ঢাকা, মঙ্গলবার 3 October 2017, ১৮ আশ্বিন ১৪২8, ১২ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশকে তার পাঁচ দফার ওপর অটল থাকতে হবে

সাদেকুর রহমান : পরিকল্পিত ও সুদূরপ্রসারী কূটচালের অংশ হিসেবেই মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির দফতরের কেবিনেট মন্ত্রী মি. কিও তিন্ত সোয়ে ঢাকায় ঝটিকা সফরে এসে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গতকাল সোমবার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের’ কথা বলা হলেও তা অস্পষ্ট হওয়ায় এ নিয়ে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। পরাক্রমশালী দেশ চীন-রাশিয়ার ভেটোর মুখে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষ্ফল আলোচনার পর গতকালের এ কথিত ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রেক্ষিতে বাস্তুচ্যুত, ভাগ্যবিড়ম্বিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ আরো অনিশ্চিয়তার মধ্যে পড়লো। বিশ্বজনমতকে উপেক্ষা করে রাখাইনে বর্বরোচিত ‘জাতিগত নিধন’, বার বার চুক্তি ভঙ্গের পর নতুন করে যৌথভাবে কাজ করার প্রস্তাবে ঢাকার সম্মত হওয়াকে বাংলাদেশ ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিলো কি-না সে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া, সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্য যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে তখন সেখানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের নিয়ে গেছে দেশটির সরকার। অন্যদিকে মংডুতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্র রাখাইন মগরা এখনো রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে মাইকিং করছে।

রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার টালবাহানা করলেও ‘বিগ পাওয়ার’ রাজনীতির কবলে পড়ে বাংলাদেশকে পালিয়ে আসা ওই সব মানুষগুলোকে আশ্রয় দিয়েছে। একই সাথে ধরেই নিয়েছে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হবে। সে কারনে স্বল্পমেয়দী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ। নতুন করে আসা ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুর মৌলিক চাহিদা পূরণকল্পে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় ত্রাণ বিতরণসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

মানবতাবাদী বিশ্বের চাপ ও তীব্র সমালোচনার মুখে মিয়ানমারের নেত্রী শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চির দফতরের কেবিনেট মন্ত্রী মি. কিও তিন্ত সোয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল রোববার রাতে ঢাকায় আসে। গতকাল সকালে রাজধানীর হেয়ার রোডে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সফররত মি. কিও তিন্ত সোয়ের সঙ্গে বৈঠক হয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুপুরে সাংবাদিকদের জানান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার জন্য মিয়ানমার বাংলাদেশকে প্রস্তাব দিয়েছে।

বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে বৈঠকটি শুরু হয় সকাল ১১টার কিছু আগে। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব ড. কামাল আবদুল নাসের প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। মিয়ানমারের কেবিনেট মন্ত্রী ছাড়াও দেশটির উচ্চ পর্যায়ের দুই কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন ওই বৈঠকে। বৈঠক শেষে মিয়ানমারের তরফ থেকে কোন বক্তব্য দেয়া হয়নি।

বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয়েছে এবং সেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলেছে মিয়ানমার। এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সার্বিক তত্ত্বাবধানে দুই দেশ একটি ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা উভয়ে সম্মত হয়েছি। এই জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের কম্পোজিশন কী হবে- সেটা আমরা বাংলাদেশও ঠিক করব, ওরাও ঠিক করবে। সম্মতিটা হয়েছে এই আলোচনায়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য বৈঠকে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলকে ওই চুক্তির খসড়াও হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে খসড়ার বিষয়বস্তু কী সে বিষয়ে কিছু জানান নি তিনি।

বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে ‘নিরাপত্তা সহযোগিতার’ বিষয়েও ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ আলোচনা হয়েছে এবং বাংলাদেশ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ পুনর্ব্যক্ত করেছে বলে মাহমুদ আলী জানান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আরও আলোচনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল শিগগিরই মিয়ানমার সফরে যাবেন। আমরা যেটা বলে আসছি প্রথম থেকে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে আমরা এই সমস্যার সমাধান করতে চাই। দুই পক্ষই তাতে একমত হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া কবে শুরু হবে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটা সভা দিয়েতো সব সমাধান হবে না। জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপটা তৈরি করতে হবে। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে দেব, ওরা ওদের পক্ষ থেকে দেবে। এটা খুব তাড়াতাড়ি করেছি। যে বিষয়গুলো বাকি রয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে সেগুলোর সমাধান করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ কবে নাগাদ গঠন হবে জানতে চাইলে তিনি শুধু বলেন, “খুব শিগগিরই হবে।”

বৈঠক সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্যাবলী এবং দায়িত্বশীলদের উপরোক্ত বক্তব্যে কোথাও দেখা যাচ্ছে না যে, মায়ানমারের সাথে এই আলোচনায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতিসংঘে যে ৫ দফা পেশ করেছেন, সে ব্যাপারে কোন আলোচনা হয়েছে কিনা। পর্যবেক্ষকদের সুস্পষ্ট অভিমত এই যে, রোহিঙ্গা সমস্যার সত্যিকার সমাধান করতে হলে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক জাতিসংঘে পেশকৃত ৫ দফার ভিত্তিতেই হতে হবে। 

উল্লেখ্য, গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা সঙ্কটের মূল কারণগুলো তুলে ধরে, তা নিরসনে পাঁচ দফা প্রস্তাব বিশ্ব নেতাদের সামনে তুলে ধরেন। প্রস্তাবগুলো হচ্ছে, অনতিবিলম্বে এবং চিরতরে মিয়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ করা, অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করা, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা এবং এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলা, রাখাইন রাজ্য হতে জোরপূর্বক বিতাড়িত সকল রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। মায়ানমারের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সমাধানের এই পাঁচ দফা কোনভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

যদি দফাগুলো এড়িয়ে কোন চাপে বা অন্য কোন কারনে রোহিঙ্গা সমস্যার কোন সমাধান চাওয়া হলে বিপদটা বাংলাদেশের ঘাড়েই চাপবে। এখন যে বিশ্বজনমত সৃষ্টি হয়েছে, এই মুহুর্তে সমস্যার সমাধানে না করা গেলে, পরে মায়ানমারকে রাজি করানো যাবে না, আর মায়ানমার দ্বিপাক্ষিক আলোচনার নামে সময় ক্ষেপণ করে এটাই চাইছে।

এদিকে, মংডু ও এর উপকন্ঠে অবস্থিত গ্রামগুলোতে থাকা রোহিঙ্গারা গতকালও এ পাশে থাকা স্বজনদের জানিয়েছেন, মংডুতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্র রাখাইন মগরা এখনো রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে মাইকিং করছে। এ নিয়ে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারাও পড়েছে জটিল সমীকরণের ফাঁদে। সদ্য সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রাণ হাতে নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা একাধিক রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেবল দেশে ফেরত নেয়াটাই সংকটের সঠিক সমাধান নয়। এর স্থায়ী সমাধানের জন্য অবশ্যই বাংলাদেশ, জাতিসংঘ ও অন্যান্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ এটা হয়তো আন্তর্জাতিক চাপে সৃষ্ট ঘায়ে ‘মলম’ লাগানোর চেষ্টা মিয়ানমারের। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য অবশ্যই দেশটিকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে সেদেশের আরো ১৩৫টি জনজাতির মতো স্থায়ী সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর স্বীকৃতি দিতে হবে। একই সঙ্গে সেই দেশের অন্য সবার মতো সব সুযোগ সুবিধা ভোগের অধিকার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে। দিতে হবে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনেরও অধিকার।

টেকনাফের সাবরাংয়ের মুন্ডের ডেইল এলকায় মংডু শহরতলির সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ঢাকা সফরে এসে রোহিঙ্গাদের নিজভূমে ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব করছেন। অথচ অন্যদিকে মংডুতে আজও রোহিঙ্গা মুসলমানদের দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে চলে আসার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। সেনাবাহিনির সহায়তায় রাখাইন মগ ও স্বপক্ষ ত্যাগকারী রোহিঙ্গা ‘হুকুমতের গোলাম’ বা ‘থাব্বে’ বাহিনির লোকেরা সেদেশে এখনও থেকে যাওয়া রোহিঙ্গাদের হুমকি ধমকি দিয়ে দেশছাড়া করছে। এরা এখনো হত্যাকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে এবং অসহায় রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে হামলা করছে ও আগুন লাগাচ্ছে।

উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া আবুল কালাম জানান, গতকালও মংডু শহরাঞ্চল (টাউনশিপ) ও এর আশপাশের এলাকায় রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে সেনাবাহিনির পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়েছে বলে তার ভাগিনা নুরুল আমিন টেলিফোনে জানিয়েছেন। দেশ না ছাড়লে রোহিঙ্গাদের বাড়িবাড়ি গিয়ে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দিচ্ছে উগ্রবাদী রাখাইন মগরা। এই অবস্থায় তারা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়া হবে বলে সুচির দফতরের মন্ত্রীর দেয়া প্রস্তাবে আর আস্থা রাখতে পারছে না। বরং দুই একদিনের মধ্যে বাংলাদেশে চলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন।

এদিকে মংডুর টমবাজার এলাকা দিয়ে গতকালই বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সাখাওয়াত হোসেন জানান, গ্রামের পর গ্রাম রোহিঙ্গাশূন্য করেও থেমে নেই রাখাইন মগ ও সেনাবাহিনীর বেপরোয়া ধ্বংসকান্ড। এখন পরিত্যক্ত গ্রাম ও বাড়িগুলোতে আগুন দেয়ার কাজ চলছে। এদিন সকালে উখিয়ার পালংখালি ইউনিয়নের আঞ্জুমান পাড়া দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন সাখাওয়াত। তিনি বলেন, রাখাইনের প্রায় সব সড়কেই এখনো যান চলাচল প্রায় বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রতিটি সড়কেই রয়েছে সেনাবাহিনীর চেক পোস্ট এবং টহল। কেবল বাংলাদেশমুখী একটি রাস্তা খোলা রয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা সেনাবাহিনীর সামনাসামনি না পড়ার জন্য জঙ্গল ও পাহাড়ের দুর্গম পথেই বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

এদিকে রোববার দিবাগত রাতে বাংলাদেশে আসা একাধিক রোহিঙ্গা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এখনো মাইকিং চলায় এবং মগ ও হুকুমতের হামলা চলায় সোমবার রাতেও তাদের স্বজনরা বাংলাদেশে আসছেন। নাফ নদী পার হয়ে রাতের প্রথম জোয়ারেই তারা শাহপরী দ্বীপে এসে পৌঁছবেন।

এদিকে ল্যাদা ক্যাম্প এলাকায় থাকা মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, মিয়ানমার হয়তো বিশ্বকে বোকা বানানোর জন্য রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের উচিত হবে আনান কমিশনের রিপোর্ট পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ দেয়া অব্যাহত রাখতে বিশ্ববাসীকে রাজি করানো।

মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের মুখে গত ২৫ অগাস্ট থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ লাখ ৭ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তারা বলছেন, সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ মারছে। রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম।

মিয়ানমারের নেত্রী সু চি সেনাবাহিনীর এই অভিযানকে ‘সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই’ হিসেবে বর্ণনা করলেও জাতিসংঘ একে চিহ্নিত করেছে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে। রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি দেখতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে সেখানে যেতে দিচ্ছে না মিয়ানমার সরকার। এমনকি সেখানে আইসিআরসি ছাড়া অন্য কোনো সংস্থাকে ত্রাণ দিতেও বাধা দেয়া হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় তিনি বলেন, রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের উপর যে সহিংসতা হয়েছে তা মধ্যাঞ্চলেও বিস্তৃত হতে পারে এবং সেখানে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। চীন ও রাশিয়ার মতো পরাক্রমশালী দেশের বিরোধিতার মুখে কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই ওই দিন নিরাপত্তা পরিষদের বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠক শেষ হয়। 

পাঁচ দশকের বেশি সময় সামরিক শাসনে থাকা মিয়ানমারে গত বছর সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সু চির দল ক্ষমতায় এলেও এখনও দেশটির স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক মন্ত্রণালয় দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে। সম্প্রতি মিয়ানমার ঘুরে আসা বৃটিশ প্রতিমন্ত্রী মার্ক ফিল্ড ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, অং সান সু চি সব রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতে চান বলে তাকে আশ্বস্ত করেছেন। সু চি একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছেন এবং তিনি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যে একটি সঠিক পথ বের করার চেষ্টা করছেন। তবে দেশটির সেনাবাহিনী তার কথা শুনবে কিনা তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন সুচি। অবশ্য মিয়ানমার প্রথমদিকে রোহিঙ্গা নিধনের বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়ে একের পর এক কূটকৌশল নিতে থাকে। হিন্দু রোহিঙ্গাদের হত্যার দায় মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া, নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের দিন আকষ্মিক বাংলাদেশ থেক রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া ঘোষনা ছিল তাদের চাতরীপনারই অংশ।

এদিকে মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী উ উইন মিত আয়ে রাখাইনের মংডু এলাকায় ‘যত দ্রুত সম্ভব’ রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন ও পুনর্বাসন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন বলে গত বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে জানায় নির্বাসিত বার্মিজদের ওয়েবসাইট ইরাবতী। সেখানে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন ও পুনর্বাসনের জন্য দুই বিলিয়ন কিয়াটের একটি কর্মসূচি নেয়া হয়েছে, যাতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যকার ১৯৯৩ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় শরণার্থীদের নিবন্ধন করা হবে। মংডুর দার গি জার গ্রামে পুনর্বাসনের আগে তাংপিও লেতওয়ে ও না খুয়ে ইয়া গ্রামে তাদের নিবন্ধন হবে।

মিয়ানমারের শ্রম, অভিবাসন ও জনসংখ্যা মন্ত্রণালয়ের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি উ মিন্ট কেইং ওই দিন ইরাবতীকে বলেন, দেশে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য যাদের মনোনীত করা হবে তাদের ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড (এনভিসি) দেয়া হবে। ‘রোহিঙ্গা’ স্বীকৃতি না থাকায় এই মুসলিম জনগোষ্ঠী ওই এনভিসি নিতে আপত্তি জানিয়ে আসছিল বলে ইরাবতীর প্রতিবেদনে বলা হয়।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংস ঘটনার পর এই পর্যন্ত ৫ লাখ ৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য পালিয়ে এসেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। যা এখনও টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপসহ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে অনুপ্রবেশ অব্যাহত আছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে সাড়ে ৫ লাখ রোহিঙ্গা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রোববার বিকেলে ‘আইওএম’র মুখপাত্র লোম ক্রিসের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘সরকারের নিয়ম অনুযায়ী আশ্রয়ের জন্য পালিয়ে আসা এসব রোহিঙ্গাদের জন্য উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন শিবিরে আবাসন, স্যানিটেশন, ওষুধ ও খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। প্রতিদিন এসব মানুষের বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ‘আইওএম’ সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। 

রাখাইনে বিদেশি কূটনীতিকদের নিয়ে গেলো মিয়ানমার : বার্তা সংস্থা এপি জানায়, ইতিপূর্বে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলকে বাধা দিলেও গতকাল রাখাইন রাজ্যে বিদেশি কূটনীতিক ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিকে পরিদর্শনে নিয়ে গেছে মিয়ানমার সরকার। তিনটি দলে ভাগ করে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। মংডুর জেলা প্রশাসক ইয়ে টুট এই তথ্য জানিয়েছেন।

২৫ আগস্ট শুরু হওয়া রাখাইনের সর্বশেষ সহিংসতায় পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগ তুলেছে। রাখাইনে ত্রাণ সংস্থা, সাংবাদিক ও বাইরের কাউকে প্রবেশ করতে না দেয়ায় মিয়ানমার সরকার সমালোচনার মুখে রয়েছে। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের একটি প্রতিনিধি দলকে প্রবেশ করতে দেয়নি সরকার। এই পরিস্থিতিতে গতকাল কূটনীতিকদের রাখাইনে নিয়ে গেলো।

জেলা প্রশাসক ইয়ে টুট জানান, তিনটি দলে ভাগ করে তাদেরকে সহিংসতা কবলিত কয়েকটি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। এর বেশি তথ্য তিনি দেননি। কোন কোন দেশের প্রতিনিধিরা রয়েছেন তাও জানাননি।

রাখাইনের স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, কূটনীতিকরা জঙ্গিদের হামলায় নিহতদের আত্মীয় ও ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলবেন। তারা মংডুর হিন্দু, ¤্রাে ও ডায়াগনেট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে কথা বলবেন। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা মোয়ে জাউ জানান, গতকাল সকালে কূটনীতিকদের রাথেউডাং শহরের আনাউট পাইন গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। এই গ্রামের রোহিঙ্গা মুসলিমরা পালিয়ে যায়নি।

রোহিঙ্গাদের জন্য সাড়ে ৭ কোটি ডলার চায় বিশ্ব খাদ্য সংস্থা : বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য জরুরি সহায়তা হিসেবে আগামী ছয় মাসে সাড়ে ৭ কোটি ডলার প্রয়োজন জানিয়ে দাতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা। রোববার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় কেন্দ্র ঘুরে দেখার পর জাতিসংঘের এ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বিসলি সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা মাত্র কয়েক বিলিয়ন ডলার পেলেই বিশ্ব থেকে ক্ষুধার অবসান ঘটাতে পারি। দাতাদের আমি বলছি, আপনারা যদি আমাদের ওই টাকা দিতে না পারেন, তাহলে যুদ্ধ বন্ধ করুন।” শরণার্থী ক্যাম্প ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা জানিয়ে ডেভিড বিসলি বলেন, “এটা ভয়াবহ এক পরিস্থিতি। এর চেয়ে খারাপ আর কিছু হতে পারে না। আগামী ছয় মাসে আমাদের দরকার অন্তত ৭৫ মিলিয়ন ডলার।”

গত ৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ জানিয়েছিল, ওই সময় পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গার জন্য সমন্বিত ত্রাণ তৎপরতায় প্রাথমিক হিসাবেই অন্তত ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার প্রয়োজন। এর মধ্যে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ লাখ ৬৪ হাজার ডলার জোগাড় করা সম্ভব হয়েছে, যা প্রাথমিক পরিকল্পনার ৪৭ শতাংশ।

সারাবিশ্বকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে বলল ইরান : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাসেমি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিজদেশে ফিরিয়ে নেয়া ও তাদের ওপর হতকান্ড, নির্বিচারে গণধর্ষণ, তাদের বাড়ি ঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট বন্ধে দেশটিকে আন্তর্জাতিক দাবি মেনে নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। তেহরান টাইমস এ খবর জানিয়ে বলেছে, ইরান গত কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন, সহিংসতা ও বর্তমানে তাদের ওপর এধরনের নির্যাতন অব্যাহত রাখার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, মিয়ানমারে এধরনের রোহিঙ্গাদের হত্যাকান্ড এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনা এখন মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। মিয়ানমার সরকার অব্যাহতভাবে এ ধরনের হত্যাকান্ড বন্ধ ও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক দাবি প্রত্যাখান করছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। মিয়ানমার সরকার রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ পাঠাতে পর্যন্ত দিচ্ছে না। নিজ দেশ ছেড়ে রোহিঙ্গা মুসলমানরা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সংখ্যা ৫ লক্ষাধিক ছাড়িয়ে গেছে। কাশেমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানান এবং তাদের ত্রাণ পাঠানোর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন বন্ধে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির কথা বলেন।

রোহিঙ্গাদের ত্রাণের জন্য ১৪টি গুদাম নির্মাণ শেষ পর্যায়ে : এদিকে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেছেন, মিয়ানমার থেকে আশ্রয়ের জন্য আসা কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সামগ্রী মজুদ রাখতে ১৪টি গুদামের নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে। ইতিমধ্যে পাঁচটি গুদামের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সব কাজ শেষ হবে। এসব গুদাম থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ দায়িত্বরত সেনাবাহিনী ও জেলা প্রশাসন বিতরণ করবে। গতকাল বিকেলে উখিয়ার ডিগ্রি কলেজ প্রাঙ্গণে রোহিঙ্গাদের জন্য অস্থায়ী ত্রাণ গুদাম পরিদর্শনকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। মন্ত্রী আরও বলেন, প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গাদের ত্রাণ আসছে। এই পর্যন্ত ৯শ’ মেট্রিক টন চাল রোহিঙ্গাদের জন্য মজুদ রয়েছে এবং চাল আসা অব্যাহত রয়েছে। এ সময় ত্রাণ সচিব শাহা কামালসহ সেনাবাহিনী, জাতিসংঘের প্রতিনিধি দল ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ