ঢাকা, শুক্রবার 29 September 2017, ১৪ আশ্বিন ১৪২8, ০৮ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন ক্ষুব্ধ বঞ্চিত চিকিৎসকরা

সংগ্রাম ডেস্ক : আমরা বিএনপির সময়ে ড্যাবও করি নাই, এখন স্বাচিপও করি না। আমরা চিকিৎসক, কেবল মানুষের চিকিৎসাটাই ঠিকমতো করে যেতে চাই। সেই লক্ষ্য নিয়েই এ পেশায় এসেছিলাম। কিন্তু কেবলমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়কে বড় দেখিয়ে, কখনও কখনও ভুল রাজনৈতিক পরিচয়ে আমাদের পদ না দেওয়াটা কেবল বঞ্চিত করাই নয়, পেশার প্রতিও হতাশ করে তোলে। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে এসব মন্তব্য করেছেন পদোন্নতি বঞ্চিত একাধিক চিকিৎসক। তারা বিএনপি সমর্থিত ড্যাব (ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) কিংবা সরকার সমর্থিত স্বাচিপ (স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ)-এর সদস্য বা কর্মী না হওয়ায় পদোন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
জানা যায়, গত ঈদুল আযহার আগে প্রায় পাঁচ শতাধিক চিকিৎসককে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপকের পদে পদোন্নতি দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অভিযোগ উঠেছে, চিকিৎসকদের পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা এবং অন্যান্য যোগ্যতা আমলে নেওয়া হয়নি, বরং রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে স্বাচিপ নেতা-কর্মী এবং সমর্থকদের বাছাই করা হয়। বাংলা ঠ্রিবিউন। স্বাস্থ্য বিভাগের ডিপিসি (ডিপার্টমেন্টাল প্রমোশন কমিটি) সূত্রে জানা যায়, সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সহকারী অধ্যাপক পদে তিন বছরের নিয়মিত চাকরি, দেশে অথবা বিদেশে কমপক্ষে তিনটি জার্নালে প্রকাশিত হওয়া নিবন্ধ, পাঁচ বছরের এসিআর ঠিক থাকা এবং সরকারি চাকরি ১০ বছর পূর্ণ হওয়া এসব যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই নীতিমালা অনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পদোন্নতির জন্য ফিট লিস্ট তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়ে থাকে। এরপর বিদ্যমান শূন্যপদের বিপরীতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় পদোন্নতি প্রদান করে। কিন্তু এসব যোগ্যতা থাকার পরও এবার অনেক চিকিৎসক পদোন্নতি পাননি। উপরোন্তু,সরকার সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাচিপ এর নেতা-কর্মী হওয়াকেই পদোন্নতির ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ।
স্বাস্থ্য বিভাগে বিভিন্ন পদে পদোন্নতির জন্য আবেদনকারী চিকিৎসকদের বিষয় ও পদভিত্তিক তথ্য থেকে জানা যায়,ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা তাহমিনা সাত্তারের নাম রয়েছে ফিট লিস্টের এক নম্বরে। তিনি ১৭তম বিসিএসে নিয়োগপ্রাপ্ত। পদোন্নতির অন্যতম শর্ত হিসেবে তার রয়েছে দেশের পাঁচটি জার্নালে প্রকাশিত নিবন্ধ (আর্টিকেল)। ফিট লিস্টের দুই নম্বরে রয়েছে সহকারী অধ্যাপক ডা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের নাম। তিনিও ১৭তম বিসিএসে উত্তীর্ণ এবং তারও জার্নালে প্রকাশিত নিবন্ধ রয়েছে পাঁচটি। একইভাবে তিন, চার এবং পাঁচ নম্বরে রয়েছেন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের ডা ফোয়ারা তাননীম (১৭তম বিবিএস), ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ডা শরীফ আসফিয়া রহমান (২০তম বিসিএস) এবং বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের ডা মোহাম্মদ আল আজাদ (২১তম বিসিএস)। অথচ এই পাঁচ জনকে ডিঙিয়ে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা হাসিব রহমান (২২তম বিসিএস)।পদোন্নতি বঞ্চিত চিকিৎসকরা বলছেন, ফিট লিস্টে থাকা অন্তত দুশ’ চিকিৎসককে তাদের প্রাপ্য পদ থেকে এবার বঞ্চিত করা হয়েছে।
জানা যায়,এবার প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ২৪তম বিসিএস পর্যন্ত গণ্য করা হয়েছে। প্লাস্টিক সার্জারিতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাঠানো তালিকার ১৪ জনের মধ্যে ১১ জন প্রার্থী ছিলেন। যেহেতু প্লাস্টিক সার্জারিতে সহযোগী অধ্যাপকের ১১টি পদ শূন্য ছিল, তাই এই ১১ জনেরই পদোন্নতি হওয়া কথা ছিল। কিন্তু ১০টি পদ শূন্য রেখে তালিকার ওপরের দিকের পাঁচ জনকে ডিঙিয়ে ২২তম বিসিএস-এর একজন চিকিৎসককে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এ বিষয়ে পদোন্নতি বঞ্চিতরা বলছেন, পদোন্নতি পাওয়া চিকিৎসকের মেধা এবং যোগ্যতা নিয়ে তাদের কোনও আক্ষেপ নেই। তবে তাদের ক্ষোভ আছে, অধিকতর যোগ্য এবং ফিট লিস্টের ওপরের দিকের তালিকায় থাকা চিকিৎসকদের পদোন্নতি না হওয়াতে।
 কেবল বার্ন ইউনিটই নয়, জেনারেল সার্জারি, ইউরোলজি, অর্থপেডিক্স, নিউরোলজিসহ বেশি কয়েকটি বিষয়ে শূন্যপদের অতিরিক্ত পদোন্নতি দেওয়া হলেও প্রায় প্রতিটি বিভাগে জ্যৈষ্ঠতা মানা হয়নি।লঙ্ঘন করা হয়েছে জ্যেষ্ঠতা।
১৭তম বিসিএসের ডা মো সায়েফ উল্লাহ কর্মরত আছেন মিটফোর্ড হাসপাতালের জেনারেল সার্জারি বিভাগে। ১৭তম বিসিএস’র এই সহকারী অধ্যাপক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি এসএসসি, এইচএসসি-তে বোর্ড স্ট্যান্ড করা, চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড, পেশাগত প্রতিটি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছি। অথচ আমার থেকে বয়স ও পড়াশোনায় জুনিয়র যে চিকিৎসক, তিনি এবারে পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন আমার সিনিয়র। তিনি এখন অধ্যাপক।’
ডা মো সায়েফ উল্লাহ বলেন, ‘আবার বয়সে আমার চেয়ে সিনিয়র হলেও, আমার আট বছর পরে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করেছেন এমন চিকিৎসকও অধ্যাপক হয়েছেন। এমনকি আমার সমসাময়িক যিনি তিনিও অধ্যাপক। অথচ ছয় বছর আগে আমার অধ্যাপক হওয়ার কথা,সেখানে ১৩ বছর ধরে আমি সহকারী অধ্যাপক। ২০১১ সালে যখন ডিপিসি গঠিত হয়, তখন আমাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। আমি ঊর্ধ্বতনদের জানিয়েছিলাম। ২০১৪ সালেও আমাকে দেওয়া হয়নি,তখনও জানিয়েছি। কিন্তু এবার আর আমার জানানোর কিছু নেই। সমস্যার কথা জানিয়ে কোনও লাভ নেই, বলেন ডা সায়েফ উল্লাহ।
তিনি বলেন,‘আমি সহকারী অধ্যাপক থাকা অবস্থায় যাকে এমবিবিএস পড়িয়েছি, সেই চিকিৎসকও এখন আমার চেয়ে পদে সিনিয়র।’
বঞ্চিত কেন করা হলো জানতে চাইল ডা সায়েফ উল্লাহ বলেন,‘বঞ্চিত হওয়ার কারণ তো তারা জানান না। তবে সাধারণত যারা ডিপিসি (ডিপার্টমেন্টাল প্রমোশন কমিটি) করেন, তাদের কাছে গিয়ে রাজনীতিক লোকেরা পছন্দের নামগুলো লিস্টে দিয়ে আসেন। আর যাদের তারা পছন্দ করেন না, তাদের নাম বাদ দেন। কেবল আমি নই, আমার মতো জ্যেষ্ঠ অন্তত ২০ থেকে ২২ জনকে ডিঙিয়ে ৩৮ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বিএমএ এবং স্বাচিপের নেতারা কেউ আমাদের নয় বলেই হয়তো আমাদের পদোন্নতি হয়নি।’
 যে পরিবেশে আমার জুনিয়ররা পদোন্নতি চেয়ে আসেন, সেখানে আমার যেতে ইচ্ছে করে না মন্তব্য করে ডা সায়েফ উল্লাহ বলেন,‘আমি গত ২৩ সেপ্টেম্বর দুই মাসের আর্ন লিভ নিয়েছি। কারণ,এ বঞ্চনা সহ্য করার মতো না।’
জানতে চাইলে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) এর সভাপতি অধ্যাপক ডা ইকবাল আর্সলান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘স্বাচিপ না করাতে পদোন্নতি হয়নি বলে যারা অভিযোগ করছেন, তাদের অভিযোগ সঠিক নয়। কারণ, স্বাচিপ করেও এবার অনেকের পদোন্নতি হয়নি। আর পদোন্নতি হয় কিছু নিয়ম মেনে। যারা এই ক্রাইটেরিয়াতে পড়েছেন তাদের পদোন্নতি হয়েছে।’
একইভাবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সহসভাপতি অধ্যাপক এহতেশামুল হক দুলাল। বিএমএ পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়েছে, এ অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘পদোন্নতি কারও অধিকার নয়। সরকার নির্ধারণ করবে কাকে পদোন্নতি দেওয়া হবে। কারও বলার সুযোগ নেই যে, তাকে পদোন্নতি কেন দেওয়া হলো না। তবে আমার জানা মতে, বিএমএ বা স্বাচিপ কোথাও ইন্টারফেয়ার করেনি। পদোন্নতিতে কোনও অনিয়ম হয়নি।’ অধ্যাপক এহতেশামুল হক বলেন, ‘যারা পদোন্নতি পাননি, তাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ক্রমাগতভাবে সবারই পদোন্নতি হবে।অধৈর্য্য হওয়ার কিছু নেই।আগামী জানুয়ারিতে তাদের পদোন্নতি হবে। তবে শর্ত হচ্ছে যে, সব কাগজপত্র সঠিক থাকতে হবে।’
এদিকে, কারও যদি এতই নিজের যোগ্যতা নিয়ে আত্মবিশ্বাস থাকে, তাহলে তিনি নিজেই নিজের পদোন্নতি দিয়ে নিক বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য সচিব ও পদোন্নতি কমিটির সভাপতি সিরাজুল হক খান।
বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন চিকিৎসকদেরই আমরা পদোন্নতি দিয়েছি। আর এমন পদোন্নতি হওয়ার পর সবসময়ই অভিযোগ থাকে বঞ্চিতদের। আমাদের দিক থেকে কোনও অবিচার করা হয়নি।’ পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাচিপ এবং বিএমএ’র কথা থাকতে পারে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘তাদের কথা যে আমরা পূরণ করি বিষয়টি তা নয়।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ