ঢাকা, শনিবার 30 September 2017, ১৫ আশ্বিন ১৪২8, ০৯ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রসঙ্গ: শিক্ষা, সৃজনশীলতা ও পরীক্ষা

বিল্লাল হোসেন কলতান : পরীক্ষা বা মূল্যায়ন : শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। শিক্ষা সম্পূর্ণভাবে মানুষের আচরণগত ও মানসিক ব্যাপার। শিশুর বর্ধন ও বিকাশে মনস্তত্ত্ব ব্যাপকভাবে জড়িত। অন্যদিকে বিশেষ জ্ঞান অর্জন বা কৌশল আয়ত্ত করাই হলো শিক্ষা। এ ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী কতটুকু জ্ঞান অর্জন করল বা কতটুকু কৌশল আয়ত্ত করল তা জানার মাধ্যম হলো পরীক্ষা। শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান বা মেধা যাচাইয়ের জন্য পৃথিবীর সকল দেশেই পরীক্ষা পদ্ধতি প্রচলিত আছে।  জ্ঞান বা মেধা যাচাই করার জন্য এর চেয়ে ভালো অন্য কোন উপায় আজ পর্যন্ত আবিস্কৃত হয়নি। মূলত পরীক্ষা হলো একটি ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি। অন্যদিকে শিখন শেখানো প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে মূল্যায়ন। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন হল শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি, সফলতা ও ব্যর্থতা যাচাই করা। শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে এই পরীক্ষা নামক মূল্যায়ন পদ্ধতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
বলা যায় যে, শিখন শেখানো কার্যক্রম চলাকালীন শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন হচ্ছে ধারাবাহিক মূল্যায়ন। চূড়ান্ত মূল্যায়ন বা পরীক্ষার পূর্ব পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে এই মূল্যায়ন চলতে থাকবে। এই মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সবলতা ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে শিখন সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে চূড়ান্ত মূল্যায়ন বা পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত করে গঠন করা যায় বলে একে গঠনকালীন মূল্যায়নও বলা হয়। 
এখানে বলে রাখা ভালো যে, একটি উন্নত পরীক্ষা পদ্ধতি বা মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। পরীক্ষা বা মূল্যায়নের দুইটি প্রক্রিয়া আছে...
ক) শিক্ষণ ভিত্তিক (Teaching Based) পরীক্ষা পদ্ধতি:
এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞানের পরিমাপ বিভিন্ন সাময়িক বা বার্ষিক পরীক্ষার মাধ্যমে হয়ে থাকে।
খ) শিখন ভিত্তিক (Learning Based) পরীক্ষা পদ্ধতি:
এ প্রক্রিয়ায় পড়ালেখার মূল উদ্দেশ্য থাকে শিক্ষার্থীর সার্বিক কর্মকান্ডের মূল্যায়ন করা। সেখানে শিক্ষার্থী পড়াশুনা ছাড়াও নানা কর্মকান্ডে সক্রিয় থাকবে এবং শিক্ষক সেখানে সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন বলে মনে করা হয়। শিখন-ভিত্তিক প্রক্রিয়ার একটি অত্যাবশ্যক উপাদান হল, শিক্ষার্থীর অব্যাহত শিখনে সময়ে সময়ে তাকে মূল্যায়ন করে সে অনুযায়ী ভববফনধপশ প্রদান করা। বছর কিংবা নির্দিষ্ট সময় শেষে শিক্ষার্থী সার্বিকভাবে কী শিখল তাও সেখানে পরিমাপ করা হয়।
তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রথমোক্ত পদ্ধতিতেই শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। কেননা বেশিরভাগ স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের সার্বিক মূল্যায়নের পরিপূরক ব্যবস্থা নেই।
পরীক্ষার প্রকারভেদ: আমাদের দেশে মূলত দুই ধরনের পরীক্ষা হয়ে থাকে।
১)    পাবলিক পরীক্ষা চারটি পাবলিক পরীক্ষা হয়।
    ক) পিইসি (PEC)       খ) জেএসসি (JSC)
     গ) এসএসসি (SSC)      ঘ) এইচএসসি (HSC)
২)    অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা দুইটি অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা হয়। 
    ক) অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষা    খ) বার্ষিক পরীক্ষা
তবে শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ ও ভালো ফলাফল অর্জনের লক্ষ্যে প্রায় প্রতিটি ভালো মানের বিদ্যালয় অর্ধ-বার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষার পূর্বে এক বা একাধিক মিডটার্ম বা সেমিস্টার বা টিউটোরিয়াল পরীক্ষা নিয়ে থাকে।
সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি: পূর্বের যে শিক্ষা পদ্ধতি ছিল সেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ের পড়া তোতাপাখির মতো মুখস্থ করত। সেই মুখস্থ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে পাবলিক পরীক্ষা গুলোতে পাশ করত। ফলশ্রুতিতে ঐ প্রশ্ন বা পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে শুধু একজন শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান বা অনুধাবন ক্ষমতা যাচাই করা যেত। কিন্তু তার প্রায়োগিক দক্ষতা যাচাই করা অনেক কষ্টকর ছিল। তাই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদগণ বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা পদ্ধতির উপায় নিয়ে তাদের মতামত ব্যক্ত করেন। তারই আলোকে বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী কতটুকু জ্ঞান অর্জন করল তা জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ, উচ্চতর দক্ষতা এই চারটি ধাপে পরীক্ষাকরণের উপায়কেই সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি বলে। 
সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি ও এর উদ্দেশ্য: সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি হচ্ছে যুগের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি। এই পশ্ন পদ্ধতি একটা চলমান প্রক্রিয়া। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষা সংস্কারের জন্য কতগুলো উদ্দেশ্য সামনে রেখে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির প্রচলন করা হয়েছে। উদ্দেশ্যগুলো হল...
ক) মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ তৈরি করা,
খ) সক্ষম ও দূর্বল শিক্ষার্থীদের পৃথক করা, গ) শিক্ষার্থীকে পাঠ্যবইমুখী করা, ঘ) মুখস্থ করাকে নিরুৎসাহিত করা, ঙ) চিন্তা করার দক্ষতার বিভিন্ন স্তরকে মূল্যায়নের আওতায় আনা, চ) পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি বিষয়বস্তুর গুরুত্ব শিক্ষার্থী যেন বুঝতে পারে,
ছ) শিক্ষার্থীর অনুমান করে উত্তর দেওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে আনা,
জ) বিভিন্ন বিষয়, বোর্ড ও বছরের ফলাফলের মধ্যে সমতাবিধান করা,
ঝ) শিক্ষার্থীর কোন বিষয়কে নিজের ভাষায় গুছিয়ে লেখার ক্ষমতা অর্জন করা, ঞ) প্রতিটি প্রশ্নোত্তরের জন্য নম্বর সুনির্দিষ্ট থাকা, ট) প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর মূল্যায়নের জন্য মার্কিং স্কিম প্রণয়ন করা, ঠ) শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা প্রকাশ করার সুযোগ দেয়া,
ড) প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর যথাযথ, প্রাসঙ্গিক ও সুনির্দিষ্ট হওয়া,
ঢ) শিক্ষার্থীর ভাষাজ্ঞান, বাক্য কাঠামো, রচনাশৈলী ও প্রকাশ ভংগীর পরিমাপ করা।
একটি আদর্শ প্রশ্নপত্রের বৈশিষ্ট্য: যে কোন আদর্শ বা উত্তম প্রশ্নপত্রের কতগুলো গুণ বা বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন। এগুলোর যদি অভাব থাকে তবে প্রশ্নপত্রটিকে পরিমাপের উপকরণ হিসেবে নিখুঁত বা নির্ভরযোগ্য বলা যায় না। প্রশ্নপত্রের এই উপাদান বা শর্তগুলোকে বলা হয় আদর্শ প্রশ্নপত্রের বৈশিষ্ট্য।  
১) যথার্থতা : একটি প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হয় কোন লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। সুতরাং কোন গুণ বা বৈশিষ্ট্যকে পরিমাপ করার জন্য যদি কোন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হয় এবং সেই প্রশ্নপত্রটি যদি যথার্থভাবে সেই গুণ বা বৈশিষ্ট্যকে পরিমাপ করতে পারে তাহলে সেই প্রশ্নপত্রটির যথার্থতা আছে বলতে বুঝায়। বলা যায় যে কোন একটি প্রশ্নপত্র দ্বারা যা পরিমাপ করতে চাওয়া হয় আর প্রশ্নপত্রটি যদি নিখুঁতভাবে তা পরিমাপ করে তাহলে প্রশ্নপত্রটি যথার্থ আছে বলা যায়। বিজ্ঞানের একটি প্রশ্নপত্র যদি শিক্ষার্থীর হাতের লেখা বা ভাষাজ্ঞান পরিমাপ না করে শুধু বিজ্ঞানের জ্ঞান ও দক্ষতা পরিমাপ করে তবে প্রশ্নপত্রটির যথার্থতা রয়েছে বলা যাবে। মূলত একটি প্রশ্নপত্রের যথার্থতা যুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে নির্ণয় করা হয়ে থাকে।      
২) নির্ভরযোগ্যতা : একটি প্রশ্নপত্রের নির্ভরযোগ্যতা বলতে বোঝায় যে ঐ প্রশ্নপত্রটি যে ফলাফল প্রদান করে তা সব সময় একই রকম হবে। উদাহরণ দিয়ে বলা যায় যে একটি প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে যদি যৌক্তিক সময় পরপর দুই বার পরীক্ষা নেয়া হয় এবং দুই বারের ফলাফল একই রকম হয় তাহলে বুঝতে হবে প্রশ্নপত্রটির নির্ভরযোগ্যতা আছে। পরিসংখ্যানগত পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্রের নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয় করা যায়।
৩) নৈর্ব্যক্তিকতা : নৈর্ব্যক্তিকতা এর আভিধানিক অর্থ হলো ব্যক্তি নিরপেক্ষতা। তাহলে কোন প্রশ্নপত্রের নৈর্ব্যক্তিকতা বলতে বুঝায় যে একটি প্রশ্নপত্র তৈরিকরণ, প্রয়োগ এবং নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে একজন পরীক্ষকের ব্যক্তিগত কোন প্রভাব থাকবে না।
৪) পরিমিততা : একটি প্রশ্নপত্রের গঠন কাঠামো, তার প্রয়োগ ও নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব কম অর্থ, পরিশ্রম ও সময় ব্যয় করাকেই একটি প্রশ্নপত্রের পরিমিততা বুঝায়। প্রশ্নপত্রের প্রয়োগ ও ফলাফল প্রদানের ক্ষেত্রে যদি বেশি সময় ও পরিশ্রম ব্যয় হয় তাহলে প্রশ্নপত্রটির পরিমিততা নেই বললেই চলে।
এখন আমরা একটি আদর্শ প্রশ্নপত্রের আরো কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করব:
ক) শিখন ফলের চাহিদা অনুসারে প্রশ্ন প্রণয়ন করতে হবে।
খ) প্রশ্নপত্রের ভাষা হবে সহজ সরল এবং প্রাঞ্জল।
গ) প্রশ্নপত্রে শ্রেণি উপযোগী ভাষা ব্যবহার করতে হবে।
ঘ) প্রশ্নপত্র এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে যাতে সবল এবং দূর্বল মানের পরীক্ষার্থীর জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হয়।
 ঙ) প্রশ্নপত্র এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে যাতে শিক্ষাক্রমের অন্তর্ভুক্ত সকল অধ্যায় মূল্যায়নের আওতাভুক্ত হয়।
চ) একই শিখন ফল / বিষয়বস্তু একই সাথে সৃজনশীল এবং বহুনির্বাচনি প্রশ্নের সাহায্যে মূল্যায়ন করা যাবে না।
ছ) ব্যাপ্তি ও পরিধি অনুসারে অধ্যায়ের প্রশ্নের সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে।
জ) একাধিক অধ্যায়ের সমন্বয়ে সৃজনশীল প্রশ্ন করা যাবে। তবে এক্ষেত্রে বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্য থাকতে হবে।
ঝ) প্রশ্নের জন্য বরাদ্দকৃত নম্বর ও উত্তর প্রদানের সময় বিবেচনায় রেখে প্রশ্ন প্রণয়ন করতে হবে।    
সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের ধরণ:
সৃজনশীল প্রশ্নকে চারটি স্তরে ভাগ করা হয়...
ক) জ্ঞানের স্তর-     নম্বর-০১
খ) অনুধাবন দক্ষতার স্তর-    নম্বর-০২
গ) প্রয়োগ দক্ষতার স্তর-    নম্বর-০৩
ঘ) উচ্চতর চিন্তন-দক্ষতার স্তর-    নম্বর-০৪
ক) জ্ঞানের স্তর : চিন্তন দক্ষতার সর্বনিম্ন স্তর হলো জ্ঞানের স্তর। এর উদ্দেশ্য হলো আগে জানা কোন বিষয়কে স্মরণ করা বা মনে করা। এই স্তরে যেসকল বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে তা হল-সাধারণ শব্দসমূহ, বিশেষ তত্ত্ব, তথ্য, প্রক্রিয়া, পদ্ধতি, ধারণা, নীতিমালা ইত্যাদি স্মরণ করা বা চিনতে পারা। এই স্তরের প্রশ্ন তৈরি করা অপেক্ষাকৃত সহজ। জ্ঞানের স্তরের প্রশ্নের উত্তর শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠ্যবই থেকে সরাসরি বের করতে পারে। 
খ) অনুধাবন দক্ষতার স্তর: অনুধাবন অর্থ হলো কোন কিছু বোঝার দক্ষতা। তাহলে বলা যায় যে তথ্য, নীতিমালা, সূত্র, নিয়ম, পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া ইত্যাদি বোঝার দক্ষতাই হলো অনুধাবন করার দক্ষতা। কোন কিছু বুঝতে পারলে যেমন তার ব্যাখ্যা অথবা অনুবাদ করা যায় তেমনি মৌখিকভাবে এবং গ্রাফ, সারণি, প্রতীক ও চিত্রের সাহায্যে কোন বিষয়বস্তুর উপস্থাপন করা সহজ হয়। বিষয়বস্তু ভালভাবে না বুঝলে এই স্তরের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। অনুধাবন স্তরের প্রশ্নে কিবোঝায়, কেন ঘটেছে, ব্যাখ্যা কর, বর্ণনা কর ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা যেতে পারে।
গ) প্রয়োগ দক্ষতার স্তর: পূর্বের জানা কোন বিষয়কে জ্ঞান এবং অনুধাবনের সমন্বয়ে নতুন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করার দক্ষতাই হলো প্রয়োগ দক্ষতা। এই স্তরে যে বিষয়গুলো পরিলক্ষিত হয় তা হলো আইন, বিধি, তত্ত্ব, সূত্র, নিয়ম, পদ্ধতি, নীতি, ধারণা ইত্যাদির প্রয়োগ করার দক্ষতা।
গ্রাফ বা চার্ট তৈরি করা, হিসাব-নিকাশ করা, পদ্ধতির সঠিক ব্যবহার ও প্রদর্শন করা প্রয়োগ দক্ষতা স্তরে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। প্রয়োগ দক্ষতার স্তরের প্রশ্নের উত্তর সরাসরি পাঠ্যবইয়ে পাওয়া যায় না। প্রয়োগ স্তরের প্রশ্নে দেখাও,প্রমাণ কর, প্রয়োগ দেখাও, মিলিয়ে দেখ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঘ) উচ্চতর চিন্তন-দক্ষতার স্তর : দক্ষতা বলতে আমরা বুঝি বিচার বিবেচনা করার ক্ষমতা। উচ্চতর  স্তরের দক্ষতা হলো কোন বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণ (সাধারণ থেকে বিশেষ), সংশ্লেষণ (বিশেষ থেকে সাধারণ) এবং মূল্যায়ন (বিচার-বিবেচনা, যুক্তি) করার দক্ষতা। বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য ও ধারণা সংগ্রহ করে তা দিয়ে একটি কাঠামো বা নকশা তৈরী করা। এটি চিন্তার দক্ষতার একেবারে সর্বোচ্চ স্তর। দক্ষতার সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে এর মধ্যে নিম্নতর স্তরের অন্য সব চিন্তন-দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই অংশে বিশ্লেষণ করো, যাচাই করো, মূল্যায়ন করো, বিচার করো, যথার্থতা নিরূপন করো, পরামর্শ দাও ইত্যাদি শব্দ যোগে কাজটি হয়ে থাকে। মূলত: আগের জানা তথ্য/তত্ত্ব ব্যবহার করে নতুন কোন পরিস্থতিতে বিচার-বিশ্লষণ করার, সিদ্ধান্ত গ্রহণের এবং মূল্যায়নের দক্ষতাই হলো উচ্চতর চিন্তন-দক্ষতা।
বহুনির্বাচনী প্রশ্ন: এই স্তরে চারটি বিকল্প প্রশ্ন থাকবে। সঠিক বিকল্পকে বলা হয় সঠিক উত্তর এবং ভুল বিকল্পকে বলা হয় বিক্ষেপকসমূহ। চিন্তন দক্ষতার সকল স্তরের প্রশ্ন এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সৃজনশীল এবং বহুনির্বাচনী এই উভয় অংশেই শুধু মুখস্থ করে উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্র সীমিত। চিন্তন দক্ষতার সকল স্তরের প্রশ্নের শতকরা হার নিম্নে উলেখ করা হল-
জ্ঞানের স্তর :    ৪০%
অনুধাবনের স্তর :     ৩০%
 প্রয়োগ স্তর :     ২০%
উচ্চতর চিন্তন-দক্ষতার স্তর :     ১০% 
জ্ঞান ও অনুধাবনের স্তর থেকে ৭০% এবং প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতার স্তর থেকে মোট ৩০% প্রশ্ন থাকবে। ব্যবহারিক নেই এমন বিষয়ে মোট নম্বরের ৭০% সৃজনশীল প্রশ্ন থাকবে। আর ব্যবহারিক পরীক্ষা আছে এমন বিষয়ে ৫০% সৃজনশীল প্রশ্ন থাকবে। প্রতিটি সৃজনশীল প্রশ্ন হবে মৌলিক অর্থাৎ যা পূর্বে কখনও ব্যবহৃত হয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ৩ ধরণের বহুনির্বাচনী প্রশ্ন থাকে...
ক) সাধারণ বহুনির্বাচনী প্রশ্ন :
প্রশ্নের আকারে অথবা অসম্পূর্ণ বাক্য হিসাবে দেয়া হয়। প্রশ্নের অথবা অসম্পূর্ণ বাক্য উদ্দীপকের কাজ করে। অসম্পূর্ণ বাক্য যথাসম্ভব না দেওয়াই ভালো। এর পর থাকবে ৪টি বিকল্প উত্তর। যার মধ্যে একটি সঠিক উত্তর থাকবে। এই প্রশ্নগুলো সকলের কাছে যথেষ্ট পরিচিত।
খ) বহুপদী সমাপ্তিসূচক বহুনির্বাচনী প্রশ্ন: প্রশ্নের বৈচিত্র্য আনয়নে এই জাতীয় প্রশ্ন গুরুত্বের দাবিদার। এ ধরনের প্রশ্নের শুরুতে ৩টি তথ্য/বিবৃতি/ধারণা দেয়া থাকবে। ৩টি তথ্য/বিবৃতি/ধারণার ১টি/২টি/৩টি সঠিক হতে পারে। ৩টি তথ্য সম্পর্কিত ৪টি উত্তর থেকে শিক্ষার্থী সঠিক উত্তরটি বাচাই করবে। এই ধরনের প্রশ্নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অনুধাবন, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা যাচাই করা সম্ভব। এ ধরনের প্রশ্নের সংখ্যা কম থাকাই ভালো। কোনভাবেই তা ২০% এর বেশি হবে না। 
গ) অভিন্ন তথ্যভিত্তিক বহুনির্বাচনী প্রশ্ন: একই তথ্য থেকে বিভিন্ন প্রশ্ন বের করাই এই পদ্ধতির মূল বিষয়। অভিন্ন তথ্য ভিত্তিক প্রশ্ন একটি উদ্দীপক/ দৃশ্যকল্প/ সূচনা বক্তব্য দিয়ে শুরু হবে। প্রশ্নগুলো পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত হবে। উদ্দীপক হতে পারে সংক্ষিপ্ত অনুচ্ছেদ, মানচিত্র, সারণি, গ্রাফ, ডায়াগ্রাম, লেখচিত্র, ছবি ইত্যাদি। মূলত: প্রয়োগ এবং উচ্চতর দক্ষতা স্তরের প্রশ্ন তৈরি করার জন্য অভিন্ন তথ্যের ব্যবহার করা হয়। এই ক্ষেত্রে জ্ঞান স্তরের যাচাই করা হয় না।
মার্কিং স্কিম (Marking Scheme):
মার্কিং স্কিম হলো এক ধরনের শিক্ষা সম্পর্কিত ডকুমেন্ট। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য মার্কিং স্কিম প্রয়োজন। তাহলে বলা যায় যে, চিন্তন দক্ষতার প্রতিটি স্তরে শিক্ষার্থীর লিখিত প্রশ্নের উত্তরে আলাদাভাবে কত নম্বর দেয়া যায় তার একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো বা মূল্যায়ন নির্দেশিকা তৈরি করাকেই মার্কিং স্কিম বলা হয়। মূলত: মার্কিং স্কিম হলো একটি লিখিত ডকুমেন্ট।
মার্কিং স্কিম প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা:
১. যে সকল পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করবেন মার্কিং স্কিম তাদের জন্য একটি নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে।
২. পরীক্ষকগণ নিজেদের ইচ্ছামত উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে পারবেন না বলে মূল্যায়ন নিরপেক্ষ হয়।
৩. ম্ল্যূায়ন সঠিক হয়। উত্তরপত্রের অবমূল্যায়ন বা অতি মূল্যায়ন হয় না।
পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কাজের বিবরণ:
ক) পরীক্ষা বিভাগ,
খ) পরীক্ষার কর্মসূচি বা রুটিন প্রণয়ন,
গ) প্রশ্নপত্র আহ্বান ও ব্যবস্থাপনা,
ঘ) হল ব্যবস্থাপনা,
ঙ) পরীক্ষার্থীদের আসন বিন্যাস,
চ) বিন্যস্ত আসন কক্ষ অনুযায়ী বেঞ্চে লাগানো,
ছ) নোটিস বোর্ডে সংক্ষিপ্ত আসন বিন্যাস প্রদর্শন,    
জ) কক্ষ ভিত্তিক প্রশ্নপত্র বিন্যাস,
ঝ) উত্তরপত্র তৈরিকরণ,
ঞ) পরীক্ষার হল ডিউটি ব্যবস্থাপনা,
ট) শিক্ষকদের নিকট উত্তরপত্র বিতরণ ও তথ্য সংরক্ষণ,
ঠ) উত্তরপত্র মূল্যায়ন,
ড) উত্তরপত্র শিক্ষার্থীর নিকট বিতরণ ও তা ফেরত আনয়ন,
ঢ) নম্বর ফর্দে নম্বর লিপিবদ্ধ করে তা সংশ্লিষ্ট শ্রেণি শিক্ষককে বিতরণ, 
ণ) ফলাফল রেজি: বইয়ে ফলাফল তৈরিকরণ ও সংরক্ষণ,
ত) প্রোগ্রেস রিপোর্ট তৈরিকরণ ও তা সংরক্ষণ
গোপনীয়তা বা Confidentiality:
গোপনীয়তা একটি স্পর্শকাতর বিষয়। গোপনীয়তার আভিধানিক অর্থ হলো কোন কিছু ঢেকে রাখা বা লুকিয়ে রাখা বা সংরক্ষিত রাখা বা কোন কিছুকে বাহিরে প্রকাশ না করা বা শপথ ভঙ্গ না করা।
Whatis.com এ Confidentiality এর সংঙ্গা দেয়া হয়েছে এভাবে, Confidentiality is a set of rules or a promise that limits access or places restrictions on certain types of information.
পরীক্ষা সক্রান্ত কাজগুলোকে বলা হয় গোপনীয় কাজ বা Confidential Work. এ কাজে গোপনীয়তার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এখানে গোপনীয়তা না থাকলে বা গোপনীয়তার ক্ষেত্রে শিথিলতা থাকলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দেয়। কখনো কখনো প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনাও ঘটে থাকে।  পরীক্ষা সংক্রান্ত যে সমস্ত কাজে গোপনীয়তা বজায় রাখতে হয় তা নিন্মরূপ
ক) প্রশ্নপত্র প্রণয়নে, খ) প্রশ্নপত্র বাছাইকরণ বা মডারেশন (Moderation) এর ক্ষেত্রে, গ) কম্পিউটার বিভাগে, ঘ) প্রশ্নপত্র প্রিন্টিং বা ছাপানোর কাজে, ঙ) প্রুফ রিডিং এর ক্ষেত্রে, চ) উত্তরপত্র মূল্যায়নে, ছ) ফলাফল তৈরিকরণে এবং জ) পরীক্ষা বিভাগের জনবলের ক্ষেত্রে।
সৃজনশীলতা ও প্রশ্নব্যাংক: প্রশ্নব্যাংক এর ধারণাটি একেবারে নতুন নয়। বরং ইহা একটি পুরানো এবং কার্যকরী প্রক্রিয়া। বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষাবিদগণ প্রশ্নব্যাংক প্রবর্তনের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করছেন। সরকারের গবেষণা প্রতিবেদনই বলছে, কেবল শিক্ষার্থীরাই নয় বরং মাধ্যমিক স্কুলের ৫৪* শতাংশ শিক্ষকই এখনও সৃজনশীল পদ্ধতি আয়ত্ত করতে পারেননি এবং এদের মধ্যে প্রায় ২২ শতাংশ শিক্ষকের অবস্থা খুবই নাজুক। প্রতিবেদনে ৫৪৩ টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। দেখা যায়, ৫৪৩ টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২৭ টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নিজেরা প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেন। অন্য বিদ্যালয়ের সহায়তায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেন ১৭ টি বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। বাইরে থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেন ৪৯৯ টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা। প্রতিবেদনে আরো পর্যালোচন করা হয় যে, নিজেরা প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করতে পারেন ঢাকা বিভাগে এমন প্রতিষ্ঠানের হার ৬৫ ভাগ, ময়মনসিংহে ৪৫ ভাগ, সিলেটে ৫৪ ভাগ, চট্টগ্রামে ৫০ ভাগ, রংপুরে ৫২ ভাগ, রাজশাহীতে ৮০ ভাগ, খুলনায় ৬১ ভাগ, কুমিল্লায় ৫৩ ভাগ। সারাদেশের হিসাবে এ সংখ্যা ৪৫ ভাগ। তাহলে সৃজনশীল পদ্ধতিতে আমাদের শিক্ষকদের মান কোন অবস্থায় আছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। ফলশ্রুতিতে প্রশ্নব্যাংক ধারণাটি এখন আবার শিক্ষাবিদগণ সামনে নিয়ে এসেছেন।
বর্তমানে যশোর শিক্ষা বোর্ডে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং এতে বোর্ড ও শিক্ষার্থীরা তার সুফল পাচ্ছে। সেখানে এ প্রশ্নব্যাংকটি শিক্ষার্থীর জন্য উম্মুক্ত নয়। প্রতিষ্ঠানগুলো password ব্যবহার করে শিক্ষা বোর্ডের ওয়েব সাইট থেকে প্রশ্নব্যাংকটি ডাউনলোড করে। সেখান থেকে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হয়।
*  একাডেমিক তদারকি প্রতিবেদন, মনিটরিং এ্যা- ইভালুয়েশন ইউনিট, মাউশি/ দৈনিক শিক্ষা, ২২ নভেম্বর ২০১৬।
তথ্যসূত্র: ১. সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি, ভালো করার নিয়মকানুন, প্রথমা প্রকাশন।
২. জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০১২ বিস্তরণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল, কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট ইউনিট, NCTB
৩. বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরীক্ষা পদ্ধতির ইতিহাস, ড. মোহাম্মদ হান্নান, অন্য প্রকাশ।
৪. দৈনিক আজাদী, ২৮ আগস্ট ২০১৩।
৫. ইন্টারনেট। 
লেখক পরিচিতি: সিনিয়র শিক্ষক, আল-আমিন একাডেমি স্কুল এ- কলেজ, চাঁদপুর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ