ঢাকা, শুক্রবার 29 September 2017, ১৪ আশ্বিন ১৪২8, ০৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দুইটি রাজনৈতিক দলের উত্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন

হারুন ইবনে শাহাদাত : দেশের রাজনীতির পতিত জমিতে আগাছার বাম্পার ফলন ফলতে শুরু হয়েছে। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের যুক্তি কোন স্থান শূন্য থাকে না। আবাদ না করে কোনো জমিন ফেলে রাখলে তাতে আগাছা জন্মাবে- এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। দেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো কোনোটা অবরুদ্ধ, কোনটা সরকারের পেটের ভেতরে থেকে মন্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে অভিনব অভিনয়ের বিরোধী দলে আছে। সংসদের বাইরের রাজপথের বিরোধী দলের ঠিকানা এখন সরকারের নির্ধারণ করে দেয়া অফিস কিংবা চার দেয়ালঘেরা কোন চৌহদ্দি। এমন অবস্থায় ভুঁইফোড় দল গজাবে- এটাই স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক বিষয়টির দিকে সময় মতো নজর না দিলে বিষবৃক্ষ রূপে দেখা দেয়া অস্বাভাবিক নয়।
গত সপ্তাহে ভারতের জনতা পার্টির আদলে দেশে দু’টি নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন হবে এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু গণতন্ত্রের দুঃসময়ে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী যদি রাষ্ট্রীয় আশীর্বাদে দল গঠন করে তবে তা অশনিসংকেত বৈ কিছু নয়। এবার তেমন এক অশনিসংকেতেরই আশঙ্কা করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। গত ২০ সেপ্টেম্বর ভারতের হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এর আদলে আমাদের দেশেই আত্মপ্রকাশ করল বাংলাদেশ জনতা পার্টি (বিজেপি)। জাগো হিন্দু পরিষদ, শিবসেনা শক্তি মিশন, হিন্দু লীগ, হিন্দু ঐক্য জোট, ভারত সেবাশ্রম ও বাংলাদেশ হিজড়া সম্প্রদায়সহ আরও বেশ কয়েকটি সংগঠনের সম্মিলনে ভারতের বিজেপির আদলে বাংলাদেশেও বিজেপি নামক একটি রাজনৈতিক দল জনসম্মুখে এলো। ভারতের বিজেপির দলীয় প্রতীক লোটাস (পদ্মফুল) এর অনুকরণে বাংলাদেশের বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক হবে পদ্মফুল ও পদ্মফুলের নিচে দু’টো হাত।
এই দলের আত্মপ্রকাশের মাত্র একদিন পর ২১ সেপ্টেম্বর দেশের সব ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমন্বয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ‘বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি)’ নামের আরেকটি নতুন  রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছে। রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট এক কমিটির মাধ্যমে এ নতুন দলের ঘোষণা করেন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা বিয়েন্দনাথ অধিকারী। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধন নিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ আসনের নির্বাচনে যাবে বিএমজেপি। সরকার গঠন করতে পারলে ৬৪টি আসন সংরক্ষিত রাখা হবে সংখ্যালঘুদের জন্য। পাশাপাশি তুলে ধরা হয় সংখ্যালঘুদের অধিকারসংবলিত ৭ দফা প্রস্তাব।
কলকাঠি নাড়ছেন কারা
নতুন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি রয়েছেন বলে দাবি করেছেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট মিঠুন চৌধুরী। এছাড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা দলটির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তবে কৌশলগত কারণে এখনই তাদের নাম প্রকাশ করা হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি। মিঠুন চৌধুরী এসব কথা জানান। ৫০টি দলের সমন্বয়ে গঠিত এই জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য আরো অনেকে যোগাযোগ করছে বলে জানান বাংলাদেশের বিজেপি প্রধান। তিনি বলেন, বর্তমান ও সাবেক মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের নাগরিক আমাদের সঙ্গে আছেন এবং তারা থাকবেন। এখানে এমপি আছেন, মন্ত্রীও আছেন। বর্তমান সরকারের অনেকে দলে থাকবেন বলে কথা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সেনাবাহিনীর অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আমলা সঙ্গে আছেন। এটাই হবে বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহৎ শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। এখন নাম প্রকাশে অসুবিধা আছে। নির্বাচনের আগে প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে সব জানানো হবে। বড় দলগুলোর সঙ্গে বিজেপি জোট করবে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের দলটিই হবে বৃহৎ রাজনৈতিক জোট। আমাদের প্রত্যাশা আমরাই সরকার গঠন করব। এই মুহূর্তে বড় দলগুলোর সঙ্গে কোনো জোট করছি না। তবে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সিনিয়র নেতারা যোগাযোগ করছেন। আলোচনা চলছে। কিন্তু এখন আমরা কোনো জোট করছি না। বাংলাদেশে শাখা খুলতে ভারতের বিজেপির কোনো অনুমোদন নেয়া হয়েছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা ভারতের বিজেপির শাখা নয়। কংগ্রেস পৃথিবীর অনেক দেশেই আছে। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে এটা কোনো শাখা নয়। এটি একটি স্বতন্ত্র দল। এখানে ওই নামে দল করতে ভারতের বিজেপির কোনো অনুমোদন লাগে না। তবে তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক চমৎকার। তিনি আরো বলেন, ভারত সরকার শুধু সংখ্যালঘু নয়, বাংলাদেশের জনগণকে সুন্দরভাবে দেখতে চায়।
আওয়ামী লীগ-বিএনপি কী বলে
যদিও বিজেপি ও বিএমজেপি দুই দলের নেতারাই দাবি করছেন, সরকার ও বিরোধী দলের অনেক রাঘবোয়াল তাদের সাথে আছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা বলছেন, এই দুটি দলের বিষয়ে তাঁদের কোনো ধারণা নেই। আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য পীযূষ কান্তি চক্রবর্তী বলেন, ‘দল গঠনের কথা শুনেছি। এরা কারা, তাদের চিনি না। আর এখন দেশে নানা সমস্যা। এদের নিয়ে ভাবার সময় নেই।’ আর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করার অধিকার যেকোনো মানুষের আছে। তবে আমি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই।’ তিনি বলেন, ‘যারা দল দু’টি করেছেন, এদের চিনি না।’ তবে কেউ কেউ বলছেন, এই দুই দল গঠনের পেছনে জাতীয় পার্টির এক নেতার ভূমিকা আছে। অবশ্য জাতীয় পার্টির ওই নেতা সভাপতিম-লীর সদস্য সুনীল শুভ রায় বলেন, ‘দুই দলের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক আছে, তবে দল গঠনের পেছনে জাতীয় পার্টির ভূমিকা নেই। এরা দল গঠনের আগে আমার সঙ্গে কথা বলেছে।’
রাজনৈতিক দল, সংখ্যালঘু সংগঠনের নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের অস্তিত্ব জাহির এবং একটি চাহিদা তৈরিই এসব দল গঠনের কারণ। একাধিক সূত্র বলছে, সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিজেদের একটি বলয় তৈরি করে নির্বাচনী মাঠে সুফল আদায় করে নেয়ার জন্য দল দু’টি গঠন করেছে জাতীয় পার্টি।
এরা কী চায়
বাংলাদেশ জনতা পার্টি (বিজেপি) যদিও দাবি করছে তারা সব ধর্মের মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য কাজ করবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতার বক্তব্য, দাবি, দলীয় প্রতীক লোগো বিশ্লেষণ করলে স্ববিরোধিতা সহজেই ধরা পড়ে।
মিঠুন চৌধুরী জানান, গত ৬ এপ্রিল তিনি ভারত সফরে যান, দেশে ফেরেন ৩ জুলাই। তার দাবি, এই তিন মাসে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি এবং তারা জানিয়েছেন, ভারতের বিজেপি বাংলাদেশের বিজেপির সঙ্গেই আছে। মিঠুন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতার সময় ভারতের ভূমিকা ছিল। তবে আমরা যে স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীন হয়েছিলাম সেসব স্বপ্ন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার সময় আমাদের মানুষগুলো (সংখ্যালঘু হিন্দুরা) ছিল ৩৯ শতাংশ। এখন তাদের সংখ্যা ১০ থেকে ১২ শতাংশ। প্রতিদিনই ৬৩২ জন ভারতে পালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা কেন পালাবে? এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র; এখানে সরকার আছে, সবকিছু আছে। তারপরও কেন এত নির্যাতন-নিপীড়ন?’
এসব প্রসঙ্গে ভারতের ক্ষমতাসীন দলের মনোভাব জানতে চাইলে মিঠুন চৌধুরী বলেন, ‘তারা (ভারতীয় বিজেপির নেতারা) বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তারা চান, সংখ্যালঘুদের অবস্থার পরিবর্তন হোক। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা মানুষের মতো সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকুক, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হোক, তাদের জমিজমা যেন হয়রানির শিকার না হয়, এই বিষয়গুলো তারা চায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘দিল্লিতে দু’বার গিয়েছি, চার-পাঁচটি বৈঠক হয়েছে। তবে কার কার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে, সেটি বলতে পারব না।’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক উদ্যোগের বিষয়ে ভারতের ক্ষমতাসীন দলের মনোভাব জানতে চাইলে মিঠুন চৌধুরী বলেন, ‘‘বিষয়টা হচ্ছে, আমাদের মতো যারা ৪৬ বছর ধরে ছোটখাটো দল করছে, তাদের কেউই রাজনৈতিকভাবে কাজ করতে চাচ্ছে না। তবে বিজেপি সর্বশেষ আমাদের বলেছে, ‘আপনারা উঠে দাঁড়াতে পারলে আমরা আলাদা-আলাদা রাষ্ট্র হলেও আমাদের শুভদৃষ্টি থাকবে আপনাদের প্রতি।’ তাদের আশীর্বাদ আছে আমাদের প্রতি।’’
দলের লোগো ভারতীয় বিজেপি’র লোগো থেকে অনুপ্রাণিত কিনা, জানতে চাইলে মিঠুন চৌধুরী বলেন, ‘এটা ভুল ধারণা। কমিউনিস্টরা সারাবিশ্বে আছে। বাংলাদেশে কেন বিজেপি হবে না। তারা ভারতীয় জনতা পার্টি, আমরা বাংলাদেশ জনতা পার্টি। আমাদের লোগো, নাম আলাদা। তাদের লোগো শুধু পদ্মফুল। আমাদের লোগো পদ্মফুল; এর নিচে দু’টো হাত দেয়ার কারণ হচ্ছে, আমরা নির্যাতিত, নিপীড়িত। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, যেন এই নিপীড়ন থেকে আমরা রক্ষা পাই।’ দলের পরিকল্পনা সম্পর্কে মিঠুন চৌধুরী জানান, বিজেপি আগামী নির্বাচনে সরকার গঠন করলে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের জটিলতা নিরসন করবে, প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন করবে, প্রতিটি বিভাগকে প্রদেশে উন্নীত করা হবে, সংখ্যালঘুদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় করা হবে, ঋণখেলাপিদের ঋণের ৮০ শতাংশ পরিশোধ না হলে নতুন ঋণ দেয়া হবে না, প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য ধর্মের উপাসনালয় তৈরি করা হবে এবং দুর্গাপূজায় তিন দিনের ছুটির গেজেট প্রকাশ করা হবে।
অপর দল বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি)’র স্লোগান,‘ ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বাঁচাও’। সংখ্যালঘুদের সমন্বয়ে গঠিত এ দলের ইঞ্জিনিয়ার শ্যামল কুমার রায়কে সভাপতি ও সুকৃতি কুমার ম-লকে সাধারণ সম্পাদক, সুমেশ সাহাকে যুগ্ম সম্পাদক, সমীর সরকারকে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। আর সহ-সভাপতি হয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার অমল কুমার রায়, ড. মো. আবদুল হাই, গোপাল দেব নাথ, স্বপন কুমার ঘোষ ও কার্তিক চন্দ্র বিশ্বাস। এছাড়া যুগ্ম সম্পাদক হয়েছেন ড. ফয়জুর রহমান, ড. রাকেশ সরকার, সুব্রত ঘোষ, গৌতম কুমার প্রমুখ। দলটির পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের জানানো হয়েছে, নির্বাচন কমিশন থেকে নিবন্ধন নিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ আসনের নির্বাচনে যাবে বিএমজেপি।
সরকার গঠন করতে পারলে ৬৪টি আসন সংরক্ষিত রাখা হবে সংখ্যালঘুদের জন্য। পাশাপাশি তুলে ধরা হয় সংখ্যালঘুদের অধিকার সংবলিত ৭ দফা প্রস্তাব। বিজেপি দেশের হিন্দুদের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় চাচ্ছে। কেন দেশের ধর্ম মন্ত্রণালয় কি শুধু এদেশের মুসলমানদের? সরকারি নানা তহবিল কি শুধু মসজিদ মাদরাসায় যায়? তাহলে একটা হিসেব হয়ে যাক।  সরকারি কত টাকা মসজিদ, মাদরাসায় যায়? কত টাকা মাদরাসা, এতিমখানায় যায়? পূজার সময় সরকারের কত টাকা মন্দিরে যায় আর ঈদের সময় কত টাকা ঈদগাহে যায়? এই হিন্দু মহাজোট সংসদে ৬০টি সংরক্ষিত আসন দাবি করেছে! তাহলে এখন যদি খ্রিস্টান, বৌদ্ধ এবং মুসলমানরাও এমন দাবি করে তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াবে?
আসলেই কি তারা নির্যাতিত
বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি)’র  লোগোর পদ্মফুল; এর নিচে দু’টো হাত দেয়ার কারণ সম্পর্কে দলীয় প্রধান জানিয়েছেন, ‘আমরা  নির্যাতিত, নিপীড়িত। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, যেন এই নিপীড়ন থেকে আমরা রক্ষা পাই।’ ভারতীয় জনতা পার্টির লোগোর পদ্মফুলের নিচে কোনো হাত নেই। তার মানে ভারতে তারা খুব ভাল আছে। তাই নিপীড়ন থেকে রক্ষা পেতে হাতের দরকার নেই। আসলেই কি তারা এদেশে নির্যাতিত এবং ভারতে খুব আরামে আছে? না কি এর মাধ্যমে তারা বিশ্ববাসীকে কোনো নেতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।
রহস্যজাল
রাজধানীর নয়াপল্টনে সাবেক এক আইটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে বিএমজেপির কার্যালয়। ফ্ল্যাটটি পরিপাটি করে সাজানো। ঘরগুলোতে দামি আসবাব। এ মাসেই এ ফ্ল্যাট ভাড়া করা হয়েছে বলে জানান বিএমজেপির মুখপাত্র হিসেবে পরিচয়দানকারী সুকৃতি কুমার মন্ডল। তিনি একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদকও। সাংবাদিকতা তাঁর পেশা বলে জানান। তিনি আরও জানান, লেখাপড়া দিল্লিতে করেছেন। এ দল গঠনের প্রক্রিয়া গত মে মাস থেকে শুরু করেছেন। তিনি জাতীয় হিন্দু মহাজোট নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও জানান। সেখান থেকে আদর্শিক কারণে চলে আসেন। এসব জানানোর পাশাপাশি বললেন, ৫২টি জেলায় তাঁদের সংগঠন আছে।
জাতীয় হিন্দু মহাজোট থেকে বেরিয়ে আসার দাবি করলেও জোটের সভাপতি গোবিন্দ প্রামাণিক দাবি করেন, সুকৃতি মন্ডল এ জোটের সঙ্গে ছিলেন না। রাজধানীর ফকিরাপুলে একটি ভবনের ছোট একটি ঘরে বিজেপির কার্যালয়। এ ভবনে ট্রাভেল এজেন্সি, প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান আছে। এ দলের সভাপতি মিঠুন চৌধুরী হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান আদিবাসী পার্টির সভাপতি। এ দলটি বছর কয়েক আগে করা বলে দাবি করেন তিনি। বিএমজেপির অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে তারা দল গঠন করেছেন কিনা- এমন দাবি অগ্রাহ্য করে তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি জেলায় ও উপজেলায় তাদের সংগঠন আছে। সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে দুটির দুজন ব্যক্তির নাম ও নম্বর দিতে পারলেন তিনি। বাকিগুলো পরে দেবেন বলে জানান। মিঠুন চৌধুরী বলেন, ‘ভারতের বিজেপি এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) আশীর্বাদ আছে আমাদের প্রতি। গত ১ এপ্রিল কলকাতায় ভিএইচপির বাংলাদেশের উপহাইকমিশন ঘেরাওয়ের কর্মসূচিতে আমি অংশ নিই।’ ভারতের বিজেপি ও ভিএইচপির সঙ্গে সম্পর্ক ও আশীর্বাদের যে দাবি মিঠুন করলেন তাকে মহামিথ্যা বলে দাবি করেন নিজেকে ভিএইচপির গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য বলে দাবি করা জাতীয় হিন্দু মহাজোট নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক। তিনি বলেন, ‘দুটি দল হয়েছে স্রেফ নির্বাচন সামনে রেখে কিছু চাহিদা সৃষ্টির জন্য। এরা শুরুতেই ভাগ হয়েছে ভাগাভাগিতে বনিবনা না হওয়ার জন্য।’
রাজনীতি পর্যক্ষেকরা মনে করেন, দেশে এখন যারা ক্ষমতায় আছেন তারা নিজেদের সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু বান্ধব বলে দাবি করেন। অথচ এই সময়েই সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি একযোগে দুইটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হলো। বিষয়টি রহস্যজনক। দুই দলের পক্ষ থেকেই বলা হচ্ছে তাদের ওপর ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি’র আশীর্বাদ রয়েছে। তাই আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখ-তার বিষয় এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পথে তাদের হুমকি বলে মনে করছেন অনেক রাজনীতি বিশ্লেষক। এদের পক্ষ থেকে নির্বাচনে প্রার্থী দিলে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে, এটি ধরে নেয়া যায়। তবে ভোটের রাজনীতি এরা করবে না। দেশীয় এবং আঞ্চলিক সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর যোগসাজশে এরা ধর্মীয় উন্মাদনা বাড়াবে বলে ধারণা করা যায়। বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষ পবিত্র ইসলাম ধর্মের অনুসারী। ভারতের মতো এদেশে সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা নেই। নেই কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা। গো-রক্ষার নামে মানুষ হত্যার মতো নির্মম ঘটনা। মুসলমান-হিন্দুসহ সব ধর্মের মানুষ  শান্তিতে বসবাস করছে। কিন্তু তারপরও কেন এদেশে রাজনৈতিক হিসেবে বিজেপি ও বিএমজেপি’র উত্থান? এই রহস্যজাল এখনই ভেদ করতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের খেসারত দিতে হবে বলে পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।
hiharun@hotmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ