ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 October 2017, ২০ আশ্বিন ১৪২8, ১৪ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হারিয়ে যাওয়া ট্রেডল মেশিনে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও নীতি কবিতা ছেপে বিলি করা হচ্ছে!

জাতীয় জাদুঘরে চলমান মাসব্যাপী ‘বাংলার প্রাচীন মুদ্রণকৌশল’ প্রদর্শনীতে কৌতূহলী দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। ছবিতে বাঁয়ে লেটার বক্স ও ডানে ট্রেডল মেশিন দেখা যাচ্ছে -আরিফুল ইসলাম

সাদেকুর রহমান : একটি টুলে বসে লেটার বক্সের সামনে সীসার অক্ষরগুলো বর্ণক্রমিক সাজাচ্ছেন, গোছাচ্ছেন। স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণগুলো অক্ষরভিত্তিক রাখছেন কাঠের বাক্সের ছোট ছোট কুঠুরীতে। অভ্যস্ত হাতে মগ্ন হয়ে ঝাড়া-মোছা করছেন কুঠুরী ও অক্ষরগুলো। তিনি একজন কম্পোজিটর। আতাউর রহমান জগলু নামের এই ব্যক্তিটি খ্যাতিমান বা ব্যাপক পরিচিত নন। কিন্তু তিনি যে কাজটি করে যাচ্ছেন তা এ যুগে প্রায় বিরল শৈল্পিক কর্ম। গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে জাতীয় জাদুঘরের চলমান মুদ্রণশিল্পের ইতিহাসের ওপর মাসব্যাপী প্রদশর্নীর ২৫তম দিনে এভাবেই দেখা গেলো তাকে। দর্শনার্থীদের ভিড় কেবল লাগতে শুরু করে তখন। দুপুরের পর থেকে তো প্রচন্ড ভিড় ছোট্ট পরিসরের প্রদর্শনী চত্বরে।
রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের প্রধান লবিতে ঢুকতেই হাতের ডান পাশে অনুসন্ধান ডেস্কের সামনে চলছে ‘অক্ষরযোজনার মাধ্যমে বাংলার প্রাচীন মুদ্রণকৌশল’ শীর্ষক এ প্রদশর্নী। তরুণ প্রজন্মকে মুদ্রণকৌশলের ইতিহাস জানাতে ও দেশের মুদ্রণ শিল্পের বিবর্তন নিয়েই এ প্রদর্শনী। এটি শুরু হয়েছে গত ৯ সেপ্টেম্বর, চলবে আগামী ৯ অক্টোবর পর্যন্ত। জাদুঘরের সময়সূচি অনুযায়ী প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সর্বস্তরের দর্শকদের জন্য প্রদর্শনী উন্মুক্ত থাকছে। এর জন্য কোন টিকিট কাটতে হয় না।
প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী প্রদশর্নী উপভোগ করছেন। অনুসন্ধান ডেস্ক থেকে জানা গেছে, এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১৫ হাজার দর্শনার্থী প্রদর্শনীটি দেখেছেন। প্রচারণার অভাবে এমন ব্যতিক্রমধর্মী একটি প্রদর্শনীও কাক্সিক্ষত দর্শনার্থী পায়নি বলে অভিযোগ ঊঠেছে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এর জবাবে বলেছেন, আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে গণমাধ্যমে এর বিজ্ঞাপন দেয়া যায়নি।
প্রদশর্নীতে প্রাচীন আমল  থেকে গত শতকের সত্তর দশক পর্যন্ত মুদ্রণ ও মুদ্রণ শিল্পের ইতিহাস প্রদর্শিত হচ্ছে। কিভাবে অক্ষর সংযোজন করে প্লেট বানিয়ে ট্রেডল মেশিন দিয়ে ছাপার কাজ অতীতে হতো তা প্রদর্শিত হচ্ছে। কিভাবে নিউজপ্রিন্ট ভিজিয়ে কালি দিয়ে অক্ষর তুলে  লেখার প্রুফ  দেখা হতো তাও দেখানো হচ্ছে দর্শণার্থীদের। সীসা ব্লক ও লাইনো ব্লকের সীল মোহর, লেখার অনুলিপি প্রদর্শন করা হচ্ছে। এ ছাড়াও দেশ-বিদেশে মুদ্রণ ও মুদ্রণযন্ত্রের ইতিহাস সম্পর্কে দর্শকদের ধারণা দেয়া হচ্ছে মুদ্রণযন্ত্রের ইতিহাস প্রদর্শনের মাধ্যমে।
বর্তমান প্রজন্মের যুবক ও শিশু-কিশোররা প্রদশর্নী থেকে দেশের মুদ্রণশিল্পের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পারছেন। প্রদশর্নীতে গিয়ে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ ও ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’ নীতি কবিতা ট্রেডল মেশিনে ছাপিয়ে কপি দর্শনার্থীদের মধ্যে বিলি করা হচ্ছে। এই প্রজন্মের মানুষ, যারা ট্রেডল মেশিন দেখেনি, তারা এই মুদ্রণকৌশল প্রত্যক্ষ করে নিজেদের মেধাকে পরিপুষ্ট করছে। ট্রেডল মেশিনটি পরিচালনা করছেন জগলুর আরেক সহকর্মী মো. গিয়াস উদ্দিন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এ মেশিনটির বয়স কমপক্ষে ৮০ বছর হবে বলে জগলু জানান।
মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকায় বেড়াতে আসা শামীমসহ কয়েকজন যুবক বলছিলেন, এই মেশিনটা (ট্রেডল) প্রথম দেখলাম। ছাপার জগতে একদিন আমাদের দেশে এই মুদ্রণযন্ত্র ছিল, তা দেখতে পেরে ভাল লাগছে। তারা আরো বলেন, এমন মুদ্রণের প্রেস এ দেশে ছিলো,তাতে বুঝা যায়, কত কষ্ট করে আগে বই ছাপা হতো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাবিভাগের ছাত্র আরমান সিদ্দিকী জানায়, এখন তো কত সহজে সবকিছু ছাপা হচ্ছে। আমাদের দেশে মুদ্রণশিল্পের প্রাচীন যুগের ওপর এই প্রদশর্নী করে জাদুঘর একটা দারুন ভাল কাজ করলো। এখনকার মানুষ তো জানেই না-আগে কি মেশিন দিয়ে ছাপার কাজ হতো।
টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার আতাউর রহমান জগলু পৈতৃক সূত্রেই প্রিন্টিং প্রেস ব্যবসায়ী। তার মাীলকানাধীন ‘শরীফ প্রিন্টার্স’ রাজধানীর হাতিরপুল ইস্টার্ন প্লাজার পেছনে অবস্থিত। প্রাচীন মুদ্রণ যন্ত্র সংগ্রহ ও প্রদর্শনের ব্যাপারে তারও যথেষ্ট আগ্রহ-উদ্দীপনা রয়েছে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাকে আড়াই লাখ টাকা সম্মানীর বিনিময়ে প্রদর্শনীতে এনেছে। পুরো প্রদর্শনীটিই জগলুর ব্যবস্থাপনায় হচ্ছে। প্রদর্শনী শেষে লেটার বক্স সহ সরঞ্জামাদি জাদুঘরের কাছে তিনি হস্তান্তর করবেন। অবশ্য এর জন্য জাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাকে অর্থমূল্য নির্ধারণ করে তা পরিশোধ করবেন বলেও তিনি এ প্রতিবেদককে জানান। তিনি আরো জানান, আনুষ্ঠানিক সমাপনী আগামী ৯ অক্টোবর হলেও আগের দিনই প্রদর্শনী গুটিয়ে ফেলা হবে। অর্থ্যাৎ এই প্রদর্শনী শেষ হতে কার্যত আর মাত্র চারদিন বাকি আছে।
আনুমানিক ১৮৪৭ সালে রঙ্গপুর বার্তাবহ মুদ্রণের জন্য রংপুরে বাংলাদেশের প্রথম মুদ্রণযন্ত্র স্থাপিত হয়। ঐ যন্ত্র থেকে ‘দি ঢাকা নিউজ’ নামের একটি সাপ্তাহিক ইংরেজি সংবাদপত্র প্রকাশ করা হয়েছিল। কালের আবর্তে প্রতিনিয়ত বাংলার মুদ্রণ শিল্প অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। কম্পিউটার প্রযুক্তিতে মনির, বিজয় বাংলা, বিজয় ৭১, অভ্র মুদ্রণ শিল্পকে যুগপযোগী করে বাংলা ভাষাকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছে।
জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টি শিল্পী হাসেম খান বলেন, বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে আমাদের মুদ্রণশিল্পের ইতিহাস হারিয়ে যাচ্ছে। বিগত শতকের পঞ্চাশ ও ষাট দশকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পের ইতিহাস একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জাদুঘরের এই প্রদর্শনী নতুন প্রজম্মের মানুষের কাছে একটি অসাধারণ বিষয়। তারা জানতে পারছে কিভাবে অতীতে আমাদের মুদ্রণশিল্পে ছাপার কাজ হয়েছে।
বিশিষ্ট লেখক আলী ইমাম বলেন, সভ্যতার সূত্রপাত ঘটে লিপির মধ্যদিয়ে। লিপি থেকে অক্ষর, এইভাবে সভ্যতার বিকাশ ঘটে। লিপি থেকেই মুদ্রণশিল্পের বিকাশ ঘটে। ১৮৪০-এ বর্ণ পরিচয় ছাপা হলো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কল্যাণে। বাংলা টাইপোগ্রাফি দৃঢ়তা পেলো। বাংলা টাইপের সুশোভন রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে তিনি জানান।
জাতীয় জাদুঘর থেকে জানানো হয়, জাদুঘর কুষ্টিয়ার কুমারখালিতে কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছে। সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথকে কেন্দ্র করে প্রাচীন মুদ্রণযন্ত্রে বাংলা মুদ্রণের একটি ইতিহাস এ জাদুঘরে রূপায়িত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় জাদুঘর এই প্রদশর্নীর ব্যবস্থা করেছে। সীসার মুদ্রাক্ষর বা সচল পেডাল বা ট্রেডল মেশিন এখন আর পাওয়া যায় না। সীসার মুদ্রাক্ষর তৈরির কারখানা বা ফাউন্ড্রিগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। তাই এ প্রদর্শনী শেষে মুদ্রাক্ষর এবং মুদ্রণযন্ত্র জাতীয় জাদুঘরে স্থায়ীভাবে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে।
জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী বলেন, লেটার প্রেস এখন মুদ্রণশিল্পের ইতিহাস। ভুরুঙ্গামারিতে আঠারো শতকের মধ্যভাগ থেকে এই লেটার প্রেসটি চালু রয়েছে। সমকালীন সভ্যতাকে ধারণ করার জন্য যে সকল উপাদান এখনো টিকে আছে তার মধ্যে মুদ্রণযন্ত্রটি অন্যতম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ