবে।

আড়ংঘাটা এলাকা থেকে এসেছে অলোকেশ হালদার। তিনি ৫শ’ টাকার রিচার্জ কার্ড কিনে পেয়েছেন ৪১১ টাকা ১৯ পয়সা। তিনি বলেন, মিটারের ভাড়া আবার কিসের জন্য।

ডিভিশন-৩ এর গ্রাহক রেলিগেট এলাকা থেকে আসা ইমন বলেন, আমি ৫শ’ টাকার রিচার্জ কার্ড কিনতে এসে পেয়েছি ৩৯৬ টাকা ১৯ পয়সা। ৫শ’ টাকার মধ্যে একশ’ টাকার ওপরেই নেই।

খানজাহান আলী রোডের বাসিন্দা আহমেদ হোসেন বলেন, মিটারের ফ্রি’তে দেয়ার কথা থাকলেও এখন ভাড়া বাবদ ৪০ টাকা কেটে নেয়া হচ্ছে। তাছাড়া এই টাকা কত দিন কাটা হবে তা স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। ফলে গ্রাহকরা হতাশ।

ডিভিশন-৪ এর গ্রাহক খলিল চেম্বার এলাকার বাসিন্দা প্রশেনজিৎ বলেন, ৫শ’ টাকার রিটার্জ কার্ডে পেয়েছি ৩২৬ টাকা ১৯ পয়সা। ১৭৩ টাকার বেশি কেটে নেয়া হয়েছে।

নগরীর নেভি চেকপোস্ট এলাকার এক গ্রাহক বলেন, গত রোববার দুপুরে কার্ড কিনতে এসে ওই ভেন্ডিং স্টেশনের অপারেটর হানিফ গ্রাহকদের সাথে দুরব্যবহার করেন। এমনকি বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দিয়ে গ্রাহকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছে বলেও সেখানে অবস্থানরত গ্রাহকরা অভিযোগ করেছেন। 

আইডিয়াল ইলেকট্রিক্যাল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার আশিকুর রহমান জোয়াদ্দার লিমন বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর থেকে মিটারের ভাড়া বাবদ ৪০ টাকা কেটে নেয়া হচ্ছে। তবে কতদিন কাটা হবে তা নির্দেশনায় বলা হয়নি। আর গ্রাহক ভোগান্তি না হয় সে জন্য আমরা প্রয়োজনীয় সেবা দিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। 

প্রি-পেমেন্ট মিটারিং প্রকল্পের পরিচালক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, প্রি-পেইড মিটার ব্যবহারে কোনও ধরনের অতিরিক্ত বিল হয়ার সুযোগ নেই। তবে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ভাড়া কাটা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় নগরীর ১৪টি ফিডারে ৬০ হাজার মিটার স্থাপন করা হয়েছে। আরো ৮ হাজার গ্রাহককে মিটার দেয়া হবে। বাকীগুলো অন্য প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। তিনি আরও বলেন, গ্রাহকদের ভোগান্তি দূর করতে ১২টি ভেন্ডিং স্টেশন ও ব্যাংকে ৯ শাখায় খোলা হয়েছে। এছাড়া মোবাইল রিচার্জের মত সুবিধা সৃষ্টির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ইতোমধ্যে গ্রামীণ ফোনের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। অচিরেই গ্রাহকরা ঘরে বসে রিচার্জ করতে পারবে।

ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শফিক উদ্দিন বলেন, তিনি এমন কোন নোটিশ পাননি। তবে শুনেছেন যে, একটি উকিল নোটিশ দেয়া হয়েছে। তিনি ঢাকা থেকে খুলনা ফিরে নোটিশটি হাতে পাওয়ার পর দেখা যাবে এর আইনগত ভিত্তি কি। এছাড়া বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ওজোপাডিকোর বিবিবি-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর রোববার একটি পত্র দিয়ে প্রি-পেইড মিটারের হয়রানি থেকে মুক্তি দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পত্রে উল্লেখ করা হয়, প্রি-পেইড মিটারের ভাড়া বাবদ ক্ষুদ্র শিল্প বাণিজ্যিক মিটারের ভাড়া প্রতি মাসে ২৫০টাকা হিসেবে জোরপূর্বক আদায় করা হচ্ছে। প্রি-পেইড মিটারগুলি যখন লাগানো হয়েছিল তখন তাদের বলা হয়েছিল যে, প্রি-পেইড মিটারটি লাগান, যার মূল্য আপনাদেরকে দিতে হবে না। শুধুমাত্র অগ্রিম বিদ্যুৎ ক্রয় করলেই চলবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, প্রি-পেইড মিটার প্রতিস্থাপনের ছয় থেকে নয় মাসের মাথায় এসে গ্রাহকদের কাছ থেকে মিটার মূল্য বাবদ ভাড়া আদায় করার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে এবং তা’ কেটেও নেয়া হচ্ছে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীবৃন্দ খুবই মর্মাহত হয়ে পড়েছেন। খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, প্রি-পেইড মিটার দেয়ার সময় ভাড়া না নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এখন ভাড়া আদায়ের বিষয়টি বোধগম্য নয়। তাছাড়া কার্ড কেনার জন্য ভেন্ডিং ষ্টেশনও চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এতে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে কার্ড কিনতে হয়। যেটি অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। এমন অবস্থায় অস্বচ্ছ এবং অনেকটা ঘোলাটে অবস্থার মধ্যদিয়ে প্রি-পেইড মিটারের গ্রাহকদের সাথে অনেকটা প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আদায় করা হচ্ছে। এমন অস্বচ্ছ অবস্থা পরিহার ঘটিয়ে অবিলম্বে তিনি প্রি-পেইড মিটারের তুঘলকি কারবার থেকে ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। 

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির মহাসচিব শেখ আশরাফ-উজ-জামান বলেন, খুলনার বিদ্যুৎ গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রি-পেইড মিটারের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়সহ নাগরিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সাম্প্রতিক উন্নয়ন কমিটির সভায় আলোচনা হয়েছে। অচিরেই এসব নাগরিক সমস্যা নিয়ে উন্নয়ন কমিটির পক্ষ থেকে কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে। 

এদিকে, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নগরীর বিভিন্ন স্থানে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত বিদ্যুৎ কর্মীদেরকে গ্রাহকদের কাছে নাজেহাল হতে হচ্ছে। বিশেষ করে কার্ড কেনার জন্য ভেন্ডিং স্টেশনগুলোতে কর্মরতদেরকে বেশিরভাগ গ্রাহকের কাছে গালমন্দের শিকার হতে হচ্ছে। তারা অবশ্য মন্ত্রণালয়ের নোটিশ দিয়ে পার পায়ার চেষ্টা করলেও কোন কোন গ্রাহক ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে এ নিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু গ্রাহকদের এ দুর্ভোগের বিষয়টি তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন বলেই তাদের দায়িত্ব শেষ করছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ