ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 October 2017, ২০ আশ্বিন ১৪২8, ১৪ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গেইল ফিরলেও ভাগ্য ফেরেনি ক্যারিবীয়দের

-নাজমুল ইসলাম জুয়েল
জাতীয় দলের বাইরে থেকেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্রাঞ্চাইজিভিত্তিক টোয়েন্টি-২০ টুর্নামেন্ট খেলে আসছে। ওয়েষ্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলে খেলা নিয়ে জড়িয়েছেন নানা বিতর্কে। সেসব মাড়িয়ে আবারো জাতীয় দলে ফিরেছিলেন এই ড্যাশিং ওপেনিং ব্যাটসম্যান। কিন্তু অনেক রেডর্কের মালিকের জন্য সময়টা বাল যাচ্ছে না। আগামী ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলতে হলে বাছাইপর্ব পেরিয়ে আসতে হবে। সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশটির জন্য যা খুবই কষ্টের একটা বিষয়। ইংল্যান্ড সফরে থাকা প্রথম দুটি ওয়ানডে বিশ্বকাপে জয়ী দেশটি একমাত্র টোয়েন্টি-২০’তে জয় পেয়েছে টোয়েন্টি-২০ ক্রিকেটের বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ম্যাচে ২১ বলে ৩ চার ও ৪ ছক্কায় ৪০ রানের পথে টোয়েন্টি-২০ ইতিহাসের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ১শ’ ছক্কা হাঁকানোর অনন্য নজির স্থাপন করেন গেইল। গেইলের খেইল ক্রিকেট বিশ্ব কম দেখেনি। টেস্টে ৩৩৩, টোয়েন্টি-২০তে ১১৭, ক্লাব টোয়েন্টি-২০তে অপরাজিত ১৭৫ রানের ব্যক্তিগত ইনিংস। তিন ভার্সনে ৪৩৯ ছক্কা। দু-দুটি ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকানো রোহিত শর্মার দিকে তাকিয়ে তবু আফসোস হতো। সেটিও পূর্ণ হয় গত ওয়ানডে বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ডবল সেঞ্চুরির অনন্য কীর্তি গড়লেন ক্যারিবিয়ান ব্যাটিং-দানব। ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ২৪ ফেব্রুয়ারি ক্যানবেরায় ২১৫ রানের অতিমানবীয় ইনিংস উপহার দেন তিনি। ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টে ট্রিপল সেঞ্চুরি, ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরি ও টোয়েন্টি-২০তে সেঞ্চুরির বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ৩৭ বছর বয়সী বাহাতি উইলোবাজ। ছোট্ট ফরমটের রাজা গেইলের ৫২ ম্যাচের ৪৯ ইনিংসে এখন মোট চক্কা ১০৩টি। ৯১ ছক্কায় দ্বিতীয় স্থানে সাবেক কিউই অধিনায়ক ব্রেন্ডন ম্যাককুলাম। পরের স্থানগুলোতে যথাক্রমে ব্রেন্ডন ম্যাককুলাম (নিউজিল্যান্ড)Ñ ৭০ ইনিংসে ৯১ ছক্কা, শেন ওয়াটসন (অস্ট্রেলিয়া)Ñ ৫৬ ইনিংসে ৮৩ ছক্কা, মার্টিন গাপটিল (নিউজিল্যান্ড)Ñ ৫৯ ইনিংসে ৭৬ ছক্কা, যুবরাজ সিং (ভারত)Ñ ৫১ ইনিংসে ৭৪ ছক্কা, ডেভিড ওয়ার্নার (অস্ট্রেলিয়া)Ñ ৬৩ ইনিংসে ৭৪ ছক্কা। দীর্ঘ আড়াই বছর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজ ওয়ানডে দলে ডাক পেয়েছেন ক্রিস গেইল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের জন্য ক্যারিবীয় বোর্ড ঘোষিত দলে সুযোগ পেয়েছিলেন শীর্ষ এ ব্যাটসম্যান। কিন্তু দলকে সফলতার মুখ দেখাতে পারেনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে দ্বন্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে থাকেন ক্রিস গেইল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্যাপ মাথায় ক্রিস গেইল সর্বশেষ ওয়ানডে খেলেন ২০১৫’র মার্চে। গেইলের পাশাপাশি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে দলে ফিরেছেন অপর অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান মারলন স্যামুয়েলস। গত অক্টোবরের পর জাতীয় দলের হয়ে আর ওয়ানডে খেলতে দেখা যায়নি স্যামুয়েলসকে। ওয়ানডেতে গেইলের কথা বলতে গেলে বিশ্বকাপে ১৪৭ বলের ইনিংসটি ছিল ১০টি চার ও ১৬টি ছক্কা দিয়ে সাজানো ২১৫ রানের কথা বিশেষভাবেই বলতে হবে। বিশ্বকাপে এটাই ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান ও ডাবল সেঞ্চুরির প্রথম ঘটনা। রেকর্ড গড়ে গেইলের ফর্মে ফেরার দিনে নির্ধারিত ৫০ ওভারে তার দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২ উইকেটে ৩৭২ রানে পাহাড় গড়ে, পায় ৭৩ রানের বড় জয়। রেকর্ড পার্টনারশিপ জুটির পথে সেঞ্চুরি তুলে নেন সঙ্গী মারলন স্যামুয়েলসও। বিশ্বকাপে তার আগের দুই ইনিংসে করেন ৩৬ ও ৪ রান। গেলকে নিয়ে তাই কথা হচ্ছিল। সমালোচনায় বিদ্ধ হচ্ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ তারকা। জবাব দিয়ে ফেরেন নিজের মতো করে। গড়েন নব-ইতিহাস। কেবল ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংসই নয়, গেইলের অবিশ্বাস্য ব্যাটিংয়ের দিনে স্যামুয়েলসের সঙ্গে জুটিতে সর্বোচ্চ রানসহ রেকর্ড হয়েছে আরও বেশ কয়েকটি। ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস খেলার পথে ব্রায়ান লারার (১০,৩৪৮) পর দ্বিতীয় ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান হিসেবে ৯ হাজার রানের মাইলফলক অতিক্রম করেন গেইল (এখন ৯,২২১)। ২৬৬তম ওয়ানডেতে (ক্যারিয়ার ২৬৯ ওয়ানডে) এটি তার ২২ নম্বর সেঞ্চুরি ইনিংস। বিশ্বকাপে আগের সর্বোচ্চ ছিল গ্যারি কার্স্টেনের। ১৯৯৬-এ ওয়ালপিন্ডিতে আরব আমিরাতের বিপক্ষে ১৮৮ রানে অপরাজিত ছিলেন সাবেক দক্ষিণ আফ্রিকান তারকা। ১৮৩, ১৮১ ও ১৭৫* রান নিয়ে রেকর্ডের তালিকায় পরের তিনটি স্থানে আছেন যথাক্রমে সৌরভ গাঙ্গুলি (১৯৯৯), ভিভ রিচার্ডস (১৯৮৭) ও কপিল দেব (১৯৮৩)। ক্যানবেরার মানুকা ওভালে গেইলের ইনিংসটা ঠিক তার মতো ছিল না। সাধারণত শুরু থেকেই প্রতিপক্ষ বোলারদের ওপর চড়াও হয়ে থাকেন ৩৫ বছর বয়সী জ্যামাইকান তারকা ব্যাটসম্যান। ফর্মে ফিরতে কাল শুরু করে দেখেশুনে। প্রতিপক্ষ ফিল্ডার ও বোলারদের বদান্যতায় একাধিকবার জীবনও পান, যেটির সদ্ব্যবহার করেন রেকর্ড গড়ে! ২৬ বলে ২৪ রান করা গেইল হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ৫১ বলে, ৪ চার ও ২ ছক্কায়। এমনকি সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতেও ছিলেন ধীরস্থির। ১০৫ বলে সেঞ্চুরি পূরনের পথে চার ও ছক্কা মারেন সমান ৫টি করে। সেই তিনিই ২১৫ রানে শেষ করেন ১৪৭ বলে! ভয়ঙ্কর মূর্তিটা ফুটে ওঠে তখনই।
যেখানে চারের চেয়ে ছক্কা বেশি (এবি ডিভিলিয়ার্স ও রোহিত শর্মার সঙ্গে রেকর্ড ১৬টি ছক্কা), সেই ইনিংস কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে মাঠে উপস্থিত ও টিভির সামনে দর্শকরা তা দেখেছেন। পরের শতরান যোগ করার পথে গেইলের ব্যাটিংকে হাইলাইটস বলেই ভ্রম হয়েছে। গোটা ইনিংস ছিল গেইলের কীর্তিগাথায় ভরপুর। বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড, ওয়ানডেতে যৌথভাবে সর্বাধিক ছক্কার মার, একই দিনে ক্যারিবিয়ান তারকা প্রবেশ করেছেন ৯ হাজারি রানের ক্লাবেও। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইতিহাসের জৌলুস বাড়িয়েছেন আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম ভয়ঙ্কর ব্যাটসম্যান। শুরুতে চেনা গেইল ছিলেন খুবই শান্ত, ক্ল্যাসিক্যাল। খেলেছেন মধ্য ব্যাটে, মাঝে মধ্যে অবশ্য খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে ছক্কাও হাঁকিয়েছেন। এভাবেই পেরিয়েছেন হাফ সেঞ্চুরির কোটা, অতঃপর তুলে নিয়েছেন ২২তম সেঞ্চুরি। ১০৫ বলে। এরপরই রক্ষণাত্মক খোলসটাকে একেবারে ছুড়ে ফেলে স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছেন তিনি।
স্যামুয়েলস অন্যপ্রান্তে কেবল যোগ্য সহায়তাই দিয়েছেন। আর চেনা গেইল একের পর এক ছক্কায় ভাসিয়ে দিয়েছেন প্রতিপক্ষকে। ১০০ থেকে ২০০ রানে পৌঁছাতে মাত্র ৩৩টি বল খেলেছেন, ১৩৮ বলে গড়েছেন দ্রুততম ডবল সেঞ্চুরির নতুন রেকর্ডও! আগের দ্রুততম ছিল শেবাগের, ১৪০ বলে। একে একে নিজের ক্যারিয়ার সেরা, এরপর বিশ্বকাপের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরিসহ অনেক কিছু। পেছনে ফেলেন গ্যারি কার্স্টেনের ১৮৮ রানের রেকর্ড। ভারতীয়দের বাইরে প্রথম কোনও ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকান গেইল। ওয়ানডে ইতিহাসে এটি পঞ্চম ডাবল সেঞ্চুরি। আগের চারটিই ভারতীয়দের। যার মধ্যে দু’টি আবার রোহিত শর্মার। গ্রেট শচীন টেন্ডুলকরের সৌজন্যে প্রথমবারের মতো ডবল সেঞ্চুরি দেখেছিল ওয়ানডে ক্রিকেট, গোয়ালিয়রে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। পরের বছর ২০১১ সালে বিরেন্দর শেবাগ ২১৯ রান করে শচীনকে পেছনে ফেলেন, ২০১১ সালে ইন্দোরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ২০১৩ সালের নবেম্বরে ব্যাঙ্গালুরুর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তৃতীয় ভারতীয় হিসেবে ডবল সেঞ্চুরি (২০৯) হাঁকান রোহিত শর্মা। এক বছরের ব্যবধানে গত নবেম্বরে কলকাতায় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৬৪ রানের অতিমানবীয় ইনিংস। একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে দু’-দু’টি ডবল সেঞ্চুরির পাশাপাশি ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড হিসেবে রোহিতের সেই ইনিংস এখনো অক্ষত। স্যামুয়েলসকে নিয়ে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে তোলেন ৩৭২ রান। বিশ্বকাপ তো বটেই, ওয়ানডে ইতিহাসে যে কোন জুটিতেই সর্বোচ্চ রানের নতুন রেকর্ড এটি! বিশ্বকাপে আগের সর্বোচ্চ ৩১৮ রানের জুটি ছিল সাবেক ভারতীয় জুটি রাহুল দ্রাবিড় ও সৌরভ গাঙ্গুলীর, ১৯৯৯-এ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। সর্বোপরি ওয়ানডেতে আগের সর্বোচ্চ জুটি ৩৩১ রানের, শচীন ও দ্রাবিড়ের, ১৯৯৯-এ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ‘আমার ওপর অনেক চাপ ছিল। রান আসছিল না ব্যাটে। ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো এত মানুষ আমার ব্যাটে রান দেখতে চেয়েছে। টুইটারে বার্তার পর’ অনুভূতি গেইলের। এখন বিশ্বকাপ খেলতে যদি গেইলের মতো একজনকে বাছাইপর্বের হার্ডলস পার হওয়ার লড়াইয়ে নামতে হয় তা ক্রিকেটের জন্যই কষ্টের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ