ঢাকা, শুক্রবার 6 October 2017, ২১ আশ্বিন ১৪২8, ১৫ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আইন-নীতিমালার অভাবে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা নদী হত্যা করছে

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীতে নদী বিষয়ক এক সংলাপ অনুষ্ঠানে পরিবেশকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে নদী রক্ষায় সুনির্দিষ্ট কোনো আইন ও নীতিমালা না থাকায় রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নদী হত্যা করছে। আবার সরকারের কাঠামোগত দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নদী রক্ষার উদ্যোগকে বাধা দিচ্ছে রাজনৈতিক কর্মীরা। এর মূলে রয়েছে ভোটের রাজনীতি। তারা আরো বলেন, সরকারের মনোযোগের অভাবে নদী কমিশন আজো পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান হতে পারেনি এবং নদীর জন্য কাজ করতে পারছে না কমিশন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর সিরডাপ মিলনায়তনে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত ‘নদীর অধিকার-নদীতে অধিকার’ শীর্ষক সংলাপে তারা এ মন্তব্য করেন। এতে আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সদস্য শারমিন মুরশিদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল মতিন, নদী বিষয়ক আইন বিশেষজ্ঞ হাসনাত কাইয়ূম, সংসদ সদস্য টিপু সুলতান, ফজলে হোসেন বাদশা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মঞ্জুরুল কিবরিয়া, একশনএইড বাংলাদেশের পরিচালক আসগর আলী সাবরি প্রমুখ।

নদী রক্ষায় সরাকারি কাঠামোর সমালোচনা করেন খোদ জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সদস্য শারমিন মুরশিদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নদী ও পানির অধিকার রক্ষায় নদী কমিশন করা হয়েছে। তবে দুঃখজনক হলো, নদী কমিশন এখন একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠান। গেল তিন মাস ধরে চেয়ারম্যান নেই। এটি একটি অসম্পূর্ণ কাঠামোর মধ্যে রয়েছে। গবেষণা ও কাজের জন্য নেই পর্যাপ্ত বাজেট। ফলে নদীর জন্য কাজ করতে পারছে না নদী কমিশন।

শারমিন মুরশিদ আরো বলেন, নদী বাঁচাতে গবেষণায় জোর দিতে হবে। বাড়াতে হবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা। নদীর জন্য আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা অত্যন্ত দুর্বল। নিজেরা যখন নড়বড়ে কাজ করি, তখন আন্তর্জাতিকভাবে আমরা দুর্বল হয়ে যাই। নদী বাঁচাতে তাই আন্তর্জাতিক শক্তিশালী কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।

পরিবেশকর্মী ডা. আব্দুল মতিন বলেন, দেশের ৫০০ নদী স্লুইস গেট দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। আমাদের সরকারের নদী নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতি নেই। নেই কোনো আইন। হাইকোর্টের রায় আছে নদী রক্ষার্থে। কিন্তু সরকার ও প্রভাবশালীরা সেটা মানছে না। স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা চাইছে না নদী রক্ষা করতে। সরকারের দুর্বলতার কারণে রাজনৈতিক কর্মীরা নদী রক্ষায় বাধা দিচ্ছে।

নদী বিষয়ক আইন বিশেষজ্ঞ হাসনাত কাইয়ূম বলেন, বাংলাদেশে কয়েকশো নীতি আছে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে-বাংলাদেশে কোনো নদী নীতিমালা নেই। ফলে নদীকে যে যার মতো করে হত্যা করছে। 

সরকারের অংশীদল ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরো এবং স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত্র সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, আমাদের সঙ্গে ভারতসহ এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটা মনস্তাত্ত্বিক বৈরিতা রয়েছে। এসব আঞ্চলিক রাজনীতির কারণেও নদী নির্যাতিত হচ্ছে। আমি ব্যারেজের বিরুদ্ধে, পদ্মায় ব্যারেজ দরকার নেই, ফারাক্কা ভেঙে দেয়ার পক্ষে। বাংলাদেশ ও ভারতের ৫৪টি নদী উন্মুক্ত করতে হবে। ভারতের সঙ্গে এতে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। বন্ধুত্বও বাড়বে। আমরা যদি নদীকে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করতে পারি, তাহলে সমস্যার অনেকাংশের সমাধান হবে।

তিনি বলেন, ফারাক্কা ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে ভারতের জনগণ ও বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে কোনও বাধা নেই। যে কারণে ফারাক্কা বাঁধ দেওয়া হয়েছিল তার কোনও প্রয়োজন নেই। হুগলী নদীতে পানি প্রবাহ যা প্রয়োজন ফারাক্কায় বাঁধ না থাকলেও তা থাকবে। আলাদা করে জাহাজ ভোড়াতে ফারাক্কা বাঁধ রেখে দুই দেশের মানুষের ক্ষতি করা ছাড়া আর কোনও কাজ নেই। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ফারাক্কা বাঁধের প্রয়োজন নেই। নদী বাঁচাতে নদীপাড়ের জনগণকে নিয়ে মোর্চা গঠন করে আন্দোলনে নামারও আহ্বান জানান ফজলে হোসেন বাদশা।

টিপু সুলতান এমপি বলেন, আমরা আমাদের নিজেদের স্বার্থে নদীর ওপর অত্যাচার করি। যে নদী আমাদের বাঁচিয়ে রাখছে, সেই নদীকে আমরা দখল করছি। মেরে ফেলছি। ভোটের রাজনীতির কারণে আমরা জনপ্রতিনিধিরা অনেক সময় নদী রক্ষায় প্রতিবাদ করতে পারি না। কারণ, কর্মীরা অসন্তুষ্ট হবে বলে।

অধ্যাপক মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, আশির দশক থেকে নদী ধ্বংস শুরু হয়েছে। দুঃখের বিষয় হচ্ছে- নদী নিয়ে আমাদের যথাযথ পরিসংখ্যান নেই। বাঁধগুলো নদীর জন্য ক্যান্সারের মতো। বাংলাদেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে নদী রক্ষা করতেই হবে। তাই শক্তিশালী করতে হবে নদী কমিশনকে। প্রয়োজন আলাদা মন্ত্রণালয়ের।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের পরিচালক আসগর আলী সাবরি বলেন, নদীর নিজস্ব একটা অধিকার আছে। সেটা রক্ষা করতেই হবে। তা না হলে আমাদের ইতিহাস, কৃষি, অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই আইন, কাঠামো ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে নদী রক্ষা করতেই হবে।

অনুষ্ঠানে পানি ও নদী অধিকার রক্ষায় কিছু সুপারিশ তুলে ধরে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে, নদীর জন্য আইন ও নীতিমালা তৈরি, নদীসহ সব জলাধার নির্মিত পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতিকর সব স্লুইস গেইট, ড্যাম ও অন্যান্য কৃত্রিম স্থাপনা অপসারণ, পানি সংক্রান্ত যেকোনও দ্বি-পাক্ষিক বা আঞ্চলিক আলোচনা বিষয়ে জনগণকে জানার সুযোগ দেয়া, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে আরো শক্তিশালী করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ