ঢাকা, বৃহস্পতিবার 28 September 2017, ১৩ আশ্বিন ১৪২8, ০৭ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সেফজোনে কিলিংজোনের আশঙ্কা

সরকারি বক্তব্যের বিরোধিতা করে ভারতে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা ফের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলো। সর্বোচ্চ আদালতকে তারা জানালো সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা তো দূরের কথা, দেশের কোথাও কোনো রকম অসামাজিক কাজের সঙ্গেও তারা জড়িত নয়। ২২ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টে এক অতিরিক্ত হলফনামায় এই দাবি জানান দুই রোহিঙ্গা শরণার্থী মোহাম্মদ সলিমুল্লাহ ও মোহাম্মদ শাকির।
উল্লেখ্য যে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে ভারত সরকারের উদ্যোগের বিরোধিতা করে সলিমুল্লাহ ও শাকির আগেই সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানিয়েছেন। আদালতের নির্দেশে কেন্দ্রীয় সরকার গত সোমবার জানায়, রোহিঙ্গারা দেশের নিরাপত্তার পাক্ষে মারাত্মক বিপজ্জনক। তাদের সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই সন্ত্রাসী সংগঠন জয়শ-ই-মহম্মদ ও লস্কর-ই-তাইয়েবার যোগসাজশ রয়েছে। দেশের নিরাপত্তার স্বার্থেই তাদের ফেরত পাঠানো হবে। এই যুক্তির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংও বলেছেন, রোহিঙ্গারা কেউ শরণার্থী নয়। তারা সবাই অনুপ্রবেশকারী। বেআইনিভাবে তারা ভারতে চলে এসেছে। তাই তাদের ফেরত যেতেই হবে। তবে ওই দুই রোহিঙ্গা শরণার্থী সরকারি অভিমতের বিরোধিতা করেছেন।
অতিরিক্ত হলফনামায় সলিমুল্লাহ ও শাকির বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক আখ্যা দেয়া হলেও সরকার এর সমর্থনে একটিও প্রমাণ দেখাতে সমর্থ হয়নি। তারা বলেন, এই বছর জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছিলেন, রোহিঙ্গাদের কেউ জঙ্গিবাদ বা ওই ধরনের কোনো অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত তেমন কোনো প্রমাণ সরকারের কাছে নেই। উল্লেখ্য যে, বেআইনিভাবে সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসার অপরাধে মোট ৩৮ জন রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে ১৭টি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। আবেদনে তারা বলেছেন, সব রোহিঙ্গার সঙ্গে সন্ত্রাসী যোগসাজশ রয়েছে, এমন দাবি সরকার করতে পারে না। কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া যায়। কিন্তু প্রাণ বাঁচাতে ২০১১-১২ থেকে চলে আসা সব রোহিঙ্গাকে সন্ত্রাসবাদী তকমা দিয়ে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা অন্যায়। আমরা মনে করি,  রোহিঙ্গাদের এইসব বক্তব্যের যুক্তি আছে। আর মানবিক কারণেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়া উচিত। আর কেউ যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে  কোনো ভিত্তি ছাড়াই রোহিঙ্গাদের জঙ্গি বা সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়, তাহলে তো তা করতেই পারে। কারণ এমন ভ্রষ্টতা তো বর্তমান সভ্যতায় নতুন কিছু নয়।
  রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে এখন সেফ জোনের কথা উঠছে। তবে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ গঠন করা হলে তা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। গত ২৩ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে সংগঠনটি আরো বলে, বাংলাদেশে ঢোকা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী যথেষ্ট খাবার, বিশুদ্ধ পানি, জরুরি চিকিৎসা সেবা ও শৌচাগারের অভাবে নিদারুণ দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছে। বৃষ্টি তাদের সার্বিক অবস্থা আরও খারাপ করে তুলেছে। শরণার্থীদের এই ঢল মোকাবিলায় সুষ্ঠু সমাধানের পথ খুঁজছে বাংলাদেশ।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুর্দশার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ সুষ্ঠু সমাধানের পথ খুঁজছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। মিয়ানমার যে নিষ্ঠুরভাবে নিজের সমস্যা বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে তাতে সুষ্ঠু সমাধানের পথতো খুঁজতেই হবে। এখন দেখার বিষয় হলো, প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্ব সম্প্রদায় এই সংকটের সমাধানে আন্তরিকভাবে কতটা এগিয়ে আসে। তবে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ গঠন নিয়ে এইচআরডব্লিউ যে আশংকার কথা উল্লেখ করেছে তা ভেবে দেখার মতো। বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে কয়েক দফা প্রস্তাবের মধ্যে মিয়ানমারের ভেতরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি ‘নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার কথা বলেন, যেখানে রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের টহল বজায় থাকা সত্ত্বেও ‘নিরাপদ অঞ্চল’ নিরাপদ হয়ে ওঠার ঘটনা বিরল। বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় সেব্রেনিৎসা নিরাপদ অঞ্চলেও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর উপস্থিতি ছিল। অথচ এর মধ্যেই বসনিয়ার সার্ব বাহিনী প্রায় সাত হাজার পুরুষ ও কিশোরকে হত্যা করেছে, ধর্ষণ করেছে নারী ও কিশোরীদের। এইচআরডব্লিউ শ্রীলংকার উদাহরণ টেনে বলেছে, দেশটির সরকার তামিল টাইগার গেরিলাদের কবল থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষায় যে নিরাপদ অঞ্চলের ঘোষণা দিয়েছিল সেটা ‘কিলিং জোনে’ পরিণত হয়েছিল। সশস্ত্র তামিল গেরিলারা সেখান থেকে ওই মানুষদের বের হতে দেয়নি। আর সেনাবাহিনী সেখানে গোলা নিক্ষেপ করে। এতে বহু বেসামরিক লোক প্রাণ হারায়।
উদাহরণগুলো নিষ্ঠুর অথচ বাস্তব। তাই মিয়ানমারে প্রস্তাবিত ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ‘কিলিং জোনে’ পরিণত হয় কিনা তা ভেবে দেখতে হবে। কারণ পৃথবীতো এখন আরো বেশি অমানবিক ও নিষ্ঠুর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ