ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 October 2017, ২০ আশ্বিন ১৪২8, ১৪ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গ্রেট মিসবাহ্-ইউনুসকে ছাড়া প্রথম টেস্টেই পাকিস্তানের হার!

-মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
শেষ উইকেটটি নিয়েই ডানা মেলে দিলেন দিলরুয়ান পেরেরা। একই ভাবে দু’হাত মেলে ভাসছিলেন দিনেশ চান্দিমালও। যেন থামাথামি নেই! থামলেন রঙ্গনা হেরাথের আলিঙ্গনে। সে কী উচ্ছ্বাস লঙ্কানদের! মাঠের বাইরে সাপোর্ট স্টাফদের উল্লাসও বাঁধনহারা। হঠাৎ ‘অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স’। টিভি রিপ্লে দেখাল, পেরেরার ডেলিভারিটি ছিল নো বল! চরম নাটকীয়তার ম্যাচে আরেক দফা নাটক। হয়ত ওই উইকেট লেখা ছিল আসলে হেরাথের ভাগ্যেই। শেষ উইকেট নিয়ে ইতিহাসের প্রথম বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে স্পর্শ করলেন ৪০০ উইকেট। প্রথমবার জয়োল্লাসের খানিক পর আবার উল্লাসে মাতল শ্রীলঙ্কা। এবার পাকিস্তানের রিভিউ আটকাতে পারল না শ্রীলঙ্কার জয়।
আবুধাবী টেস্টে রোমাঞ্চ, নাটকীয়তা আর উত্তেজনায় ঠাসা চলমান প্রথম টেস্টের শেষ দিনে পাকিস্তানকে ২১ রানে হারিয়েছে শ্রীলঙ্কা। এগিয়ে গেল দুই ম্যাচ সিরিজে। সিরিজ জয়ের আগে সব দিক থেকেই ফেভারিট ছিল পাকিস্তান। তবে শ্রীলঙ্কাও ছিল সমানে সমান। চারশ রান করে থামে তাদের ইনিংস। জবাবে পাকিস্তান তাদেও থেকে মাত্র ৩ রান বেশী করে। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয় ঘটে শ্রীলঙ্কার। ১৬ উইকেট পতনের দিনে দ্বিতীয় ইনিংসে ১৩৮ রানেই গুটিয়ে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কা। পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য ছিল মাত্র ১৩৬। কিন্তু রান তাড়ায় মুখ থুবড়ে পড়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং। গুটিয়ে যায় তারা ১১৪ রানেই। লঙ্কানদের জয়ের নায়ক সেই হেরাথ। অসাধারণ বোলিংয়ে শেষ ইনিংসে নিয়েছেন ৬ উইকেট। ম্যাচে ১১ উইকেটে পূর্ণ করেছেন ৪০০ টেস্ট উইকেট। ছুঁয়েছেন প্রথম বোলার হিসেবে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১০০ উইকেটের মাইলফলকও।
চ্যাম্পিয়ন ট্রফির পর নিজেদের মাটিতে বিশ্ব একাদশের বিরুদ্ধে সিরিজ জয়ের পর বেশ উৎফুল্ল ছিল সরফরাজরা। আত্মবিশ্বাস ছিল অনেক। তারপর অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদেও কথা স্মরণ করেছিল সরফরাজ। তাদের ছাড়াই যে টেস্ট বেশ কঠিন হবে তা আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিল দলপতি। শেষ পর্যন্ত সেই অভাবই কপাল পুড়লো পাকিস্তানীদের। বিশেষ করে টেস্ট স্পেশালিস্ট ইউনিস খান এবং মিসবাহকে দারণ মিস করেছে পাকিস্তান। টেস্টেও প্রতিটা ধাপে তাদেও অভাব ছিল লক্ষ্যণীয়।
‘মিসবাহ্-ইউনুস আমাদের কিংবদন্তি। তাদের অভাব সহসা পূরণ হওয়ার নয়।’ বলেছেন-সরফরাজ আহমেদ। তিন ভার্সনে পাকিস্তানের নতুন অধিনায়ক মোটেও বাড়িয়ে বলেননি। গত বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরেই অবসর নিয়েছেন আধুনিক ব্যাটিংয়ের বিস্ময়কর এ যুগলবন্দী। গেল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া আবুধাবী টেস্টের মধ্য দিয়ে মিসবাহ উল হক-ইউনুস খান উত্তর যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে পাকিস্তান ক্রিকেট। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টটা হবে ডে-নাইট। তবে সব ছাপিয়ে আলোচনায় কেবলই অবসরে যাওয়া দুই গ্রেট। স্বাভাবিক। ইউনুস-মিসবাহ একসঙ্গে পাকিস্তানের জার্সি গায়ে ১৯৩টি টেস্ট খেলেছেন। দু’জনে মিলে সংগ্রহ করেছেন ১৫,৩৩১ রান। মূলত তাদের ব্যাটে ভর করেই প্রথমবারেরমতো পাকিস্তান প্রথমবারের মতো টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে উঠেছিল। দু’জনের সেঞ্চুরি সংখ্যা ৪৪, সেঞ্চুরি জুটি ১৫টি।
নতুন কা-ারী সরফরাজ আরও বলেন, ‘অবশ্যই ব্যাটিংয়ে তাদের অভাব সহজে পূরণ হওয়ার নয়। পাকিস্তান ক্রিকেটে তাদের যথেষ্ট অবদান ছিল। কিন্তু তারপরও এখন আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে হবে।’ ২০০৯ সালে লাহোরে শ্রীলঙ্কা দলকে বহনকারী বাসে সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তানের মাটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ হয়ে আছে। বিদেশী বড় কোন দল সেখানে যায়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাতকে পাকিস্তানের হোম ভেন্যু হিসেবে অনুমোদন দেয় আইসিসি। তারপর থেকে মরু শহরগুলোতে অনুষ্ঠিত টেস্ট সিরিজগুলোতে ইউনুস-মিসবাহর দাপট ছিল সর্বাগ্রে। দলে দু’জনের অবদান এতটাই যে, এ সময়ে আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত নয়টি সিরিজের একটিতেও পরাজিত হয়নি পাকিস্তান। মিসবাহর পরিবর্তে টেস্ট দলের দায়িত্ব পাওয়া সরফরাজ আহমেদের সামনে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। যার প্রথমটিতে তিনি হেরেছেন। অনেকেই বলছেন, তার বাজে শট খেলতে যাওয়ার কারণেই পাকিস্তান তাদেও নিশ্চিৎ জয় হাতছাড়া করে। দলপতি হিসেবে তার আরও কৌশলী ও দায়িত্বশীল হওয়া দরকার ছিল।
১০,০৯৯ রান নিয়ে শুধু পাকিস্তানের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকই নন, স্লিপ-ফিল্ডার বিশেষজ্ঞ হিসেবে ১১৮ টেস্টে রেকর্ড ১৩৯টি ক্যাচ তালুবন্দী করেছেন ইউনুস। অপরদিকে মিসবাহ ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি তার অধিনায়কত্বের মুন্সিয়ানায় দলকে দুর্দান্ত সব সাফল্য উপহার দিয়েছেন। ইউনুস ও মিসবাহকে ছাড়া টেস্ট ক্রিকেটে খেলতে নামা পাকিস্তনের জন্য একেবারেই এক নতুন অভিজ্ঞতা। গত সাত বছরে এই দু’জন ছিলেন টেস্ট দলের অপরিহার্য অংশ। সাফল্যের সারথী। তার ওপর পাকিস্তানের সামনে এখন ঘরের মাঠে আবারও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরিয়ে আনার হাতছানি। আগামী মাসে লাহোরে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে একটি টি২০ আয়োজনের মাধ্যমে সেই দ্বার আরও উন্মোচনের অপেক্ষায় এখন গোটা জাতি। ঠিক এই মুহূর্তে দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে হারিয়ে টেস্ট অঙ্গনে নিজেদের মর্যাদা ধরে রাখাও সরফরাজদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাবর আজম চার নম্বরে ব্যাটিং করছেন। অন্যদিকে এখনও টেস্ট না খেলা হারিস সোহেলকেও মূল একাদশে দেখা যেতে পারে। আজহার আলী ও আসাদ শফিকের মতো দুই স্টাইলিশকে ব্যাটিংয়ে নেতৃত্বভার নিতে হবে। পাঁচ ফাস্ট বোলারের সঙ্গে মূল স্পিনার হিসেবে দলে ফিরেছেন অভিজ্ঞ ইয়াসির শাহ। দুই বছর আগে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২-১ সিরিজ জয়ে ২৪টি উইকেট নিয়েছিলেন তুখোড় এই লেগস্পিনার। প্রথম টেস্টেই তিনি নিজের জাত চেনালেন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আবুধাবী টেস্টের প্রথম দিনেই ইয়াসির ছুঁলেন মাইলফলক। পূর্ণ হলো তার দেড়শ উইকেট। টেস্ট ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম দেড়শ! ২৭ টেস্টে এই মাইলফলক ছুঁলেন পাকিস্তানি লেগ স্পিনার।
তার চেয়ে কম টেস্টে দেড়শ’ ছুঁতে পেরেছেন কেবল সিডনী বার্নস। যে রেকর্ড তার কাছে আছে ১০৪ বছর ধরে। দেড়শ’ ছুঁতে সাবেক ইংলিশ পেসারের লেগেছিল ২৪ টেস্ট। রেকর্ডটি গড়েছিলেন ১৯১৩ সালে। দুইয়ে অবশ্য ইয়াসির একাই নন। দেড়শ ছুঁতে ২৭ টেস্ট লেগেছিল ওয়াকার ইউনিসেরও। ইয়াসির তাকে স্পর্শ করার সময় ধারাভাষ্য কক্ষেই ছিলেন ওয়াকার। এই দু’জনের পরে আছেন ক্ল্যারি গ্রিমেট। কিংবদন্তি লেগ স্পিনারের লেগেছিল ২৮ টেস্ট। ২৯ টেস্টে দেড়শ’র ঠিকানায় পৌঁছেছেন ৫ জন-দক্ষিণ আফ্রিকার অফ স্পিনার হিউ টেফিল্ড, ইংল্যান্ডের ইয়ান বোথাম, দক্ষিণ আফ্রিকার ডেল স্টেইন, পাকিস্তানের সাঈদ আজমল ও ভারতের রবিচন্দ্রন অশ্বিন।
প্রথম টেস্টে হারের পর পাকিস্তান অধিনায়ক সরফরাজ বলেন, ‘ব্যাটিংয়ে মিসবাহ্-ইউনুসের অভাব সহজে পূরণ হওয়ার নয়। পাকিস্তান ক্রিকেটে তাদের যথেষ্ট অবদান। কিন্তু তারপরও এখন আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে হবে। ইউনুস ও মিসবাহকে ছাড়া টেস্ট ক্রিকেটে খেলতে নামা পাকিস্তনের জন্য যে একেবারেই এক নতুন অভিজ্ঞতা ছিল সেটি আবারো প্রমাণিত হলো। আইসিসি টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ে পাকিস্তান ছয় ও শ্রীলঙ্কা সাত নম্বরে।
পিঠেপিঠি অবস্থানে হলেও শক্তি-সামর্থ্যরে বিচারে এই সিরিজে পাকিস্তানই ফেবারিট। এছাড়া মরুর দেশ আরব আমিরাত পাকিস্তানের জন্য একপ্রকার ঘরের মাঠ। অবসরে যাওয়া দুই গ্রেট মিসবাহ-উল হক ও ইউনুস খানের ব্যাটিংয়ে তুলে নিয়েছে একের পর এক সাফল্য। ক’দিন আগে ওয়ানডে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের পর টেস্টের মধ্য দিয়ে তিন ভার্সনে অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন সরফরাজ আহমেদ। প্রথম টেস্ট হারলেও বাকিগুলোতে জয়ের মাধ্যমে গ্রেট মিসবাহ-ইউনুসকে ছাড়া টেস্ট যুগে প্রবেশের সিরিজটা স্মরণীয় করে রাখতে চায় সরফরাজবাহিনী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ