ঢাকা, মঙ্গলবার 3 October 2017, ১৮ আশ্বিন ১৪২8, ১২ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নবী নন্দিনী হযরত ফাতিমাতুযযোহরা (রাঃ)

-প্রফেসর মুহাম্মদ আব্দুল জলিল মিঞা
॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
ফাতেমার মর্যাদা : হযরত ফাতিমার মহত্ব ও মর্যাদার পিছনে রয়েছে তার অতুলনীয় গুণাবলী, মধুর চরিত্র, ঈমান-আমল, ইবাদত, রিয়াজত আল্লাভীরুতা, নবীপ্রেম, আধ্যাত্মিক সাধনা, আন্তরিক পরিসুদ্ধি, শরীয়তের কঠোর অনুশীলন, স্বামী ভক্তি, সংযোমশীলতা, ধৈর্য্য সহ্য, শ্রমমেহেনত, নম্রতা-ভদ্রতা ও শিষ্টাচারীতা। এ সমস্ত গুণাবলী তাকে করেছে সৌভাগ্যশীলা এবং বিশ্ব মানবতার জন্য পাথেয়।
জান্নাতে নারীদের সর্দার হবেন মারইয়াম তারপর ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ (সা:) এর পর খাদিযা (আঃ) তারপর ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া।
আল্লাহ তায়ালা নারী সমাাজের মধ্যে হযরত ফাতিমা (রা:) কে যে ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য দান করেছেন, তার কোন নজির আর কোথাও নেই। হযরত ফাতিমার ফজিলত সম্পর্কে হদীস শরীফে উল্লেখ রয়েছে। (তিরমিযী, কিতাবুল মানাকেব)। তোমাদের অনুসরনের জন্য দুনিয়ার স্ত্রীদের মধ্যে মারইয়াম বিনতে ইমরান, খাদিযা বিনতে খুওয়ালিদ, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ (সা:) এবং ফেরাউনের স্ত্রী আছিয়া যথেষ্ট। সততা ও সত্যবদিতায় ফাতিমার কোন তুলনা ছিলনা। হযরত আয়শা (রা:) বলেন, আমি ফাতিমার চেয়ে সত্যবাদি আর কাউকে দেখিনি। অবশ্য তার পিতার কথা স্বতন্ত্র। তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী। (আল এস্তীআব পৃষ্ঠা ৭৭২)।
রাসূল (সা:) কোন সফর থেকে ফিরে এসে প্রথমে হযরত ফাতিমা (রা:) এর ঘরে যেতেন। (উসুদুল গাবা পৃষ্ঠা ৫২৩)। তিনি হযরত ফাতিমা (রা:)কে যতটা ভালবাসতেন অন্যকোন সন্তানকে ততটা ভালবাসতেন না। অথচ তার কোন কোন বোন তার চেয়ে বেশী বুদ্ধিমতি ও রুপবতী ছিলেন। কিন্তু হযরতের কাছে হযরত ফাতিমা (রা:) ছিলেন সবচেয়ে প্রিয়। সুনানে আবু দাউদ)
রাসূল (সা:) ফাতিমাকে বলেন, তোমার সন্তুষ্টিতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, আর তোমার রাগ ও উম্মায় আল্লাহ ক্রদ্ধ হন। (উসুদুল গাবা পৃষ্ঠা ৫২২)।
নবীজী কোন যুদ্ধ বা সফর থেকে ফিরে প্রথমে মসজিদে যেতেন, দু’রাকাত নামাজ পড়তেন, পরে পযরত ফাতিমর ঘরে যেতেন। এরপর স্ত্রীদের কাছে যেতেন। (আল এস্তীআব পৃষ্ঠা ৭৭১)। কোন এক তাবেয়ী হযরত আয়শা (রা:) কে জিজ্ঞেস করেন, রাসূলে খোদা সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন কাকে? জবাবে তিনি বলেন, নারীদের মধ্যে হযরত ফাতিমা (রা:) আর পুরষদের মধ্যে হযরত আলী (রা:) কে। (আল এস্তীআব পৃষ্ঠা ৭৭২)।
হযরত ফাতিমা জীবনে সকল কাজে রাসূলে খোদাকে অনুসরণ করতেন। হযরত আয়শা সিদ্দিকা (রা:) বলেন, আমি উঠা বসা, চাল চলন, এবং কথা বলার ভাব ভঙ্গিতে রাসূলে (সা:) এর সাথে হযরত ফাতিমার চেয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ কাউকে দেখিনি। হযরত ফাতিমা নবীজীর নিকট আগমন করলে তিনি উঠে দাড়াতেন, কপালে চুমু খেতেন এবং নিজের স্থানে বসাতেন। (আবু দাউদ, হযরত আয়শার বর্ণনায়)।
আবার পিতা তার ঘরে গেলে মেয়ে উঠে দাঁড়াতেন, পিতাকে চুমু দিতেন এবং নিজের স্থানে নিয়ে বসাতেন।
হযরতের চেহারার সাথে ফাতিমার চেহারার অনেক মিল ছিল। আয়েশা সিদ্দিকা (রা:) বলেন, আমার চক্ষু হযরত ফাতিমা (রা:) পর রাসূলুল্লাহর (সা:) এর চেয়ে উত্তম আর কাউকে দেখিনি। (আল এছবাহ পৃষ্ঠা ৭২৬)। নবীজী বলেন, ফাতিমা আমার দেহের একাংশ। যে তাকে নারাজ করবে সে আমাকে নারাজ করবে (সহীহ্ বুখারী পৃষ্ঠা ২৩২)।   
হযরত ফাতিমার (রা:) ইবাদত বন্দেগী : বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় দেখা যায়, ফাতিমা (রা:) এর পুরো জীবনটাই অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে কেটেছে। তবুও তার ইবাদত বন্দেগীতে সামান্যতম ঘাটতি ছিলনা। ইবাদত বন্দেগীতে তিনি ছিলেন অনড়-অটল। হযরত ঈমাম হোসাইন (রা:) বর্ণনা করেছেন ‘আমার মা সৈয়দা ফাতিমা (রা:) কে সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত আল্লাহর কাছে রোদন করতে দেখেছি, তাকে খুব বিনয়ের সাথে কাকুতি মিনতি করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেও শুনেছি। কিন্তু এ প্রার্থনায় একবার ও তিনি আল্লাহর কাছে নিজের জন্য কিছু চাননি।
হযরত হাসান বসরী (র:) থেকে জানা যায়, তিনি বলেছেন, নবী নন্দিনী ইবাদাতের দিকে এমনই মজবুত ছিলেন যে, সারা রাত নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতেন। একবার অসুস্থ অবস্থায় ও  সারারাত ইবাদতে কাটালেন। সকালে হযরত আলী (রা:) যখন ফজরের নামজ পড়তে মসজিদে রওনা হলেন তখন হযরত ফাতিমা (রা:) তিনিও ফজর পড়তে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাজ শেষ করে যাঁতা পিষতে শুরু করলেন। আলী (রা:) নামাজ শেষে ফিরে এসে ফাতিমা (রা:) কে যাতা পিষতে দেখে বললেন ‘হে আল্লাহ্র রাসূলের কন্যা এত পরিশ্রম কর না, কিছুক্ষণ আরাম করো। তা না হলে অসুখ বেড়ে যেতে পারে। উত্তরে ফাতিমা (রা:) বললেন, আল্লাহ্র ইবাদত এবং আপনারই তা’য়াত বা আনুগত্য অসুখের সর্বোত্তম চিকিৎসা। এর মধ্যে যদি কোনটি মৃত্যুর কারণও হয় তাহলে তার চেয়ে বেশি আমার জন্য আর সৌভাগ্যের কি হতে পারে”।
হযরত সালমান ফারসী (রা:) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন “নবীজীর হুকুম মত আমি একবার মা খাতুনে জান্নাতের বাড়ীতে গেলাম। ছেলে ঘুমাচ্ছিল, তিনি হাতপাখা দিয়ে তাকে বাতাস করছিলেন এবং মুখে কোরআন আবৃত্তি করছিলেন।
বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় দেখা যায়, দোযোখের আযাব সম্পর্কে আয়াত নাজিল হওযার পর রাসূল (সা:) কাঁদছিলেন। তাদেখে সাহাবাগণও কাঁদতে লাগলেন, কিন্তু কেউই কাঁদার কারণ কি  জানতে পারছিলেন না। সাহাবারা জানতো যে, ফাতিমা (রা:) কে দেখলে রাসূল (সা:) শত কষ্টের মধ্যেও শান্ত হন। তাই তাকে খবর পাঠানো হলো। খবর পেয়ে ফাতিমা (রা:) মসজিদে ছুটে এলেন। তখন ফাতিমা (রা:) পড়নে দশ-বার জায়গায় তালি দেয়া একটা কম্বল ছিল। সাহাবারা নবী নন্দিনীর এ দৃশ্য দেখে আরো জোড়ে কাঁদতে লাগলেন।
হযরত ফাতিমা এসেই রাসূল (সা:) কে উদ্দেশ্য করে বললেন, আব্বাজান! আপনার কান্নার কারণ কী? রসূল (সা:) দোযখের আযাব সংক্রান্ত নাজিলকৃত আয়াত তাকে পড়ে শোনালেন। নবী দুলালী হযরত ফাতিমতুযযোহুরা (রা:) দোযখের ভয়াবহ আযাবের কোরআনিক বর্ণনা শুনে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। জ্ঞান ফিরলে তিনি বার বার ঐ আয়াত পড়ে কাঁদতে লাগলেন।
এ সময় আল্লাহ পাক তার করুণা সম্পর্কিত আয়াত নাজিল করলেন। তখন রাসূল (সা:) আল্লাহর করুণার কথা স্মরণ করে সেজদা করলেন।
একবার ফাতিমা (রা:) কে জিজ্ঞাস করলেন, প্রিয় কন্যা! মহিলাদের কি কি গুণ থাকা উচিত। ফাতিমা (রা:) বললেন! আব্বাজান মহিলাদের উচিত আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করা, সন্তানদের প্রতি স্নেহবৎসল হওয়া, নিজের দৃষ্টি অবনত রাখা, নিজের রূপ গোপন রাখা, নিজে অপরকে না দেখা এবং অন্যেও যাতে দেখতে না পায় সে ব্যবস্থা করা।
রাসূল (সা:) এর ঘরে আবু সুফইয়ান : রাসূল (সা:) এর মক্কা অভিযানের খবর যথা সময়ে মক্কায় পৌঁছে গেল। পৌত্তলিক কুরাইশদের হৃদয় কম্পন শুরু হয়ে গেল। তারা ভাবতো এবার আর রক্ষা নেই। অনেক চিন্তা ভাবনার পর তারা মদিনা বাসীদেরকে তাদের সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখার জন্য আবু সুফইয়ান ইবনে হারব (উম্মু হাবীবা রামলা (রা:) এর বাবা) কে মদিনায় পাঠলো। কারণ ইতোমধ্যে তার কন্যা উম্মু হাবীবা রামলা (রা:) ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং রাসূল (সা:) তাকে বেগমের মর্যাদা দান করেছেন। সুতারাং তাদের ভাবনা তাকে দিয়েই এ কাজ সম্ভব হবে।
তিনি কোন উদ্দেশ্যে কিভাবে মদিনায় প্রবেশ করেছেন জবাবে আবু সুফইয়ান বললেন, মক্কাবাসীরা মুহাম্মাদ (সা:) এর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য তার তার সাথে একটা আপোষ রফা করার উদ্দেশ্যে তাকে পাঠিয়েছে। তিনি নিজের পরিচয় গোপন করে মদিনায় ঢুকে পড়িছেন, এবং সরাসরি  নিজের কন্যা উম্মুল মু’মিনীন উম্মু হাবীবা রামলা (রা:) এর ঘরে উপস্থিত হয়েছেন। সেখানে রাসূল (সা:) এর বিছানায় বসার জন্য উদ্যত হতেই নিজ কন্যার নিকট বাধা প্রাপ্ত হয়েছেন। কারণ তিনি একজন মুশরেক, অপবিত্র। আল্লাহ রাসূল (সা:) এর পবিত্র বিছানায় বসার যোগ্যতা তার নেই। কন্যা বিছানাটি গুটিয়ে নেন। মনে বড় ব্যাথা নিয়ে তিনি নবী (সা:) এর নিকটে যান এবং তার সাথে অভিযানের ব্যাপারে কথা বলেন। কিন্তু তিনি তার নিকট থেকে কোন জবাব পাননি। হযরত আবু বকর (রা:) এর নিকট থেকেও একই আচরণ লাভ করলেন। তারপর যান হযরত ওমর (রা:) নিকট তিনি তার বক্তব্য শুনে বলেনঃ আমি যাব তোমার জন্য সুপারিশ করতে রাসূল (সা:) এর নিকট? আল্লাহর কসম! ভূমিতে উৎগত সামান্য উদ্ভিদ ছাড়া আর কিছুই যদি না পাই তা দিয়েই তোমাদের সাথে লড়বো। (ইবনে হিসাম, আস-সীরাহ ৮/৩৮)। অবশ্য পরে তিনি (আবু সুফইয়ান) রাসূল (সা:) এর সামনে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন।
পিতার অন্তিম রোগশয্যায় ফাতিমা (রা:) : হিজরী ১১ সনের সফর মাসে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ পয়ে পড়লেন। বিদায়ের পয়গাম আস্তে আস্তে এগিয়ে এল। পিতা মেয়েকে ডেকে পাঠালেন। সঙ্গে সঙ্গে পিতার ডাকে সাড়া দিয়ে তার গৃহের দিকে রেবিয়ে পড়লেন। রাসূলের শয্যাপাশে তখন হযরত আয়েশা (রা:) সহ অন্য বেগমগণ বসা। এ সময় ধির স্থীর ও গম্ভীরভাবে কন্যা ফাতিমাকে এগিয়ে আসতে দেখে পিতা তাকে স্বাগতম জানালেন এভাবে মারহাবা য়্যাবেনতি আমার মেয়ে! স্বাগতম! তারপর তাকে চুমু দিয়ে ডানপাশে বসান এবং কানে কানে বলেন, তার সময় ঘনিয়ে এসেছে। ফাতিমা কেঁদে ফেলেন। তার সেই কান্না থেমে যায় যখন পিতা তার কানে কানে আবার বলেনঃ (তাবাকাত ৮/১৬, বুখারীঃ বাবু আলামাত  আন নুবুওয়াহ, মুসলীম)। আমার পরিবার বর্গের মধ্যে তুমি সর্বপ্রথম আমার সাথে জান্নাতে মিলিত হবে। আর তুমি গোটা বিশ্বের রমনীদের সর্দার হবে, এটা কি তোমার পছন্ন না? এ কথা শুনার সঙ্গে সঙ্গে ফাতিমার মুখম-ল আনন্দের সাড়া ফুটে উঠলো। তিনি কান্না থামিয়ে হেসে দিলেন। পরে আয়েশা (রা:) ফাতিমা (রা:)কে এক সুযোগে জিজ্ঞেস  করেনঃ তোমার পিতা কানে কানে তোমাকে কি বলেছেন? জবাবে তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহর গোপন কথা প্রকাশ করতে পারিনা। (ত্বাবাক্বাত ৮/১৬)  ফাতিমা (রা:) এই কথাগুলোর জবাব দিয়েছেন রাসূলের ইন্তেকালের পর।
অসুস্থতার অন্তিম পর্যায়ে তিনি অন্যান্য স্ত্রীর কাছে হযরত আয়েশা (রা:) এর গৃহে অবস্থানের অনুমতি চান এবং তাদের সবার অনুমতি লাভ করেন।
ফাতিমা (রা:) সব সময় এমন কি রাত জেগে অসুস্থ পিতার সেবা শুশ্রুষা করতে থাকেন। ধৈর্য্যরে সাথে সেবার পাশাপাশি অত্যন্ত বিনয় ও বিনম্র ভাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে পিতার সুস্থতার জন্য দু’আ করতে থাকেন। এত কিছুর পরও যখন উত্তরোত্তর রোগের প্রকোপ বেড়ে যেতে লাগল এবং কষ্টের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়ে চললো, ফাতিমা (রা:) তখন হাতে পানি নিয়ে অত্যান্ত দরদের সাথে পিতার মাথায় দিতে থাকেন। পিতার এ কষ্ট দেখে কান্নায় কন্ঠরোধ হওয়ার উপক্রম হয়। কান্নাজড়িত কন্ঠে অসুচ্চ স্বরে উচ্চারণ করেনঃ আব্বা! আপনার কষ্ট তো আমি সহ্য করতে পারছিনা। পিতা তার দিকে স্নেহমাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে অত্যান্ত দরদের সাথে উত্তর দেন আজকের দিনের পর তোমার আব্বার আর কোন কষ্ট নেই। (বুখারী ফাতলুল বাযী ৮/১০৫, মুমনাফে আহমদ ৩/১৪১, ত্বাবাক্বাত ২/২)। পিতাকে হারিয়ে ফাতিমা দারুণভাবে শোকাহত হয়ে পড়লেন। এ অবস্থায় দুদিনের মধ্যেই সাকীফা বানু সাঈদা চত্তরে খলিফা হিসাবে আবু বকর (রা:) এর হাতে বায়মত সম্পন্ন হয়।
রাসূলের ইন্তেকালে পিতার উত্তরাধিকার দাবী : প্রিয় নবীর ইন্তেকালের পর মীরাস সম্পর্কে প্রশ্ন উঠে। ফাতিমা (রা:) সোজা আবু বকর (রা:) এর নিকট গেলেন এবং তার পিতার উত্তরাধিকার বণ্টনের আবেদন জানালেন। আবু বকর (রা:) সাথে সাথে তাকে রাসূলুল্লাহ (সা:) এর এ হাদীসটি শোনান।
আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই সবই সাদাকা হয়। তার কোন উত্তরাধিকার হয় না। তারপর আবু বকর (রা:) বলেন, এরপর আমিতা কিভাবে বণ্টন করতে পারি? এ জবাবে ফাতিমা (রা:) একটু রুষ্ট হলেন। (মুসলিম ফিল জিহাদ ওয়াম  ১৭৫৯, বুখারী ৬/১৩৯, ১৪১, ৭২৫ পৃষ্ঠা ফিল মাগাবী)  ফাতিমা ঘরে ফিরে এসে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এ রকম ও বর্ণিত আছে যে, আবু বকর (রা:) এর জবাবে ফাতিমা (রা:) দুঃখ পান এবং আবু বকর (রা:) এর প্রতি এত নারাজ হন যে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার সাথে কোন কথা বলেননি। কিন্তু ঈমাম আশ শাহাবী (রহঃ) এর একটি বর্ণনায় জানা যায়, ফাতিমা (রা:) যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন আবু বকর (রা:) তার গৃহে যান এবং সাক্ষাতের অনুমতি প্রার্থনা করেন। আলী (রা:) ফাতিমা (রা:) এর নিকট গিয়ে বলেন, আবু বকর (রা:) তোমার সাথে সাক্ষাত করতে চাচ্ছে। ফাতিমা (রা:) আলী (রা:) কে প্রশ্ন করলেনঃ আমি তাঁকে সাক্ষাতের অনুমতি দিই তাতে কি তোমার সম্মতি আছে? আলী (রা:) বললেন হ্যাঁ। ফাতিমা (রা:) অনুমতি দিলেন। আবু বকর (রা:) ঘরে ঢুকে কুশল বিনিময়ের পর বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি আমার অর্থবিত্ত পরিবার পরিজন গোত্র সবকিছু পরিত্যাগ করতে পারি, আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল (সা:) এবং আপনারা আহ্লি বায়ত তথা নবী পরিবারের সদস্যদের সন্তুষ্টির বিনিময়ে। আবু বকর (রা:) এমন কথায় হযরত ফাতিমা (রা:) মনের সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। তিনি খুশী হয়ে যান (তাবাকাত ৮/২৭)। ঈমাম আয যাহাবী (রহঃ) এ তথ্য উল্লেখ করার পর মন্তব্য করেছেন। স্বামী গৃহে অন্য পুরুষের সঙ্গে সাক্ষত  করতে হলে স্বামীর অনুমতি নিতে হয়- এ সুন্নাত সম্পর্কে ফাতিমা (রা:) অবহিত ছিলেন। এ ঘটনা দ্বারা সে কথা জানা যায়। (মিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা ২/২২১) এখানে উল্লিখিত বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় হযরত ফাতিমা (রা:) অন্তরে পূর্বে কিছু অসন্তুষ্টি থাকলেও পরে তা দূর হয়ে যায়। তাছাড়া একটি বর্ণনায় এ কথাও জানা যায় যে, ফাতিমা (রা:) মৃত্যুর পূর্বে আবু বকর (রা:) এর স্ত্রীকে অসীয়ত করে যান , মৃত্যুর পরে তিনি যেন তাকে গোসল দেন। (নিসা মুবাসসারাত বিল জান্নাহ- ২২৪  টিক নং ১)।
ফাতিমা (রা:) ইন্তেকাল : হযরত ফাতিমা (রা:) আরও তিন বোন ছিলেন। তারাও যৌবনেই বিদায় নেন। রাসূলে কারীম (সা:) এর মৃত্যুর কতদিন পর হযরত ফাতিমা (রা:) ইন্তেকাল করেন। এ ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন মতামত লক্ষ্য করা যায়। তবে বিশুদ্ধ মত এটাই যে, রাসূলে করীম (সা:) এর ইন্তেকালের ছয়মাস পরে হিজরী ১১ সনের ৩ রামাযান মঙ্গলবার  রাতে ২৯ বছর বয়সে ফাতিমা (রা:) ইন্তেকাল করেন। রাসূলুল্লাহর ভবিষ্যৎবানী আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই সর্বপ্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে- সত্য পরিনত হয়। (মিয়ারু আ’লাম আন’নুবালা ২/১২৭)।
আল ওয়াকিদী বলেছেনঃ হিজরী ১১ সনের ৩ রামাযান ফাতিমা (রা:) এর ইন্তেকাল হয়। হযরত আব্বাস (রা:) জানাযার নামায পড়ান। হযরত আলী (রা:) কাফন ও আব্বাস (রা:) কবরে নেমে দাফন কাজ সম্পন্ন করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি কিছু অসীয়ত করে যান।
(১) যেন রাতের আঁধারে তাকে দাফন করা হয়।
(২) জানাযায় যেন ভির না হয় অর্থাৎ মৃত্যু সংবাদ যেন খুব বেশি প্রচারিত না হয়।
(৩) যদি গোসলের প্রয়োজন পড়ে, তবে তা যেন সম্পন্ন করেন হযরত আসমা বিনতে উমাইস (রা:) তার সাহায্যে থাকবেন আলী (রা:)।
(৪) তার কবর যেন চিহ্নিত না থাকে।
এ কথাও বর্ণিত আছে যে, আলী (রা:) মতান্তরে আবু বকর (রা:) জানাযার নামায পড়ান। স্বামী আলী ও আসমা বিনতে উমাইস (রা:) তাকে গোলস দেন। (আল ইসাতী আব ৪/৩৬৭, ৩৬৮, আনসাব-আল আশরাফ ১/৪০২, ৪০৫)।
হযরত ফাতিমার মৃত্যু-পীড়া সম্পর্কে ইতিহাসে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না, অবশ্য এটা জানা যায় যে, কোন কঠিন পীড়ায় তার ইন্তেকাল হয়নি। ফলে মৃত্যুর আগে অনেকদিন শয্যাশায়ী থাকতে হয়নি। উম্মু সালমা (রা:) বলেন, ফাতিমা (রা:) ওফাতের সময় আলী (রা:) পাশে ছিলেন না। তিনি আমাকে ডেকে পাঠান এবং বলেন, আমার গোসলের জন্য পানির ব্যবস্থা করুন। নতুন কাপড় বের করে দিলাম। তিনি উত্তমরুপে গোসল করে নতুন কাপড় পড়েন। তারপর বলেন, আমার বিছানা করে দিন। বিশ্রাম করবো। আমি বিছানা করে দিলাম। তিনি কিবলা মুখী হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। তারপর আমাকে বলেন, আমার বিদায়ের সময় অতি নিকটে। আমি গোসল করেছি। দ্বিতীয় বার গোসল দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমার পরিধেয় বস্ত্রও খোলার প্রয়োজন নেই। এরপর তিনি মৃত্যুর কোলে ঢেলে পড়েন। আলী ঘরে ফেরার পর আমি তাকে এসব ঘটনা বললাম। তিনি ফাতিমা (রা:) সেই গোসলকেই যথেষ্ট মনে করলেন এবং তাকে সেই অবস্থায় দাফন করেন। (আ’লাম আন-নিসা ৪/১৩১) এ রকম বর্ণনা উম্মু রাফি থেকেও পাওয়া যায়। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, আলী (রা:) মতান্তরে আবু বকর (রা:) এর স্ত্রী তাকে গোসল দেন। (তাবাকাত-৮/১৭, ১৮, সিয়ারু আ’লাম, আন নুবালা ২/১২৯)।
কবর : ঐতিহাসিক আল ওয়াফিদি বলেন, আমি আব্দুর রহমান ইবনে আবিল মাওলাকে বললাম, বেশীর ভাগ মানুষ বলে থাকে ফাতিমা (রা:) কবর জান্নাতুল বাকীতে। এ ব্যাপারে আপনার মত কি? তিনি জবাব দিলেন জান্নাতুল বাকীতে তাকে দাফন করা হয়নি। তাকে আকীলের বাড়ীর এক কোণে দাফন করা হয়েছে। তার কবর ও রাস্তার মধ্যে ব্যবধান ছিল প্রায় সাত হাত। (সাহাবিয়াত ১৫৩)।
লেখক পরিচিতি : লেখক অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আব্দুল জলীল মিঞা ১৯৪০ সালের ৭ জানুয়ারী গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা থানার পূর্ব অনন্তপুর গ্রামের এক এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম আলহাজ্ব মাওঃ আকবর হোসেন, যিনি দিল্লী এব বেনারসে দীর্ঘদিন লেখাপড়া শেষে দেশে ফিরে আজীবন মাদরাসার প্রধান মুহাদ্দিস হিসেবে দীনের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। মাতা মরহুমা মেহেরুন্নেছা অত্যন্ত ধার্মিক মহিলা ছিলেন। নিজে গ্রামের পার্শ্ববর্তী কওমী মাদরাসায় পিতার কাই লেখকের আরবী শিক্ষার হাতেখড়ি। প্রায় ছয় বছর কওমী মাদরাসাতেই তিনি কুরআন-হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে লেখাপড়া করে আরবী শিক্ষার উপর দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করেন। পাশাপাশি প্রাইমারী স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে স্থানীয় হাইস্কুলে ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া শেষে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে উচ্চ শিক্ষার আশা নিয়ে ১৯৫৮ সালে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বগুড়া জিলা স্কুলে ৮ম শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৬১ সালে তিনি বগুড়া জিলা স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে তৎকালিন ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। পিতার প্রধান শিক্ষক এবং ৮ম শ্রেণী থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণী পর্যন্ত আরবী কমপালসরি বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে ছোটবেলা থেকেই এ বিষয়ের উপর ব্যৃৎপত্তি অর্জনের চেষ্ট করেন।
১৯৬৭ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে এম,এ ডিগ্রী লাভ করেন। মাস্টার্স ডিগ্রী নেয়ার পর তিনি কলেজের অধ্যাপনাকের জীবনের মহান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। সেই সুবাদেই ১৯৬৮ সালের ২ মার্চ তিনি বগুড়া জেলার সোনাতলা নাজির আখতার কলেজে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃত বিভাগের লেকচারার হিসেবে যোগদান করে কর্মজীবন শুরু করেন। ৮০ এর দশকে তিনি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে প্রায় ছয় বছর কাজ করেন এবং একপর্যায়ে প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালের ১ নভেম্বর তিনি অত্র সরকারী কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৯২ সালের ১৮ জুলাই সহযোগী অধ্যাপকের পদোন্নতি পেয়ে মানিকগঞ্জ সরকারী দেবেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন। অত্র কলেজে সুদীর্ঘ ৯ বছর চাকুরী শেষে মেহেরপুর সরকারী কলেজে বদলী হন। তিনি ২০০১ সালে প্রফেসর হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে দেশের ঐতিহ্যবাহী অন্যতম বৃহত্তম কলেজ সরকারী বিএল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, দৌলতপুর খুলনায় বিভাগীয় চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেন। চাকুরী জীবনের গোধুলী লগ্নে এসে ২০০১ সালের ৮ অক্টোবর আবারো পূর্বের ১ম কর্মস্থল বগুড়া জেলার সোনাতলা সরকারী নাজির আখতার কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা বিভাগের বিভিন্নমুখী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন।
২০০২ সালের ২৩ এপ্রিল তৎকালীন সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের চ্যান্সেল ২এর দুই বছরের জন্য সরকারী নাজির  আখতার কলেজের প্রিন্সিপ্যাল প্রফেসর মুহাম্মদ আব্দুল জলীল মিঞাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে মনোনীত করেন। তিনি দু’বছর সফলভাবে রাজশীহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালের ১৩ নভেম্বর তিনি অধ্যক্ষ হিসেবেই অবসর গ্রহণ করেন।
লেখকের প্রকাশিত বই সমূহ
১। রাসূলুল্লাহ (সা:) এর নামায ও জরুরী দু’আ
২। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোযা
৩। শবেক্বদর, শবেবরাত ও ইতেকাফ
৪। দু’আ তাওবা ও ইস্তেগফার
৫। সহীহ হজ্জ ও উমরাহ্ শিক্ষা
৬। শবেবরাত কি সৌভাগ্য রজনী?
৭। নবী নন্দিনী হযরত ফাতিমাতুযযোহ্রা (রা:)। (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ