ঢাকা, বুধবার 27 September 2017, ১২ আশ্বিন ১৪২8, ০৬ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিচিত্র মানুষ ঠকবাজ লোক

বিচিত্র দেশের ছাত্র জীবনের এক বিচিত্র ঘটনা আজ মনে পড়ে গেল। তাই এই ঘটনা আজ পাঠকের সামনে তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করলাম। অনার্সে নতুন বর্ষে ভর্তির পর নতুন ছাত্র হিসেবে হোস্টেলে ভর্তি হলাম। ছোট বেলা থেকে দরিদ্র জনগণের প্রতি আমার একটা ভালোবাসা বা দরদ সব সময় ছিল। দরিদ্রকে সাহায্য করে কেন যেন আমি তৃপ্তি পাই। কিন্তু মাঝে মধ্যে কিছু ঘটনা আমাকে ভীষণ পীড়া দেয়। ফলে সাহয্য করতেই ভীতশ্রদ্ধ হই, নানা জল্পনা-কল্পনা মনে বাসা বাঁধে।
 একদা এক ইয়া লম্বা লোক লাঠি হাতে ঠক ঠক করে হোস্টেলের দিকে এগিয়ে আসল। লোকটাকে দেখলে বেশ চোখে পড়ার মত। কমপক্ষে ৮ (আট) ফিট লম্বা। ইয়া দাঁড়ি-চুল, মাথায় পাগড়ী, হাতে লম্বা লাঠি, কাঁধে কাপড়ের একটি বড় গাঁট। ছোট বেলায় কাবুলীওয়ালার গল্প পড়েছিলাম, দেখতে কাবুলীওয়ালার মত। আমাদের রুমের সামনে এসেই বলল ইয়া বাবরা কে আছেন? আমাকে নামাজ পড়ার জন্য একটা পুরাতন লুঙ্গি দেবেন? এমন একটা ভাল কাজের আহ্বানে কার না মনে গলে বলুনতো?
কিন্তু ওর আহ্বানে অন্য রুম মেটেরা নিশ্চুপ। তারা ঐ লোকের আহ্বানে কোনো সাড়া দিল না। হয়তো বা তারা তার সাথে পূর্ব পরিচিত। তার পরণে ছেঁড়া লুঙ্গি দেখে নামাজ পড়ার জন্য একটা পুরাতন লুঙ্গি দিতে আমার মন বড়ই আগ্রহ সহকারে সাড়া দিল। আমি তাকে একটা পুরাতন লুঙ্গি বাড়িয়ে দিলাম। লুঙ্গি দিতেই সে বলল একটা কাগজে লিখ দিন। তা নাহলে লোকে আমাকে বলবে এটা তুমি চুরি করে নিয়ে এসেছো। ভাবলাম, বেশ ভাল। আমি এক টুকরো কাগজ নিয়ে দু-লাইন লিখে দিলাম। লোকটি ঠক ঠক করে চলে গেল। দুই মাস পর আবার আসল। কিন্তু পরনের কাপড়ের কোন পরিবর্তন হলো না, আবার আগের সুরে বলতে লাগল, নামাজ পড়ার জন্য একটা লুঙ্গি চাই। এবার ওর আপাদমস্তক একবার দেখে নিলাম, কিন্তু কিছু বললাম না। ভাবলাম, এ লোকটা মনে হয় ভ-। না হয় বার বার লুঙ্গি চায় কেন? তাকে নামাজ পড়ে বলেও মনে হয় না।
দু’-এক মাস পর এভাবে লুঙ্গির জন্য হোস্টেলে আসে। আর বিভিন্ন জন থেকে এত লুঙ্গি নিয়ে সে কি করে? সে লুঙ্গির ব্যবসা করে নাকি? নানা ধরনের প্রশ্ন মাথার ভিতর ঘোরপাক খাইতে লাগল। একজন লোকের ময়টা লুঙ্গিইবা লাগে। আবার দেখা যায় তার পরনের কাপড়েরও কোনা পরিবর্তন হয় না। বিষয়টা মনের মধ্যে ভীষণ ঘোরপাক খাইতে লাগল। আসলে এ লোক কি করে? কোনো দিন টাকা পয়সা চায় না। গরীব লোকেরা সাধারণত টাকা পর্যসা চায়। কিন্তু এ লাক কেবল লুঙ্গি ভিক্ষা করে। এত লুঙ্গি দিয়ে সে কি করে? ভাবতে ভাবতে ঢাকা যাওয়র প্রোগ্রাম হল।
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সারা ঢাকায় মহাসমাবেশ ডেকেছে। তবে সমাবেশ ভিন্ন ভিন্ন। ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। ছাত্র জীবন, তাই মন খুব উৎফুল্ল। বিভিন্ন নেতানেত্রীর বক্তব্য শুব। ঢাকায় পৌঁছলাম, মহাসমাবেশেগুলো গুরে ফিরে দেখছিলাম। বিভিন্ন নেতা নেত্রীর বক্তব্য শুনছিলাম। হঠা’ দুই সমাবেশের মাঝখানে একটু খালি জায়গায় চোখ পড়ল। চোখ পড়তেই আঁৎকে উঠলাম।  ঐ লম্বা লোকটি, একই বেশে দুই সমাবেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এদিকে ওদিক হাত পাতছে। দেখেই আমার পিলে চমকে উঠল! এ লোক এখানে! আমি তার কাছে না গিয়ে একটু দূরে থেকে তাকে চুপি চুপি পর্যবেক্ষণ করলাম। এবার আমার বুঝতে পার বাকী রইল না যে, এ লোক নিশ্চয়ই গোয়েন্দা বাহিনীর লোক। মনে মনে স্থির করলাম এবার চট্টগ্রামের হোস্টেলে আসলে তাকে মজা দেখাবো। মহাসমাবেশ শেষে চট্টগ্রাম ফিরে আসলাম। রীতিমত অপেক্ষা করছিলাম কখন এ ঠকবাজ লোক আবার হোস্টেলে আসে।
অপেক্ষা করতে করতে দুই তিন মাস গত হয়ে গেল। হঠাৎ এসে হাজির। নামাজের জন্য একটা লুঙ্গি চাই। সেদিন আর আমার রুমমেটেরা নেই। বললাম ভিতরে আসু। লোকটা ইতস্ত করল। একটু পরেই ভিতরে ঢুকতেই দরজা লক করে দিলাম। বললাম, কোন দেশের গোয়েন্দা বল। তোমার ঐ বড় গাঁটে ওয়্যারলেস আছে। ওটি বের কর।
তোমাকে আমি আজ ছাড়বো না। দরজার কাঠের লাঠি নিয়ে মারতে উদ্যত হলাম। এমনিতেই লোকটি চেঁচামেচি রে উঠলো এবং চিৎকার দিল। আশপাশের বন্ধুরা দৌড়ে এসে আমাকে দরজা খুলতে অনুরোধ করল। দরজা খুলে দিলাম।
বন্ধুরাও আর তাকে মারতে দিল না। লোকটি ঠক ঠক করে অতি দ্রুত চলে গেল।  বন্ধুরা বলল, এমনটি করো না, কেননা সে গোয়েন্দা বাহিনীর লোক হলে সে কোনো না কোনো দেশের গোয়েন্দাতো হবেই।
সুতরাং পুলিশসহ অন্যান্য লোক এসে আমাদেরকে ঝামেলা করবে। সুতরাং এসব লোকের সাথে ঝামেলা করতে নেই। ভাবলাম ঠিকইতো। ঐ যে, লোকটি ঐদিন পালিয়ে গেল আজ পর্যন্ত আর কোন দিন তার দেখা মেলেনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ