ঢাকা, বুধবার 27 September 2017, ১২ আশ্বিন ১৪২8, ০৬ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ব্যাংকে গোপন সুদের ফাঁদ

দ্রুত বেড়ে চলা খেলাপি ঋণ এবং অর্থ পাচারসহ দেশের ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে মাঝে-মধ্যেই খবর প্রকাশিত হয়ে থাকে। এসবের কোনোটিতেই আশান্বিত হওয়ার মতো কিছু থাকে না। বিভিন্ন তথ্য জেনে বরং ভীত ও উদ্বিগ্ন হতে হয়। গত সোমবার একটি জাতীয় দৈনিকেও এ ধরনের একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে জানা গেছে, বাংলাদেশে ব্যাংকগুলো গোপন সুদের ফাঁদ পেতেছে। এই ফাঁদে পড়ে বিপুল পরিমাণ বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে সব শ্রেণীর গ্রাহকদের। খবরে বিশেষ করে বড় অংকের ঋণগ্রহীতাদের উদাহরণ উল্লেখ করে জানানো হয়েছে, নিয়মিতভাবে ঋণের বিপরীতে কিস্তির অর্থ পরিশোধ করা সত্ত্বেও ব্যাংকের গোপনে চাপানো সুদের কারণে ঋণের পরিমাণ তো কমছেই না, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিমাণ বরং বেড়ে চলেছে। এ ব্যাপারে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণের বিপরীতে সুদ হিসেবে কোনো একটি ব্যাংক ছয় কোটি টাকা বেশি আদায় করেছিল। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ হিসাব নিরীক্ষার সময় বিষয়টি ধরা পড়ে। তখন ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ব্যাংক বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে। প্রতিষ্ঠানটি আবারও হিসাব নিরীক্ষা করে দেখে, আসলেও ছয় কোটি টাকা বেশি আদায় করেছে ব্যাংকটি। উভয় পক্ষের মধ্যে তখন চ্যালেঞ্জ এবং পাল্টা চ্যালেঞ্জের পালা শুরু হয়।
শেষ পর্যন্ত ব্যাংকটি নিজেদের দোষ স্বীকার করে এবং জানায়, এটা নাকি কম্পিউটারের ভুলে ঘটেছে! প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যাংক ছয় কোটি টাকা ফেরৎ দেয়। অর্থাৎ ওই পরিমাণ টাকা ঋণ ও সুদ থেকে সমন্বয় করে। একই প্রতিষ্ঠান তখন অন্য কয়েকটি ব্যাংকের হিসাবও পরীক্ষা করে দেখে। দেখা যায়, প্রতিটি ব্যাংকই কোটি টাকার অংকে বেশি আদায় করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এসব ব্যাংকের হিসাবকেও চ্যালেঞ্জ করে। এভাবে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানই সাতটি ব্যাংকের কাছ থেকে ২৫ কোটি টাকা আদায় করেছে। গোপন সুদের ফাঁদে ফেলে এই টাকা বেশি আদায় করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপকরা জানিয়েছেন, অতীতেও তাদের কাছ থেকে বেশি টাকা আদায় করা হয়েছে কি না সে ব্যাপারে তারা অনুসন্ধান শুরু করেছেন।
ওদিকে একটি প্রতিষ্ঠানের ঘটনায় পুঁজি বাজার ও ব্যাংকিং সেক্টরে তুমুল আলোড়ন উঠেছে। অন্য কিছু প্রতিষ্ঠানও নিজেদের ঋণ ও সুদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে একই ধরনের বিষয় দেখতে পেয়েছে। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও গোপনে কোটি কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে কিছু জানায়নি ব্যাংকগুলো। অথচ আইন হলো, ঋণ দেয়ার চুক্তি স্বাক্ষরকালেই পরিশোধের সময় ও সুদের পরিমাণসহ সকল বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বিভিন্ন শর্তের উল্লেখ করতে হয়। করা হয়েও থাকে। বছরের ঠিক কোন কোন মাসে কতবার কত শতাংশ হারে ঋণের সুদ আদায় করা হবে, সময় মতো সুদের টাকা না দিতে পারলে বা ডিফল্টার হলে কি পরিমাণ বাড়তি অর্থ দিতে হবেÑ এ ধরনের সকল শর্তেরও উল্লেখ থাকে চুক্তিপত্রে। সুতরাং কোনো কারণেই নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি অর্থ কেটে নেয়ার বা আদায় করার সুযোগ থাকতে পারে না। অন্যদিকে জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে দেখা গেছে, একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই সাতটি পৃথক ব্যাংক ২৫ কোটি টাকার বেশি অর্থ আদায় করেছে। বড় কথা, ধরা পড়ার পর কম্পিউটারের ভুল বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নরসহ অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে বড় ধরনের প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার আহবান জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, শত বা হাজার কোটি টাকার অংকে ঋণগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শুধু নয়, ছোট বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গেও ব্যাংকগুলো একই ধরনের প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে জাতীয় দৈনিকটির রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বেসরকারি ব্যাংকে একটি হিসাবের বিপরীতে প্রতি বছর কেবল সার্ভিস চার্জ হিসেবেই দেড় থেকে দু’হাজার টাকা পর্যন্ত কেটে রাখা হচ্ছে। ব্যাংকগুলো হিসাব পরিচালনার জন্য চার্জ বা ফি তো আদায় করছেই, একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে এসএমএস পাঠানো এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং-এর জন্যও বছরে ৫৭৫ টাকা পর্যন্ত কেটে নিচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আপত্তির কারণ হলো, কোনো গ্রাহক এসএমএস পাওয়ার এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং-এর সুবিধা নেয়ার ব্যাপারে রাজি না হলেও তার কাছ থেকে টাকা কাটা হচ্ছে। সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে বেশি বিপদে আছেন তারা- যারা কোনো ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন। বিশেষ করে বিদেশি ব্যাংকগুলো ক্রেডিট কার্ডের সুদ আদায়ের ক্ষেত্রে রীতিমতো চৌর্যবৃত্তি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, একবার ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার শুরু করলে কারো পক্ষেই ব্যাংকের কবল থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব হয় না। সুদে আর আসলে টাকার পরিমাণ শুধু বাড়তেই থাকে।
বিভিন্ন ধরনের ঋণসহ ব্যাংকিং খাতের আরো অনেক বিষয়েই জাতীয় দৈনিকটির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্যের প্রতিটিই অত্যন্ত আশংকাজনক। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর প্রতারণা ও চৌর্যবৃত্তির বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষ অনতিবিলম্বে পদক্ষেপ নেয়া। এমন ব্যবস্থা অবশ্যই নিশ্চিত করা দরকার- যাতে কোনো ব্যাংকের পক্ষেই কোনো গ্রাহককে সুদের গোপন ফাঁদে ফেলে চুক্তির বাইরে বেশি অর্থ আদায় করা সম্ভব না হয়। বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ক্ষুদে আমানতকারী পর্যন্ত সকলের জন্যই একই নীতি ও আইন নিশ্চিত করতে হবে। বৃহৎ ঋণের ক্ষেত্রে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে একই টেবিলে বসে হিসাব ঠিকঠাক করার ব্যাপারে ব্যাংকগুলোকে এমনভাবে বাধ্য করতে হবে, কোনো ব্যাংকই যাতে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২৫ কোটি টাকার মতো বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করার চৌর্যবৃত্তি করার সুযোগ না পায়। ক্ষুদে আমানতকারীদের ক্ষেত্রেও এমন কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা দরকার, ব্যাংকগুলো যাতে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এসএমএস বা ইন্টারনেট ব্যাংকিং ধরনের অজুহাত দেখিয়ে সার্ভিস চার্জ আদায় করতে না পারে। বড় কথা, প্রতিটি বিষয়ে ব্যাংকগুলো যাতে ঋণগ্রহণকারী ও আমানতকারীদের আগেই অবহিত করতে বাধ্য হয়- সে বিষয়ে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। বলা দরকার, এভাবে প্রতারণা ও চৌর্যবৃত্তি চলতে দেয়া হলে খেলাপি ঋণের বিষয়টি তো স্থায়ী হবেই, ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং ব্যবস্থা নেয়া দরকার জরুরি ভিত্তিতে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ