ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 October 2017, ২০ আশ্বিন ১৪২8, ১৪ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বয়সভিত্তিক ফুটবল নিয়ে স্বপ্ন দেখা যায়

-মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক
ফুটবলের যেমন আগের সেই গৌরব নেই ঠিক তেমনি নেই সাফল্যও। সফলতা-ব্যর্থতার চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে খেলাটির জনপ্রিয়তা। যা চিন্তার ভাজ ফেলে দিয়েছে খেলাটির সাথে সংশ্লিষ্টরা। তবে বয়সভিত্তিক দল নিয়ে আশা দেখা যাচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে অনূর্ধ্ব-১৬ ও অনূর্ধ্ব-১৮ জাতীয় দলের পাশাপাশি অনূর্ধ্ব-১৬ বালিকারা অংশ নিয়েছে এএফসি বাছাই, সাফ ফুটবল ও এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ মূল প্রতিযোগিতায়। সেখানে ছেলেদের দু’টি দল রানার্সআপ হয়ে আলো ছড়িয়েছে। আর ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের ভাল খেলার সম্ভাবনা তৈরি করেছেন ষোল না পেরুনো বালিকা ফুটবলরা। এখন জাতীয় দলের সামনে কোন খেলা নেই, তাই সাফল্য-ব্যর্থতার কোন সুযোগও নেই। ফুটবলের পুরো ব্যস্ততাই এখন বয়ষভিত্তিক দল নিয়ে। সুখবরও নিয়ে এসেছে তারা। সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ চ্যাম্পিয়নশীপের শিরোপা জয়ের খুব কাছে গিয়েও তা ছোয়া হয়নি মাহবুব হোসেন রক্সির দলের। শেষ ম্যাচে ভুটানকে ২-০ গোলে জিতে নিজেদের কাজটা সেরে রাখলেও ভারত নেপালের কাছে একই ব্যবধানে পরাজিত হলে আশা শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের। সমান পয়েন্ট থাকলেও গোল গড়ে সবার উপরে থেকে শিরোপা ধরে রেখেছে নেপাল। আর বাংলাদেশকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে রানার্সআপ হয়ে। তবে ভবিষ্যতের জন্য সুখবর নিয়ে আসে এই দল। ষ্ট্রাইকারের জন্য যখন জাতীয় দলে হাহাকার তখনি নতুন তারকার দেখা মিলেছে। জাফর ইকবাল নামের এক তরুন ৫ গোল করে জিতে নিয়েছেন সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার। পুরো আসরেই ধারাবাহিক ছিলেন চট্টগ্রাম আবাহনীতে খেলা এই ফুটবলার। সিনিয়র ফুটবল দলে কোনো সুখবর নেই। তবে বয়সভিত্তিক দলগুলো মোটামুটি ভালোই করছে। শিরোপা জিততে হলে থিম্পুর চাংলিমিথাং স্টেডিয়ামে ভুটানের বিপক্ষে ম্যাচটি জিততেই হতো বাংলাদেশকে। গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্নটা ফ্যাকাশে হয়ে যায় অনেকটাই। দ্বিতীয়ার্ধেও গোলের দেখা পাচ্ছিল না ভুটানের বিপক্ষে।
শেষ ম্যাচে আক্রমণাত্মক ফুটবলে বারবার স্বাগতিকদের রক্ষণ কাঁপিয়ে দিলেও বল জড়াচ্ছিল না জালে। তবে হাল ছেড়ে দেয়নি বাংলাদেশের যুবারা। ফুটবলদেবতাও নিরাশ করেননি। বদলি হিসেবে নেমে দলের জয়ে অবদান রাখেন জাফর। বয়সভিত্তিক ফুটবলে এমনিতে বাংলাদেশের সাফল্য অনেক বেশি। দুই বছর আগে সিলেটে সাদ উদ্দিনরা লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়েছিল। সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ব্যর্থ হয় বাংলার যুবারা। ২০১৫ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এএফসি’র নতুন নিয়মানুযায়ী, এবার এক বছর কমিয়ে করা হয়েছে সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ চ্যাম্পিয়নশিপ। বয়সভিত্তিক এ প্রতিযোগিতায় এবার শিরোপা জয়ের স্বপ্ন ছিল মাহবুব হোসেন রক্সির দলের। প্রথম দিনেই কঠিন পরীক্ষায় নামতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। সেখানে ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও ৪-৩ গোলে দুর্দান্ত জয় পায় টুটুল হোসেন বাদশারা। দ্বিতীয় ম্যাচে মালদ্বীপের বিপক্ষে ২-০ গোলের সহজ জয় পায়। কিন্তু তৃতীয় ম্যাচে এসে নেপালের কাছে ২-১ গোলে পরাজিত হওয়ার পর কিছুটা ব্যাকফুটে চলে গিয়েছিল যুবদল। কিন্তু শেষ ম্যাচে ভুটানকে ২-০ গোলে পরাজিত করলেও শিরোপা জয়ের জন্য যা যথেষ্ট ছিল না। এএফসি অনুর্ধ্ব-১৬ বাছাই প্রতিযোগিতার মতোই দুই বছরের বড়রা রানার্সআপ হয়েছেন। এর আগে কিছুদিন পূর্বেই সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ আসরে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছিল বাংলাদেশ। সেমিফাইনালে হেরে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় কিশোর ফুটবলারদের।
২০১৫ সালে সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশীপের শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। সাদ উদ্দিন, সারোয়ার জামান নিপুরা সিলেটকে উৎসবের নগরীতে পরিণত করেছিল। দুইবছর পর শিরোপা ধরে রাখতে না পারলে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ বাছাই প্রতিযোগিতায় ভালো খেলেছে লাল সবুজ প্রতিনিধিরা। তিন ম্যাচের দু’টিতে জয় আর একটিতে পরাজিত হয়েছে গ্রুপে রানার্সআপ হয়েছে পারভেজ বাবুর শীষ্যরা। চুড়ান্ত পর্বে খেলতে হলে সেরা পাঁচ রানার্সআপের একটি হওয়ার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সেটা হতে পারেনি বাংলাদেশ। গোলগড়েই পিছিয়ে পড়েছে তারা। আরব আমিরাতের বিপক্ষে ওয়াক ওভার পাওয়ার মাধ্যমে আসর শুরু করেছিল বাংলাদেশ।
দ্বিতীয় ম্যাচে শক্তিশালী ইয়েমেনের বিপক্ষে লগাই করে হার মানে দল। আর শেষ ম্যাচে স্বাগতিক কাতারকে ২-০ গোলে পরাজিত করে রানার্সআপ হয়ে গ্রুপ পর্বের খেলা শেষ করে বাংলাদেশ। বর্তমানে কাতার জাতীয় দলের র‌্যাংকিং ৮৫, অন্যদিকে ১৯৬ নাম্বারে থেকে দুইশ ছোয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। সেই দলকে তাদের মাটিতে পরাজিত করার মতো কঠিন কাজটিই করেছেন ইয়াসিন আরাফাতের দল। এশিয়ার ১০টি অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাছাই প্রতিযোগিতা। সংযুক্ত আরব আমিরাত নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ায় তিন দলের টুর্ণামেন্টে ইয়েমেন কাতারকে ৬-১ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজিত করে। বাংলাদেশ কাতারকে হারিয়ে সেরা রানার্সআপ দলের একটি হওয়ার পথে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। যদিও পথটা বেশ কঠিন। এএফসি অধিভুক্ত ৪৫টি দেশ ১০টি গ্রুপে ভাগ হয়ে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বে পরস্পরের বিপক্ষে খেলছে।
তবে একটু আলাদা বলা যেতে পারে সাফল্যের রাস্তায় থাকা বালিকা ফুটবলারদের। তিন ম্যাচে অংশ নিয়ে সবগুলোতেই পরাজিত হয়েছে বাংলাদেশ, তবে ভবিষ্যতের জন্য আত্ববিশ্বাস সঞ্চয় করেছে বাংলাদেশ। গত বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত এএফসি অনুর্ধ্ব-১৫ বালিকা বাছাই ফুটবল প্রতিযোগিতায় অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপ থেকে নিঃশ্বাস দুরত্বে থাকা এই আসর নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতে থাকে বাংলাদেশের ফুটবলের কর্মকর্তারা।
কিন্তু বড় আসরে এসে প্রত্যাশার সাথে মিললনা প্রাপ্তির মেলবন্ধন। তিন ম্যাচ খেলে সবগুলোতে পরাজিত হয়ে দেশে ফিরে আসে গোলাম রব্বানী ছোটনের শীষ্যরা। যদিও শুরুর পারফরম্যান্সের সাথে শেষের পারফরম্যান্সের উন্নতিটা ছিল চোঁখে পড়ার মতো। প্রথম ম্যাচে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ৯-০ গোলে হারের পর জাপান ও অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পরাজয়ের ব্যবধানটা ছিল তুলনামূলক কম। জাপানের বিপক্ষে ৩-০ গোলে পরাজয়ের পর অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩-২ পরাজয়ে শেষ হয় এবারের মিশন। উত্তর কোরিয়া অনুর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। যদিও ৯-০ গোলের ব্যবধানে পরাজয়টাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। যদিও প্রথম ম্যাচে মাঠে নামার দিন সকালে ৪৫ মিনিটের অনুশীলন করানোর কারণে মেয়েরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সে কারণে ম্যাচে পুরো শক্তি নিয়ে খেলতে পারেনি। যদিও এর দায় পুরোপুরি বর্তায় টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মালির উপর। কারণ বিদেশী এই কোচই সকালে দলকে অনুশীলন করিয়েছেন। যদিও টিম ম্যানেজমেন্ট বলেছে, এতে খেলোয়াড়দের কোন সমস্যা হয়নি। কিন্তু ম্যাচের দিন সকালে সাধারনত অনুশীলন করানো হয়না। করলে সেটা ঐচ্ছিক হিসেবেই করে থাকেন খেলোয়াড়রা।
তবে জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে উজ্জীবিত পারফরম্যান্স দেখিয়েছে লাল সবুজ পতাকাধারীরা। কারণ অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে বর্তমান রানার্সআপ দলের বিপক্ষে লড়াই করে ৩-০ গোলে পরাজয়কে বড় করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের কিশোরী ফুটবলাররা এখনো শেখার পর্যায়ে রয়েছে। শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। যদিও ফিফা র‌্যাংকিংয়ে যেখানে অজিদের অবস্থান ৬ অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬! তবুও মাঠে বুক চিতিয়ে লড়াই করে শেষ মুুহূর্তের গোলে পরাজিত হয় কৃষ্ণা রানী সরকারের দল। যদিও এ ম্যাচে লাল কার্ড পেয়ে মাঠের বাইরে চলে যেতে হয়েছিল কুষ্ণাকে। সে কারণে ১০ জন নিয়ে খেলে অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লড়াই করে বাহবা কুড়িয়েছে ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের তৈরি করা কিশোরীরা।
এখন সাফ ফুটবল নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করে দিয়েছেন ফুটবল ফেডারেশনের মহিলা উইংয়ের কর্মকর্তারা। প্রস্তুতিও শুরু হবে খুব শীঘ্রই। আঠার না পেরুনো কিশোর ফুটবলররা সাফে শুরুটা কি দুর্দান্ত করেছিল! ভারতের বিপক্ষে ৩-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জয় ৪-৩ গোলে। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে মালদ্বীপের বিপক্ষে ০-২ গোলের দুর্দান্ত জয়। তৃতীয় ম্যাচে এসে নেপালের বিপক্ষে ২-১ গোলে পরাজিত হলেও শেষ ম্যাচে ভুটানের বিপক্ষে ২-০ গোলে জিতেছিল লাল সবুজ প্রতিনিধিরা। এখন সেই আত্মবিশ্বাস ভবিষ্যতের জন্য জ্বালানী হিসেবে কারবে বলেই বিশ্বাস ফুটবল বোদ্ধাদের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ