ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 October 2017, ২০ আশ্বিন ১৪২8, ১৪ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

লাসভেগাস হতাকাণ্ড

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাসভেগাসে গত রোববার রাতে সংঘটিত ঢালাও হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিশ্বের দেশে দেশে এখনো জোর আলোচনা চলছে। অবসান হয়নি বিতর্কেরও। বিতর্ক হচ্ছে ভয়াবহ এই সন্ত্রাসী হামলার কারণ ও অন্তরালের রহস্যকে ঘিরে। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ, লাসভেগাস যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা অঙ্গরাজ্যের বিনোদন ও পর্যটন নগরী। সেখানে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক যায়, দর্শনীয় নানা স্থান ও স্থাপনা দেখে এবং আনন্দ-ফূর্তি করে। সারা রাত জেগে থাকে লাসভেগাস। একই কারণে লাসভেগাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও যথেষ্ট কঠোর হওয়ার কথা। তার ওপর দেশটি আবার বিশ্বব্যাপী কথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারীর ভূমিকায় নিয়োজিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
অন্যদিকে সে দেশেরই একটি প্রধান নগরী লাসভেগাসে এক সন্ত্রাসী হামলায় মারা গেছে অন্তত ৫৯ জন নারী-পুরুষ। গুলীতে আহত হয়েছে দেড়শ’রও বেশি। বিনোদন নগরী লাসভেগাসে সে সময় ‘রুট নাইনটি ওয়ান’ নামের কান্ট্রি মিউজিক ফেস্টিভ্যাল বা সংগীতের উৎসব চলছিল। তিনদিনের ওই উৎসবে অংশ নিতে সমবেত হয়েছিল প্রায় ২২ হাজার নারী-পুরুষ। উৎসব জমেও উঠেছিল। কিন্তু এরই মধ্যে স্টিফেন প্যাডক নামের এক ব্যক্তি উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলী ছুঁড়তে শুরু করে। ৬৪ বছর বয়সী স্টিফেন প্যাডক এই হামলা চালিয়েছিল অনুষ্ঠানস্থলের নিকটবর্তী মান্দালে বে হোটেলের ৩২ তলা থেকে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই একের পর এক নারী-পুরুষ লুটিয়ে পড়তে থাকে। ওদিকে গুলী চালানো বন্ধ করার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছিল না। খ্যাপা উন্মাদের মতো গুলী চালাচ্ছিল বন্দুকধারী স্টিফেন প্যাডক।
এক পর্যায়ে পুলিশ এবং অন্যান্য মার্কিন নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন এসে যায়। তারা মান্দালে বে হোটেলের ৩২ তলায় গিয়ে ঘিরে ফেলে ঘাতক প্যাডককে। কিন্তু পুলিশের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আত্মসমর্পণ করার পরিবর্তে প্যাডক উল্টো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তার গুলীতে পুলিশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজনও মারা যায়। তা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলো সফল হয়েছে। তারা গুলী করে মেরে ফেলেছে স্টিফেন প্যাডককে। 
লাসভেগাসের এই হামলা এবং হত্যাকান্ড নিয়ে অনেক কারণেই সারা বিশ্বে উদ্বেগ ও আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাধান্যে এসেছে অনেক জিজ্ঞাসাও। পাশ্চাত্যের মুসলিম বিদ্বেষের কারণে প্রাথমিকভাবে ইসলামী জঙ্গিদের দিকে আঙুল ওঠানো হয়েছিল। ইসলামিক স্টেটস বা আইএস নামের মূলত ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থবিরোধী সংগঠন যথারীতি ‘দায়’ স্বীকার করে মুর্খের মতো বিবৃতিও প্রচার করেছিল। বলেছিল, আইএস-এর কয়েকজন জঙ্গি যোদ্ধাই নাকি হামলাটি চালিয়েছে! কোনো রকম খোঁজ-খবর না করে বিবৃতি দেয়ার এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আরো একবার এই সত্য প্রমাণিত হয়েছে যে, আইএস-এর সঙ্গে বিশ্বের কোনো দেশের মুসলিমদেরই কোনো সম্পর্ক নেই এবং আইএসকে আসলেও মুসলিম বিরোধী আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর স্বার্থে ভূমিকা পালনের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, ঘাতক স্টিফেন প্যাডক যেহেতু মুসলিম নয় বরং খোদ নেভাদা রাজ্যেরই একজন নাগরিক, সেহেতু লাসভেগাস হত্যাকান্ডের জন্য কোনো ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠী কিংবা সাধারণভাবে মুসলিমদের ওপর দোষ চাপানোর কোনো সুযোগ থাকতে পারে না।
মার্কিন সরকারও আকস্মিক এ ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ঘটনার পর মুহূর্তেই ঘাতক প্যাডক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। এতে জানা গেছে, প্যাডক মানসিক রোগী যেমন ছিল না, তেমনি তার ছিল না কোনো রাজনৈতিক দল বা সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক বা যোগাযোগও। হত্যাকাণ্ড সে নিজের একার ইচ্ছায় ও সিদ্ধান্তেই ঘটিয়েছে। ঠিক কোন্ কারণে প্যাডক এতো নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে প্রশ্নের উত্তর নিয়েই এখন জল্পনা-কল্পনা চলছে। চলছে তদন্তও। কিন্তু কোনো সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। একটি তথ্য অবশ্য পুলিশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে ভাবিয়ে তুলেছে। জানা গেছে, ঘটনার কয়েকদিন আগে প্যাডক ব্যাংক থেকে এক লাখ ডলার উঠিয়েছিল। বলা হচ্ছে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সে সম্ভবত অস্ত্র ও গুলী কেনার এবং হোটেলে রুম ভাড়া নেয়ার জন্য উঠিয়ে থাকতে পারে। ওদিকে কোনো তদন্তেই একথা জানা যায়নি যে, প্যাডকের সঙ্গে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি জড়িত ছিল। মূলত সে কারণে ঘাতক প্যাডককে ‘লোন উল্ফ’ বা নিঃসঙ্গ শিকারী ধরনের বিশেষণে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, যেহেতু মার্কিন নাগরিক সেহেতু তাকে ‘সন্ত্রাসী’ বলা হচ্ছে না! বিষয়টি কৌতূহলের পাশাপাশি নিন্দার কারণও সৃষ্টি করেছে। বলা হচ্ছে, প্যাডক মুসলিম হলে কিংবা তার সঙ্গে ইসলামি কোনো জঙ্গি সংগঠনের ন্যূনতম যোগাযোগের তথ্য জানতে পারলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা নিশ্চয়ই এত বেশি উদারতা দেখাতো না! তাকে সোজা সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করতো এবং বিশ্বের কোনো না কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর হামলা চালানোর পাঁয়তারা শুরু হয়ে যেতো।
বলার অপেক্ষা রাখে না, লাসভেগাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ড সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতংকের সৃষ্টি করেছে। আমরা এ হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দা জানাই এবং আশা করি যুক্তরাষ্ট্রসহ কোনো দেশেই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ