ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 October 2017, ২০ আশ্বিন ১৪২8, ১৪ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভারতের সঙ্গে ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ইআরডি সচিব কাজী শফিকুল আজম এবং ভারত সরকারের পক্ষে এক্সিম ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড রাসকিনহা ঋণচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবুল মুহিত ও ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি

# ভারতীয় ঠিকাদারেরাই প্রকল্পের কাজ পাবেন

# ঋণের টাকার পূর্তকাজের প্রকল্প হলে ৬৫ শতাংশ ও অন্য প্রকল্পে ৭৫ শতাংশ মালামাল ও সেবা ভারত থেকে আনতে হবে

# ঋণের সুদহার ১ শতাংশ

# ২০ বছরে পুরো টাকা পরিশোধ করতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার : ভারতের সঙ্গে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের তৃতীয় ক্রেডিট লাইন (এলওসি) চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। টাকার অঙ্কে যা প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। গতকাল বুধবার সকাল ১১টায় সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে এই চুক্তি সই হয়। এই চুক্তির আওতায় প্রাথমিকভাবে ১৭টি উন্নয়ন প্রকল্প থাকবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও ভারতের এক্সিম ব্যাংকের মধ্যে এই ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ইআরডি সচিব কাজী শফিকুল আজম এবং ভারত সরকারের পক্ষে এক্সিম ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড রাসকিনহা এই ঋণচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে সাত বছরের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো বড় ধরনের ঋণ দিল ভারত, যা তৃতীয় লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) নামে পরিচিত। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবুল মুহিত ও ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। এ সময় বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি সংক্রান্ত একটি যৌথ ইন্টারপ্রেটিভ নোটও স্বাক্ষরিত হয়।

অনুষ্ঠানে অরুণ জেটলি বলেন, বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর আমন্ত্রণে প্রথম বাংলাদেশে এসে আমি আনন্দিত। আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিশেষ করে আমাদের অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে পর্যালোচনা করেছি, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশের দ্রুত অগ্রগতি দেখে আমি খুবই মুগ্ধ। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে, যা সাম্প্রতিককালে ক্রমবর্ধমান। ভারতের স্বার্থে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

অরুণ জেটলি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার হতে ভারত পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই পর্যন্ত এটাই ভারতের কোনো দেশকে দেওয়া সর্বোচ্চ মাত্রার ঋণ। এটি অতি কম সুদের হারে দেয়া হয়েছে।

এ সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে। ভারতের অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাংলাদেশ সফর এটি। এর আগে দুটি এলওসি আমরা পেয়েছি। এটি তৃতীয় এলওসি। উভয় দেশ পারস্পরিক উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

১৭ প্রকল্পে যা থাকবে : তৃতীয় এলওসির অর্থ দিয়ে ১৭টি প্রকল্প করার প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছে বাংলাদেশ। তবে ঋণচুক্তিতে কোনো প্রকল্পের নাম থাকবে না বলে ইআরডি সূত্রে জানা গেছে। তালিকায় থাকা প্রকল্পগুলো হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র বিতরণ অবকাঠামো উন্নয়ন; পায়রা বন্দরের বহুমুখী টার্মিনাল নির্মাণ; বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার ও তীর সংরক্ষণ; বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত দ্বৈতগেজ রেলপথ নির্মাণ; সৈয়দপুর বিমানবন্দর উন্নতকরণ; বেনাপোল-যশোর-ভাটিয়াপাড়া-ভাঙ্গা সড়ককে চার লেনে উন্নীত করা; চট্টগ্রামে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ; ঈশ্বরদীতে কনটেইনার ডিপো নির্মাণ; কাটিহার-পার্বতীপুর-বরনগর দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন তৈরি; মোংলা বন্দর উন্নয়ন; চট্টগ্রামে ড্রাই ডক নির্মাণ; মিরসরাইয়ের বারৈয়ারহাট থেকে রামগড় পর্যন্ত চার লেনে সড়ক উন্নীত করা; মোল্লাহাটে ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র কেন্দ্র নির্মাণ; মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন; কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর হয়ে সরাইল পর্যন্ত চার লেন সড়ক নির্মাণ; ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে ১ লাখ এলইডি বাল্ব সরবরাহ প্রকল্প।

কোনো ঋণচুক্তির আওতায় এটিই হচ্ছে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় বড় ঋণ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ার সঙ্গে ১ হাজার ১৩৮ কোটি ডলারের (বাংলাদেশের টাকায় যা প্রায় ৯২ হাজার কোটি) ঋণচুক্তি করে বাংলাদেশ।

শর্ত সাপেক্ষে ঋণ : ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, আগের দুটি এলওসির মতো তৃতীয় এলওসির শর্ত একই। আগের মতো ভারতীয় ঠিকাদারেরাই প্রকল্পের কাজ পাবেন। ঋণের টাকার পূর্তকাজের প্রকল্প হলে ৬৫ শতাংশ মালামাল ও সেবা ভারত থেকে আনতে হবে। অন্য প্রকল্পে ৭৫ শতাংশ মালামাল ও সেবা ভারত থেকে আনতে হবে। আর ঋণের সুদহার ১ শতাংশ, প্রতিশ্রুতি মাশুল আধা শতাংশ। ৫ বছর রেয়াত সময়সহ ২০ বছরে পুরো টাকা পরিশোধ করতে হবে।

আগের এলওসিতে যা ছিল : দুটি এলওসিতে মোট ৩০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়। গত জুন মাস পর্যন্ত প্রথম এলওসির মাত্র ৩৫ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। প্রথম এলওসির ১৫টি প্রকল্পের মধ্যে ৮টি প্রকল্প শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় এলওসির কোনো প্রকল্পে অর্থ ছাড় হয়নি। 

জানা গেছে, ঋণচুক্তি হওয়ার পর প্রকল্প চূড়ান্ত করতেই বেশ সময় লাগে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো এক্সিম ব্যাংকে পাঠানো হয়। সেখান থেকে প্রকল্প অনুমোদন হয়ে ফেরত আসতেও বেশ সময় কেটে যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের দিক থেকে সমস্যা হলো, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন, ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেয়াসহ এসব প্রাথমিক কাজ করতেও কালক্ষেপণ হয়। এর ফলে এক দিকে যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় না; আবার ব্যয় বেড়ে যায়।

২০১০ সালের ৭ আগস্ট দুই দেশের মধ্যে ১০০ কোটি ডলারের প্রথম এলওসি ঋণচুক্তি হয়। পরে অবশ্য ১৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার অনুদানে রূপান্তর করে ভারত। ২০১৫ সালের জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের সময় ২০০ কোটি ডলার ঋণ বা দ্বিতীয় এলওসি দেয়ার সমঝোতা চুক্তি হয়। পরে ২০১৬ সালের মার্চ মাসে ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণচুক্তি হয়। এ ঋণের আওতায় ১৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায় বাংলাদেশ।

ভারত থেকে নেয়া ঋণের শর্ত কতটা সহজ : ২০ বছরের মধ্যে ঋণ ফেরতসহ ভারত থেকে ঠিকাদার নিয়োগ এবং নির্মাণসামগ্রীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ক্রয়ের শর্তসাপেক্ষে বাংলাদেশকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ দেবে ভারত। ১৭টি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এই ঋণ দেয়া হবে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটিই অবকাঠামো খাতের।

এটি বাংলাদেশকে দেয়া ভারতের ধারাবাহিক ঋণের তৃতীয় দফা। এর আগে গত বছর দেশটি বাংলাদেশকে ২০০ কোটি এবং ২০১০ সালে প্রথম ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেয়।

এর আগের ঋণগুলোর ক্ষেত্রে একইরকম শর্ত ছিল। তখন অনেকেই এই শর্তগুলো কঠিন বলে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু বেসরকারি থিংক ট্যাংক পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান মনসুর বিবিসিকে বলেন, দ্বিপাক্ষিক ঋণের ক্ষেত্রে শর্ত এরকমই থাকে। এর আগে একইরকম শর্তে অন্যান্য দেশ থেকেও এমন ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ।

থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এই প্রকল্পগুলোর গতি শ্লথ হলেও বাংলাদেশের জন্য এগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। 

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ গণমাধ্যমকে বলেন, চুক্তির শর্ত হচ্ছে ভারতীয় ঠিকাদারেরাই প্রকল্পের কাজ পাবেন। ঋণের টাকার পূর্তকাজের প্রকল্প হলে ৬৫ শতাংশ মালামাল ও সেবা ভারত থেকে আনতে হবে। অন্য প্রকল্পে ৭৫ শতাংশ মালামাল ও সেবা ভারত থেকে আনতে হবে। আসলে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো এমনই হয়ে থাকে। আমাদের চীনের সঙ্গে যে চুক্তি আছে, সেগুলোও এমন ধরনের শর্তেই আছে। এটা খুব ভালো হতো যদি যেখান থেকে সবচেয়ে বেশি সাশ্রয়ী হয়, সেখান থেকে মালামাল নেওয়া যেত এবং তা নির্ধারণে আমাদের আরও স্বাধীনতা থাকত। তবে দ্বিপক্ষীয় ক্ষেত্র আসলে এমনটা দেখা যায় না। কারণ, তারা ঋণ দিচ্ছে এই সবকিছু শর্ত মেনে নেয়ার ভিত্তিতেই। যেহেতু এতে আমাদের ইচ্ছা আছে, তাই এই চুক্তি হচ্ছে।

গতকাল সকাল ১০টায় সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। এর আগে সকাল ৭টায় তিনি ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শনে যান।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার তিন দিনের সফরে ঢাকা পৌঁছান ভারতের অর্থমন্ত্রী। বিকাল ৩টায় ভারতের একটি বিশেষ বিমানে ঢাকার কুর্মিটোলায় বিমানবাহিনীর ঘাঁটি বঙ্গবন্ধুতে পৌঁছান তিনি। তাকে স্বাগত জানান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পরে বিমানবন্দর থেকে অরুণ জেটলিকে সোনারগাঁও হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সফরকালে তিনি এ হোটেলেই অবস্থান করেন। আজ বৃহস্পতিবার অরুণ জেটলি ঢাকা ত্যাগ করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ