ঢাকা, বুধবার 4 October 2017, ১৯ আশ্বিন ১৪২8, ১৩ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশ ভূখন্ড থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে হায়েনা মন্থর ভল্লুক শিঙাহরিণ কৃষ্ণষাঁড়

* দেশে মোট প্রাণির ২৪ শতাংশই ‘বিলুপ্তির হুমকিতে’
সাদেকুর রহমান : লোভ আর হিংস্রতা বোঝাতে যে প্রাণিটির উদাহরণ দেয়া হয়, সেটা হায়েনা। রাজশাহীর বরেন্দ্র এলাকার ঊষর লাল মাটিতে উনিশ শতকের শেষের দিকেও ঘুরে বেড়াত ধূসর হায়েনার দল। তবে এখন বরেন্দ্র তো বটেই, বাংলাদেশের কোথাও হায়েনা নেই। নতুন প্রজন্মকে বইয়ের পাতা কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় দেখে হায়েনার সাথে পরিচিত হতে হয়। একসময় এ দেশে গন্ডারও ছিল। হারিয়ে গেছে মন্থর ভাল্লুক, শিঙাহরিন ও কৃষ্ণষাঁড়ের মতো প্রাণিও। গত ১০০ বছরে বাংলাদেশ ভূখন্ড থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে এমন ৩১ প্রজাতির প্রাণি। এ তথ্য জানিয়ে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থা আইইউসিএন’র সর্বশেষ লাল তালিকায় তুলে ধরা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট প্রাণির ২৪ শতাংশই ‘বিলুপ্তির হুমকিতে’ আছে। স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ, উভচর, স্বাদু পানির মাছ, চিংড়ি ও প্রজাপতির ১ হাজার ৬১৯টি প্রজাতির মধ্যে ৩৯০টি-ই কোনো না কোনোভাবে হুমকির মুখে আছে।
এমনি এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ বুধবার বিশ্ব প্রাণি দিবস পালন করা হচ্ছে। বিশ্ব প্রাণি দিবসের আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটের মতে এ দিবসের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে প্রাণিদের কল্যাণের মাধ্যমে এদের অবস্থার উন্নতি করা। বিশ্ব প্রাণি দিবস উদযাপনের মাধ্যমে প্রাণি কল্যাণ আন্দোলনকে একত্রিত করা, একে আন্তর্জাতিকভাবে জোরদার করে পৃথিবীকে প্রতিটি জীবের জন্য উন্নততর বাসস্থান হিসেবে গড়ে তোলা। জাতি-ধর্ম, বিশ্বাস বা রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে দিবসটিকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাবে পালন করা হয়।
সর্বপ্রথম হেনরীক জিম্মারমেন নামের একজন জার্মান লেখক এবং প্রকাশক ১৯২৫ সালের ২৪ মার্চ জার্মানির বার্লিন স্পোর্ট প্যালেসে এই দিবস উদযাপন করেন। ১৯২৯ সালে প্রথমবারের মতো এই দিবসটি ৪ অক্টোবর পালন করা হয়। ১৯৩১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রাণি সুরক্ষা কংগ্রেসে তার উত্থাপন করা প্রস্তাবমতে ৪ অক্টোবরকে বিশ্ব প্রাণি দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।
গত বছর ২২ জুন প্রকাশিত আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থা আইইউসিএন-বাংলাদেশ শাখার প্রাণিকূলের ‘হালনাগাদ প্রজাতির লাল তালিকা- ২০১৫’ এ বাংলাদেশের মোট প্রাণির ২৪ শতাংশই ‘বিলুপ্তির হুমকিতে’ আছে বলে শঙ্কার কথা জানানো হয়। এর আগে ২০০০ সালে প্রথমবার প্রাণিকূলের অবস্থা নিয়ে ‘লাল তালিকা’ প্রণয়ন করে আইইউসিএন।
বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে আইইউসিএনের হালনাগাদ ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ, উভচর, স্বাদু পানির মাছ, চিংড়ি ও প্রজাপতির ১ হাজার ৬১৯টি প্রজাতির মধ্যে ৩৯০টি-ই কোনো না কোনোভাবে হুমকির মুখে আছে। সাত ক্যাটাগরির ৩১ প্রজাতি এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তালিকায় দেখা যায়, গত ১৫ বছরে পাখি প্রজাতি সবচেয়ে বেশি বিলুপ্ত হয়েছে। দেশের ৫৬৬ প্রজাতির পাখির মধ্যে ১৯টি গত ১০০ বছরের বেশি সময়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্তির দৌড়ে দ্বিতীয় অবস্থান স্তন্যপায়ী প্রাণিদের। ১১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণি হারিয়ে গেছে এই সময়ে। আর সরীসৃপজাতীয় প্রাণি বিলুপ্ত হয়েছে একটি।
প্রতিবেদনটিতে যেসব প্রজাতির তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে তার মধ্যে আছে, ১৩৮ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৫৬৬ প্রজাতির পাখি, ১৬৭ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪৯ প্রজাতির উভচর, ২৫৩ প্রজাতির মাছ, ১৪১ প্রজাতির চিংড়ি প্রজাতি ও ৩০৫ প্রজাতির প্রজাপতি। এর মধ্যে অতি বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে ৫৬টি প্রজাতি, বিপন্ন ১৮১ প্রজাতি আর সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে ১৫৩টি প্রজাতি। সাত ক্যাটাগরির ৩১ প্রজাতি এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সাথে জানানো হয়, দেশের ৮০২টি প্রজাতির প্রাণি ঝুঁকিতে নেই।
সর্বশেষ লাল তালিকা অনুযায়ী, বিলুপ্ত ৩১ প্রজাতির প্রাণির মধ্যে রয়েছে স্তন্যপায়ী ১১, পাখি ১৯ ও সরীসৃপ ১। অতি বিপন্ন ৫৬ প্রজাতির মধ্যে স্তন্যপায়ী ১৭, পাখি ১০, সরীসৃপ ১৭, উভচর ২, মাছ ৯ ও প্রজাপতি ১। বিপন্ন ১৮১ প্রজাতির মধ্যে স্তন্যপায়ী ১২, পাখি ১২, সরীসৃপ ১০, উভচর ৩, মাছ ৩০, চিংড়ি ২ ও প্রজাপতি ১১২। ঝুঁকিপূর্ণ ১৫৩ প্রজাতির প্রাণির মধ্যে রয়েছে স্তন্যপায়ী ৯, পাখি ১৭, সরীসৃপ ১১, উভচর ৫, মাছ ২৫, চিংড়ি ১১ ও প্রজাপতি ৭৫। হুমকির কাছাকাছি ৯০ প্রজাতির মধ্যে স্তন্যপায়ী ৯, পাখি ২৯, সরীসৃপ ১৮, উভচর ৬, মাছ ২৭ ও চিংড়ি ১। আর ঝুঁকিতে নেই ৮০২ প্রজাতি, যার মধ্যে স্তন্যপায়ী ৩৪, পাখি ৪২৪, সরীসৃপ ৬৩, উভচর ২৭, মাছ ১২২, চিংড়ি ৪৭ ও প্রজাপতি ৮৫। অন্যদিকে ২৭৮ প্রজাতি সম্বন্ধে সব তথ্য পাওয়া যায়নি; ২৮টি প্রজাতির পর্যালোচনায় আসেনি। শতকরা হিসেবে হুমকির কাছাকাছি দেশের মোট প্রাণির ৬ শতাংশ, ঝুঁকিপূর্ণ ৯ শতাংশ, বিপন্ন ১১ শতাংশ, অতি বিপন্ন ৩ শতাংশ, বিলুপ্ত প্রজাতি ২ শতাংশ এবং ঝুঁকিতে নেই ৫০ শতাংশ।
আইইউসিএন’র গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ সালের পর থেকে পরবর্তী পনেরো বছরে দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়েছে একটি স্তন্যপায়ী প্রাণি, যার নাম মন্থর ভাল্লুক বা শ্লথ বিয়ার আর বিপন্নের তালিকায় রয়েছে ৩৮টি। বিপন্ন প্রজাতিগুলোর মধ্যে ১৭টি অতি বিপন্ন, ১২টি বিপন্ন ও ৯টি প্রজাতি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। একই সময়ে দেশে ২১টি নতুন স্তন্যপায়ী প্রাণি শনাক্ত হয়েছে।
আইইউসিএন ১৩৮টি স্তন্যপায়ীর ওপর ‘ইভালুয়েশন’ করে দেখেছে এর মধ্যে ১১টি প্রজাতি উনিশ শতকেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নির্বিচারে আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্যাভাব ও পরিবেশের সার্বিক ভারসাম্যহীনতার কারণে দেশের প্রায় দেড়শ’ প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। স্তন্যপায়ী প্রাণিদের মধ্যে ডোরাকাটা হায়েনা রাজশাহী অঞ্চলে, ধূসর নেকড়ে নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে, নীলগাই দিনাজপুর-পঞ্চগড় এলাকায়, বান্টিং বা বনগরু চট্টগ্রাম ও সিলেটে এবং বনমহিষ দেশের সব বনাঞ্চলেই দেখা যেত। এ ছাড়া তিন ধরনের গন্ডার ছিল বাংলাদেশে- সুমাত্রা গন্ডার, জাভা গন্ডার ও ভারতীয় গন্ডার। বাদা বা জলার হরিণকে স্থানীয়ভাবে বলা হতো বারো শিঙা হরিণ। এটি সিলেট ও হাওর এলাকায় দেখা যেত। কৃষ্ণষাঁড় নামে একটি প্রাণি ছিল রাজশাহী ও দিনাজপুর এলাকায়। আর মন্থর হরিণ পাওয়া যেত পার্বত্য চট্টগ্রামে। এই ১৩ প্রজাতির প্রাণির মধ্যে বেশির ভাগই গত শতাব্দীতেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর মধ্যে একমাত্র মন্থর ভাল্লুক নামে ভাল্লুকের একটি প্রজাতি গত ৪০ বছরে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গেছে।
মহাবিপন্ন প্রাণিদের তালিকায় রয়েছে বেঙ্গল টাইগার, হাতি, ভোঁদড়, লামচিতা, চিতা, বনরুই, উল্লুক, চশমা পরা হনুমান, বনগরু, সাম্বার হরিণ, প্যারাইল্লা বানর, হিমালয়ান ডোরা কাঠবিড়ালি ও কালো ভাল্লুক। পাখির মধ্যে লালমুখ দাগিডানা একসময় সিলেটে দেখা যেত। সেখানকার পাহাড়ি বাঁশঝাড়ে এরা বাসা বাঁধত। ওই বিশেষ জাতের পাহাড়ি বাঁশঝাড় প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ায় এই পাখিরাও এ দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার একেকটি সারস বাংলার নদীর ধারে ঘুরে বেড়াতো। জলাভূমির শামুক ও ঝিনুক ছিল এদের খাবার। মূলত শিকারিদের কবলে পড়ে এই বিশাল পাখিটি এ দেশ থেকে হারিয়ে গেছে।
এ ছাড়া ধূসর মেটে তিতির ও বাদা তিতির পাখিও হারিয়ে গেছে। বাংলার বিখ্যাত বাদি হাঁস, গোলাপি হাঁস, বড় হাড়গিলা বা মদনটাক, ধলাপেট বগ, সাদাফোঁটা গগন রেড, রাজ শকুন, দাগি বুক টিয়াঠুঁটি, লালমাথা টিয়াঠুঁটি, গাছ আঁচড়া, সবুজ ময়ূর চিরতরে এ দেশ থেকে হারিয়ে গেছে।
বান্দরবানের রুমায় চামড়া ঝোলা ব্যাঙ এবং কেঁচোর মতো দেখতে নীল রঙের একটি নতুন উভচর প্রাণীও মহাবিপন্ন উভচর প্রাণীর তালিকায় উঠে এসেছে। বিপন্নের তালিকায় এসেছে চিত্রিত ব্যাঙ, বেলুন ব্যাঙ, চ্যাপ্টা মাথা ব্যাঙ, ঝরনা সুন্দরী ব্যাঙ, বড় গেছো ব্যাঙ।
আইইউসিএন সুন্দরবন ক্রো বা বাংলার কাক নামে প্রজাপতির একটি জাতকে মহা বিপদাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটি মূলত সুন্দরবনের কটকা ও কচিখালী এলাকার আট কিলোমিটার বিস্তীর্ণ বনে বসবাস করে। সরীসৃপজাতীয় প্রাণির মধ্যে মিঠাপানির কুমির বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গেছে। বন্য পরিবেশ থেকে এটি অনেক আগেই হারিয়ে গেলেও বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মাজারে দুটি মিঠাপানির কুমির ছিল। বছর তিনেক  আগে এরা মারা গিয়ে এই প্রজাতিই বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ ছাড়া পদ্মার চর ও দেশের বেশির ভাগ এলাকায় একসময় ঘড়িয়াল পাওয়া যেত। এই প্রাণি দুটি এবার মহাবিপন্নের তালিকায় প্রবেশ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন-পাহাড়-জলাভূমির আবাস বিনষ্ট হওয়া ছাড়াও সংরক্ষণ কার্যক্রমের দুর্বলতা বা আদৌ না থাকা, দুর্বল আইন, চোরা শিকার, নদীর নাব্যতা হ্রাস ও দূষণসহ পরিবেশের সামগ্রিক ভারসাম্যহীনতা পরিস্থিতি আরো সঙ্গীন করে তুলেছে। এজন্য বন্যপ্রাণির অভয়াশ্রম ও সংরক্ষিত এলাকা নিরাপদ রাখার পাশাপাশি নতুন অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা এবং বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ আইন যুগোপযোগী করা ও তা প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ