ঢাকা, বুধবার 27 September 2017, ১২ আশ্বিন ১৪২8, ০৬ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

এখনো দেখা মেলে ডুবুরী মাটিয়াল

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে এখনো দেখা মেলে ডুবুরী মাটিয়াল শ্রমিকদের। একসময় বর্ষাকালেও জলের তলায় ধানী জমি থেকে মাটি কেটে  তা নৌকা করে বিক্রি করতো এক শ্রেণির ডুবুরী মাটিয়ালরা। মাটি  তুলে বিক্রি করার এ প্রাচীন দৃশ্যগুলো শহরতলীয় গ্রাম এলাকায় চোখে পড়লেও  কালের বিবর্তে খুব একটা দেখা যায় না এমন চিত্র। তবে এখনো রূপগঞ্জের বেশ কয়েকটি গ্রামেই দেখা গেছে এমনটা।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার জাঙ্গীর, ভিংরাব, কলাতলী, রানীপুরা, দিঘলিয়া, চারিতালুক, নাওরা, ছনি, গোয়ালপাড়া, আগারপারা, মধূখালীসহ রাজধানী ঘেঁষা গ্রামগুলোতে বর্ষা এলে সাধারণত দিনমজুর শ্রেনির শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়ে। একসময় ঢাকার পূর্বাঞ্চলীয় নীচু অঞ্চল তথা রাজধানীর ডেমরা, রামপুরা, বাড্ডা, খিলক্ষেত ও বসুন্ধরা এলাকায় রূপগঞ্জের  উঁচু টিলা ও সাধারণ ক্ষেত খামারের জমির মাটি কেটে বিক্রি করতো স্থানীয়রা। এসব মাটি কাটায় স্থানীয় শ্রমিকসহ মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ,গাজীপুর ও নরসিংদী জেলার লোকজন মাটি কাটার ব্যবসা করতো।
এসব মাটি কাটতে ব্যবহৃত হতো ইঞ্জিন চালিত ট্রলার ও সাধারণ ডিঙ্গি নৌকা। সাধারণ নিচু এলাকা ভরাটের জন্য সে সময় মাটিই ছিল একমাত্র ভরসা। তবে কালের বিবর্তে ড্রেজিং পদ্ধতির জনপ্রিয়তা  ও অবাধ বালুমাটি  স্বস্তায় প্রাপ্তির কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে মাটি কাটার শ্রমিকরা। ফলে জীবিকার তাগিদে দিন মজুররা এখন অট্টালিকার বেইস কাটা ও সড়কের কাজ করে সংসার চালান বলে জানা গেছে। এছাড়াও উচু জমির দাম বেশি হওয়ায় স্থানীয় কেহই মাটি বিক্রি করতে রাজি না হওয়া ও নীচু এলাকা ভরাট করতে  ও মাটির ব্যবহার ব্যয়বহুল হওয়াতেও এ পদ্ধতি ছেড়ে দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
রূপগঞ্জ উপজেলার ভিংরাব এলাকার কথা হয় ডুবুরী মাটিয়াল আয়নাল মিয়া সাথে। তিনি জানান, ডুবুরী মাটিয়াল হিসেবে বিগত ৩০ বছর যাবৎ কাজ করছেন। সাধারণ শ্রমিকের তুলনায় এ ডুবুরী হিসেবে কাজ করলে বেশি শ্রমমুল্য পাওয়া যায়। তিনি আরো জানান, সাধারণ দিনমুজুর দিনের মুজুরী পান ২শ থেকে ৪ শত টাকা। আর ডুবুরী মাটিয়ালরা একই দিনে একই সময়ে পান  ৫ শত থেকে ১ হাজার টাকা। তবে নিয়মিত এ ডুবুরী কাজে মাটি না পাওয়াতে মাঝে মাঝে বেকার থাকেন।
শ্রমিক আয়নাল আরো জানান, একটি ডিঙ্গি নৌকা ভরাট করে মাটি বিক্রি করলে পাওয়া যায় ২ হাজার টাকা। এতে  মাটি ক্রয় ও নৌকা খরচসহ তার লাভ থাকে প্রায় ১২শত টাকা। এভাবে কোনমতে টিকে আছেন তিনি।
একই ধরণের শ্রমিকের দেখা মেলে উপজেলার মধূখালীতে। মোস্তফা মিয়া নামের ডুবুরি মাটিয়াল শ্রমিক জানান, এক দশক পূর্বে মধূখালী, ব্রাহ্মণ ও গুতিয়াব এলাকা থেকে ১৫ থেকে ২৫টি টিলা কেটে ঢাকার নীচু এলাকা ও আবাসন কোম্পানী ভরাট করেছে।
সূত্র জানায়, ড্রেজিং পদ্ধতি চালু হওয়ায় এখন আর মাটি কিনেন না কেউ। বালি ফেলে জলাশয় ও নীচু এলাকা ভরাট করে আবাসন পর্যায় নিয়ে আসছেন। ফলে মাটি কাটা ও বিক্রির দৃশ্য আর আগের মত নেই। তবে এখনো ড্রেজিংকৃত বালি আটকাতে বাঁধ দেয়ার প্রয়োজন পরে। তাই কোথাও কোথাও চোখে পড়ে এমন দৃশ্য।
 লেখক, কলামিষ্ট ও গবেষক লায়ন মীর আব্দুল আলীম বলেন, কালের বিবর্তে ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে নানা পেশার রকমারী দৃশ্য। এসব দৃশ্য হয়তোবা ফিরে পাবে না তবে পুরনো পেশাগুলোর সাথে আধুনিক মানুষদের পরিচয় করিয়ে দেয়া প্রয়োজন রয়েছে বলে দাবী করেন তিনি। এ সময় তিনি আরো বলেন, আধুনিক সব পেশার সাথে অনেক পুরনো পেশাদারীরা মানিয়ে নিতে পারছেন না। তাই ডুবুরী মাটিয়াল শ্রমিকরা এখনো সেই পুরনো কায়দায়ই কাজ করতে পছন্দ করেন।
এ বিষয়ে জাঙ্গীর এলাকার শিক্ষক সাখাওয়াত হোসেন ভুঁইয়া বলেন, দিনমজুর শ্রেণির শ্রমিকরা শুস্কমৌসুমে কাজের মধ্যে থাকলেও বর্ষাকালে তারা বেকার হয়ে পড়েন। তাই এদের মধ্যে কেউ কেউ ডুবুরী মাটিয়ালের কাজ রপ্ত করেছেন। ফলে বর্ষাকালেও মাটি কাটার প্রয়োজন হলে এখন আর কেউ সমস্যায় পড়েন না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ