ঢাকা, বুধবার 27 September 2017, ১২ আশ্বিন ১৪২8, ০৬ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ছাপাখানা ও মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের ইতিকথা

মাহমুদ ইউসুফ : বিশ্বের প্রাচীনতম মুদ্রিত পুস্তক ‘হীরক সূত্র’ পাওয়া যায় চীনের পশ্চিমাঞ্চলের তুং হুয়াং শহরের হাজার বুদ্ধের গুহায় ১৯০০ সালে। হীরক সূত্রের মুদ্রণকাল ১১ মে ৮৬৮। আর মুদ্রাকর হলেন গুয়াং চীহ্। কাঠ খোদাই করে এর লিপি লেখা হয়েছিল। ১৬ ফুট দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট হীরক সূত্র ছিল বুদ্ধের উপদেশাবলীতে পূর্ণ। ড. অরেন স্টইন ১৯০৭ সালে এটাকেই পৃথিবীর প্রাচীনতম মুদ্রিত গ্রন্থ বলে প্রমাণ করেন। বর্তমানে এটি বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
প্রাচীনকালে কাঠের ব্লকের সাহায্যেই গ্রন্থ মুদ্রিত হতো। তখন এটা নতুন বা আশ্চর্য কোন আবিষ্কার ছিল না। কেননা বহু পূর্ব থেকেই এ প্রথা চালু ছিল। তবে আধুনিক মুদ্রণ পদ্ধতির জনক জার্মানির গুটেনবার্গ (১৪০০-১৪৬৮)। পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি তিনি এ কাজে সফলতা অর্জন করেন। এরপরপরই সমগ্র ইউরোপে আধুনিক মুদ্রণ শিল্পে উন্মেষ ও প্রচলন হয়। রেনেসাঁসের ঢেউ তখন ইউরোপের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে। জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতার ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব সৃষ্টির দ্বারপ্রান্তে পশ্চিমা বিশ্ব। হাতে লিখে কিংবা কাঠ খোদাই করে বই ছাপিয়ে তখন চাহিদা মিটানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া এ পদ্ধতি ব্যয়বহুলও বটে। এমন একটা সময় জার্মানির মেনজ শহরে ১৪০০ সালে গুটেনবার্গ জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রাথমিক জীবন ও গবেষণা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। তবে বইয়ের প্রতি ছিল অগাধ ভালোবাসা। ১৪২০ সালে গুটেনবার্গ-এর পরিবার মেনজ থেকে স্ট্রাসবুর্গে গমন করেন। এখানে গুটেনবার্গ জহুরীদের সংস্থায় যোগ দেন এবং মনিকারের কাজ শেখেন। পরবর্তীতে তিনি আয়না তৈরি ও হীরক কাটার কাজেও জড়িত ছিলেন। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য ছিল মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার। অনেকে মনে করেন আয়না তৈরি বা হীরক কাটার কাজে তিনি ব্যাপৃত হন আসল উদ্দেশ্যকে গোপন করার জন্য। ব্লক তৈরি থেকেই গুটেনবার্গ মুদ্রণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভ করেন। তিনি প্রথমে তৈরি করে পাঞ্চ, পাঞ্চ থেকে মেটরিকস এবং মেটরিকস ও ছাঁচের সাহায্যে পৃথক অক্ষর। এভাবেই তিনি চলিত টাইপ (Moveable Type) নির্মাণ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।
পদ্ধতি আবিষ্কার করার পর তিনি বাস্তবে অক্ষর তৈরি করতে গিয়ে দেখলেন প্রচুর অর্থের প্রয়োজন যা তার কাছে নেই। এ সময় তিনি হীরক ও পাথর কাটা ব্যবসায় তিনজন অংশিদার নিয়োগ করেন। কার্যপদ্ধতির শিখানোর বিনিময়ে তারা প্রত্যেকে ১০০ ওলডেন করে গুটেনবার্গকে দিতেন। পরবর্তীতে ১৪৪৮ সালে তিনি পাঁচ শতাংশ সুদে ১৫০ পাউন্ড ঋণ গ্রহণ করেন। একই সময় ফাস্ট নামে একজন স্বর্ণকার গুটেনবার্গকে তার আবিষ্কারের কাজে অর্থ বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসেন। ছয় শতাংশ হারে তিনি ১ হাজার ৬শত ওলডেন সাহায্য দেন। এখানে স্মরণ রাখতে হবে যে, গুটেনবার্গ কোন ছাপার যন্ত্র আবিষ্কারে রত ছিলেন না। কেননা ব্লক ছাপার জন্য তখন প্রেস বা ছাপাখানার প্রচলন ছিল। তিনি মূলতঃ অক্ষর ঢালাই করার ছাঁচ বা মোল্ড যন্ত্র আবিষ্কারের চেষ্টায় নিয়োজিত ছিলেন যার সাহায্যে টাইপের দেহ গঠিত হয়ে থাকে। ফাস্টের কাছ থেকে ঋণ নেয়ার পর গুটেনবার্গ ৪২ লাইনের বাইবেল মুদ্রণে হাত দেন। ১৪৫৩ সালে তার বাইবেল মুদ্রণ কাজ শেষ হয়। ১৪৫৫ সালে তার সঙ্গে ফাস্টের সম্পর্ক ছিন্ন ঘটে। ফাস্ট গুটেনবার্গের বিরুদ্ধে মামলা করে।
মামলায় গুটেনবার্গ হেরে যান। ফলে তার ছাপাখানা, নব আবিষ্কৃত সীসার অক্ষর তৈরির ছাঁচ ও অন্যান্য সরঞ্জাম ফাস্টের হস্তগত হয়। গুটেনবার্গের আবিষ্কৃত মুদ্রণ পদ্ধতি অবলম্বন করে ফাস্টের ছাপাখানা দ্রুত উন্নতির পানে এগিয়ে চলে। আর গুটেনবার্গ হতাশাগ্রস্ত সহায়সম্বলহীন, ঋণভারে জর্জরিত অবস্থায় কালাতিপাত করতে লাগলেন। ১৪৬৮ সালে তিনি পরলোকগমন করেন। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, বিশ বছর বয়স থেকে গুটেনবার্গ পৃথক পৃথক অক্ষর তৈরি ও সেই অক্ষরের সাহায্যে গ্রন্থ মুদ্রণের সাধনা করে গেছেন। কিন্তু তার সুফল ভোগ করে যেতে পারেননি।
জার্মানিতে মুদ্রণ পদ্ধতি আবিস্কৃত হওয়ার সাথে সাথেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তা প্রসার লাভ করে। ১৪৬৫ সালে কনার্ড মেনহাইম ও আর্নল্ড প্যানার্টজ ইতালির সুবলাকো শহরে টুরেক্রিমাস্টারের  ধর্মগৃহে স্থাপিত হয়। রোমে স্থাপিত হয়। ১৪৬৭ সালে। সুইজারল্যান্ডেও একই বছরে মুদ্রণ যন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ভেনিসে ১৪৬৯ সালে জেহানেস প্রথম ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে অলডাস (১৪৪৭-১৫১৫) ও নিকোলাস জেনসন-এর প্রচেষ্টায় মুদ্রণ শিল্পের অগ্রযাত্রায় খ্যাতি লাভ করে। হেইনলিস ও ফিচেট ১৪৬৮ সালে প্যারিস ও চেকোশ্লোভাকিয়ায়, জেরার দুসলিম্পট ১৪৭৩ সালে নেদারল্যান্ডে, আনড্রেস হেস ১৪৭৩ সালে হাঙ্গেরিতে, ১৪৭৪ সালে ল্যাম্বার্ট পামার্ট স্পেনে, ১৪৭৫ সালে ক্যাসপার হকফেদার পোল্যান্ডে, ক্যাকস্টোন ১৪৭৬ সালে গ্রেট বৃটেনে স্টিফেন লিঙ্গার ১৪৮২ সালে ভিয়েনা, জোহান স্কেল ১৪৮৩ সালে সুইডেনে, রাব্বি এলাইসার ১৪৮৯ সালে পর্তুগালে, ডেভিড স্যামুয়েল ইবনে নার্সিমাস ইস্তাম্বুলে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছাপাখানা স্থাপিত হয় সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়। ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম ইউরোপ থেকে ছাপাখানার আমদানি করেন পর্তুগীজরা। ১৪৯৮ সালে এদেশে প্রথম বসতি স্থাপন করার পর পর্তুগীজরা গোয়ায় দুটি মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপন করেন। বাংলাদেশের প্রথম ছাপাখানা ‘বার্তাবহ যন্ত্র’ রংপুরে ১৮৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৮৬০ সালের মধ্যে ঢাকায় ঢাকা প্রেস ও বাংলা প্রেস নামে দু’টি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে বাংলা মুদ্রণ শিল্পের জনম হলেন চার্লস উইলকিন্স। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সম্পূর্ণ বাংলা অক্ষর ঢালাই করে বাংলা মুদ্রণের যথার্থ অর্থে সূত্রপাত ঘটান।
মুদ্রণ যন্ত্রের ক্রম বিকাশের ইতিহাসে গুটেনবার্গের পর যার নাম সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ তিনি হলেন জার্মানের ফ্রেডারিক কোয়েনিগ। গুটেনবার্গ ছাপাখানা আবিষ্কার করেননি। তিনি আবিষ্কার করেছিলেন পৃথক অক্ষরের সাহায্যে মুদ্রণ পদ্ধতি এবং পৃথক অক্ষর তৈরির উপায়। এ যন্ত্র প্রায় ৪০০ বছর অপরিবর্তিত থাকে। তখন যন্ত্র নির্মিত হতো কাঠ দিয়ে আর সেগুলো ছিল হস্তাচালিত। মুদ্রণযন্ত্রের এই সনাতন ধারায় প্রথম পরিবতর্থন আনেন ফ্রেডারিক কোয়েনিগ। তাই তাকেই মুদ্রণ যন্ত্রের প্রকৃত আবিষ্কারক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
কোয়েনিগ ১৮১৪ সালের নবেম্বর মাসে দি টাইমস পত্রিকার মালিক জন ওয়াল্টারের অর্থায়নে লন্ডনে মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কার করেন এবং ২৯ নবেম্বর দি টাইমস পত্রিকা এই ছাপাখানায় ছাপিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়। দি টাইমস-এর সেই সংখ্যায় বলা হয় ‘যন্ত্রের এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে, এমনভাবে তাকে সজ্জিত করা হয়েছে যার পলে মানুষ আজ মুদ্রণের সবচেয়ে কষ্টসাধ্য শ্রম থেকে মুক্ত হয়েছে এবং এই পদ্ধতি ক্ষিপ্রতায় ও সরবরাহে মানুষের সর্বকালের ক্ষমতাকে বহুগুণে অতিক্রম করেছে’। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের আবিষ্কারের মাধ্যমে হস্তচালিত যন্ত্রযুগের সমাপ্তি ঘটে।
কোয়েনিগ-এর পূর্বে ১৮২০ ও ১৮১১ সালে আরও দু’টি মেশিন নির্মাণ করেন। কিন্তু সে দু’টো এত অত্যাধুনিক ছিল না বিধায় তার প্রসার ঘটেনি। কোয়েনিগের নতুন আবিষ্কৃত যন্ত্রের সাহায্যে ঘণ্টায় হাজার হাজার শিট কাগজ মুদ্রণ সম্ভবপর হল। যা ইতোপূর্বে ছিল কল্পনার বাইরে। গুটেনবার্গ থেকে কোয়েনিগ পর্যন্ত ছাপাখানার ইতিহাস মূলতঃ লেটার প্রেসের ইতিহাস। বর্তমানে প্রচলিত অফসেট মুদ্রণের সূচনা হয় লিথোগ্রাফি বা লিথোপ্রিন্ট থেকে। লিথোগ্রাফির আবিষ্কারক হলেন জার্মানির আলইস সেনেফেলডার। আঠার শতকের শেষের দিকে এবং ঊনবিংশ শতকের প্রথমদিকে জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রচলন হয়। চিত্রশিল্পীদের মধ্যে এ পদ্ধতিতে চিত্রাঙ্কনের ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। লিথোগ্রাফি মুদ্রণের জন্য সেনেফেলডারের নির্মিত যন্ত্র ১৮৫১ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। ১৮৫১ সালে জর্জ সিঙ্গল লিথো মুদ্রণের জন্য একটি সিলিন্ডার তৈরি করেন।
এরপর ১৮৫৭ সালে বার্ক্ল টিনের উপর মুদ্রণের জন্য অফসেট পদ্ধতিতে মুদ্রণের ব্যবস্থা করেন। অফসেট মুদ্রণ পদ্ধতি ১৯০৪ সালে রুবেলের হাতে আধুনিক রূপ লাভ করে। মি. রুবেল নিউইয়র্কে ইস্টার্ন লিথোগ্রাফি কোম্পানীতে সর্বপ্রথম তার অফসেট যন্ত্র নির্মাণ করে স্থাপন করেন।
এরপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অফসেট মুদ্রণ যন্ত্র নির্মাণ করতে থাকে। বর্তমানে এর প্রসার ও ব্যবহার বিশ্বের সর্বত্র।
তথ্যসূত্র: ছাপাখানার ইতিকথা, ফজলে রাব্বি, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ: জুন, ১৯৭৭।
লেখক: ফিল্যান্স সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ