ঢাকা, বুধবার 4 October 2017, ১৯ আশ্বিন ১৪২8, ১৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নজিপুর পাবলিক ক্লাবের ইতিহাসের সাক্ষী

মো: মনিরুজ্জামান চৌধুরী মিলন পত্নীতলা (নওগাঁ) : বর্তমান নওগাঁ জেলার পত্নীতলা থানার প্রাণকেন্দ্র নজিপুর স্থানটি ভারত বিভাগের পূর্ব থেকেই প্রসিদ্ধ। এ এলাকার জনসাধারণ তখন স্বচ্ছলভাবে জীবন যাপন করত। তাই পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষেও এ এলাকায় তেমন প্রভাব পড়েনি। ১৯৩১ সালে অত্র এলাকার প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নজিপুর উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠত হয়। বৃটিশ শাসনমলে বহুবিধ কারণে হিন্দু সম্প্রদায় শিক্ষায় অগ্রসর ছিল, যার জন্য  নজিপুর ও পার্শ্ববর্তী পাটিচরা ইউনিয়নের তাদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা ছিল। ১৯৬৩ সালে তখনকার নজিপুর ইউনিয়ন প্রেসিডেন্ট শ্রী শচীন কুন্ডু এবং পাটিচরা নিবাসী প্রভাবশালী ডা: শ্রী শিরিষ চন্দ্র নজিপুরে শিক্ষিত সমাজের রুচি সম্মত বিনোদনের জন্য একটি ক্লাব ঘর তৈরী করেন নজিপুর হাট ও থানা সংলগ্ন স্থানে। প্রথম দিকে ক্লাবটির প্রধান আকর্ষণ নাটক ড্রামার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বলে তা ড্রামাটিক ক্লাব নামে পরিচিত লাভ করে। পরবর্তীতে অনেক সাহিত্যানুরাগী এই ক্লাবে একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত করেন। এই পাঠাগারটি ক্রমেই অবিভুক্ত বাংলার নামীদামী কবি লেখকের কাব্য সাহিত্য ভরে যায়। তৎকালীন নজিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী বিনয় ভূষন, সহকারী শিক্ষক মোঃ আমীর আলীসহ বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকগণ এ ক্লাবের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
চল্লিশের দশকের প্রথম থেকেই সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার মুসলমানগণও এগিয়ে আসেন। তাদের দু’জন উভয়ে মরহুম জনাব মোহাম্মদ আলী সরদার ও রিয়াজ উদ্দীন মন্ডল এর সহযোগিতায়  ক্লাব ঘরটির উন্নয়ন সাধিত হয়। এছাড়াও তখনকার নজিপুরে ঢাকাইয়া ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচিত শশী বাবু ক্লাবের জন্য সার্বিক সহযোগিতা করেন। চল্লিশ দশকের শেষ দিকে উপ মহাদেশ বিভক্তির পর প্রভাবশালী হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে ভারতে চলে যাওয়ার পর শিক্ষিত মুসলমানগণ এই ক্লাবের তত্বাবধায়ক হন। নজিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধণ শিক্ষক ও ইউনিয়ন প্রেসিডেন্ট মরহুম খয়ের উদ্দীন আহমদ এর পৃষ্ঠপোষকতায় ক্লাবটি আবারো বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়। ইতিমধ্যে নজিপুরের স্থানীয় শিক্ষিত সমাজ ছাড়াও সরকারী কর্মকান্ডগণ এই ক্লাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হন। ১৯৪৮ সালে পর হতে কিছু দিনের জন্য আবু বক্কর সিদ্দিক ক্লাবের পরিচালনায় দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এইভাবে সাধারণ জনগণ ও সরকারী কর্মকর্তাদের চিত্তবিনোদনের একমাত্র প্রতিষ্ঠান নজিপুর পাবলিক ক্লাব নাম ধারণ করে।
১৯৫৬ সালে নজিপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ডা. আব্দুল মজিদ ক্লাব পরিচালনার দায়িত্বভাব গ্রহণ করেন এবং ইউনিয়ন করণিক প্রখ্যাত সাহিত্যিক নাট্যকার মোঃ নূরুল ইসলাম তাকে সার্বিক সহযোগিতা দান করেন।
এই সময়ই অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকেই ক্লাবের প্রভূত উন্নয়ন সাধন হয় যাদের অবদানে তারা হলেন বর্ডার ইন্সপেক্টর আফছার উদ্দীন, সিআই জনাব আলাউদ্দীন, সিও আব্দুল মান্নান ও রওশন আলী উপরোক্ত সরকারী কর্মকর্তাগণ সহ স্থানীয় তখনকার যুব কর্মী প্রাক্তন নজিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূ: আল: খাদেমুল ইসলাম, ডা: আব্দুল মজিদ, কাজী আব্দুল মজিদ, কাজী আব্দুল হামিদসহ অনেকেই এ থানার বিভিন্ন এলাকায় ক্লাবে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়। তারা ক্লাবে পড়াশুনা ও খেলাধুলা করতেন। ক্লাবে যাবতীয় আন্ত:কক্ষ ও মাঠে খেলাধুলা সামগ্রী সংগ্রহ করা হয়।
১৯৫৮ সাল হতে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ সময় নজিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খাদেমুল ইসলাম ক্লাব পরিচালনার জন্য সেক্রেটারী নিয়োজিত হন। সংক্ষেপে ১৯৪৭-৭১ সাল পর্যন্ত নজিপুর পাবলিক ক্লাব যাবতীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সহ জাতীয় দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির আয়োজক ছিল। ক্লাবের জমজমাট পাঠাগারে সর্বদা যাদের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হত তাদের মধ্যে শ্রী তরণীমোহন সেন, শ্রী বিভৃতি ভূষণ ঘোষ, ডাঃ বিমল কুমার দাস এর নাম উল্লেখযোগ্য। এই প্রতিষ্ঠানের বদৌলতে এলাকায় অনেক প্রতিভাবান লেখক নাট্যকার কবি সাহিত্যকের সৃষ্টি হয়। তার মধ্যে মরহুম নূরুল ইসলাম তার ছোট ভাই অধ্যাপক আব্দুল মান্নানের নাম উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সামাজিক নাটকের জন্য নয়নাভিরাম দৃশ্যাবলীর স্ত্রীন এই ক্লাবের আর এক মূল্যবান সম্পদ ছিল।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ক্লাব পরিচালনার ভার নবীন নেতৃত্বের হাতে আসে। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত নজিপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মোঃ আজিজুল হক আগের মতই ক্লাবের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত আব্দুল খালেক চৌধুরী ক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের ভার গ্রহণ করেন।
এখানে উল্লেখ করতে হয় ১৯৭২ সালে সম্মুখে হাটের জায়গায় স্থানীয় নেতা কাজী মজিদের সহযোগিতায় ইউপি সদস্য আবু বক্কর সিদ্দিক এক বৃহদাকার আটচালা সাপ্তাহিক হাট, ক্লাবে বড় বড় অনুষ্ঠান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজা সহ অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান হত। ১৯৭৬ সাল থেকে ক্লাবের কার্যক্রম দূর্বল হতে থাকে বিভিন্ন কারণে।
এমতবস্থায় ১৯৮৪ সালে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কাজী আখতার হোসেন তারা ক্লাবের দায়িত্ব গ্রহন করেন। ক্লাবের উন্নয়নের চেষ্টা করলেও ১৯৮৬ সালের প্রচন্ড ঘূণিঝড়ে ক্লাবের প্রভৃত ক্ষতিসাধন হয়। অনেক আসবাবপত্র সহ বই পুস্তক স্কীন বিনষ্ট হয়। এরপর আর কোন উদ্যোগ গ্রহন হয়নি ক্লাবের উন্নয়নের জন্য।
ক্লাবের ইতিহাসের সাথে জড়িত আছে ঐতিহ্যবাহী নজিপুর পাবলিক মাঠ। নজিপুর বাজারের দক্ষিণ পার্শ্বে বর্তমান আত্রাই নদী সেতু সংযোগ সড়কের সাথে এ ঐতিহাসিক মাঠের চাইতেও এ মাঠের প্রতিই বেশী অনুরক্ত। খেলাধুলার জন্য এ মাঠ দখলের প্রতিযোগিতা বিভিন্ন সময় দেখা গেছে। খেলাধুলা ছাড়াও এ মাঠে বিভিন্ন সময় জাতীয় নেতৃবৃন্দ ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছেন। তার মধ্যে ১৯৫৪ সালে মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, ১৯৭০ সালে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে মরহুম আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, ১৯৮১ সালে মরহুম জিয়াউর রহমান, ১৯৯৪ সালের জানুয়ারীতে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু দু:খের বিষয় সেতু সংযোগ সড়কের জন্য এ মাঠের ২৬ শতক জমি সরকার অধিগ্রহন করায় মাঠের আয়তন ছোট হয়ে পড়ে। মাঠের তত্বাবধান ও অর্থের অভাবে মাঠটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নজিপুর পাবলিক ক্লাব ও মাঠ একটি ইতিহাস একটি ঐতিহ্য। এই গুরুত্বপূর্ণ সার্বজনীন প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসে হাত হতে রক্ষার জন্য এলাকাবাসী ও প্রশাসনের আশু পদক্ষেপ গ্রহনই সকলের দাবি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ