ঢাকা, শনিবার 7 October 2017, ২২ আশ্বিন ১৪২8, ১৬ মহররম ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বাঙ্কার করে সীমান্তে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধের উস্কানি দিচ্ছে মিয়ানমার বাহিনী

সংগ্রাম ডেস্ক : মিয়ানমার সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক রীতি লংঘন করে বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থান নিয়েছে। সীমান্তে বাঙ্কার স্থাপন করে মগসেনারা যুদ্ধের উস্কানি দিচ্ছে বলে জানা গেছে। সীমান্তে এ ধরনের সেনা মোতায়েন আন্তর্জাতিক রীতির লঙ্ঘন। এ অবস্থায় বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তে শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি নজরদারি বাড়িয়েছে।

এদিকে মগবাহিনী মংডুতে দু’শ’ বছরের একটি প্রাচীন মাদরাসা পুড়িয়ে ফেলেছে। মাদরাসার বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের পর ৫ দিন ধরে আগুন জ্বলতে থাকে এবং সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কুরআন-হাদীসসহ অসংখ্য দুর্লভ গ্রন্থ ছিল এ মাদরাসায়। সবই শেষ হয়ে যায় আগুনে পুড়ে। এই মাদরাসার অধিকাংশ শিক্ষককে হত্যা করা হয় বলে বাংলাদেশে আগত প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গারা জানায়। এটা মংডুর মিয়াজানপুর জামিয়া মাদরাসা।

অপর এক খবরে জানা গেছে, রোহিঙ্গা সংকটের ব্যাপারে সহযোগিতা বাতিল ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে মিয়ানমারকে চাপ দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখন কিছু করতে চায় না যাতে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে মোড় নিতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ কথা জানান।

বংলাদেশের সীমান্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনী যুদ্ধের উস্কানি দিচ্ছে

সময় টিভির খবরে বলা হয়, আন্তর্জাতিক রীতি লঙ্ঘন করে বংলাদেশের সীমান্তে অবস্থান নিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সীমান্তে তারা বাংকার স্থাপন করে যুদ্ধের উস্কানি দিচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘সীমান্তে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে দেশের বর্ডার বাহিনী। সেনাবাহিনী মোতায়েন আন্তর্জাতিক রীতির লঙ্ঘন।’ এ অবস্থায় সীমান্তে শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি।

বান্দরবান পার্বত্য জেলার তমব্রু সীমান্ত ঘেঁষে গত তিনদিন ধরে অবস্থান করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একটি দল। সকাল-দুপুর এবং সন্ধ্যায় দিনের তিনভাগে তাদের দায়িত্ব পরিবর্তন হচ্ছে। তিনটি ট্রাকে করে ওই পয়েন্টে বর্ডার গার্ড পুলিশের পাশাপাশি আসা-যাওয়া করছে মিয়ানমার সেনাবহিনীর সদস্যরা। বর্ডার গার্ড পুলিশ সদস্যরা তারকাঁটা স্থাপন করলেও সেনাসদস্যরা দূরে অবস্থান নিয়ে থাকছে।

শুধু তমব্রু সীমান্ত নয়। বাংলাদেশের চাকমা পাড়া এবং বাইশারী সীমান্ত এলাকায়ও অবস্থান নিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তবে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিতে তারা দিনের বেশিরভাগ সময় ঘনজঙ্গলে অবস্থান নিয়ে থাকে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। তমব্রু-চাকমা পাড়া এবং বাইশারী এলাকার জিরো পয়েন্ট বা নো ম্যান্স ল্যান্ডে অন্তত ১৫ হাজার রোহিঙ্গার অবস্থান রয়েছে।

তবে সীমান্ত পরিদর্শনে আসা পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এ ধরনের উস্কানিমূলক কাজে বাংলাদেশ জবাব দেবে না । পলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান বলেন, আমরা বিশ্ব জনমতসহ কূটনৈতিকভাবে এই সমস্যার সমাধান চাই।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব: ) এমদাদুল বলেন, সীমান্তে সেনাবাহিনী মোতায়েন আন্তর্জাতিক রীতির লঙ্ঘন। সীমান্তে নো ম্যান্স ল্যান্ডে এই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে তা আন্তর্জাতিক রীতির সরাসরি লঙ্ঘন।

এদিকে সীমান্তে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। লে কর্ণেল মঞ্জুরুল হাসান খান বলেন, আমরা একে হুমকি মনে করছি না। অন্যদিকে আমাদের আর যা যা করা প্রয়োজন তা করছি। 

এর আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ও ড্রোন ওড়ানো, স্থল মাইন স্থাপন এবং কাঁটাতারের বেড়া স্থাপনের মধ্য দিয়ে একাধিকবার সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করেছে। প্রতিটি ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে বিজিবি এবং বাংলাদেশ সরকার।

দুই শ’ বছরের পুরনো মিয়াজানপুর জামিয়া মাদরাসা পুড়িয়ে ফেলা হয়

মিয়ানমারে বর্মিবাহিনী ও উগ্রবাদী বৌদ্ধরা যেসব মাদরাসা আগুনে পুড়িয়ে ফেলেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো মংডুর মিয়াজানপুর জামিয়া মাদরাসা। মংডুর মিয়াজানপুরে যার অবস্থান। আগুন দেয়ার পর ৫ দিন ধরে তা জ্বলে সব কিছু ছাই করে দেয়। কুরআন-হাদিস ছাড়াও শত শত বছরের পুরনো অনেক কিতাব ছিল এই মাদরাসায়। যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করতেন। এই মাদরাসার বেশির ভাগ শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন।

টেকনাফের উইঞ্চিপ্রাংয়ের ঠিক উল্টো দিকে নাফ নদীর পূর্ব দিকে মিয়াজানপুর। এখানেই অবস্থান দুইশ’ বছরের পুরনো মাদরাসাটির। নাম মিয়াজানপুর জামিয়া মাদরাসা। মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুসলিম শিক্ষার্থীরা এই মাদরাসায় শিক্ষা গ্রহণের জন্য আসতেন। এখান থেকে অত্র অঞ্চলের অনেক বিখ্যাত আলেম বের হয়েছেন। ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে ওই মাদরাসাটিতে আগুন লাগায় বর্মি সেনা ও উগ্রবাদী বৌদ্ধরা। ২৫ আগস্ট সেনাবাহিনী ও নাডালা বাহিনীর আক্রমণ শুরু হওয়ার পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা যেমন ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশে ছুটে আসেন, তেমনি এই মাদরাসার অনেক ছাত্র-শিক্ষকও মাদরাসা ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে আশ্রয় নেন। তখনো কিছু আলেম ওই মাদরাসায় অবস্থান করছিলেন।

রোহিঙ্গারা বলেন, চার একর জমির ওপর এই মাদরাসাটির অবস্থান। ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে আগুন লাগানোর পর ৫ দিন সেখানে আগুন জ্বলেছে। আগুন লাগিয়ে সেখানে উল্লাস করেছে মগরা। ওই এলাকারই বাসিন্দা আব্দুস শুকুরের ছেলে নুর করিম জানান, আগুন লাগানোর দৃশ্য তারা প্রত্যক্ষ করেছেন। ওখানে একটি দোতলা ভবনও ছিল। পুরো কম্পাউন্ডে পাউডার দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয় মগরা। সে সময় বর্মি সেনারা অস্ত্র হাতে পাহারা দেয়। যেসব শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সেখানে অবস্থান করছিলেন তাদেরকে ধরে নেয়া হয়।

নুর করিম জানান, ২৫ আগস্টের আগে এই মাদরাসার আলেম ও শিক্ষার্থীদের দেখা করার নির্দেশ দিয়েছিল বর্মি সেনারা। সেনাক্যাম্পে যারা গিয়েছিলেন তাদের কেউ আর ফেরেননি।

নুর করিম বলেন, ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসেও এই মাদরাসায় সেনাবাহিনী অভিযান চালায়। তখন অনেক মূল্যবান কিতাব চুলার আগুনে দিয়ে তাতে ভাত রান্না করে খায় বর্মি সেনারা। ওই সময় তারা রুমে রুমে তল্লাশি চালায়। পরে সব আলেমকে ডেকে নিয়ে সবাইকে সেনাবাহিনীর অভিযানে সহায়তা করার নির্দেশ দেয়া হয়।

মিয়াজানপুরের বাসিন্দা জমির হোসেনের ছেলে ওসমান গনি বলেন, ওই মাদরাসায় ১১২ জন প্রখ্যাত আলেম ছিলেন। যারা সেখানে শিক্ষকতা করতেন। এই মাদরাসায় মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুসলিম ছাত্ররা এসে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। ২৫ আগস্টের আগে এই মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের ডেকে নেয়া হয়। যারা সেনাবাহিনীর ডাকে গিয়েছিলেন তাদের কেউ আর ফিরে আসেননি। আর ২৫ আগস্ট অভিযান শুরুর পর অনেকেই মাদরাসা ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু মাদরাসার প্রধান আলেম মৌলভী আব্দুল্লাহ তার পরিবার-পরিজন নিয়ে সেখানেই অবস্থান করছিলেন। তার কী দশা হয়েছে তা জানাতে পারেননি নুর করিম ও ওসমান গনি। তারা বলেন, হয়তো পুরো পরিবারসহ মৌলভী আব্দুল্লাহকে মেরে ফেলা হয়েছে।

আব্দুস সালামের ছেলে শামসু বলেন, শুধু মিয়ানমারেই নয়; আশপাশের মুসলিম দেশগুলোর আলেম-ওলামাদের কাছে এই মিয়াজানপুর মাদরাসাটি অতি পরিচিত। শত শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য এই মাদরাসাটি। বর্মি সেনাবাহিনী ও উগ্র মগদের দেয়া আগুনে পুড়ে ৫ দিনে তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

রয়টার্স জানায়, মিয়ানমারে মার্কিন সহায়তা বন্ধ ও নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেশটির সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। তবে এমন কোনও পদক্ষেপ নিতে চান না তারা যাতে করে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে মোড় নেয়। শুক্রবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের উপর সরকারি বাহিনীর হামলা বন্ধ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির এক শুনানিতে দেশটির পররাষ্ট্র দফতরের ভারপ্রাপ্ত উপমন্ত্রী প্যাট্রিক মার্ফি বলেন, ‘আমরা এমন কিছু করতে চাই না যাতে রোহিঙ্গাদের দুন্দশা বেড়ে যায়। আমরা পরিস্থিতি জটিল করতে চাই না।’

২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের মুখে পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর এই নিপীড়নকে জাতিসংঘ জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মিয়ানমার এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে তারা। সহিংসতা শুরু হওয়ার পর প্যাট্রিক মার্ফি মিয়ানমার সফর করেছেন।

এই নিধনযজ্ঞের সমালোচনা শুরু হয় বিশ্বজুড়ে। রোহিঙ্গাদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে থাকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। জাতিসংঘসহ অন্যান্য সংস্থাও মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আইনপ্রণেতারাও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

যুক্তরাষ্ট্রে ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান এড রয়েস বলেছেন, ‘সু চি জাতিগত নিধনযজ্ঞের কথা অস্বীকার করলেও বিষয়টি সত্য। এটা নিয়ে তার কথা বলা উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই অপরাধে জড়িতদের অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে। তার (সু চি) ও সামরিক নেতাদের এগিয়ে আসতে হবে। এটা অবশ্যই জাতিগত নিধনযজ্ঞ।’

এই কমিটির ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষনেতা এলিয়ট অ্যাঞ্জেল বলেন, ‘ওয়াশিংটনের উচিত মিয়ানমারের সরকার ও সেনাবাহিনীর উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা।’ 

এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে কমিটির পক্ষ থেকে। রিপাবলিকান রিপ্রেজেন্টেটিভ স্কট পেরি বলেন, ‘আমরা এখানে সাদা শার্ট ও স্যুট পরে বসে আছি। আর ওখানে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে ও দেশ থেকে বিতাড়ন করা হচ্ছে। কাউকে না কাউকে পদক্ষেপ নিতেই হবে।’

মার্ফি জানান, এই মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। 

ফরেন কমিটি প্যানেলের এশিয়া সাব-কমিটির চেয়ারম্যান টেড ইউহো প্রশ্ন তুলেন, রাখাইনে জাতিসংঘ পর্যবেক্ষকদের তদন্তের অনুমতি দেওয়ার আগ পর্যন্ত মিয়ানমারে মার্কিন সহায়তা বন্ধ করলে তা কার্যকর হবে কিনা। 

হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শী আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক মার্কিন সস্থা ইউএসএইড-র কেট সোমভংসিরি জানান, বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতির ভয়াবহতায় আমাদের অবশ্যই সবগুলো উপায় বিবেচনায় রাখতে হবে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ