ঢাকা, বুধবার 4 October 2017, ১৯ আশ্বিন ১৪২8, ১৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রসঙ্গ: শব্দদূষণ

-হাফিজ ইকবাল
প্রাণীর যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হলো শব্দ। একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনের জন্য শরীরে রক্ত সঞ্চালনের মতোই একটি উপাদান। কিন্তু এই শব্দই আজ দূষিত করছে পরিবেশ। আবাসিক, অনাবাসিক এলাকা, অফিসপাড়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি হাসপাতালের আশপাশেও শব্দ দূষণের তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। শব্দ দূষণের মতো এই মারাত্মক ঘাতক থেকে জনসাধারণকে রক্ষা করতে আমাদের সচেতন মহল, শ্রমিক, মালিক, বাস চালক, মোটর বাইক চালকসহ সবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
শব্দ দূষণের বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানার আগে আমরা জেনে নেই শব্দ দূষণ কি? শব্দদূষণ বলতে মানুষের বা কোনো প্রাণীর শ্রুতিসীমা অতিক্রমকারী কোনো শব্দ সৃষ্টির কারণে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে বোঝায়। আসলে ‘‘শব্দ’’ পরিবেশের কোন খারাপ উপাদান নয়। বরং শব্দ আমাদের জীবনযাপনের জন্য এক অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু শব্দ দূষণ পরিবেশের এক চরম বিরক্তিকর উপাদান। জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি এই শব্দ দূষণ। ইন্ডিয়ার বিখ্যাত পরিবেশ বিজ্ঞানী ঘ. গধহরাধংধশধস-এর মতে, ‘‘ভৌত পরিবেশে (বিশেষত বায়ু মাধ্যমে) শ্রুতিসীমা বা সহনক্ষমতা বহির্ভূত অপেক্ষাকৃত উচ্চ-তীব্রতা বা তীক্ষèতা সম্পন্ন শব্দের (বিশেষ করে সুরবর্জিত শব্দ বা নয়েজ) উপস্থিতিতে জীব-পরিবেশ তথা মানুষের উপর যে অসংশোধনযোগ্য ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি হয়, সেই পরিবেশ সংক্রান্ত ঘটনাকে শব্দ দূষণ বলে’’ অন্যভাবেও বলা যায় যেমন, বজ্রপাত অথবা মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন উপকরণের মাধ্যমে যে বিকট শব্দ; যা সাধারণভাবে মানুষের শ্রবণসহন ক্ষমতার বাইরে ও মানুষের শ্রবণ শক্তির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং মানুষের মস্তিষ্ক ও দেহে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করে তাকে শব্দ দূষণ বলে। বিভিন্ন উপকরণের মাধ্যমে শব্দ দূষণ হয়ে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ডিজেল ও পেট্রোলচালিত ইঞ্জিন যেমন বাস, ট্রাক, লরি, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, টেম্পু ইত্যাদির হাইড্রোলিক হর্ন (৬০-৯০ ডেসিবল)। রেলগাড়ির হুইসেল (৯০-১১০ ডেসিবল), পটকা, বাজি (৯০-১২০ ডেসিবল), ডিজেল চালিত জেনারেটর (৮০ ডেসিবল), ঝগড়া বিবাদে পারস্পরিক উচ্চ স্বরে কথা বলার সময় (পুরুষের ১২০ হার্জ এবং নারীর ২৫০ হার্জ), মিছিল, মিটিং এ স্লোগান, লাউড স্পিকার ও মাইকের মাধ্যমে (১১০ ডেসিবল), (ঢোল ১০০ ডেসিবল), নিউজপেপার প্রেস (১০০ ডেসিবল), টেক্সটাইল, পাওয়ার লুম এবং চাবি পাঞ্চিং মেশিন (৮০ ডেসিবল), রেডিও, টেলিভিশন, ক্যাসেট প্লেয়ার (৪৫-৮০ ডেসিবল), জেড বিমান ও সুপারসনিক বিমান (১৪০ ডেসিবল), বিভিন্ন নির্মাণ কাজে (৬০-৮০ ডেসিবল), জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের সময় ঠধপ ট ঠধঃড়ৎ-এর শব্দ, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার (৯০-১০০ ডেসিবল), লঞ্চ, ফেরি, স্টিমারের ভেঁপু (৮০ ডেসিবল), হোটেল, বার কাউন্সিল, বাজার, খেলাধুলার মাঠ, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ইত্যাদিতেও অযাচিতভাবে শব্দ দূষণ হয়ে থাকে।
আমাদের দেহের যথেষ্ট সংবেদী অঙ্গ কান। উচ্চ শব্দ আমাদের কানের পর্দাকে অনেক জোরে ধাক্কা দেয়। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে এই উচ্চ শব্দের কারণে আমাদের কানের পর্দা নষ্টও হয়ে যেতে পারে। আর কানের পর্দা নষ্ট হওয়া মানে হচ্ছে চিরকালের জন্য কানে না শোনা। উচ্চ শব্দে গান শুনতে খুবই মজা লাগে বা কানে হেডফোন লাগিয়ে অনেক জোরে গান শোনার অভ্যাসটা আমরা বদলাইতে পারি না ! কিন্তু আমরা কি জানি এর প্রতিক্রিয়া কতোটা মারাত্মক ? আমরা আসলে ক্ষণিকের আনন্দের জন্য আমাদের জীবনের অনেক বড় বিপদ ডেকে আনছি। একটা পরীক্ষায় দেখা গেছে উচ্চ শব্দযুক্ত পরিবেশে যারা বসবাস করে বা কাজ করে তাদের শ্রবণ শক্তি দশ বছরের মধ্যে প্রায় অর্ধেক হ্রাস পায়।
বাহ্যিকভাবে শব্দদূষণ তেমন কোন ক্ষতিকর মনে না হলেও এটি মানুষের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। শব্দদূষণ এক নীরব ঘাতক। এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের শতকরা ১০০ % লোক শব্দ দূষণের শিকার। ‘‘পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপ অনুসারে সহনীয় মাত্রার চাইতে বেশি শব্দ মানুষের মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতার সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত শব্দ উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, মাথা ধরা, বদহজম, পেপটিক আলসার এবং অনিদ্রার কারণ ঘটায়। যে কোনও স্থানে আধাঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে মাইকে ১০০ মাত্রার শব্দ দূষণের মধ্যে কাউকে থাকতে হলে তাকে সাময়িক বধিরতার শিকার হতে হবে। দীর্ঘদিন উচ্চ শব্দের মধ্যে কাজ করলে যে কেউ বধির হয়ে যেতে পারে। যে কোনও ধরনের শব্দ দূষণ সন্তানসম্ভবা মায়ের জন্য গুরুতর ক্ষতির কারণ। পরীক্ষায় দেখা গেছে লস এঞ্জেল্স, হিথ্রো এবং ওসাকার মতো বড় বিমানবন্দরের নিকটবর্তী বসবাসকারী গর্ভবতী মায়েরা অন্য জায়গার চাইতে বেশি সংখ্যক পঙ্গু, প্রতিবন্ধী ও অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেয়।’’ ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ ডা. সোলায়মান খান বলেন, ক্রমাগত শব্দ দূষণের ফলে কানের টিস্যুগুলো আস্তে আস্তে বিকল হয়ে পড়ে তখন সে স্বাভাবিক শব্দ শুনতে পায় না। শিশুদের মধ্যে মানসিক ভীতি দেখা দেয়। মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে মানুসের কারোনারি হার্ট ডিজিজ হতে পারে। পরিবেশ গবেষক কাজী হেদায়েতুল ইসলাম বলেছেন, ‘‘শব্দ দূষণের ফলে, মানসিক ও শারীরিক বিপত্তি ঘটে থাকে। রক্তচাপ ও স্বাভাবিক হৃদ-কম্পন ব্যাহত হয়। শ্রবণশক্তি কমে যায়। বধির হবার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়। কণ্ঠনালির প্রদাহ, আলসার, মস্তিষ্কের রোগ হতে পারে। সাময়িক রক্ত প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হয়। হাসপাতালসমূহের রিপোর্ট অনুসারে আগত রোগীদের মধ্যে শতকরা ৫-৭ ভাগই অতিমাত্রার শব্দের ভুক্তভোগী এবং স্থায়ী বধিরতায় আক্রান্ত।’’
তাঁত শ্রমিকদের কর্ম পরিবেশে পাওয়ার লুমে ৮০ ডেসিবেল ও লাউড স্পীকারে ১১০ ডেসিবেল শব্দমাত্রা তৈরী করে। আর এই পরিমাপ শব্দ দূষণের ফলে দশ বছরের মাথায় এ সকল তাঁত শ্রমিক বধির হয়ে যাবে। এছাড়াও হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, পেপটিক আলসারসহ উপর্যুক্ত রোগগুলির প্রভাব পড়বে তাদের উপরে। সারা জীবনের অর্জিত সম্পদ ব্যয় করেও সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত নেয়ামত শ্রবণশক্তি আর ফিরে পাওয়া যাবে না। ফলে জগৎ সংসারে অন্যের উপর বোঝা হয়ে থাকতে হবে বাকি জীবনটুকু। ভোগ করতে হবে লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা।
নারায়ণগঞ্জে চাকুরীর সুবিধায় কিছু মিল-কারখানা পরিদর্শনের সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে কিছু কিছু মিল-কারখানায় দেখেছি উচ্চশব্দ সম্পন্ন কর্মস্থলে নিযুক্ত কর্মীদের কানে এক ধরনের বিশেষ হেডফোন লাগানো। যাতে করে এই উচ্চশব্দ সেখানে নিযুক্ত কর্মীর কোনো ক্ষতি করতে না পারে। যারা শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করেন তাদের কাছে একটা অনুরোধ এই দাবি আপনারা মালিকদের কাছে করবেন যে, ‘এ রকম উচ্চ শব্দ পরিবেশে নিযুক্ত কর্মীদের জন্য যেন অবশ্যই বিশেষ ধরনের হেডফোন সরবরাহ করা যাতে তাদের অমূল্য সম্পদ শ্রবণ শক্তি সহ দেহের অন্যান্য অঙ্গের কোনো ক্ষতি না হয়।” পাশাপাশি সকল শ্রমিক ভাইদের বিশেষ করে তাঁত শ্রমিকদের বলব, দয়াকরে এ রকম আত্মবিধ্বংসী কাজ(লাউড স্পিকার বাজানো) থেকে বিরত থাকুন!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ