ঢাকা, মঙ্গলবার 3 October 2017, ১৮ আশ্বিন ১৪২8, ১২ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সুমাইয়্যা সিদ্দীকা

ভূমিকা : প্রযুক্তির আলোয় উদ্ভাসিত একবিংশ শতাব্দীর সভ্য পথিবীতে হেঁসেলে হাঁড়ি-পাতিল ঠেলে আর ঘরের কোণে বালিশের ওয়ারের মাপ-ঝোঁকেই সীমাবদ্ধ নয় আজকের নারীর জগৎ। বরং পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গ্রহ থেকে গ্রহান্তর পেরিয়ে মহাকাশেও স্থান করে নিয়েছে নারী। স্বীয় মেধা,বুদ্ধি আর দক্ষতায় সর্বত্রই নারীর সরব পদচারণা। অথচ অতীব দুঃখের বিষয় পত্র-পত্রিকা, ইলেক্ট্রিক মিডিয়া কিংবা স্যাটেলাইট চ্যানেল খুললেই নিত্যদিন সবচেয়ে বেশী যে নিউজটি চোখে পড়ে তা হলো নারীর প্রতি সহিংসতা। কি ঘরে কি বাইরে সর্বত্রই মানসিক, শারীরিক নির্যাতনের শিকার নারী। তিন বছরের শিশু থেকে সত্তর বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত কেউই রেহাই পাচ্ছে না একশ্রেণীর মানুষ নামের নরপশুর হাত থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে পরিসংখ্যানগুলোতে দেশে নারী নির্যাতনের যে ভয়াবহ নৃশংসতার চিত্র উঠে এসেছে এতে মনে হয় সমগ্র দেশটি যেন নারী নির্যাতনের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এমনকি যখন এই রচনাটি লিখছি হয়তো তখনো দেশের কোন কোণে নিপীড়িত হচ্ছে কোন নারী। আলোচ্য প্রবন্ধে স্বল্প পরিসরে নারীর প্রতি সহিংসতার কারণ ও প্রতিকার তুলে ধরার প্রয়াস পাব। ইনশাল্লাহ।
কেস স্টাডি
কিছু কেস স্টাডির মাধ্যমে আমরা নারী নির্যাতনের একটি ক্ষুদ্র চিত্র পাঠকের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস করছি। যার প্রতিটি ঘটনা সত্য।
কেস স্টাডি-১
বনানীর অভিজাত হোটেল দ্যা রেইনট্রি। ধনী বাবার (আপন জুয়েলার্স এর মালিক) আদরের দুলালের জন্মদিনের পার্টি। বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া দু‘তরুণীকে পার্টিতে আমন্ত্রণ করে কৌশলে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ধর্ষণ ও চিত্র ধারণ। পরবর্তীতে ভিডিও চিত্রগুলো দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে মানসিক নির্যাতন।১
কেস স্টাডি-২
মাজারে মাজারে গান করত বাউল শিল্পী। এভাবে পরিচিত হয় এক নারী শিল্পীর সাথে। ওই নারী শিল্পীর সূত্রে সাভারের আটকপাড়ায় গানের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করা হয় তাকে। কিন্তু ধোঁকা দিয়ে ঘরে আটকিয়ে ১০/১২ জন মিলে রাতভর ধর্ষণ করে ওই শিল্পীকে। গত ৯ আগস্ট ২০১৭ তারিখের ঘটনা।২
কেস স্টাডি-৩
গত ১৭ জুলাই মেয়েটিকে ধর্ষণ করে বগুড়ার শহর শ্রমিক লীগের নেতা তুফান সরকার। পরে তুফানের ক্যাডাররা আবারো পাশবিক নির্যাতন করে মেয়েটিকে। ২৮ জুলাই তুফান সরকারের স্ত্রী আশা সরকার এবং তাঁর বড় বোন নারী কাউন্সিলর মিলে মারধর করে ও মা-মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে দেয়।৩
কেস স্টাডি-৪
নওগাঁর চৌরবাড়ি গ্রামে মোস্তাকের সাথে শারমিন আক্তারের (১৮) বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন সময় যৌতুক ও বিদেশ যাওয়ার জন্য মোস্তাক ও তার পরিবারের লোকজন শারমিনের পরিবারের কাছে দেড় লাখ টাকা দাবি করে। তাঁদের এ দাবি পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় শারমিনের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো। এমনকি বিয়ের তিনমাসের মাথায় যৌতুকের বলি হয়ে শারমিন চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে।৪
কেস স্টাডি-৫
গাজীপুর-শ্রীপুরের ছিটপাড়া গ্রামে এক প্রভাবশালীর ছেলের হাতে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয় ৭ বছরের শিশু আয়েশা আক্তার। ঘটনার বিচার চাইতে শিশুটির বাবা হযরত আলী গিয়েছিলেন স্থানীয় ইউপি সদস্যের কাছে। বিচার পাননি। অভিযোগ জানিয়েছিলেন শ্রীপুর থানায়। সেখান থেকেও ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ আখ্যা দিয়ে ভুক্তভোগী মেয়েসহ তাকে তাড়িয়ে দেয় পুলিশ। তাদের কোনো অভিযোগই আমলে নেয়নি প্রশাসন কিংবা সমাজপতিরা। উল্টো ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। কোথাও মেয়ের নির্যাতনের বিচার না পেয়ে গত ২৯ এপ্রিল শিশু আয়েশাকে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে বাবা-মেয়ে।৫
কেস স্টাডি-৬
রাজধানীর বাড্ডার আদর্শনগর। বিকালে বাইরে খেলতে গিয়েছিল মাত্র সাড়ে তিন বছরের ছোট্ট শিশু তানহা। সাড়ে ৫টার দিকে তানহার মা জানতে পারে মেয়ে পাশের বাড়ির বাথরুমে পড়ে আছে। রক্তাক্ত, ক্ষত-বিক্ষত তানহাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা জানান ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে তাকে।৬
নারী নির্যাতন সমীক্ষা : ২০১৬ ও ২০১৭ সালে নারী নির্যাতনের কয়েকটি চিত্র নিম্নরূপ, যদিও বাস্তব অবস্থা আরো অনেক বেশী ভয়াবহ :
২০১৬ সালে কয়েকটি সংগঠনের সমীক্ষা থেকে নারী নির্যাতনের নি¤œরূপ চিত্র উঠে এসেছে।
- নারী ধর্ষণ - ১০৫০, গণধর্ষণ - ১৬৬, ধর্ষণের পর হত্যা -৪৪, যৌন নির্যাতন -১২০।৭
- যৌতুক ও অন্যান্য কারণে নির্যাতন - ১৪১৫, নারী অপহরণ -৩৯৭, অপহরণের পর মরদেহ উদ্ধার -৭৩।পারিবারিক কলহের জেরে নিহত-২৮৯, আত্মহত্যা -৫৪,আহত-৬৬। যৌতুকের জন্য নির্যাতন -২২৭, নিহত -১৫০, আত্মহত্যা- ৫ এবং আহত -৭২। এসিড নিক্ষেপের শিকার - ৩৫,নিহত-১, এবং আহত-৩৯।৮
- নারী গৃহকর্মী নির্যাতন-৬৪। যৌন নির্যাতন ও বখাটের উত্ত্যক্তকরণের শিকার-২৪৪,আত্মহত্যা-৬, প্রতিবাদে নিহত-৭।৯
২০১৭সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে নারী নির্যাতনের যে ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে তা সত্যিই একটি সুষ্ঠু সমাজের অবস্থা হতে পারে না।
- ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১১৯টি। জানুয়ারিতে ১৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৩টি, মার্চে ১৪টি, এপ্রিল ১৪টি, মে মাসে ২৫টি, জুন মাসে ২৪টি এবং জুলাই মাসে ১৫টি।১০
- ২০১৭ সালের (জানুয়ারি থেকে জুলাই) সাত মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫২৬টি। এর মধ্যে জুলাই মাসেই ঘটেছে ৯৭টি ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪১ জনকে।১১ 
- ২০১৭ সালের ( জানুয়ারি থেকে জুন) ৬ মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৪১ নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে আর গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৩ নারী।১২
গত সাড়ে ৫ বছরের (২০১২-২০১৭সালের ১ম ৬মাস) সমীক্ষা :
শিশু :
- ২০১২ সালে ৮৬ জন, ২০১৩ সালে ১৭৯ জন, ২০১৪ সালে ১৯৯ জন, ২০১৫ সালে ৫২১ জন, ২০১৬ সালে ৬৮৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
২০১৭ সালের প্রথম ৬ মাসেই শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২৯৪টি। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৬ জন শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৮ শিশুকে আর ৩ জন শিশু ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে। এছাড়া ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে আরো ২৮ শিশু।১৩
নারী : সাড়ে ৫ বছরে গড়ে দিনে প্রায় ৩টি করে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে -ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭৩ নারী ও শিশুকে।
-ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে ৫৬ জন।
২০১২ সাল :
- নারী ও শিশু ধর্ষণ-গণধর্ষণের শিকার হয়েছে-১১৪৮ জন
- ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে-৯৮ জনকে
- ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে -১৪ জন
২০১৩ সাল :
- নারী ও শিশু ধর্ষণ-গণধর্ষণের শিকার হয়েছে-৯৯৮ জন
- ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে-৮৭ জনকে
- ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে -১৪ জন
২০১৪ সাল :
য় নারী ও শিশু ধর্ষণ-গণধর্ষণের শিকার হয়েছে-৭০৭ জন
- ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে-৬৮ জনকে
- ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে -১৩জন
২০১৫ সাল :
- ধর্ষণ-গণধর্ষণের শিকার হয়েছে-৮৪৬ জন
- ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে-৬০ জনকে
- ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে -২ জন
২০১৬ সাল :
- নারী ও শিশু ধর্ষণ-গণধর্ষণের শিকার হয়েছে-৭২৪ জন
- ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে-৩৭ জনকে
- ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে -৮ জন।১৪
নারীর প্রতি সহিংসতার কারণ :
নারী নির্যাতনের কারণ সমূহের মধ্যে যে বিষয়গুলো প্রণিধানযোগ্য :
- সঠিক ইসলামী জ্ঞান ও মূল্যবোধের অভাব ও সঠিক ইসলামকে চর্চার অভাব।
- সমাজের বসবাসরত জনসমষ্টির মধ্যে আল্লাহভীতির অভাব।
- ইসলামী বিধানের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন।
- পর্দা প্রথার প্রতি বিতৃষ্ণার কারণে নারী নিগ্রহ বাড়ছে।
- ইসলাম প্রদত্ত নারীর অধিকার সমূহ যথাযথভাবে প্রয়োগ না করে ভুল ব্যাখ্যা করা।
- পারিবারিক মূল্যবোধ ও রক্ষণশীলতার অভাব।
- যুব সমাজের নৈতিকতার চরম অবক্ষয়।
- পর্ণগ্রাফি, অশ্লীল সিনেমা, অশ্লীল ম্যাগাজিন, বিলবোর্ডে নারীর সহজলভ্যতা।
- নারীকে পুরুষের চোখে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন।
- পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণে উগ্র -অর্ধ নগ্ন পোশাক, ফ্রি-মিক্্িরং যার কারণে নারীর প্রতি পুরুষের মর্যাদা বোধ কমে যাচ্ছে।
- নেশা জাতীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা।
- অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহার, ইন্টারনেটে নিয়ন্ত্রণহীন পর্ণগ্রাফি,চটির ছড়াছড়ি যুব সমাজকে অশ্লীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
- নির্যাতনকারীর যথাযথ বিচার না হওয়া।
- নৈতিক শিক্ষা বিবর্জিত ভোগবাদী ও সহশিক্ষা।
- নারীদের জন্য আলাদা ট্রান্সপোর্ট না থাকা।
- সম্পূর্ণ নারীদের ব্যবস্থাপনায় নারীদের জন্য আলাদা হাসপাতাল না থাকা।
- নারীর স্বীয় অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অসচেতনতা।
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সরকার প্রণীত কিছু আইন : নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা রোধে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হলোও জ্যামিতিক হারে নারী নির্যাতন বেড়েই চলেছে।
- যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন -১৯৮০
- নারী নির্যাতন (প্রতিরোধ শাস্তি) আইন -১৯৮০
- অর্থনৈতিক কর্মকান্ড দমন আইন -১৯৯৫
- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন- ২০০০
- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধিত) -২০০৩
- মাতৃত্ব সুবিধা আইন
- মহিলা ও শিশু উন্নয়ন আইন
- জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১
- জাতীয় শিশু নীতি-২০১১
- পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০
- জাতীয় শিশু নীতি-২০১১
- মাদক পাচার বিরোধী অধ্যাদেশ-২০১২
নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিকারে করণীয় :
ইসলামই নারী মুক্তির একমাত্র পথ : আজ থেকে ১৫শত বছর পূর্বে জীবন্ত প্রোথিত করা হতো কন্যা সন্তানকে, নারীকে অধিকার দেওয়া তো দূরের কথা মানুষ হিসাবেও স্বীকৃতি দেওয়া হতো না। সেই জাহেলিয়াতী সমাজের নিষ্পেষিত, নিপীড়িত, নিগৃহীত নারীকে মুক্তি দিয়েছিল যে আলোকরশ্মি সেই আলোকরশ্মিই পারে বর্তমান নারী সমাজকে দিতে তাদের কাংখিত মুক্তি। নারীর মুক্তির লক্ষ্যে ইসলাম যে পদক্ষেপ নিয়েছে:
মহান আল্লাহ বলেন-তোমরা পুরুষ হও বা নারী হও আমি তোমাদের কারো আমল বিনষ্ট করবো না। তোমরা সবাই একই জাতির অন্তর্ভুক্ত।১৫
ইসলামে নারীর মর্যাদা : কন্যা-জায়া-জননী-সহোদরারূপে নারীকে সুমহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে ইসলাম।
মাতা হিসাবে নারীর মর্যাদা : আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আমার সর্বাপেক্ষা সে বললো: হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অগ্রাধিকারী কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি বললো, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে আবারও জিজ্ঞেস করলো, তারপর কে ? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করলো, তারপর কে ? তিনি বললেন, তোমার পিতা।১৬
কন্যা হিসাবে নারীর মর্যাদা : আনাস ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি দু’টি কন্যা সন্তান লালন-পালন করবে, আমি এবং সে একত্রে এভাবে পাশাপাশি বেহেশতে প্রবেশ করব। এই বলে তিনি নিজের হাতের দু‘টি আংগুল একত্র করে ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন।১৭
স্ত্রী হিসাবে নারীর মর্যাদা : মহান আল্লাহ বলেন-আল্লাহর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটি একটি যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জীবন সঙ্গীনীদের সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাদের সাহচর্যে পরিতৃপ্তি ও প্রশান্তি লাভ করতে পার, সেজন্যই তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও মমতা দান করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে বহু নিদর্শন রয়েছে।১৮
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : তোমাদের মধ্যে সেই -ই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম।১৯
বোন হিসাবে নারীর মর্যাদা : আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন - যার তিনটি কন্যা বা তিনটি বোন আছে, অথবা দু‘টি কন্যা বা দু‘টি বোন আছে, সে তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করলে এবং তাদের (অধিকার) সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করলে তার জন্য বেহেশত নির্ধারিত রয়েছে।২০
সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিত করণ : আমাদের সমাজে নারীকে বিভিন্ন কূট-কৌশল অবলম্বন করে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। অথচ মহান আল্লাহ বলেন: পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে, তা থেকে কম হোক বা বেশী হোক। এ অংশ (আল্লাহর পক্ষ থেকে) নির্ধারিত।২১
মোহরানার অধিকার : বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে কোন ব্যক্তি কোন মহিলার উপর স্বামীতে¦র অধিকার অর্জন করার বিনিময় স্বরূপ যে অর্থ-সম্পদ দান করে তাকে মোহর বলে। ফিকহবিদদের মতে, মোহর ব্যতীত বিয়ে জায়েয নয়। যতদিন মোহর আদায় করা হবে না ততদিন এটা স্বামীর ঘাড়ে ঋণ হিসাবে ঝুলতে থাকবে। মহান আল্লাহ বলেছেন- তোমরা নারীদের সন্তুষ্ট চিত্তে মোহর দিয়ে দাও।২২
বিবাহে মত প্রদানের অধিকার : আবু হুরায়রা রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: বিধবা স্ত্রীলোকের পরামর্শ ও প্রকাশ্য অনুমতি ছাড়া তাকে বিয়ে দেয়া যাবে না এবং কুমারী স্ত্রীলোককে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেয়া যাবে না। আরয করা হলো: হে আল্লাহর রাসূল ! তার (কুমারী) অনুমতি কিভাবে নেয়া যাবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: নীরব থাকাই তার অনুমতি।২৩
নৈতিক পবিত্রতা রক্ষায় বিবাহের নির্দেশ : মহান আল্লাহ বলেন: তোমরা তাদের মোহরানা আদায় করে দিয়ে বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে তাদের রক্ষক হবে। তোমরা অবাধ যৌনাচারে লিপ্ত হতে পারবে না আর লুকিয়ে লুকিয়েও প্রেম করতে পারবে না।২৪
গৃহাঙ্গনে নারী : ইসলাম নারীর জন্য গৃহাঙ্গনকেই তার প্রকৃত কর্মক্ষেত্র হিসাবে নির্ধারণ করেছে। গৃহের যাবতীয় বিষয় নারী পরিচালনা করবে নারীর নিকট এটাই ইসলামের দাবী। তবে পুরুষকে নারী তত্ত্বাবধায়ক করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন- আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করো এবং পূর্বের জাহেলী যুগের মতো সাজসজ্জা দেখিয়ে বেড়িও না। সালাত কায়েম করো, যাকাত দাও এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো। আল্লাহ তো চান, তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূর করতে এবং তোমাদের পুরোপুরি পাক- পবিত্র করে দিতে।২৫
ইবনে উমার থেকে বর্ণিত, তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং নিজ অধীনস্ত লোকদের ব্যাপারে সে দায়ী। শাসক একজন দায়িত্বশীল এবং কোন ব্যক্তি তার পরিবারের লোকদের দায়িত্বশীল। কোন মহিলা তার স্বামীর গৃহের ও তার সন্তানদের দ্বায়িত্বশীল। অতএব তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং অধীনস্ত লোকদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।২৬
তবে গৃহেও নারীর নিরাপত্তা  নিশ্চিত করতে ইসলাম কিছু বিধি-বিধান আরোপ করেছে-
- নারী মাহরাম আত্মীয় ব্যতীত অন্য কারো সাথে দেখা দিবেনা।
আল্লাহ বলেন, তারা যেন তাদের সাজসজ্জা প্রকাশ না করে, তবে নিম্নোক্তদের সামনে ছাড়া স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, নিজের মেলামেশার মেয়েদের,নিজের মালিকানাধীন দাস-দাসী, অধীনস্থ যৌনকামনামুক্ত পুরুষ এবং এমন শিশুদের সামনে যারা মেয়েদের গোপন বিষয় সম্পর্কে এখনো অজ্ঞ।২৭
মাহরাম কারা : কুরআনের এই আয়াত ও হাদীসের আলোকে মহিলাদের জন্য মাহরাম ব্যক্তি ১৪ জন। তারা হলেন-
১.স্বামী, ২.পিতা ৩. শ্বশুর, ৪.ছেলে, ৫.স্বামীর ছেলে, ৬. ভাই, ৭.ভাইয়ের ছেলে, ৮.বোনের ছেলে, ৯. ঘনিষ্ঠ স্ত্রীলোক, ১০ নিজেদের মালিকানাধীন দাস-দাসী, ১১.কামনাহীন অধীনস্ত পুরুষ ১২.নারীদের গোপন বিষয় বুঝে না এমন বালক।
২. হাদীসের আলোকে দুইজন- ১.মামা ও দুধ মামা ২.চাচা ও দুধ চাচা।
য় নারীর ঘরে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করা। মাহরাম হলেও মালিকানাধীন দাস-দাসী, বালেগ ও না-বালেগ সন্তানেরা তিনটি সময়ে অনুমতি না নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করবে না।
এসম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন: হে ঈমানগণ! তোমাদের মালিকানাধীন দাম-দাসী ও না-বালেগ সন্তানেরা তাদের অবশ্যই তিনটি সময়ে অনুমতি নিয়ে তোমাদের কাছে আসা উচিত : সালাতুল ফজরের আগে, দুপুরে যখন তোমরা পোশাক ছেড়ে রেখে দাও ও সালাতুল ইশার পরে। এই তিনটি তোমাদের গোপনীয়তার সময়।২৮
- একান্তই প্রয়োজনে গায়রে মাহরামদের সাথে কোন কথা বলতে হলে পর্দার আড়াল থেকে অ-আকর্ষণীয় সুরে স্বাভাবিক কন্ঠে কথা বলতে হবে।
পবিত্র কুরআনে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে: হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা সাধারণ নারীদের মতো নও, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করে থাকো, তাহলে মিহি স্বরে কথা বলো না, যাতে মনের গলদে আক্রান্ত কোন ব্যক্তি প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে, বরং সোজা ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলো।২৯
বহিরাঙ্গনে নারী : ইসলাম নারীকে শুধুই গৃহকোণে জড়পদার্থের মত আটকে রেখেছে-বলে অনেকেই বলে থাকলেও এটা আসলে ভুল প্রচারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ ইসলাম প্রয়োজনে নারীকে বাইরে যেতে কোন রকম বাধা দেয় না। তবে কিছু বিষয় মেইনটেইন করে নারী বাইরে বের হবে, যাতে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়।
 আয়শা (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ...... নারী কে তার প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।৩০
বাইরে বের হতে হলে যে বিষয়গুলো নারীকে মেইনটেইন করতে হবে :
- বিনা প্রয়োজনে বাহিরে না যাওয়া।
- গায়রে মাহরাম পুরুষদের থেকে পর্দা করে চলা।
- গায়রে মাহরামদের সাথে আকর্ষণীয় সুরে কথা না বলা।
হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা সাধারণ নারীদের মতো নও, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করে থাকো, তাহলে মিহি স্বরে কথা বলো না, যাতে মনের গলদে আক্রান্ত কোন ব্যক্তি প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে, বরং সোজা ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলো।৩১
- গায়রে মাহরামদের নিকট নিজ সৌন্দর্য প্রদর্শন না করা। আল্লাহ বলেন- পূর্বের জাহেলী যুগের মতো সাজসজ্জা দেখিয়ে বেড়িও না।৩২
- দৃষ্টি সংযত রাখা।
- বাইরে বের হলে চাদরের একাংশ নিজ চেহারার উপর ঝুলিয়ে দেয়া।
- বাইরে বের হলে এমন জোরে জোরে চলা-ফেরা না করা যাতে লুকানো সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়ে যায়।
হে নবী মুমিন মহিলাদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে রাখেএবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। আর তাদের সাজ সজ্জা না দেখায় যা নিজে নিজে প্রকাশ হয়ে যায় তা ছাড়া। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে। ...... তারা যেন নিজদের যে সৌন্দর্য তারা লুকিয়ে রেখেছে তা লোকদের সামনে প্রকাশ করে দেবার উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তাওবা কর, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।৩৩
পুরুষের দৃষ্টি সংযত রাখার নিদের্শনা : ইসলাম শুধু নারীকে নয় বরং পুরুষকেও নারীর প্রতি সম্মান আরোপ করতে আদেশ করে। শারীরিক নির্যাতন তো দূরের কথা বরং চোখের সামান্যতম ইশারা দিয়েও নারীকে যেন নারীকে মানসিকভাবে নির্যাতন না করা হয়। বিব্রত করা না হয় তাই ইসলাম পুরুষকে স্বীয় দৃষ্টি সংযত রাখার আদেশ দিয়েছে। আল্লাহ পাকের নির্দেশ: হে নবী! মুমিন পুরুষদের বলে দাও তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাজাত করে। এটি তাদের জন্য বেশী পবিত্রতম পদ্ধতি। যা কিছু তারা করে আল্লাহ তা জানেন।৩৪  (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ