ঢাকা, মঙ্গলবার 3 October 2017, ১৮ আশ্বিন ১৪২8, ১২ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খাদিজা হত্যাচেষ্টার বছর পূর্তি আজ

কবির আহমদ, সিলেট থেকে : দেশে-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের মেধাবী ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস হত্যাচেষ্টার আজ মঙ্গলবার ১ বছর পূর্তি। ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় (শাবি) শাখার ছাত্রলীগের অন্যতম সহ-সাধারণ সম্পাদক বদরুল আলম ওরফে চাপাতি বদরুল প্রেম প্রত্যাখ্যান করায় মেধাবী খাদিজাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে।

সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের বিএসএস ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী খাদিজাকে এমসি কলেজের পুকুর পাড়ে পৈশাচিক কায়দায় তার হাতের ধারালো চাপাতি দিয়ে কুপায়। এই কুপানোর দৃশ্য ফেইসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশে-বিদেশে ক্ষোভের আগুন জ¦লে উঠে। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের ইমরান কবির সাহস করে খাদিজাকে ঐদিন সিলেট ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।

ঘাতক বদরুলকে ছাত্র জনতা গণধোলাই দিয়ে শাহপরাণ থানা পুলিশের কাছ সোপর্দ করেন। বর্তমানে দেশে-বিদেশে ঘৃণিত ছাত্রলীগ ক্যাডার বদরুল ওরফে চাপাতি বদরুলকে নিয়ে দেশ-বিদেশের মানুষের জানার আগ্রহ বেড়েছে। সিলেটের কেন্দ্রীয় কারাগারে যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত আসামী বদরুল কেমন আছেন এ নিয়ে আজকে দৈনিক সংগ্রামের প্রতিবেদন।

ছাত্রলীগ ক্যাডার বদরুল ওরফে চাপাতি বদরুল বর্তমানে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজার হালতে রয়েছেন। তবে এগুলো মানতে নারাজ জেল কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, জেল কোড অনুযায়ী সাজাপ্রাপ্ত আসামী বদরুল তার সাজা ভোগ করছেন।

গতকাল সোমবার দুপুরে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে তার রুমে কথা হয় সিনিয়র জেল সুপার আব্দুল জলিলের সাথে। তিনি জানান, বদরুলের যখন যাবজ্জীবন সাজা হয় তখন তিনি সিলেটে ছিলেন না। পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে এই ঘটনা দেখেছেন। তবে জেল কোড অনুযায়ী বদরুল তার সাজা খাটছে বলে জানান তিনি।

কথা হয় জেলার আবু ছায়েম এর সাথে। তিনি জানান, চলতি বছরের ৮ মার্চ সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক আকবর হোসেন মৃধা আসামী বদরুলকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়ার পর থেকে বদরুল জেল কোড অনুযায়ী সাজা খেটে আসছে। প্রথমে সে নতুন আসামীদের নাম তালিকাভুক্ত করতো, এরপর কিছুদিন সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের অক্ষর জ্ঞান দান করতো। গত ৩ মাস থেকে সিলেট কারাগার হাসপাতালে রাইটার হিসাবে কাজ করছে। আবু ছায়েম জানান, সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের মধ্যে শিক্ষিত আসামী কম থাকায় তাকে দিয়ে এই কাজ করানো হচ্ছে। আবু ছায়েমের পাশের চেয়ারে বসা হাসপাতালের ডাক্তার মিজানুর রহমানও অনুরূপ কথা জানালেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিলেট কারাগারে বেশ কয়েকজন কারারক্ষী সংগ্রামকে জানান, সন্ত্রাসী বদরুলকে দিয়ে রাইটারের কাজ না করিয়ে আরো অনেক কষ্টজনক কাজ ছিলো সেটা করানো যেতো। বেতের মোড়া তৈরি করা এবং পানি উঠানো সহ আরো অনেক কাজ ছিলো। কিন্তু কেন যে কর্তৃপক্ষ দেশে-বিদেশে ঘৃণিত একজন সন্ত্রাসীকে দিয়ে রাইটারের কাজ করিয়ে নিচ্ছেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে আসা সিলেটের টুকেরবাজার এলাকার জায়েদ আহমদ জানান, চাপাতি বদরুল সিলেট কারাগারে এখন রাজার ছুরতে রয়েছে। তার মধ্যে কোন অনুতপ্ত হওয়ার লক্ষণ জেলে থাকা বন্দীরা দেখছেন না। তিনি আরো জানান, সে যদি কোন দিন বের হয়ে আসতে পারে তবে খাদিজা সহ তার পরিবার পরিজনকে দেখে নেয়ার হুমকিও দিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। 

ছাত্রলীগ ক্যাডার বদরুলকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেছেন সিলেট মহানগর আদালত। গত ৮ মার্চ বুধবার দুপুরে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক আকবর হোসেন মৃধা বাংলায় এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের পাশপাশি ৫ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো দুই মাসের কারাদন্ড প্রদান করেছেন উক্ত আদালতের বিজ্ঞ বিচারক। 

২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর সোমবার পৈশাচিক কায়দায় খাদিজা হত্যাচেষ্টা মামলার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় দেশ-বিদেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় প্রদান করা হলো। ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর এমসি কলেজ পুকুর পারে ছাত্রলীগ ক্যাডার বদরুলের হামলার শিকার হন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস। রায় প্রদানকালে বদরুলকে আদালতে হাজির করা হলেও অসুস্থতার কারণে খাদিজা উপস্থিত ছিলেন না। 

মামলার বাদী যা বলেন : বর্বরোচিত এ হামলার ঘটনায় খাদিজার চাচা আবদুল কুদ্দুস বাদী হয়ে বদরুলকে একমাত্র আসামি করে এসএমপির শাহপরাণ থানায় ২০১৬ সালের ৪ অক্টোবর মামলা দায়ের করেন। আজ ৩ অক্টোবর মঙ্গলবার ঘটনার ১ বছর পূর্তিতে তিনি দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, আমার ভাতিজি খাদিজাকে হত্যাচেষ্টা মামলার একমাত্র আসামী বদরুলের বিরুদ্ধে ৮ মার্চ সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিজ্ঞ বিচারক যে রায় দিয়েছেন এতে তিনি সন্তুষ্ট ও খুশী। আমরা আশা করছি, উচ্চ আদালতে যদি আসামিপক্ষ আপিল করে, তবে সেখানেও এই রায় বহাল থাকবে। আর কোন বদরুল যেন কোন মেয়ের উপর এইভাবে হামল করতে না পারে। তিনি আরো জানান, খাদিজাকে নিয়ে এখনও দুশ্চিন্তায় আছেন আগামী মাসে তার বাম হাতের দুইটি আঙ্গুলে অপারেশন হতে পারে। তাছাড়া নিয়মিত সিলেটের সিআরপিতে গিয়ে ফিজিওথ্যারাপি নিচ্ছেন খাদিজা। তিনি আরো জানান, আমরা শুনেছি বদরুল জেল থেকে হুমকি দিচ্ছে। এ ব্যাপারে আমরা আইনের আশ্রয় নেবো। গতকাল সোমবার সিলেট সদর উপজেলার আউশা গ্রামে খাদিজাদের বাড়িতে আলাপকালে দৈনিক সংগ্রামকে খাদিজা বলেন, ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর এমসি কলেজের পুকুর পাড়ে সন্ত্রাসী হামলার কথা আজো আমার মনে পড়ে। তিনি গত ৮ মার্চের বিজ্ঞ আদালতের রায় উচ্চ আদালতে বহাল থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। খাদিজা জানান, তিনি এখনও পড়তে চান, তার প্রিয় সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়ে তার সহপাঠীদের সাথে আগের মতো জমিয়ে আড্ডা দিতে চান।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর বিকেলে সিলেট এমসি কলেজে পৈশাচিক কায়দায় হামলার শিকার হন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের স্নাতক শ্রেণীর ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিস। খাদিজাকে কোপানোর দায়ে ঘটনাস্থল থেকে জনতা শাহজালাল বিশ্ববদ্যিালয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদরুল আলমকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। বদরুলের চাপাতির আঘাতে খাদিজার মাথার খুলি ভেদ করে মস্তিষ্কেও জখম হয়। খাদিজাকে কোপানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পেলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

এদিকে, ঘটনার পরদিন খাদিজার চাচা আব্দুল কুদ্দুস বাদী হয়ে দন্ডবিধির ৩০৭, ৩২৪ ও ৩২৬ ধারায় বদরুলকে একমাত্র আসামি করে শাহপরান থানায় মামলা করেন। ওইদিনই বদরুলকে বহিষ্কার করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গত ৫ অক্টোবর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বদরুল। গত ৮ নবেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগরীর শাহপরান থানার এসআই হারুনুর রশীদ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে ১৫ নভেম্বর আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। ২৯ নবেম্বর আদালত বদরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। চলতি বছরের গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন খাদিজা। এর মাধ্যমে মামলার ৩৬ সাক্ষীর মধ্যে ৩৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয় এবং আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ৮ মার্চ বুধবার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন সিলেট মহানগর দায়রা জজ। গত ৮ মার্চই ছাত্রলীগ নেতা বদরুলের যাবৎজীবন রায় ঘোষণা করেন সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচার আকবর হোসেন মৃধা। রায় ঘোষণার পর খুশীতে ফেটে পড়েন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা, শিক্ষকবৃন্দ কৃতজ্ঞতা জানান আদালতের প্রতি। খাদিজার বাড়িতেও আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। দুই আঙ্গুল উঁচু করে ভি চিহ্ন দেখিয়ে খাদিজা আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। দেশবাসীর দোয়া কামনা করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ