ঢাকা, শুক্রবার 29 September 2017, ১৪ আশ্বিন ১৪২8, ০৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চালের পর আটা ও ময়দার মূল্যবৃদ্ধি

৩৫/৪০ টাকা কেজি দরের মোটা চালও ৫৫ টাকায় কিনতে গিয়ে সাধারণ মানুষের যখন জিহবা বেরিয়ে পড়ি পড়ি করছে ঠিক তেমন এক কঠিন সময়ে হঠাৎ বেড়ে গেছে আটা ও ময়দার দামও। দু’-এক টাকা নয়, বেড়েছেও প্রতি কেজিতে পাঁচ-ছয় টাকা করে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, ২২ সেপ্টেম্বর সপ্তাহের সমাপ্তির দিন পর্যন্ত যে প্যাকেটজাত আটা ৬০ টাকা দরে বিক্রি হতো, ২৪ সেপ্টেম্বর সপ্তাহের শুরুর দিন থেকে সে আটাই বিক্রি হচ্ছে ৬৫/৬৬ টাকা দরে। বিভিন্ন নাম করা ব্র্যান্ডের আটা কিনতে হচ্ছে আরো বেশি দাম দিয়ে। জানা গেছে, যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ ছাড়াই বিভিন্ন কোম্পানি তাদের আটা ও ময়দার দাম বাড়িয়ে দেয়ার ফলে পাইকারি বাজারের পাশাপাশি খুচরা বাজারেও তার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে। খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছে, ৫০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা আটার দাম বেড়েছে ৩০০ টাকা, যার ফলে প্রতি কেজিতে বেড়েছে ৬ টাকা করে। কিছুটা কম হলেও প্রতি বস্তা ময়দার দাম বেড়েছে ২১০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত। এজেন্ট ও ডিলাররা দাম বাড়িয়ে দেয়ার ফলে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারাও দাম না বাড়িয়ে পারেনি। সব মিলিয়েই বর্ধিত মূল্যের চাপ গিয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। তাদের এখন বেশি দামে আটা ও ময়দা কিনতে হচ্ছে।
প্রকাশিত খবরে কোনো মহলের সূত্রেই হঠাৎ করে আটা ও ময়দার দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকসহ বাজার বিশেষজ্ঞরা দুটি কারণের কথা বলেছেন। তাদের মতে দেশের বাজারে সব ধরনের চালের দাম বেড়ে যাওয়া আটা ও ময়দার দাম বাড়ার প্রথম কারণ। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কথা বলা হয়েছে। বাজার বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে চালানো ব্যাপক ত্রাণ কার্যক্রমে চালের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণে আটা ও ময়দা বিতরণ করা হচ্ছে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই আটা ও ময়দার মজুদে টান পড়েছে। আর সে অবস্থারই সুযোগ নিয়েছে প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো। তারা রাতারাতি দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ তথ্যাভিজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্রায় তিন মাসের বন্যা ও বৃষ্টির কারণে প্রথমে বোরোর এবং পরে আউশ ও আমনের ফলন কম হলেও গমের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়নি। তাছাড়া দেশে আটা ও ময়দার মজুদ এতদিন যথেষ্টই ছিল। সুতরাং হঠাৎ করে এ দুটি খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতি কেজিতে ৬/৭ টাকা করে বেড়েছে বলেই বাজার বিশেষজ্ঞরা একদিকে কোম্পানিগুলোর দিকে আঙুল তুলেছেন, অন্যদিকে দায় চাপিয়েছেন অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের ওপর। তারা এমনকি একথা পর্যন্ত বলেছেন যে, চালের পর আটা ও ময়দার ব্যাপারেও তৎপর হয়ে উঠেছে ব্যবসায়ী নামের একই সিন্ডিকেট, যাদের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
আমরা মনে করি, প্রতি কেজিতে গড়ে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়া দামে চাল কিনতে গিয়ে সাধারণ মানুষের যখন নাভিশ্বাস উঠেছে, তেমন এক সময়ে হঠাৎ করে আটা ও ময়দার দাম বাড়িয়ে দেয়ার কর্মকান্ডকে মড়ার ওপর খাড়ার ঘা ছাড়া আর কিছু বলার সুযোগ থাকতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের এই অভিমতের সঙ্গেও ভিন্নমত পোষণ করার সুযোগ নেই যে, সবকিছুর পেছনে রয়েছে সরকারের ব্যর্থতা। সরকার আসলে বাজার ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এ ব্যাপারে ধারণা দেয়ার জন্য বাজারের দিকে দৃষ্টি দেয়াই যথেষ্ট। কারণ, চাল ও আটা-ময়দাসহ সব পণ্যের দামই কেবল বেড়ে চলেছে। বাড়ছেও বহুদিন ধরে। অন্যদিকে মানুষের আয়-রোজগার যেমন বাড়েনি তেমনি তাদের জন্য চাকরি বা ব্যবসারও সুযোগ সৃষ্টি করেনি সরকার। সে কারণে সাধারণ মানুষের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। জানা গেছে, তিন কোটির বেশি মানুষ এরই মধ্যে দু’ বেলা পেট ভরে খেতে পারছে না। দেশে আসলে অঘোষিত দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে গেছে।
আপত্তি ও প্রতিবাদের একটি বড় কারণ হলো, বিগত বেশ কিছুদিন ধরে চালের বাজার পাগলা ঘোড়ার মতো লাফিয়ে চললেও এবং পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠলেও সরকারকে সততার সঙ্গে তৎপর হতে দেখা যায়নি। একটি উদাহরণ হিসেবে চালের আমদানি শুল্ক হার কমানোর তথ্য উল্লেখ করলে দেখা যাবে, সরকার এই শুল্ক হার ২৮ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে তখনই নামিয়ে এনেছিল, যে সময়ের মধ্যে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। অথচ সময় থাকতে কমানো হলে আমদানিকারকরা উৎসাহিত হতেন এবং চালের আমদানি অনেক বাড়তে পারতো। ফলে চালের দামও বাড়তো না। আটা ও ময়দার ব্যাপারেও একই কথা সত্য। বলা হচ্ছে, মূলত সরকারের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়েই কোম্পানিগুলো দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। একই কারণে দাম কমছে না অন্য কোনো পণ্যেরও।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ