ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 October 2017, ২০ আশ্বিন ১৪২8, ১৪ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অদ্ভুত সাইনবোর্ড ‘মুসলিমমুক্ত এলাকা’

রাখাইনের বহু গ্রামের প্রবেশপথে দেখা যায় অদ্ভুত এক ধরনের সাইনবোর্ড। তাতে বার্মিজ ভাষায় বড় বড় অক্ষরে লেখা, ‘মুসলিমমুক্ত এলাকা’। সঙ্গে থাকে আরও নানা মুসলিমবিদ্বেষী কথাবার্তা। তবে শুধু রাখাইনে নয়, মিয়ানমারের অন্যান্য এলাকায়ও এমন সাইবোর্ডের দেখা মেলে। উল্লেখ্য যে, মানবাধিকার সংগঠন ‘বার্মা হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্ক (বিএইচআরএন) এরকম ২১টি সাইনবোর্ডের ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করেছে। সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে এব্যাপারে বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এ ধরনের মুসলিম বিদ্বেষী সাইনবোর্ডের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অবাক ব্যাপার হলো, এসব বিদ্বেষমূলক সাইনবোর্ড ঝোলানোর জন্য স্থানীয় সরকারি কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিয়ে থাকে। মিয়ানমারের শান প্রদেশের ইয়াসাউক শহর থেকে বিএইচআর এন-এর তোলা একটি সাইনবোর্ডের ছবিতে লেখা রয়েছে, ‘মুসলিমমুক্ত এলাকা’। এর নিচে লেখা রয়েছে- ১. এই এলাকায় রাতে মুসলমানদের থাকার অনুমতি নেই। ২. মুসলমানদের সম্পত্তি বিক্রি বা কেনার অনুমতি নেই। ৩. কোনো মুসলমানকে বিয়ের অনুমতি নেই। এর নিচে লেখা রয়েছে ‘দেশপ্রেমী যুবসংঘ। এ ধরনের মুসলিম বিদ্বেষী সাইনবোর্ডের পাশাপাশি রয়েছে ভিন্ন সাইনবোর্ড। সেখানে বৌদ্ধধর্ম ও জাতিকে ‘সবার চেয়ে সেরা’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব আচরণ থেকে উপলব্ধি করা যায়, মিয়ানমারে উগ্র বৌদ্ধ জাতিয়তাবাদ আজ কোন্্ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। এমন উগ্রতার পেছনে শুধু মিয়ানমারের জান্তা সরকার নয়, ইন্ধন যুগিয়েছে বৌদ্ধ ধর্মযাজকরাও। এদের সম্মিলিত প্রয়াসেই মিয়ানমারে লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলমানরা। মিয়ানমারে নৃশংস গণহত্যার বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় উঠেছে বিশ্বব্যাপী।
 রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির ২১ জন সিনেটর। এদের মধ্যে ১৭ জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর, বাকিরা রিপাবলিকান। তারা যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ানমার সংক্রান্ত নীতি পুনর্মূল্যায়নেরও আহ্বান জানিয়েছেন।
সিনেটররা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের কাছে লেখা চিঠিতে বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার ঝুঁকি রয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযান শুরুর পর গত এক মাসে রোহিঙ্গারা গণহারে পালাতে বাধ্য হয়েছে। কয়েকশ’ রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। হাজারো বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া যথাযথ হয়নি। চিঠিতে আরো বলা হয়, মিয়ানমারের রাখাইনে নৃশংসতার জন্য যারা দায়ী তাদের আন্তর্জাতিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের আইনে জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হবে। তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবিও জানিয়েছেন। সিনেটররা বলেন, এখনই পদক্ষেপ নেয়া না হলে বার্মা, ওই অঞ্চল ও বিশ্বে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে।
এদিকে ভারতে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সমর্থনে ২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীতে উপবাস পালন করেন আর্য সমাজের প্রচারক ও বিশিষ্ট সমাজকর্মী স্বামী অগ্নিবেশ। তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নেয়া পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। গত ২৬ সেপ্টেম্বর স্বামী অগ্নিবেশ বলেন, ভারতের ‘বসুটধব কুটুম্বকম’ (গোটা বিশ্ব আমার আত্মীয়)-এর ঐতিহ্য রয়েছে, যাতে মানবতার অবশ্য কর্তব্য পালনে লোকদের নিরাপত্তা দিতে আশ্রয় দেয়া হয়। যেভাবে ভারতে বাংলাদেশী, তিব্বতি ও আফগানিস্তানের শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে, সেভাবেই রোহিঙ্গা মুসলমানদের আশ্রয় দেয়া উচিত। তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের সম্পর্ক থাকার অভিযোগ ভিত্তিহীন, তাই এটি নিন্দনীয় বিষয়। সরকার একজন রোহিঙ্গার বিরুদ্ধেও সন্ত্রাসের প্রমাণ পেশ করতে পারেনি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে তিনি মিয়ানমারকে ভারতের পক্ষ থেকে চাপ প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন। খবরটি পরিবেশন করেছে পার্স টুডে।
প্রসঙ্গত স্বামী অগ্নিবেশ বলেন, দেশে হিন্দু এলে তাকে শরণার্থী বলা হয়, কিন্তু মুসলিম আসলে সে সন্ত্রাসবাদী! কিন্তু সব মুসলিম সন্ত্রাসী হতে পারে না। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সন্ত্রাসী নয়, তাদের অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দেয়া উচিত। ভারতে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের খাদ্য-পানীয়ের ব্যবস্থা করা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের  নৈতিক দায়িত্ব। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মের ভিত্তিতে শরণার্থীদের ভাগ করার অভিযোগ এনে অগ্নিবেশ বলেন, এ ধরনের নীতির ফলে দেশে সাম্প্রদায়িকতা উৎসাহিত হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ভারতে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কর্মসূচি নিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। তারা শরণার্থী নয় বরং অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। এ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সুপ্রীম কোর্টে জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে দাবি করা হয়েছে যে, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বিদেশি সন্ত্রাসীদের সংযোগ রয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে পাল্টা হলফনামা দিয়ে সরকারের ওই দাবিকে নাকচ করে বলা হয়েছে, সন্ত্রাস তো দূরের কথা অপরাধমূলক কাজকর্মের সঙ্গেও তারা জড়িত নন।
স্বার্থান্ধ ও নীতিভ্রষ্ট বর্তমান সভ্যতায় সত্যভাষণের জন্য আমরা স্বামী অগ্নিবেশকে ধন্যবাদ জানাই। তেল-গ্যাস ও বাণিজ্য স্বার্থের জন্য বর্তমান সভ্যতার বড় বড় রাষ্ট্রগুলো যেভাবে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও গণহত্যাকে সমর্থন করে যাচ্ছে তাতে স্পষ্ট করেই বলা চলে, আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ এর চাইতে অনেক ভাল ছিল। আমরা আসলে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মুখোশ পরা এক অমানবিক ও হিংস্র সভ্যতার মধ্যে বসবাস করছি। সভ্যতার নিষ্ঠুর শাসকরা ছলচাতুরির মাধ্যমে পৃথিবীর ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে শোষণ-পীড়ন ও নির্যাতনের শিকলে বেঁধে রেখেছে- মুসলমানরা যার বড় শিকার। এখন তো ধর্মের ভিত্তিতে শরণার্থীদেরও ভাগ করা হচ্ছে। ভারতে রোহিঙ্গা মুসলমানরা এর শিকার। এর প্রতিবাদ ও নিন্দা করেছেন স্বামী অগ্নিবেশ। আমরাও এর নিন্দা জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ